মাতৃভাষা: হৃদয়ের প্রথম স্বর
বাসিরা খাতুন
মাতৃভাষা শুধু একটি ভাষা নয়, এটি মানুষের জীবনের প্রথম অনুভব, প্রথম পরিচয় এবং প্রথম ভালোবাসা। মানুষ জন্মের পর যখন চোখ খুলে পৃথিবীর আলো দেখে, তখন সে ভাষার অর্থ বুঝতে পারে না, কিন্তু মায়ের কণ্ঠের উষ্ণতা বুঝে যায়। শিশুর কান প্রথম যে শব্দ শোনে, সেই শব্দের ভেতর থাকে আদর, আশ্বাস, নিরাপত্তা এবং ভালোবাসা। সেই প্রথম শব্দগুলোই ধীরে ধীরে মাতৃভাষায় পরিণত হয়। মাতৃভাষা তাই কেবল কথাবার্তার মাধ্যম নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের ভিত, স্মৃতির মাটি, আর আত্মার শিকড়। আমরা যে ভাষায় কাঁদি, যে ভাষায় হাসি, যে ভাষায় ভালোবাসা প্রকাশ করি, যে ভাষায় অভিমান করি, যে ভাষায় স্বপ্ন দেখি—সেই ভাষাই মাতৃভাষা। পৃথিবীর বহু ভাষা আমরা শিখতে পারি, অনেক ভাষায় দক্ষ হতে পারি, কিন্তু মাতৃভাষার মতো করে আর কোনো ভাষা আমাদের মনের গভীরে পৌঁছাতে পারে না। কারণ মাতৃভাষা আমাদের শিখতে হয় না, মাতৃভাষা আমাদের ভেতরে জন্মায়।
মাতৃভাষা মানুষের পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। মানুষকে শুধু পোশাক, ধর্ম, দেশ কিংবা জাতি দিয়ে চেনা যায় না; মানুষের আসল পরিচয় ধরা পড়ে তার ভাষার মাধ্যমে। মাতৃভাষা মানুষের চিন্তার ধরণ তৈরি করে, তার সংস্কৃতির রং তৈরি করে এবং তার মানসিকতার গভীরে একটি নিজস্ব পৃথিবী গড়ে তোলে। মাতৃভাষা ছাড়া মানুষ যেন শিকড়হীন গাছের মতো। শিকড় না থাকলে যেমন গাছ বড় হতে পারে না, তেমনই মাতৃভাষার সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হলে মানুষের ভেতরের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং আত্মপরিচয় ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যায়। মাতৃভাষা আমাদের পরিবারের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে এবং ইতিহাসের সঙ্গে এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন তৈরি করে। একজন মানুষ যখন তার মাতৃভাষায় কথা বলে, তখন সে শুধু শব্দ উচ্চারণ করে না, সে তার বংশের ঐতিহ্য, তার পূর্বপুরুষের স্মৃতি এবং তার জাতির ইতিহাসকেও বহন করে। মাতৃভাষার মধ্যে লুকিয়ে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের সংগ্রাম, হাসি-কান্না, আশা-নিরাশা এবং স্বপ্নের গল্প।
বাংলা ভাষার ইতিহাস এই সত্যকে আরও স্পষ্ট করে। বাংলা ভাষা শুধু সাহিত্যের ভাষা নয়, এটি সংগ্রামের ভাষা। এই ভাষার জন্য মানুষ রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে। ভাষা আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষা কখনো ছোট বিষয় নয়; ভাষা মানুষের আত্মসম্মানের প্রশ্ন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল এমন এক অধ্যায়, যেখানে মানুষ প্রমাণ করেছিল যে মাতৃভাষাকে রক্ষা করা মানে নিজের অস্তিত্বকে রক্ষা করা। যখন মানুষের মুখ থেকে মাতৃভাষা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়, তখন মানুষ শুধু প্রতিবাদ করে না, সে লড়াই করে। বাংলা ভাষার জন্য জীবন দেওয়া শহীদদের আত্মত্যাগ আজও আমাদের শেখায় যে মাতৃভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের অধিকার, মর্যাদা এবং আত্মার স্বাধীনতা। তাই মাতৃভাষা দিবস শুধুই একটি স্মরণ দিবস নয়, এটি আমাদের কাছে একটি শপথের দিন—যে শপথ বলে আমরা নিজের ভাষাকে ভালোবাসব, সম্মান করব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা সঠিকভাবে পৌঁছে দেব।
মাতৃভাষা আমাদের সাহিত্যের প্রাণ। সাহিত্য ছাড়া ভাষা যেমন পূর্ণ হয় না, তেমনই ভাষা ছাড়া সাহিত্য জন্মায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, সুকান্ত ভট্টাচার্যসহ অসংখ্য কবি-লেখক বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁদের লেখা পড়লে বোঝা যায়, বাংলা ভাষা কতটা গভীর, কতটা মধুর এবং কতটা শক্তিশালী। মাতৃভাষা আমাদের অনুভূতির সূক্ষ্ম দিকগুলোকে প্রকাশ করতে সাহায্য করে। মাতৃভাষায় বলা একটি কথা অনেক সময় অন্য ভাষায় অনুবাদ করলে তার আসল আবেগ হারিয়ে যায়। কারণ মাতৃভাষার শব্দের সঙ্গে আমাদের অনুভূতির সম্পর্ক থাকে। আমরা যখন বলি "মা", তখন সেই শব্দের মধ্যে শুধুই একজন নারীর পরিচয় থাকে না, থাকে আশ্রয়, ভালোবাসা, ত্যাগ এবং মমতার অসীম পৃথিবী। মাতৃভাষা তাই আমাদের হৃদয়ের ভাষা।
