বেলা তার ও চলচ্চিত্রের দর্শন
উৎপল সরকার
বিশ শতকের শেষ ভাগ ও একবিংশ শতকের শুরুর দিকের বিশ্ব চলচ্চিত্রের মানচিত্রে এমন কিছু নির্মাতার নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে, যাঁরা মূলধারার বিনোদনমুখী সিনেমার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সময়, নীরবতা ও অস্তিত্বের গভীর প্রশ্নকে চলচ্চিত্রের ভাষায় রূপ দিতে চেয়েছেন। হাঙ্গেরীয় চলচ্চিত্রকার বেলা তার ছিলেন সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যাঁর সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা কেবল গল্পগ্রহণ দর্শননার আস্বাদন নয়—বরং ধৈর্য, মনোসংযোগ ও আত্মঅনুসন্ধানের এক দীর্ঘ যাত্রা।এই সেদিন ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি বুদাপেস্টে তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বিশ্ব চলচ্চিত্র হারাল ধীরগতির চলচ্চিত্র ধারার এক অগ্রপথিককে।
১৯৫৫ সালের ২১ জুলাই হাঙ্গেরির পেচ শহরে জন্ম নেওয়া বেলা তার কৈশোর থেকেই সমাজ ও মানুষের প্রতি গভীর আগ্রহ অনুভব করেছিলেন। তাঁর পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ তাঁকে বাস্তবতার খুব কাছ থেকে জীবন দেখার সুযোগ দেয়। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁর চলচ্চিত্রে রূপ নেয় নিরাবরণ, নিষ্ঠুর অথচ মানবিক এক ভাষায়। তিনি ছিলেন কেবল একজন পরিচালক নন—একজন চিন্তাবিদ, যিনি ক্যামেরাকে ব্যবহার করেছেন দর্শনের অনুসন্ধানী যন্ত্র হিসেবে।
সামাজিক সিনেমা’ থেকে নৈরাশ্যের মহাকাব্য
১৯৭৯ সালে নির্মিত তার পারিবারিক নীড় চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বেলা তারের পরিচালনা জীবনের সূচনা। এই ছবিকে তিনি নিজেই ‘সামাজিক সিনেমা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। এখানে কোনো চমকপ্রদ নাটকীয়তা নেই, নেই বাণিজ্যিক আকর্ষণের কৌশল—আছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের টানাপোড়েন, সম্পর্কের টান এবং আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার অনিবার্য চাপ। সিনেমা ভেরিতে ধারার প্রভাব স্পষ্ট এই ছবিতে, যা তাঁকে হাঙ্গেরীয় নতুন তরঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত করে তোলে।এরপর ১৯৮৪ সালের শরতের অ্যালমানাক অফ ফল- তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে যান। একটি জরাজীর্ণ অ্যাপার্টমেন্টে বসবাসকারী কয়েকজন মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, ঈর্ষা ও সহিংসতার সূক্ষ্ম মানসিক দিকগুলো এখানে তুলে ধরা হয়। এই ছবিতে বেলা তার প্রথমবারের মতো নাট্যগঠনের সীমা অতিক্রম করে পরিবেশ ও সময়কে চরিত্রে রূপ দেন। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে তাঁর নিজস্ব শৈলী—লম্বা শট, সীমিত সংলাপ এবং ক্যামেরার সচেতন স্থিরতা।
স্বাক্ষরশৈলীর জন্ম: কারহোজাত
১৯৮৮ সালের কারহোজাত (ইংরেজি নাম "Damnation" ) বেলা তারের চলচ্চিত্রভাষায় এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এই ছবিতে তাঁর ক্যামেরা চলন হয়ে ওঠে ধীর, নিয়ন্ত্রিত এবং প্রলম্বিত। সময় যেন এখানে বাস্তবের মতোই প্রবাহিত হয়—দর্শককে কোনো কৃত্রিম গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় না। কারহোজাত-এর মধ্য দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং তাঁর নাম ধীরে ধীরে বিশ্ব চলচ্চিত্রের গম্ভীর আলোচনায় প্রবেশ করে।এই সময় থেকেই তাঁর ছবিতে সাদা-কালো চিত্রভাষা প্রধান হয়ে ওঠে। এই রঙহীনতা কোনো নান্দনিক কৌশলমাত্র নয়—বরং তা জীবনের শূন্যতা, স্থবিরতা ও অনিশ্চয়তার প্রতীক। বেলা তার বিশ্বাস করতেন, রঙ যত কম, তত বেশি স্পষ্ট হয় মানুষের অস্তিত্বগত সংকট।
