জন্মশতবর্ষে ভুপেন হাজারিকা
হিমাদ্রী শেখর দাস
ভুপেন হাজারিকা—"ব্রহ্মপুত্রের বাদুলে" বা সাধারণভাবে 'ভুপেন দা' নামে পরিচিত—বাঙালি ও অসমীয়াসহ পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সাংস্কৃতিক চিত্রে এক অটল ল্যান্ডমার্ক। গান, সংগীত রচনায় তাঁর দখল এত গভীর যে তিনি শুধু একক শিল্পী নন; তিনি একটি সমগ্র সাংস্কৃতিক বোধের কণ্ঠস্বর। ৮ই সেপ্টেম্বর ১৯২৬ সালে আসামের সাদিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া ভুপেন হাজারিকা দীর্ঘজীবী কর্মজীবনে গান, সুর, ছবির সুরসংশ্লেষ, কবিতা ও জনমনকে স্পন্দিত করা রাজনৈতিক-সামাজিক বক্তব্য—এসবের এক অদ্বিতীয় মিলন ঘটিয়েছেন। সামাজিক-মানবিক বিষয়গুলোকে শৈল্পিকভাবে অনুধাবন করে তিনি সেই কথাগুলো সঙ্গীতে রূপ দিয়েছেন, যা এখনো প্রাসঙ্গিক।
শৈশব, শিক্ষা ও গঠন
ভুপেন হাজারিকা ৮ সেপ্টেম্বর ১৯২৬-এ আসামের সাদিয়া-তে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলাতেই তাঁর সঙ্গীতের প্রতি প্রেম জন্মায়—মায়ের ভক্তিমূলক ও লোকসঙ্গীতের ছোঁয়ায়। শৈশবে তিনি জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা ও বিষ্ণুপ্ৰসাদ ৰাভাৰ মতো সংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সংস্পর্শে আসেন, যাদের সহযোগিতায় তাঁর প্রতিভা দ্রুত বিকশিত হয়। বোধ ও শিক্ষার সূত্রেই তাঁর গানগুলোতে বিশ্বজনীন মানবতাবাদ, শ্রেণী-পরিচয় ও নিপীড়িতের কাহিনী বারবার ফিরে আসে।
সঙ্গীত ও শিল্পী জীবনের বিবর্তন
ভুপেন হাজারিকার সঙ্গীত আবেগ, লয় ও বাণীর এক অনন্য মিশ্রণ —এখানে লোকসংগীত, আধুনিক বাংলা-অসমীয়া ধারার সংযোগ এবং পশ্চিম সুরশিল্পের ছোঁয়া মিলিত হয়েএক অনন্য স্বরতন্ত্রতা গঠন করে। পূর্ব ভারতের লোকজ ও শাস্ত্রীয় উপাদান নিয়ে তিনি এমনভাবে গান তৈরি করেছেন যে তা সাধারণ মানুষের অনুভূতির সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। সামাজিক-ন্যায়, শোষণবিরোধী ভাবনা, প্রেম, দূরত্ব, মানুষের করুন ছবি তিনি গান ও কবিতার মাধ্যমে ছুঁয়ে গেছেন। তাঁর গানগুলো শুধু কন্ঠস্বরের অনুষঙ্গ নয়; তা ছিল রাজনৈতিক ও নৈতিক বিবেক জাগরনের একটি মাধ্যম।
ভুপেন শুধুই গায়ক ছিলেন না, তিনি সঙ্গীত পরিচালনা, চলচ্চিত্রের সংকলন ও নির্মাণেও সক্রিয় ছিলেন। বাঙালি ও অসমীয়া ছবির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সময়ের সংযোগ ছিল; তিনি নানান চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করে চলচ্চিত্রজগতকেও সমৃদ্ধ করেছেন। ১৯৯২ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার লাভ করেন, যা তাঁর চলচ্চিত্রসংক্রান্ত অবদানের স্বীকৃতি। এছাড়া ১৯৭৫ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (Best Music Direction) প্রাপ্তি শুধু সঙ্গীতশিল্পী হিসেবেই নয়, চলচ্চিত্র-বিশ্বের একজন বিশিষ্ট সৃষ্টিকর্তা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
গানের শক্তি ও মানবতাবাদ
ভুপেন হাজারিকার গানগুলো নানা সময়ে সামাজিক নির্মমতা, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত মানুষের বিপথগামী কাহিনি, শ্রমজীবী মানুষের দুঃখ-দূর্ত্ব, জাতীয় ঐক্য ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি Indian People's Theatre Association (IPTA)-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এখানেই তাঁর সমাজতান্ত্রিক দিকটির প্রকাশ। তাঁর বহু রচনাই মানুষের অধিকার, সম্প্রীতি ও সমতার নীতিকে সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রচার করেছে। এই দিক থেকেই তিনি কেবল শিল্পী নন,একজন সমাজ-চেতনার ধারক ছিলেন
