কাজ এখনও বাকি
সৈকত প্রসাদ রায়
ঘড়িতে তখন সকাল আটটা বাজে। জানলার ফাঁক গলিয়ে ঢুকে পড়েছে সকালের মিষ্টি রোদ। সেই আলো এসে পড়েছে সত্তরোর্ধ্ব সঞ্জীববাবুর মুখে। দীর্ঘ ঘুম ভেঙে চোখ খুলতেই দেখলেন সামনে দাঁড়িয়ে আছে একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে তার একমাত্র ছেলে সৌনক।
সঞ্জীববাবুকে প্রতিদিন ভোর ছ'টায় ঘুম থেকে ডেকে তুলতে হতো না কখনও। শীত–গ্রীষ্ম–বর্ষা, তিন দশক ধরে তিনিই ছিলেন সৌনকের সকালবেলার অ্যালার্ম। পড়াশোনার সময় হোক কিংবা অফিসের দিন, বাবার ডাকে ঘুম ভাঙা সৌনকের জীবনের অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু আজ হঠাৎ আটটা বেজে গিয়েও বাবা ঘুম থেকে ওঠেননি। সামনেই সৌনকের বিয়ে—সব দায়িত্ব, সব আয়োজন একা হাতে সামলাচ্ছেন সঞ্জীববাবু। তাই বাবাকে এইভাবে শুয়ে থাকতে দেখে ছেলের মনে দুশ্চিন্তা হওয়াটাই স্বাভাবিক।
সৌনক এগিয়ে এসে উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করল—
—"বাবা, তোমার শরীর ঠিক আছে তো? কোনো কষ্ট হচ্ছে? ডাক্তার আঙ্কেলকে ডাকব?"
সঞ্জীববাবু এক ঝলক তাকালেন ছেলের দিকে। তারপর মৃদু হেসে বললেন—
—"আরে, কিছু লাগবে না রে! আমি একেবারেই ফিট অ্যান্ড ফাইন আছি। আসলে কাল রাতে ঘুম আসতে একটু দেরি হয়েছিল, তাই আজ ভোরে ঘুম ভাঙতেও দেরি হয়ে গেল।"
সৌনক বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত গলায় বলল—
—"না বাবা, তোমার চোখ-মুখগুলো কেমন যেন লাগছে। তুমি এক্ষুনি আমার সঙ্গে ডাক্তার মুখার্জির চেম্বারে যাবে। কোনো অজুহাত শুনব না।"
সৌনকের এতটা জোরাজুরিতে আর না করতে পারলেন না সঞ্জীববাবু। ছেলের মনটা অকারণে খারাপ হয়ে থাকুক, সেটা তিনি চান না। তাই ধীরে ধীরে উঠে জামাকাপড় পরে ছেলের সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন ডাক্তারবাবুর চেম্বারের পথে।
ডাক্তার মুখার্জি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন মন দিয়ে। সবকিছুই মোটামুটি ঠিকঠাক, শুধু রক্তচাপটা একটু বেশি। প্রেসার মাপার যন্ত্রের কাঁটাটা দেখিয়ে ডাক্তারবাবু হেসে বললেন—
—"দুশ্চিন্তা কোরো না। এ বয়সে এ রকম ওঠানামা খুবই স্বাভাবিক। ওষুধটা নিয়ম করে খেলে আর চিন্তা না করলে সব ঠিক থাকবে।"
এই আশ্বাসজনক কথাগুলো শুনে স্বস্তি পেলেন সঞ্জীববাবু। তবে ছেলের চোখের উৎকণ্ঠা পুরোপুরি গেলো না। প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে বাবা-ছেলে ফিরলেন বাড়ি।
বাড়ি ফিরে সৌনক সোজাসুজি বলে দিল—
—"আমি এখন অফিসে যাচ্ছি। হাজারটা কাজ থাকলেও তুমি আজ বাড়ির বাইরে কোথাও বেরোবে না। আমি মানোদা মাসিকে বলে যাচ্ছি তোমার খোঁজ রাখতে। অফিস থেকে ফিরে আমি নিজেই তোমাকে নিয়ে বেরোব।"
সঞ্জীববাবু মাথা নেড়ে সম্মতির ইঙ্গিত দিলেন। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ভিন্ন এক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে তার মনে। ভাবলেন—
"না, আজকেই একবার রায় জুয়েলারিতে যেতে হবেই। সৌনকের বিয়ের দিন আর বেশি দূরে নয়। "
সৌনক অফিস বেরিয়ে যাওয়ার পর সঞ্জীববাবু ধীরে ধীরে আলমারির দিকে গেলেন। চাবিটা বের করে লকার খুললেন। লকারের ভেতর থেকে বের করলেন একটি সোনার নেকলেস—সেই নেকলেস যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অগণিত স্মৃতি।
মনে পড়ল কুড়ি বছর আগের কথা। সৌনকের পাঁচ বছর বয়সের জন্মদিন। সেদিনই তিনি সুরঞ্জনাকে এই নেকলেসটা উপহার দিয়েছিলেন।
সেদিন নেকলেস হাতে পেয়ে অবাক হয়ে সুরঞ্জনা বলেছিলেন—
—"আজ তো বাবুর জন্মদিন, আমাকে উপহার দিচ্ছ কেন?"