আজকের সময়ে মাতৃভাষার গুরুত্ব আরও বেড়েছে, কারণ প্রযুক্তি এবং বিশ্বায়নের যুগে আমরা অনেক সময় নিজের ভাষা ভুলে যেতে বসি। আজ মানুষ ইংরেজি বা অন্য ভাষায় কথা বলাকে আধুনিকতা মনে করে। অনেক বাবা-মা নিজের সন্তানকে বাংলা শেখানোর বদলে শুধু বিদেশি ভাষার দিকে বেশি গুরুত্ব দেন। তারা ভাবে, মাতৃভাষা শিখলে উন্নতি হবে না, উন্নতি হবে বিদেশি ভাষায় দক্ষ হলে। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বিদেশি ভাষা শেখা অবশ্যই দরকার, কারণ বিশ্বকে জানার জন্য বহুভাষা জানা একটি বড় শক্তি। কিন্তু মাতৃভাষাকে অবহেলা করে বিদেশি ভাষা শিখলে মানুষ নিজের শিকড় হারিয়ে ফেলে। মাতৃভাষা হলো ভিত্তি, আর বিদেশি ভাষা হলো সিঁড়ি। ভিত্তি না থাকলে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠা যায় না। যে শিশু মাতৃভাষায় শক্তিশালী হয়, সে অন্য ভাষাও দ্রুত এবং গভীরভাবে শিখতে পারে। মাতৃভাষা মানুষের চিন্তাশক্তিকে গঠন করে, কারণ মানুষ প্রথম ভাবতে শেখে মাতৃভাষায়। তাই মাতৃভাষাকে ছোট করে দেখা মানে নিজের চিন্তার শক্তিকেই ছোট করে দেখা।
মাতৃভাষা আমাদের সংস্কৃতির রক্ষাকবচ। একটি জাতির গান, কবিতা, গল্প, প্রবাদ, লোককথা, উৎসব এবং ঐতিহ্য সবকিছুই ভাষার মাধ্যমে বেঁচে থাকে। ভাষা হারিয়ে গেলে সংস্কৃতিও হারিয়ে যায়। তাই মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা মানে নিজের ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা। মাতৃভাষা মানুষকে নিজের মাটির গন্ধ দেয়। বিদেশে গিয়ে অনেক মানুষ উন্নতি করে, অনেক বড় হয়, কিন্তু তারা যখন মাতৃভাষায় কথা বলে তখন তাদের চোখে এক ধরনের আলাদা আলো দেখা যায়। কারণ মাতৃভাষা তাদের কাছে শৈশবের বাড়ি, মায়ের ডাক, গ্রামের মেঠোপথ, বৃষ্টির শব্দ এবং মাটির ঘ্রাণের মতো। মাতৃভাষা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় সে কোথা থেকে এসেছে।
মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা মানে শুধু ভাষায় কথা বলা নয়, ভাষাকে সম্মান করা, শুদ্ধভাবে ব্যবহার করা এবং ভাষার সৌন্দর্যকে রক্ষা করা। আজ অনেক সময় আমরা বাংলা লিখতে গিয়ে বানানে ভুল করি, অযত্ন করি, কথার মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিদেশি শব্দ ঢুকিয়ে দিই। এটা আধুনিকতার লক্ষণ নয়, বরং নিজের ভাষার প্রতি অবহেলার পরিচয়। মাতৃভাষা যত সুন্দরভাবে চর্চা করা হবে, ভাষা তত সমৃদ্ধ হবে। আমাদের উচিত বাংলা বই পড়া, বাংলা সাহিত্যকে ভালোবাসা, নতুন প্রজন্মকে বাংলা শিখতে উৎসাহ দেওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ানো। কারণ মাতৃভাষা যত বেশি বাঁচবে, আমাদের জাতিসত্তাও তত বেশি বাঁচবে।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, মাতৃভাষা মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। মাতৃভাষা আমাদের ভাবনার পথ দেখায়, আমাদের আত্মপরিচয় গড়ে তোলে এবং আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে। মাতৃভাষাকে ভালোবাসা মানে শুধু ভাষার প্রতি ভালোবাসা নয়, এটি নিজের জন্মভূমি, নিজের ইতিহাস এবং নিজের অস্তিত্বের প্রতি ভালোবাসা। যে মানুষ মাতৃভাষাকে সম্মান করে, সে আসলে নিজের শিকড়কে সম্মান করে। তাই আমাদের উচিত মাতৃভাষাকে হৃদয়ে ধারণ করা, জীবনে ব্যবহার করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরা। মাতৃভাষা আমাদের আত্মার প্রথম স্বর, আর সেই স্বর যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন আমাদের জাতিসত্তাও বেঁচে থাকবে।
........................................
বাসিরা খাতুন
Village+ post - magra
District - Hooghly
Pin- 712148

Comments
Post a Comment