আমি বাংলাকে ভালবাসি
সৌম্য পাল
শহরের কোলাহল পেরিয়ে যখন রাত নামে তখন অর্কর ঘরে অদ্ভুত এক নীরবতা ভর করে। সারাদিন ইংরেজি শব্দে ঘেরা জীবন—ইমেল কল মিটিং ও ডেডলাইন। কিন্তু রাত হলেই সে জানালার ধারে এসে দাঁড়ায় আর মনে মনে অজান্তেই ভেসে ওঠে কিছু বাংলা শব্দ। সেই শব্দগুলোর কোনো নির্দিষ্ট মানে নেই তবু তারা অর্ককে নিজের মতো করে জড়িয়ে ধরে।
অর্কর জন্ম এক মফস্সলে। ছোট্ট শহর যেখানে সন্ধ্যেবেলা চায়ের দোকানে বসে মানুষ রাজনীতি থেকে রবীন্দ্রসংগীত—সব নিয়ে আলোচনা করত বাংলায়। স্কুলের প্রথম দিন প্রথম কবিতা আবৃত্তি প্রথম প্রেমপত্র—সবই লেখা ছিল বাংলায়। তখন সে জানত না এই ভাষাই একদিন তার পরিচয়ের সবচেয়ে শক্ত ভিত হয়ে দাঁড়াবে।
কলেজে উঠে অর্ক শহরে আসে। ধীরে ধীরে বাংলার জায়গা দখল করে নেয় অন্য ভাষা। প্রথমে প্রয়োজনের তাগিদে পরে অভ্যাসে। বন্ধুমহলে বাংলা বললে অনেকে মজা করত এত আবেগ কেন? অর্কও হাসত কিন্তু কোথাও যেন কিছু একটা খসে পড়ত ভেতর থেকে।
একদিন অফিসে এক সহকর্মী তাকে বলেছিল
তোমাদের বাংলা ভাষাটা খুব মিষ্টি শোনায় কিন্তু প্রফেশনাল লাইফে তো ওটার দরকার পড়ে না।
অর্ক সেদিন কোনো উত্তর দেয়নি। শুধু মনে মনে প্রশ্ন করেছিল ভাষার কি শুধু দরকারের হিসেব থাকে?
সেই রাতে সে অনেকদিন পর পুরোনো ডায়েরিটা খুলে বসে। পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে। ভেতরে কলেজ জীবনের কবিতা ছোট গল্প কিছু অসম্পূর্ণ ভাবনা। সবই বাংলায়। নিজের হাতের লেখায় লেখা শব্দগুলো পড়ে তার মনে হলো—এই অর্কটাই তো সে ছিল যে খোলা মনে অনুভব করতে পারত।
কয়েকদিন পর সে বাড়ি গেল। মা এখনো সকালে রেডিওতে খবর শোনেন বাংলায়। বাবা সন্ধ্যেবেলা খবরের কাগজ পড়েন বাংলায়। অর্ক লক্ষ করল এই ভাষার ভেতরেই তাঁদের সমস্ত জীবন লুকিয়ে আছে হাসি দুঃখ রাগ ও ভালোবাসা।
সেদিন সন্ধ্যায় সে পাড়ার মাঠে হাঁটতে বেরোল। সেখানে কয়েকজন কিশোর মোবাইলের স্ক্রিনে মুখ গুঁজে বসে আছে। তাদের কথা শুনে অর্ক বুঝল বাংলাটা যেন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে ভাঙা ভাঙা হয়ে। হঠাৎ তার ভেতরে এক অদ্ভুত তাগিদ জন্ম নিল।
শহরে ফিরে অর্ক একটা সিদ্ধান্ত নিল। সে সপ্তাহান্তে বাংলার ক্লাস নেবে গল্প লেখা কবিতা পড়া নিজের কথা নিজের ভাষায় প্রকাশ করার জন্য। প্রথম দিন মাত্র চারজন এল। অর্ক একটু হতাশ হলেও থামেনি। সে জানত ভাষার প্রতি ভালোবাসা জোর করে শেখানো যায় না কিন্তু তাকে সামনে এনে রাখা যায়।
ধীরে ধীরে ক্লাসে লোক বাড়তে লাগল। কেউ অফিসের কাজের চাপ থেকে মুক্তি পেতে এসেছে কেউ নিজের সন্তানকে বাংলার সঙ্গে পরিচয় করাতে। একদিন এক বৃদ্ধা এসে বললেন বাবা আমি তো লেখাপড়া বেশি জানি না। কিন্তু বাংলায় কথা বলতে ভালো লাগে। এখানে এসে মনটা হালকা হয়।
অর্ক সেই মুহূর্তে বুঝল সে ঠিক কাজটাই করছে।
একদিন ক্লাসের শেষ দিকে সে সবাইকে একটা লাইন লিখতে বলল আমি বাংলায় ভালবাসি আমি বাংলাকে ভালবাসি।
কেউ লিখল বড় হাতের অক্ষরে কেউ আঁকাবাঁকা করে কেউ আবার পাশে ছোট্ট একটা হৃদয় এঁকে দিল। অর্ক বুঝল এই লাইনটা সবার কাছে আলাদা আলাদা অর্থ বহন করে কিন্তু অনুভূতিটা এক।
রাতে বাড়ি ফিরে সে জানালার ধারে দাঁড়াল। শহরের আলো ঝলমল করছে। অর্ক ভাবল বাংলা কোনো নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যে আটকে নেই। বাংলা বেঁচে থাকে মানুষ যতদিন তাকে অনুভব করে যতদিন তাকে ব্যবহার করে ভালবাসার ভাষা হিসেবে।
সে ল্যাপটপ খুলে নতুন একটা গল্প লেখা শুরু করল। বাংলায়। নির্ভয়ে। কারণ সে এখন জানে ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয় ভাষা হলো আত্মার ঠিকানা।
আর সেই ঠিকানায় পৌঁছাতে সে গর্বের সঙ্গে বলে
আমি বাংলায় ভালবাসি আমি বাংলাকে ভালবাসি।
......................................
সৌম্য পাল
সাঁইথিয়া, বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ, পিন - ৭৩১২৩৪

Comments
Post a Comment