কম্পিটিটর
চন্দ্রমা মুখার্জী
রুমঝুম স্কুল থেকে লাফাতে লাফাতে বাড়ি ফিরল, 'ঠাম্মা আমি
ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছি। এবার বলো আমাকে কি প্রাইজ দেবে?' ঠাম্মা ওর হাত
থেকে ব্যাগটা নিতে নিতে বললেন, 'ওরে দাঁড়া দাঁড়া। আগে রেজাল্টটা দেখা
তো।' রুমঝুম ঠাম্মার হাতে রেজাল্ট কার্ডটা দিতে দিতে বলল, 'এই নাও। আমি
সবেতে ফার্স্ট হয়েছি, শুধু ম্যাথস আর বেঙ্গলিতে শতদল হায়েস্ট পেয়েছে।
তাই টোটালে আমি ফার্স্ট আর ও সেকেন্ড। জানো, ঠাম্মা শতদল মুখটা কিরকম
পাঁচের মতো করে ছিল। আমাকে বলল, ওকে নাকি একটা সাইকেল কিনে দিতো ওর বাবা
ও ফার্স্ট হলে। এখন আর ওটা হবে না, তাই ওর মন খারাপ।'
ঠাম্মা বললেন, 'আচ্ছা, বেশ। তুমি স্নান করে এস, খেতে দিচ্ছি।
আর ও কি কথা? শতদলের মন খারাপ দেখে তুমি লাফাচ্ছো দিদিভাই? ব্যাড
ম্যানারস্।' টিকলি মাসির বাড়ি বেড়াতে এসেছে। ও সব শুনে মাসিমণি মানে
রুমঝুমের ঠাম্মাকে বলল, 'ও অত পাঁচের মতো মুখ জানলো কি করে?' ঠাম্মা
বললেন, 'ওই তোর মেসো বলে তাই শুনে শুনে শিখেছে। যাকগে, তুইও খেয়ে নে।
তারপর বিকেলে তোদের নিয়ে একটু বেরবো। ওর জন্য একটা খেলনা কিনে আনতে হবে,
ফার্স্ট হয়েছে।'
দাদু স্নান করতে গিয়েছিলেন। এসে বললেন, 'বাহ্, ফার্স্ট
হয়েছে, তাহলে আমি ওকে আইসক্রিম খাওয়াবো।' 'হ্যাঁ, তোমার নাতনি ফার্স্ট,
আর শতদল সেকেন্ড। কিরকম পুরনো কথা মনে পড়ছে না? নাতনি আবার মা – বাবার পথ
অনুসরণ করবে নাকি গো?' – বলে ঠাম্মা মুখ টিপে হাসতে লাগলেন।
টিকলি কিছু না বুঝে বলল, 'পুরনো কথা মানে? কি বলো না।' ঠাম্মা
বললেন, 'তোর মেসোকে জিজ্ঞেস কর, আমি রুমুকে তৈরি করে নিয়ে আসি।' টিকলি
এবার মেসোর দিকে ঘুরে বলল, 'বলো না মেসো।' মেসো বললেন, 'সে তো অনেক আগের
কথা। তোর দাদা – বৌদি তো স্কুলে এক ক্লাসে পড়তো। তোর বৌদি ফার্স্ট আর
দাদা সেকেন্ড। প্রত্যেকবছর এক রেজাল্ট। তা পরে তো ওরা বিয়ে করলো তাই তোর
মাসি বলছে এরকম। ভালো করে শুনতে হলে তোর বৌদিকে জিজ্ঞাসা করিস।'
---------------
সন্ধ্যেবেলা রুমঝুমকে খেলনা কিনে দিয়ে, আইসক্রিম খেয়ে ওরা
ফিরল। রাতে দাদা – বৌদি ফিরে খাওয়াদাওয়া সারার পর টিকলি বৌদিকে ধরল,
'বৌদি তোমাদের কি করে আলাপ হল, বলো।' বৌদি হাসতে হাসতে বলল, 'হঠাৎ?'
