বেনারসিটা শুধুই তোর জন্য
সৈকত প্রসাদ রায়
জানালা দিয়ে ভোরের আলো এসে পড়েছে শৌনকের মুখে। কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই,স্বপ্নটা এখনও যেন বুকের ভেতর কাঁপছে। সে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। বাইরে শীতের সকাল, কুয়াশার চাদরে ঢাকা শহর। কিন্তু শৌনকের চোখে ভাসছে শুধু সেই লাল বেনারসি, সেই জলভরা চোখ।
শৌনক চোখ বন্ধ করল। মনে পড়ল সেই দিনটা।
তিন বছর আগে, ১৪ই ফেব্রুয়ারি, সকালবেলা ফোন করেছিল সোনিয়া,গলায় উচ্ছ্বাস।
"শৌনক! আজ কী দিন জানিস?"
"ভ্যালেন্টাইন্স ডে। আর আমাদের বিয়ের শপিং এর দিন!" শৌনক হেসেছিল।
"ঠিক! দশটায় রেডি থাকবি। আমরা নিউ মার্কেট যাব। আমার বেনারসি শাড়ি দেখতে হবে, তোর শেরওয়ানি, আর..."
"আর তোর অসংখ্য শপিংয়ের লিস্ট!" শৌনক হাসতে হাসতে বলেছিল।
"হ্যাঁ! আর মা বলেছে লাল বেনারসি নিতে। ট্র্যাডিশনাল। তুই কী বলিস?"
"তুই যেটা পরবি, সেটাই সবচেয়ে সুন্দর হবে সোনিয়া।"
ফোনের ওপাশ থেকে সোনিয়ার খিলখিল হাসি ভেসে এসেছিল - " আচ্ছা, দশটায় আমার বাড়ির সামনে, দেরি করবি না কিন্তু!"
শৌনক ঠিক সাড়ে নয়টায় পৌঁছে গিয়েছিল সোনিয়ার বাড়ির সামনে। সোনিয়া বেরিয়ে এসেছিল গোলাপি কুর্তা পরে, চুল বেণি করে। দেখেই শৌনকের মনে হয়েছিল, এই মেয়েটাকে নিয়েই তো তার পুরো জীবন।
"চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে!" সোনিয়া তাড়াতাড়ি স্কুটিতে উঠে বসেছিল।
নিউ মার্কেটে পৌঁছে প্রথমে গিয়েছিল শাড়ির দোকানে। সোনিয়া একের পর একটা শাড়ি দেখছিল। নীল, সবুজ, গোলাপি—কিন্তু চোখ আটকে গিয়েছিল লাল বেনারসিতে।
"এটা!" সোনিয়া শাড়িটা হাতে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল। "শৌনক, কেমন লাগছে?"
শৌনক তাকিয়েছিল। সোনিয়ার মুখে সেই উজ্জ্বল হাসি, চোখে স্বপ্ন। "পারফেক্ট। একদম পারফেক্ট।"
শাড়িটা কিনে ফেলার পর সোনিয়া বলেছিল, "এবার তোর শেরওয়ানি। চল, ওই দোকানে যাই।"
"সোনিয়া, একটু ক্লান্ত লাগছে। চা খেয়ে যাই?"
"না না, আগে শেরওয়ানিটা দেখে নিই, তারপর আমরা ওই ক্যাফেতে বসব। প্ল্যান করব, বিয়ের পর কোথায় হানিমুন যাব!"
সোনিয়ার উত্তেজনা দেখে শৌনক হেসে মাথা নেড়েছিল। "ঠিক আছে বাবা,চল।"
তারা রাস্তা পার হচ্ছিল। সোনিয়া শাড়ির প্যাকেটটা শক্ত করে ধরে রেখেছিল। "শৌনক, আমি কিন্তু এই শাড়িটা আমাদের বিয়ের দিন ছাড়া আর কখনও পরব না। কারণ বিয়ের দিন শুধু সাজবো তোর জন্য , ওই দিনটা আমার কাছে খুব স্পেশাল কারণ ওই দিন তোকে আমি শুধু আমার করে পাবো , তাই ওই দিনটা শুধু তোর জন্য ।"
শৌনক হাত বাড়িয়ে সোনিয়ার হাত ধরেছিল - "পাগলী!"
ঠিক সেই মুহূর্তে একটা ট্রাক চলে এলো, ব্রেক ফেল করলো , সোনিয়া একটু এগিয়ে গিয়েছিলো , শৌনক হতচকিত হলেও চেষ্টা করলো সোনিয়া কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে কিন্তু পারলোনা, চোখের সামনে ঘটে গেলো অঘটন, সবকিছু থেমে গিয়েছিল।
শৌনক ছুটে এসেছিল আইসিইউ-র সামনে। ডাক্তার বেরিয়ে এসে মাথা নিচু করেছিল। "We tried our best. I'm sorry."
