শূন্য ক্যানভাসে চেনা কোলাহল ব্রজ গোপাল চ্যাটার্জ্জী শিয়ালদহ মেইন লাইনের ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মটা আজ বড় নিঝুম। সৌন্দর্যায়নের খাঁচায় বন্দি স্টেশনটি আজ সম্পূর্ণ হকারমুক্ত। অফিসটাইমের সেই পরিচিত হাঁকডাক—"চা-গরম" কিংবা "ঝালমুড়ি"—সবই আজ উধাও। ওভারব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে অর্কর মনে পড়ল কলেজজীবনের সেই ডেলি প্যাসেঞ্জারির দিনগুলো। ভিড় ঠেলে ট্রেনের হ্যান্ডেল ধরার যুদ্ধ আর ক্লান্তি ধুয়ে দেওয়া এক ভাঁড় চা। পাশেই ভেসে উঠল তিতলির মুখ; হকারের থেকে আলুকাবলি কিনে ঝাল লেগে চোখ লাল হওয়া আর ওদের খুনসুটি—সবই এই প্ল্যাটফর্মের স্মৃতি। আধুনিক কর্পোরেট পরিচ্ছন্নতার চাদরে ঢাকা স্টেশনটা আজ বড় বেশি গোছানো, কিন্তু মায়াহীন। "বাবু, একটা কলম নেবেন? খুব ভালো লেখে।" চেনা কণ্ঠস্বরে অর্কর ভাবনায় ছেদ পড়ল। মলিন পোশাক, তাড়া খাওয়া ত্রস্ত চোখে এক যুবক সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। হাতে গোটাচারেক সস্তা বলপেন। মুখের দিকে তাকাতেই অর্কর বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। এ তো কলেজজীবনের সেই ঝালমুড়িওয়ালা কেষ্টদার ছেলে সনাতন! পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবার চিকিৎসার খরচ আর নিজের পড়াশোনার দায় মেটাতে আজ সে ফেরিওয়ালা। ...
অনুর অপেক্ষা নাজিরুল ইসলাম গ্রামের নাম জলামাদুল। গ্রাম বললে অবশ্য ভুলই বলা হবে, আসলে সেটি এক অজপাড়া গাঁ। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ চাষবাস করেই জীবন ধারণ করে। শহরের আধুনিক হাওয়া এখানে এখনো এসে পৌঁছায়নি। কাঁচা-পাকা রাস্তা, তাই বর্ষাকালে জল জমে কাদা প্যাচপ্যাচে হয়ে থাকে। গ্রামে গাছপালা, জলাজমি, পুকুর, ধান রাখার মরাই আর খড়ের গাদা—সবই আছে। এই প্রাকৃতিক সুন্দর পরিবেশে মানুষের সংখ্যা খুব কম। সব মিলিয়ে কুড়ি-বাইশটি ঘর হবে, সবাই সবাইকে চেনে। সন্ধ্যার পর গ্রামের বয়স্ক মানুষেরা একজোট হয়ে আড্ডা জমায়, তারপর হুঁকোয় টান দিতে দিতে যে যার বাড়ি চলে যায়। গ্রামের ঠিক মাঝখানে একটা একলা দোকান—চায়ের দোকান। দোকান বলতে বাঁশের খুঁটি, টালির ছাউনি আর সামনে পাতা দুটো কাঠের বেঞ্চ। দোকানটা চালায় অনু। অনুর বয়স ১৯ কিংবা ২০ হবে। শ্যামবর্ণের রোগাটে চেহারা, গোলগাল মুখ। তবে তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো জোড়া ভুরুর নিচে একজোড়া নীল চোখের মণি, যা তাকে আর পাঁচটা মানুষের থেকে আলাদা করে। অনু অনাথ। কীভাবে সে মানুষ হয়েছে, সে নিজেও তা ভালো করে জানে না। আপনজন বলতে এক দাদি ছ...