শাতান্তাঙ্গো: ধীর চলচ্চিত্রের মাইলফলক
১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রায় সাত ঘণ্টার চলচ্চিত্র শাতান্তাঙ্গো (Satantango) বেলা তারের কর্মজীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হিসেবে বিবেচিত। লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই ছবি কেবল দৈর্ঘ্যের জন্য নয়, তার ভাবগত গভীরতার জন্যও কিংবদন্তি হয়ে ওঠে। এক গ্রাম, কয়েকজন চরিত্র, বারবার ফিরে আসা ঘটনা—সব মিলিয়ে এটি যেন সময়ের চক্রাকার বন্দিত্বের প্রতীক।এই ছবিতে গল্পের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় অপেক্ষা, হাঁটা, বৃষ্টি, নীরবতা। দর্শককে বাধ্য করা হয় সময়ের ভার বহন করতে। ফলে শাতান্তাঙ্গো হয়ে ওঠে ধীর চলচ্চিত্র ধারার অন্যতম ভিত্তিস্তম্ভ। আন্তর্জাতিক নানা আকাদেমিক জরিপে ছবিটি সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্রগুলোর তালিকায় স্থান পায়—যা বেলা তারকে বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসে স্থায়ী আসন এনে দেয়।
প্রলয় ও শূন্যতার দর্শন
২০০০ সালের ভের্কমাইস্তার হারমোনিয়াক-এ ((Werkmeister)-বেলা তার আবারও এক ধ্বংসাত্মক আবহ নির্মাণ করেন। একটি মৃত তিমির আগমনকে কেন্দ্র করে এক শহরের নৈতিক ও সামাজিক পতনের কাহিনি এখানে প্রতীকী রূপ পায়। ছবিটি মানবসভ্যতার ভঙ্গুরতা ও অযৌক্তিকতার এক গভীর রূপক।পরবর্তীকালে ২০০৭ সালে তিনি কান চলচ্চিত্র উৎসবে লন্ডনি লোক নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। যদিও ছবিটি সমালোচকদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পায়, তবু এটি তাঁর ধারাবাহিক নৈরাশ্যবাদী অনুসন্ধানেরই অংশ।
বিদায়বেলায় তুরিন ঘোড়া
২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তুরিন ঘোড়া (The Turin Horse) ছিল বেলা তারের শেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ফ্রিডরিখ নিৎসের জীবনের একটি কিংবদন্তিকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবি মানব অস্তিত্বের চূড়ান্ত ক্লান্তি ও নিঃশেষিত জীবনের প্রতিচ্ছবি। প্রতিদিনের একই কাজ, একই বাতাস, একই নিঃশব্দতা—সব মিলিয়ে ছবিটি যেন এক অন্তিম ধ্যান।এই ছবির মুক্তির পরই তিনি ঘোষণা করেন যে আর পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পরিচালনা করবেন না। অনেকের কাছেই এটি ছিল এক যুগের অবসান।
শিক্ষক ও শিল্পী হিসেবে নতুন পথ
চলচ্চিত্র থেকে অবসর নিলেও সৃজনশীলতা থেকে দূরে সরে যাননি বেলা তার। ২০১২ সালে তিনি সারায়েভোতে চলে যান এবং ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিদ্যালয় ফিল্মফ্যাক্টরি। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রথাগত পাঠ্যক্রমের বাইরে গিয়ে অভিজ্ঞতা, আলোচনা ও মুক্ত চিন্তার উপর জোর দেয়। বিশ্বের নানা প্রান্তের খ্যাতনামা চলচ্চিত্রশিল্পীরা এখানে শিক্ষকতা করেন। অল্প সময়েই এটি বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় উচ্চস্তরীয় চলচ্চিত্র বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিতি পায়।
চলচ্চিত্রের বাইরেও শিল্প