টিকলি তখন দুপুরের কথাগুলো বলল। তাই শুনে বৌদি বলল, 'যাক, তাহলে, আমার আর
কোন চিন্তা নেই। শতদল তো ভালো ছেলে। ওর বাড়ির লোকজনও ভালো।'
টিকলি বলল, আহ্, মজা না করে গল্পটা বলো না।' বৌদি বলল, 'আচ্ছা
শোন্। আমাদের বিয়ের সময় তুই তো ছোট ছিলিস, তাই অতো জানিস না। বলি তবে।'
----------------
অনুশ্রী আর কৌশিক একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়ে। প্রত্যেকবছর
ক্লাসে অনুশ্রী ফার্স্ট আর কৌশিক সেকেন্ড। কিছুতেই এর অন্যথা হয় না।
কৌশিক কোনভাবেই অনুশ্রীকে আর হারাতে পারে না। অনুশ্রীও খুব হিংসুটে,
ক্লাসে সবাইকে নোটস দেয়, পড়ায় সাহায্য করে। কিন্তু কৌশিককে সাহায্য করে
না। অবশ্য কৌশিকেরও খুব দেমাক, কিছুতেই ও অনুশ্রীর থেকে কোন ব্যাপারে
সাহায্য নেবে না।
একবার ক্লাসে দুজন করে দল বেঁধে একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা
হল। শিক্ষকরাও ইচ্ছে করেই ওদেরকে এক দলে রাখলেন। সে তো কি প্রচণ্ড ঝামেলা
দুজনের। কিছুতেই ওরা একসাথে কাজ করবে না। আসলে অনুশ্রী নিজের আইডিয়া
কৌশিকের সাথে ভাগ করবে না, আর কৌশিকও নিজের বুদ্ধি অনুশ্রীকে দেবে না।
আবার দুজনেই অন্যজনের মতটাও নেবে না।
এইভাবে প্রতিযোগিতার প্রথম রাউন্ড হয়ে গেল। ওরা দুজন সবার শেষে
জায়গা পেল যা ওদের দুজনের কাছেই প্রথম। দ্বিতীয় রাউন্ডের পরে প্রথম চার
দল সেমিফাইনালে যাবে। ওরা যদি দ্বিতীয় রাউন্ডেও এমন করে, তাহলে হারবেই।
ওদের শ্রেণি শিক্ষিকা নমিতাদি ওদের ডাকলেন – 'তোরা দুজনেই ক্লাস সেভেনে
পড়ছিস, বড় হয়েছিস। এভাবে ঝগড়া – ঝামেলা করলে তো নিজেরাই বাতিল হয়ে যাবি।
মিলেমিশে কাজ কর।'
কৌশিক বলল, 'দিদি, ও খুব হিংসুটি। কিচ্ছু বলতে চায় না।' 'আর
তুই খুব বলিস না, আমি বললে যেন কত তুই সেটা মানবি।' – অনুশ্রী বলল।
নমিতাদি বললেন, 'শোন, তোরা এরপর স্কুলের বাইরে যাবি। স্কুলে প্রথম হওয়া
নিয়ে ঝামেলা করে কোন লাভ নেই বুঝলি। যারা ক্লাসে শেষের দিকে থাকে, এমন
অনেকে দেখবি তোদের থেকে এগিয়ে যাবে। তাই নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করে সময়
নষ্ট করিস না। তাছাড়া কত অপছন্দের লোকের সঙ্গে মতের অমিল হলেও মিলেমিশে
কাজ করতে হবে। সেটার শুরু আজ থেকেই কর।'
দিদির কথা শুনে ওরা বেরিয়ে এল। তারপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও
মিলেমিশে প্রতিযোগিতা করলো আর প্রথমও হলো। আগের থেকে একটু ভালো হলেও
বন্ধুত্ব ওদের মধ্যে হল না।
----------------
এতটা শুনে টিকলি বলল, 'যা তাহলে বন্ধুত্বই হল না, তো বিয়ে হল
কি করে গো বৌদি?' বৌদি বলল, 'আরে, এ তো ছোটবেলায়। তারপর স্কুল ছেড়ে আর