ভুপেন বিভিন্ন ভাষায় গান লিখেছেন ও গেয়েছেন—অসমীয়া, বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি। এই বহুভাষিকতা তাঁকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। তাঁর গানগুলো সীমা-রেখা লঙ্ঘন করে, একই সুর ও বাণী বাঙালি, অসমীয়া ও পুরো উপমহাদেশে মানবিক অনুভূতির সঙ্গে প্রতিধ্বনিত হয়।
তিনি পদ্মশ্রী ( ১৯৭৭), পদ্মভূষণ (২০০১) পদ্মবিভূষণ ( ২০১২)
এবং সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন ( ২০১৯) পেয়েছেন।
ভুপেন হাজারিকার ক্ষেত্রে জন্মশতবর্ষ কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মরণ নয়—এটি একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক পুনরাবর্তন ও পুনঃপ্রবর্তনের মুহূর্ত। তাঁর গানের ভাবনা— মানবতাবাদ, ঐক্য, শ্রমিক-শক্তির মর্যাদা—আজও প্রাসঙ্গিক;
কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয় ভুপেন হাজারিকার সম্মানে একটি স্মারক ১০০ টাকার কয়েন (commemorative coin) মঞ্জুর করেছে—এটি তাঁর জাতীয় স্বীকৃতিকে দৃঢ়ভাবে প্রতিফলিত করে।
জ্ঞান-প্রচারণা: জীবনী ও শিক্ষা কর্মসূচি: সরকারি উদ্যোগে একটি বিস্তৃত জীবনী লেখা ও প্রকাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে—যাকে বহু ভাষায় অনুবাদ করে দেশের পড়াশুনার সংস্থাগুলোতে পৌঁছাতে হবে; শিক্ষাগত পাঠ্য-সূচীতে হাজারিকার জীবন ও কর্মকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাঁর গান ও সাহিত্যিক রচনাবলি নিয়ে কর্মশালা, সেমিনার ও প্রদর্শনী রাখা হবে।
জন্মশতবর্ষ শুধু অনুষ্ঠান নয়; এক নতুন 'রেডিসকভারি'—যেখানে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার করে ভুপেন হাজারিকার সৃষ্টিকে তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌছে দেওয়া প্রচেষ্টা । ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি, স্কুল পাঠ্যপুস্তকে গান ও লেখা অন্তর্ভুক্ত। ।
ভুপেনের সমাজতান্ত্রিক ও মানবতাবাদী বার্তা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করে তাঁর কাজকে বিশ্বসংস্কৃতির অংশ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে
তাঁর জীবনী ও গবেষণামূলক কাজ করে নতুন-নতুন পর্যালোচনা ও গবেষণাপত্রের উৎসাহ দেওয়া দরকার।
ভুপেন হাজারিকার জন্মশতবর্ষ কেবল একটি স্মৃতিচারণা নয়, এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের প্রকাশ। রাষ্ট্রীয়-সামাজিক উদ্যোগ ও প্রতিটি সাংস্কৃতিক স্তরের অংশগ্রহণই যদি মেলবন্ধন করতে পারে, তাহলে এ বছরের উদ্যোগগুলো কেবল স্মৃতি গড়বে না; নতুন প্রজন্মকে একটি মানবিক, উদার ও সাংস্কৃতিক বোধে সমৃদ্ধ করবে। তাঁর গানগুলো 'মানুষ'কে বারবার মনে করিয়ে দেয়। জন্মশতবর্ষ আমাদের সুযোগ দেয় সেই বার্তা নতুনভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার—একটা সময় যখন আমাদের সমাজ মানবিকতার, সাধারণ মানুষের মর্যাদা ও সংহতির বার্তা শুনে জাগ্রত হতে পারে।
==================
তথ্যসূত্র:-
১.Dr. Bhupen Hazarika Foundation — তথ্য ও জীবনী।
২. "Bard of Brahmaputra - Dr. Bhupen Hazarika" — indiaculture.gov.in
৩.India Today
৪. NDTV ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যম — ভুপেন হাজারিকার সম্মান (Bharat Ratna ২০১৯)

Comments
Post a Comment