শঙ্করের প্রস্থান : বাংলা নগরসাহিত্যের এক মহাযুগের অবসান
শিবাশিস মুখার্জী
বাংলা সাহিত্য কখনও কখনও এমন কিছু লেখকের জন্ম দেয়, যাঁরা শুধু গল্প লেখেন না—সময়ের ভেতর দিয়ে মানুষের জীবনকে নথিভুক্ত করেন। মণি শঙ্কর মুখার্জী, যিনি 'শঙ্কর' নামে পাঠকের কাছে চিরপরিচিত, ছিলেন তেমনই এক বিরল কথাশিল্পী। তাঁর প্রয়াণ শুধু একটি সাহিত্যিক জীবনের সমাপ্তি নয়; এটি বাংলা নগরসাহিত্যের এক দীর্ঘ, উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান।
শঙ্করের সাহিত্যিক যাত্রা বিশ শতকের মধ্যভাগে শুরু হলেও তাঁর রচনার প্রাসঙ্গিকতা একবিংশ শতাব্দীতেও অটুট। তিনি ছিলেন এমন এক লেখক, যিনি বাংলা সাহিত্যে নগরজীবনের এক নতুন ভাষা তৈরি করেছিলেন। গ্রামকেন্দ্রিক সাহিত্যধারা যখন দীর্ঘদিন বাংলা কথাসাহিত্যের প্রধান সুর ছিল, তখন শঙ্কর শহরকে কেন্দ্র করে মানুষের নতুন বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসেন। তাঁর কলমে কলকাতা কেবল একটি শহর নয়; এটি এক বহুমাত্রিক জীবন্ত সত্তা—যেখানে স্বপ্ন, প্রতিযোগিতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ভয়, নিঃসঙ্গতা ও প্রেম একসঙ্গে সহাবস্থান করে।
শঙ্করের সাহিত্যচর্চার মূল ভিত্তি ছিল অভিজ্ঞতা। তিনি জীবনের বাস্তব ক্ষেত্র থেকে উপাদান সংগ্রহ করতেন—কর্মক্ষেত্র, সামাজিক পরিবেশ, মানুষের সম্পর্ক এবং সময়ের পরিবর্তনশীলতা। এই অভিজ্ঞতাগুলিকে তিনি এমনভাবে রূপ দিয়েছেন, যা একদিকে সাহিত্যিক, অন্যদিকে সমাজতাত্ত্বিক দলিল। তাঁর লেখায় যে অফিসপাড়া, কর্পোরেট জগত, হোটেল সংস্কৃতি বা মধ্যবিত্ত জীবনের চাপ—এসব কেবল কাহিনির উপাদান নয়; এগুলি আধুনিকতার ইতিহাসের অংশ।
'চৌরঙ্গী' উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি যে নগর-মানবজীবনের জটিলতা তুলে ধরেছিলেন, তা বাংলা সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। একটি হোটেলের ভেতর দিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন বহুজাতিক সংস্কৃতি, শ্রেণি-বিভাজন, ক্ষমতার সম্পর্ক এবং মানুষের অন্তর্লীন একাকিত্ব। এই উপন্যাস শুধু জনপ্রিয়তা অর্জন করেনি; এটি বাংলা সাহিত্যে আধুনিক নগর-বাস্তবতার এক প্রামাণ্য দলিল হয়ে উঠেছে।
'সীমাবদ্ধ' উপন্যাসে শঙ্কর কর্পোরেট জগতের প্রতিযোগিতা, নৈতিক সংকট এবং ব্যক্তিমানসের দ্বন্দ্বকে বিশ্লেষণ করেছেন। আধুনিক কর্মজীবনের সাফল্য-ব্যর্থতার যে জটিল সমীকরণ, তা তিনি গভীর অন্তর্দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন। একইভাবে 'জন অরণ্য'-তে তিনি শহুরে যুবসমাজের বেকারত্ব, হতাশা এবং অস্তিত্বসংকটকে এমনভাবে প্রকাশ করেছেন, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এই রচনাগুলিতে আমরা দেখতে পাই—শঙ্কর কেবল গল্পকার নন; তিনি সমাজবিশ্লেষক এবং মানবমনের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষক।
শঙ্করের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাঁর মানবিকতা। তিনি চরিত্রদের বিচার করেননি; বরং তাদের বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাঁর লেখায় নায়ক-খলনায়কের সরল বিভাজন নেই। বরং প্রতিটি চরিত্রই সময় ও পরিস্থিতির দ্বারা গঠিত। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে আধুনিক মানবতাবাদী সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিতে পরিণত করেছে।
ভাষার ক্ষেত্রে শঙ্কর এক অনন্য ভারসাম্য বজায় রেখেছিলেন। তাঁর ভাষা সহজবোধ্য, কিন্তু তাতে ছিল গভীর অন্তর্নিহিত অর্থ। তিনি প্রমাণ করেছেন যে সাহিত্যিক শক্তি ভাষার জটিলতায় নয়, অনুভূতির সত্যতায় নিহিত। তাঁর বর্ণনা সংযত, কিন্তু প্রভাবশালী; তাঁর সংলাপ বাস্তব, কিন্তু তাতে লুকিয়ে থাকে সমাজের গভীর সত্য।
বাংলা সাহিত্যে নগরায়নের যে প্রভাব, তা বোঝার জন্য শঙ্করের রচনা অপরিহার্য। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে শহর মানুষের সম্পর্ককে বদলে দেয়, কীভাবে সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা মানুষের অন্তর্লোককে ক্ষতিগ্রস্ত করে, এবং কীভাবে আধুনিকতার মধ্যেও মানুষ তার মানবিকতা খুঁজে ফেরে। তাঁর সাহিত্য একদিকে আধুনিকতার সমালোচনা, অন্যদিকে তারই এক সংবেদনশীল দলিল।
শঙ্করের প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য এমন এক কণ্ঠস্বর হারাল, যিনি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সময়কে ভাষা দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর সাহিত্য আমাদের কাছে থেকে যাবে—একটি আয়নার মতো, যেখানে আমরা আমাদের সমাজ, আমাদের শহর, এবং নিজেদের দেখতে পাব। তাঁর বইগুলি শুধু পাঠ্য নয়; এগুলি অভিজ্ঞতার ভান্ডার, চিন্তার উৎস, এবং নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস।
একজন প্রকৃত সাহিত্যিক কখনও সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যান না। তাঁর শব্দ, তাঁর চরিত্র, তাঁর ভাবনা—সবই সময়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। শঙ্করও তেমনই একজন লেখক, যিনি তাঁর রচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতের পাঠকদের সঙ্গে কথা বলে যাবেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে সেইসব লেখকদের সঙ্গে, যাঁরা সাহিত্যের মাধ্যমে সময়কে অমর করে তুলেছেন।
আজ তাঁর প্রয়াণে আমরা শোকাহত, কিন্তু একই সঙ্গে কৃতজ্ঞ—কারণ তিনি আমাদের এমন এক সাহিত্যজগৎ উপহার দিয়েছেন, যা আমাদের চিন্তা ও অনুভূতিকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর স্মৃতি আমাদের সাহিত্যচর্চায় পথ দেখাবে, তাঁর রচনা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখাবে।
শঙ্কর নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট জগৎ এখনও জীবন্ত। সেই জগৎই তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার।
তাঁর প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, নীরব প্রণাম এবং চিরন্তন কৃতজ্ঞতা।
==============
শিবাশিস মুখার্জী
ফ্যাকাল্টি, কলকাতা ও সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়
Comments
Post a Comment