আমাদের মধ্যে কোন যোগাযোগই ছিল না। তারপর হঠাৎ একদিন দেখা হল স্কুল ছাড়ার
প্রায় ৮ বছর পরে। সে বলি শোন।'
-------------------
অনুশ্রীর মা তখন খুব অসুস্থ, প্রায়ই ডাক্তার দেখাতে যেতে হয়।
অনুশ্রীর নতুন চাকরি, সবসময় সম্ভব হয় না। বাবা নিয়ে যান। একদিন এরকম
যাওয়ার পথেই কৌশিকের সাথে দেখা। আসলে অনুশ্রীর মা হাঁটতে পারছিলেন না,
এদিকে হাসপাতালের গেটের সামনেই গাড়ি নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে। ওর বাবা একা
ধরে ধরে নিয়ে যেতে পারছেন না। কৌশিকও ঐ সময়ই ওর এক বন্ধুকে হাসপাতালে
দেখে ওখান দিয়েই বেরোচ্ছিল।
ও ছুটে এসে অনুশ্রীর মাকে ধরল, যদিও ও ওদের চিনতে পারেনি।
তারপর ডাক্তারের কাছে দেখানো পর্যন্ত ওদের সঙ্গেই থাকল। অনুশ্রীর বাবা
অনুশ্রীকে ফোন করে পুরোটা বলেছিলেন। ও ছুটতে ছুটতে এলো। কৌশিকের কাছে
গিয়ে ওর মুখ না দেখেই বলতে শুরু করেছে, 'আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।' কৌশিক
তখনই ওকে দেখে বলে উঠেছে – 'অনুশ্রী, তুই? উনি তোর মা? আমি চিনতে
পারিনি।'
অনুশ্রীও অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'কৌশিক? ভালো
আছিস?' তারপর একথা সেকথা হতে থাকল। কাকু এসে কৌশিককে বললেন, 'ওর মা একেই
অসুস্থ। তার ওপর মেয়ের বিয়ে নিয়ে চিন্তা করতে করতে আরও অসুস্থ হয়ে
যাচ্ছে। ডাক্তার বলছে, ব্যাঙ্গালোর নিয়ে গেলে, ওখানে চিকিৎসা করালে সুস্থ
হয়ে যাবে। কিন্তু আমার অতো অর্থবল, লোকবল কিছুই নেই।'
অনুশ্রী বাবাকে থামতে বললেও উনি না থেমে নিজের খেয়ালেই বলতে
লাগলেন। কিন্তু কৌশিক স্থির করে ফেলেছিল।
বাড়ি ফিরেই মাকে বলল, 'মা আমি অনুশ্রীকে বিয়ে করতে চাই।' বলে
মাকে পুরো ঘটনাটা বলল। বাবা – মা রাজি হয়ে গেলেন। এরপর কৌশিক
অনুশ্রীরসঙ্গে দেখা করল। সোজাসুজি বলল, 'আমি তোকে বিয়ে করতে চাই। তুই কি
করবি? তোরা আমাদের থেকে উঁচু জাত, তাইতে তুই ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল
ছিলিস, ভেবে দেখ।'
অনুশ্রী মুচকি হেসে বলল, 'এই ছিল তোর মনে? ফার্স্ট গার্লকে
তখনই যদি প্রেম নিবেদন করে দিতিস, তাহলে হয়তো পরের বার থেকে তুইই
ফার্স্ট হতিস। এই বুদ্ধিটা তখন তোর মাথায় আসা উচিৎ ছিল।'
কৌশিক বলল, 'সেই প্রেমে পড়ে তোর মনোযোগ কমে যেত, আর আমি
ফার্স্ট হয়ে যেতাম। ইস্, আফশোষ হচ্ছে রে।' অনুশ্রী বলল, 'যাকগে, ওসব
ছাড়। Better late than never। চল্, আমিও রাজি।'
তারপর অনুশ্রীর মায়ের চিকিৎসা ব্যাঙ্গালোরে করে ওঁনাকে সুস্থ
করে ওঁনাদের মত নিয়ে ওদের বিয়েটা হয়ে গেল।
টিকলি বলল, 'দারুণ বৌদি। পুরো সিনেমার মতো।'
-------------------
চন্দ্রমা মুখার্জী
সমরপল্লী, কৃষ্ণপুর, কলকাতা ৭০০১০২

Comments
Post a Comment