সোনিয়ার বাবা দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। মা অঝোরে কাঁদছিল, কিন্তু শৌনক? শৌনক দাঁড়িয়ে ছিল পাথরের মতো। চোখে জল নেই, মুখে কোনো ভাব নেই।
নার্স এসে একটা প্যাকেট এগিয়ে দিয়েছিল। "উনি এটা ধরে ছিলেন.......।"
লাল বেনারসির প্যাকেট। রক্তের দাগ লেগে আছে।
শৌনক প্যাকেটটা হাতে নিয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে আইসিইউ-তে ঢুকেছিল।
সোনিয়া শুয়ে আছে সাদা চাদরে ঢাকা। মুখটা শান্ত, যেন ঘুমিয়ে আছে। শৌনক কাছে গিয়ে তার কপালে হাত রেখেছিল। ঠান্ডা, বরফের মতো ঠান্ডা।
"সোনিয়া..." গলা ভেঙে গিয়েছিল শৌনকের। "তুই... তুই কী করলি?"
সোনিয়ার বাবা তখন পাশেই শৌনকের হাতটা জড়িয়ে ধরে প্রলাপ বকছেন " এ আমার কি হয়ে গেলো... ভগবান আমায় কেন এতো বড় শাস্তি দিলো... , মেয়েটার যে সামনেই বিয়ে ছিল ঠাকুর... " , সোনিয়ার বাবার কথায় শৌনকের মনে এক অদম্য জেদ তৈরী হলো , ও কিছুতেই ওর সোনিয়াকে অবিবাহিত অবস্থায় যেতে দেবে না , শৌনক সোনিয়ার বাবা ঋদ্ধিমান বাবুকে বললো " আমি সোনিয়াকে সাজাবো " ঋদ্ধিমান বাবু শৌনকের কথার বিন্দু বিসর্গ বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে শৌনকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বাড়ির বড় ঘরটা প্রস্তুত করা হয়েছে। মেঝেতে আলপনা আঁকা, চারপাশে ফুলের সাজ, সোনিয়াকে শুইয়ে রাখা হয়েছে ফুলের মাঝে।
শৌনক নিজের হাতেই সোনিয়াকে সেই লাল বেনারসি পরিয়েছিল। মেয়েরা সাহায্য করেছিল, কিন্তু শৌনকের হাত কাঁপছিল না। সে শাড়ির আঁচল ঠিক করে দিয়েছিল, যেন সোনিয়া সত্যিই তার বউ হিসেবে সাজছে । তারপর কপালে চন্দনের টিপ এঁকে দিয়েছিল, হাতে পরিয়েছিল শাঁখা আর পলা ,গলায় সোনার হার - যেটা সোনিয়ার মা নিজের হাতে খুলে দিয়েছিল, চোখের জল মুছতে মুছতে। সোনিয়ার চুল বেণি করে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছিল। মাথায় লাল ঘোমটা।
সোনিয়াকে দেখে মনে হচ্ছিল ঠিক নতুন বউ। কিন্তু সেই মুখে হাসি নেই, চোখ বন্ধ চিরকালের জন্য ।
শৌনক সোনিয়ার পাশে বসে তার হাত ধরেছিল। "সোনিয়া, আমি তোকে সমস্ত রীতিনীতি মেনে হয়তো বিয়ে করতে পারলাম না, কিন্তু আজ থেকে তুই আমার বউ, চিরকালের জন্য।" শৌনক সোনিয়ার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছিল। একটা আংটি বের করে সোনিয়ার আঙুলে পরিয়ে দিয়েছিল—যেটা সে বিয়ের দিন পরাতে চেয়েছিল।
"তুই আমার স্ত্রী সোনিয়া, সাতজন্মের স্ত্রী।" শৌনক ফিসফিস করে বলেছিল।
তারপর শৌনক নিজের হাতেই পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়েছিল সোনিয়াকে, চিরবিদায় জানানোর জন্য খুব সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজানো গাড়িটি প্রস্তুত, ধীর পায়ে সেদিকেই এগিয়ে গেলো শৌনক সোনিয়া কে নিয়ে, সোনিয়ার মুখটা খোলা রাখা হয়েছিল। সেই শান্ত মুখ, সিঁদুরে রাঙা সিঁথি ,শাঁখা-পলা - সবকিছু যেন বলছে, সে কারো নতুন বউ।
রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় আশেপাশের মানুষ দাঁড়িয়ে দেখছিল। অনেক মহিলাদের চোখে জল , কেউ কেউ ফিসফিস করছিল, "কী সুন্দর বউ! কিন্তু কী দুর্ভাগ্য! বিয়ের আগেই..."
শৌনক কিছু শুনতে পাচ্ছিল না। তার চোখে ভাসছিল সোনিয়ার সেই হাসি, সেই উচ্ছ্বাস - "এই শাড়িটা শুধু তোর জন্য শৌনক!"