জীবনের শেষ দশকে বেলা তার চলচ্চিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমে কাজ করেন। ২০১৭ সালে আমস্টারডামের আই চলচ্চিত্র জাদুঘরে তাঁর টিল দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড প্রদর্শনী দর্শক ও সমালোচকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। চলচ্চিত্র, মঞ্চসেট ও ইনস্টলেশনের মধ্যবর্তী এই কাজটি ৪০,০০০-এর বেশি দর্শক দেখেন।২০১৯ সালে ভিয়েনার ভাইনার ফেস্টভোখেনের জন্য নির্মিত মিসিং পিপল প্রকল্পে তিনি শিল্পকে সরাসরি সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেন। ভিয়েনার ২৫০ জন গৃহহীন মানুষ এই স্থান-নির্দিষ্ট শিল্পকর্মে অংশ নেন—যা শিল্প ও মানবিক দায়বদ্ধতার এক বিরল দৃষ্টান্ত।
সহযোগিতা ও ব্যক্তিগত জীবন
বেলা তারের সৃষ্টিশীল জীবনে পরিচালক ও সম্পাদক আগ্নেস হ্রানিৎস্কির ( বেলা তারের স্ত্রী )ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯৭৮ সালে পরিচয়ের পর থেকেই তিনি ছিলেন তারের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ও সহ-পরিচালক। পাশাপাশি নোবেলজয়ী ঔপন্যাসিক লাসলো ক্রাসনাহোরকাই, সুরকার মিহাই ভিগ, চিত্রগ্রাহক ফ্রেড কেলেমেন এবং অভিনেত্রী এরিকা বোকের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতা তাঁর চলচ্চিত্রকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
এক নীরব উত্তরাধিকার
বেলা তারের চলচ্চিত্র হয়তো সবাইকে আনন্দ দেয় না, সহজ বিনোদনও দেয় না। কিন্তু যারা ধৈর্য ধরে তাঁর কাজের ভেতরে প্রবেশ করেন, তাঁদের জন্য তাঁর সিনেমা হয়ে ওঠে জীবনের অর্থ অনুসন্ধানের এক গভীর মাধ্যম। ধীর গতি, দীর্ঘ শট আর নীরবতার মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন—মানুষের অস্তিত্ব কতটা অনিশ্চিত, আর সময় কতটা নির্মম।তাঁর প্রয়াণে এক অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও, বেলা তার রয়ে যাবেন তাঁর ছবির প্রতিটি নিঃশব্দ ফ্রেমে, বৃষ্টিভেজা পথে, ক্লান্ত মানুষের মুখে—যেখানে জীবন থেমে থাকে না, কেবল ধীরে এগিয়ে চলে।
শেষ তবু শেষ নয়
বেলা তার ছিলেন সেই বিরল চলচ্চিত্রশিল্পীদের একজন, যিনি সিনেমাকে গল্প বলার মাধ্যম নয়, বরং সময়, নীরবতা ও অস্তিত্বকে অনুভব করার এক দার্শনিক পরিসর হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর ছবিতে গতি নেই, উত্তেজনা নেই—কিন্তু আছে জীবনের ভার, মানুষের ক্লান্তি এবং ইতিহাসের ধূসর ছায়া। তিনি দেখিয়েছেন, আধুনিক সভ্যতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা শূন্যতা ও অবসাদের ভাষা কীভাবে ক্যামেরার নীরব দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। মূলধারার বিনোদনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বেলা তার ধৈর্যশীল দর্শকের কাছে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার দরজা খুলে দেন। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো হয়তো সহজে গ্রহণযোগ্য নয়, কিন্তু সেগুলি দর্শককে প্রশ্ন করতে শেখায়—সময় কী, জীবন কী, আর মানুষ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। বেলা তার চলে গেলেও তাঁর সিনেমা রয়ে যাবে এক দীর্ঘ, অবিচল হাঁটার মতো—যা ধীরে ধীরে আমাদের ভাবনার ভেতর প্রবেশ করে।
# সকল তথ্য (জন্ম-মৃত্যু তারিখ, ছবির নাম, কর্মজীবনের বিবরণ ইত্যাদি) বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সংগৃহীত, যেমন:
The Guardian (৬,৭ও ৯ জানুয়ারি ২০২৬-এ obituary)
The New York Times (৬ ও ৭ই জানুয়ারি ২০২৬)
Wikipedia (আপডেটেড ২০২৬)
NPR, Hollywood Reporter প্রভৃতি।
লেখক:
উৎপল সরকার, নিউটাউন, আলিপুরদুয়ার, জেলা :- আলিপুরদুয়ার।
বর্তমানে কর্মসূত্রে শিলিগুড়ির বাসিন্দা।

Comments
Post a Comment