অসমাপ্ত শ্রুতি
জয় মণ্ডল
শিলিগুড়ির ঘিঞ্জি শহর ছাড়িয়ে গাড়িটা যখন কার্শিয়াং-এর কুয়াশার বুক চিরে উপরে উঠছিল, তখন অনিকেতের ল্যাপটপে একটা পুরোনো সুর বাজছিল। অনিকেত পেশায় একজন ফটোগ্রাফার। পাহাড় তার নেশা, আর একাকীত্ব তার স্বভাব। কিন্তু এবারের এই পাহাড় ভ্রমণটা ছিল একটু অন্যরকম। তার হাতে ছিল একটা মেরুন রঙের খাম, যা সে খুঁজে পেয়েছিল তার ঠাকুরদার পুরোনো ট্রাঙ্কে।
চিঠিটা লেখা হয়েছিল ১৯৫৫ সালে। প্রেরক— মৃন্ময়ী। প্রাপক— অনিকেতের ঠাকুরদা, বিনায়ক। কিন্তু চিঠিটা কোনোদিন খোলা হয়নি।
• কুয়াশার শহরে প্রথম দেখা:
কার্শিয়াং-এর এক জীর্ণ কিন্তু আভিজাত্যে ভরা হোমস্টে-তে অনিকেত উঠল। সেখানে তার পরিচয় হলো ইপ্সিতার সাথে। ইপ্সিতা সেখানকার স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষিকা। চশমার আড়ালে তার চোখ দুটো যেন সবসময় পাহাড়ের মেঘের মতো কিছু একটা লুকোতে চায়।
অনিকেত যখন ডাইনিং হলে বসে সেই মেরুন খামটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল, ইপ্সিতা পাশে এসে বসল।
"আপনিও কি পুরোনো চিঠির গন্ধ খুঁজছেন?" ইপ্সিতার গলায় এক অদ্ভুত মাদকতা ছিল।
অনিকেত হাসল। "না, আমি এক অপূর্ণ প্রেমের শেষটা খুঁজতে এসেছি। আমার ঠাকুরদা আর মৃন্ময়ী— এঁদের গল্পটা হয়তো এই কুয়াশাতেই কোথাও লুকিয়ে আছে।"
• স্মৃতির সরণি বেয়ে:
পরের কয়েকদিন অনিকেত আর ইপ্সিতা একসাথেই পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ঘুরে বেড়াল। ইপ্সিতা তাকে দেখাল সেই পুরোনো লাইব্রেরি, সেই ভিক্টোরিয়া স্কুল, আর সেই নির্জন গির্জা— যেখানে বসে মৃন্ময়ী আর বিনায়ক একসময় আকাশ দেখতেন।
অনিকেত খেয়াল করল, ইপ্সিতা যখন কথা বলে, তখন সে যেন বর্তমানের চেয়ে অতীতে বেশি বাস করে। একদিন ম্যাকাওবেরি চা বাগানের ঢালে বসে ইপ্সিতা হঠাৎ বলল, "জানেন অনিকেত, ভালোবাসা মানে সবসময় পাশে থাকা নয়। কখনো কখনো ভালোবাসা মানে হলো এক আকাশ দূরত্ব রেখেও কারো অপেক্ষায় থেকে যাওয়া।"
অনিকেতের মনে হলো, ইপ্সিতা যেন তার নিজের জীবনের কথাই বলছে।
• একটি অদ্ভুত উন্মোচন:
সেই রাতে অনিকেত ঠিক করল সে মেরুন খামটা পড়বে। ইপ্সিতাকে পাশে নিয়ে সে খামটা খুলল। চিঠিতে লেখা ছিল:
"বিনায়ক, তুমি পাহাড় ছেড়ে শহরে চলে যাচ্ছ। আমি থেকে গেলাম এই মেঘেদের দেশে। যদি কখনো ফিরে আসো, তবে আমাদের সেই পুরোনো অর্কিড গাছের নিচে আমি তোমার জন্য একটি চারা পুঁতে রেখে যাব। যদি চারাটি ফুল দেয়, জানবে মৃন্ময়ী আজও তোমার পথ চেয়ে বসে আছে।"
অনিকেত আর ইপ্সিতা পরদিন ভোরেই সেই পুরোনো অর্কিড গাছের সন্ধানে বের হলো। গাছটি আজও আছে, তবে সেটি এখন এক বৃদ্ধাশ্রমের সীমানার ভেতরে। সেখানে পৌঁছে তারা যা দেখল, তাতে দুজনেরই চোখের কোণ ভিজে উঠল।
সেখানে এক বৃদ্ধা বসে আছেন, যাঁর চোখে ছানি পড়েছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর হাত দুটো আগলে রেখেছে একটি গোলাপি অর্কিডের টব। অনিকেত কাছে যেতেই বৃদ্ধা অস্ফুট স্বরে বললেন, "বিনায়ক? ফিরে এলে?"
ইপ্সিতা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে অনিকেতের হাতটা শক্ত করে ধরল। অনিকেত বুঝল, এই বৃদ্ধাই মৃন্ময়ী। তিনি অর্কিডের মাধ্যমে তাঁর ভালোবাসাকে সজীব রেখেছেন দীর্ঘ সত্তর বছর।
• হৃদয় ছোঁয়া সমাপ্তি:
অনিকেত ঠাকুরদার হয়ে মৃন্ময়ীর হাতটা নিজের হাতে নিল। সে বুঝল, সে এখানে কেবল ঠাকুরদার প্রেমের শেষ খুঁজতে আসেনি, সে এসেছে নিজের প্রেমের শুরু করতে।
ইপ্সিতার দিকে তাকিয়ে অনিকেত বলল, "মৃন্ময়ী আর বিনায়ক এক হতে পারেননি। কিন্তু তাঁদের এই মেরুন খাম আজ আমাদের মিলিয়ে দিল। ইপ্সিতা, এই পাহাড়ের কুয়াশা যেমন সত্য, আমাদের এই মুহূর্তটাও কি তেমন সত্য নয়?"
ইপ্সিতা আর কিছু বলেনি, শুধু অনিকেতের কাঁধে মাথা রাখল। বাইরে তখন কার্শিয়াং-এর আকাশে হালকা বরফ পড়তে শুরু করেছে। গোলাপি অর্কিডটি তখন মৃদু বাতাসে দুলছিল— যেন সত্তর বছরের অপেক্ষার অবসানে সে আজ শান্ত।
আসলে "ভালোবাসা সময়ের চেয়েও দীর্ঘজীবী হতে পারে, যদি সেই ভালোবাসায় ত্যাগের বিশুদ্ধতা থাকে।"
==========
জয় মণ্ডল, কালীমন্দির পূর্বপাড়া, কালিকাপুর, পোস্ট - কালিকাপুর, সোনারপুর, পশ্চিমবঙ্গ - ৭৪৩৩৩০

Comments
Post a Comment