হ্যাঁ, শাড়িটা শুধু তার জন্যই ছিল। কিন্তু ভাগ্যের এমন পরিহাস যে, সেই শাড়ি পরে সোনিয়া তার ঘরে আসছে না, বরং চিরকালের জন্য চলে যাচ্ছে।
অন্তিম পর্যায়ে গিয়ে শেষবারের মতো সোনিয়াকে ধাতব বিছানায় শৌনক শুইয়ে দিল, শেষবারের মতো তার কপালে হাত রাখল।
"সোনিয়া, তোর সাথে আমার সমস্ত রীতিনীতি মেনে বিয়ে হয়নি ঠিকই, কিন্তু আজ থেকে তুই আমার বউ, চিরকালের জন্য আমার ,এই সিঁদুর, এই শাঁখা-পলা, এই বেনারসি শাড়ি—সব সাক্ষী, তুই আমার বউ।" পুরোহিত শেষ মন্ত্র পড়ছিল।
সোনিয়াকে নিয়ে সেই ধাতব বিছানা আস্তে আস্তে ভিতরে চলে গেলো , লাল বেনারসি শাড়ি, ফুলের মালা, সব বিলীন হয়ে গেল। কিন্তু শৌনকের হৃদয়ে সোনিয়ার সেই রূপ অমলিন হয়ে রইলো ।
তিন বছর পর , আজও ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ভালোবাসার দিন। কিন্তু শৌনকের জন্য এই দিনটা বিচ্ছেদের দিন। সে আলমারি থেকে একটা ছোট্ট বাক্স বের করে খুললো। ভেতরে রাখা আছে সোনিয়ার শাঁখা-পলা—যেগুলো শৌনক খুলে নিয়েছিল শেষ স্মৃতি হিসেবে। আর রয়েছে সেই আংটি, যেটা শৌনক নিজের হাতে পরিয়ে দিয়েছিলো সোনিয়াকে ।
শৌনক শাঁখা দুটো হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করল। মনে হল সোনিয়া ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। লাল বেনারসি পরা, সিঁথিতে সিঁদুর, চোখে জল।
"শৌনক, কষ্ট পাচ্ছিস?"
"হ্যাঁ রে , প্রতিদিন। প্রতি মুহূর্তে।"
"কিন্তু তুই তো জানিস, আমি তোর সাথেই আছি, তোর বউ হয়েই আছি।"
শৌনক চোখ খুলল, সোনিয়ার ছবিটা দেখল, সেই হাসি, সেই স্বপ্ন ভরা চোখ।
হ্যাঁ, সোনিয়া ঠিকই বলেছে। সে শৌনকের বউ, বিয়ের মণ্ডপে ঘুরে, সাত পাক দিয়ে, হাজারো আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যায়নি সত্যি। কিন্তু সেই লাল বেনারসি, সেই সিঁদুর, সেই শাঁখা-পলা—সবকিছুই সাক্ষী, সোনিয়া তার স্ত্রী ছিল। একদিনের জন্য হলেও।
শৌনক শাঁখা দুটো ঠোঁটে ছুঁইয়ে আবার বাক্সে রেখে দিল। জানালা খুলে দিল,বাইরে সূর্য উঠে গেছে,পাখিরা ডাকছে, জীবন চলছে। কিন্তু শৌনকের জীবন থেমে আছে সেই দিনটাতেই। ১৪ই ফেব্রুয়ারি, তিন বছর আগে ,যেদিন সে তার প্রিয় মানুষটাকে বিয়ের সাজে শেষবারের মতো দেখেছিল। দেওয়ালে টাঙানো ছবিটার দিকে তাকাল শৌনক, সোনিয়া হাসছে সেই ছবিতে—সেই চিরচেনা, নির্মল হাসি। এনগেজমেন্টের দিনের ছবি, হলুদ শাড়ি পরা, হাতে আংটি, চোখেমুখে স্বপ্ন - "সোনিয়া, তুই যেখানেই থাকিস, শান্তিতে থাকিস। আর জেনে রাখিস, তুই আমার বউ, এই জন্মে আমি তোকে ঘরে আনতে পারিনি, কিন্তু পরের জন্মে তোকে ঠিক খুঁজে পাব। আর সেবার আমরা সারাজীবন একসাথে থাকব।"
জানালা দিয়ে হাওয়া এসে ছবিটা একটু নড়ে উঠল। যেন সোনিয়া মাথা নাড়ছে, সম্মতি দিচ্ছে।
শৌনক গভীর শ্বাস নিল। আজ বিকেলে গঙ্গার ঘাটে যাবে,ফুল ভাসাবে, সোনিয়ার প্রিয় গোলাপ। তার বউয়ের জন্য, তার অসমাপ্ত সংসারের জন্য।
কারণ ভালোবাসা কখনও মরে না, ভালোবাসা থেকে যায়,হৃদয়ে, স্মৃতিতে, অমর হয়ে।
ঠিক যেমন সোনিয়া থেকে গেছে শৌনকের হৃদয়ে। লাল বেনারসি পরা, শাঁখা-পলা পরা, সিঁদুর পরা—তার চিরকালের বউ হয়ে।
---
===============
সৈকত প্রসাদ রায়
রানাঘাট, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ।

Comments
Post a Comment