সঞ্জীববাবু হেসে জবাব দিয়েছিলেন—
—"আজ যে সৌনককে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছে, তারও তো জন্মদিন তাই দিলাম।"
সুরঞ্জনা লজ্জা পেয়ে সামনের দিকে তাকাতে না পেরে মুখ নামিয়ে রেখেছিলেন। সেই মুহূর্তেই সঞ্জীববাবু আলতো করে তার গলায় নেকলেসটা পরিয়ে দিয়েছিলেন।
ঠিক তখনই ঘরে ঢুকেছিল পাঁচ বছরের ছোট্ট সৌনক। দরজার কাছে দাঁড়িয়েই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মায়ের গলায় নতুন নেকলেসের দিকে।
সুরঞ্জনা ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে স্নেহভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিলেন—
—"কী রে বাবু, তোর নেকলেসটা ভালো লেগেছে?"
ছোট্ট সৌনক সোজাসাপ্টা উত্তর দিয়েছিল—
—"হ্যা।"
সুরঞ্জনা মৃদু হেসে বলেছিলেন—
—"কিন্তু বাবু, এটা তো মেয়েদের জিনিস। তুই কেমন করে পরবি? আমি বরং এটা তোর বৌয়ের জন্য তুলে রেখে দেব, কেমন?"
সৌনক গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলেছিল—
—"ঠিক আছে।"
ছেলের সেই পরিণত উত্তরের দিকে তাকিয়ে সুরঞ্জনা হেসে ফেলেছিলেন—
—"আরে বাবা, আমার ছেলেটা এখনই বিয়ের নাম শুনে গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে!"
কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে, মাত্র সাত বছরের সৌনককে আর তার বৌয়ের জন্য সযত্নে রাখা সেই নেকলেস—দুটোই সঞ্জীববাবুর জিম্মায় রেখে চিরতরে চলে গেলেন সুরঞ্জনা। সেই দিনটার পর থেকে প্রতিটি সকাল যেন সঞ্জীববাবুর কাছে আরও ফাঁকা হয়ে উঠল।
আজ হঠাৎই সেই স্মৃতির কথা মনে পড়তেই চোখের কোণে জল এসে গেল তাঁর। হাতের আঙুলে নেকলেসটা আঁকড়ে ধরে অনেকক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইলেন। তারপর মনটাকে শক্ত করে নিলেন —
"না, এখন ভেঙে পড়লে চলবে না। এই নেকলেসটাই সৌনকের বৌকে দেব, যেন সুরঞ্জনার আশীর্বাদ বৌমার গলায় থেকে যায়।"
মনের দুঃখ চেপে সঞ্জীববাবু নেকলেসটা নিয়ে বেরিয়ে গেলেন দোকানে, ওটা একটু পালিশ করিয়ে নতুনের মতো করে তোলার জন্য।
এখন তাঁর হাতে অনেক কাজ। একা হাতে সমস্ত আয়োজন সামলাতে হচ্ছে তাঁকে। ভাই সঞ্জয় আমেরিকা থেকে ভাইপোর বিয়েতে অবশ্যই আসবেন, কিন্তু মাত্র দু'দিন আগে। ফলে আসল সমস্ত দায়িত্বই এখন সঞ্জীববাবুর ঘাড়ে।
দেখতে দেখতেই বিয়ের দিন এসে মিটে গেল। আজ সৌনকের বৌভাত, সঞ্জীববাবু'র পাশের ঘরে, সৌনকের ফুলসজ্জার খাট সাজাতে লোকজন এসেছে। সঞ্জীববাবু সব দেখছিলেন, মনে হচ্ছিল সব কিছু যেন ঠিক মতো চলছে।
রাত নামতেই সবকিছু নির্বিঘ্নে মিটে গেল। অতিথিরা একে একে বিদায় নিলেন। সৌনক আর তার বৌ প্রিয়াঙ্কা দু'জনে এসে সঞ্জীববাবুকে প্রণাম করলেন।
সঞ্জীববাবু প্রাণ থেকে আশীর্বাদ করলেন—
—"সুখী হও তোমরা দু'জনে। জীবনের প্রতিটি দিন হোক আনন্দে ভরা, হোক একে অপরের প্রতি ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।"
সৌনক আর প্রিয়াঙ্কা দু'জনের চোখে আনন্দ আর কৃতজ্ঞতা ফুটে উঠল। সঞ্জীববাবুর সেই আশীর্বাদ যেন তাদের জীবনের শুরুটা আরও মধুর করে দিল।
এবার সঞ্জীববাবু নিজে ঘরে ঢুকলেন। নিজেকে মনে হলো যেন এক ক্লান্ত সৈনিক। নিজের বিছানার দিকে তাকিয়ে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। সাত বছর বয়সে সুরঞ্জনা চলে যাওয়ার পর থেকে একদিনের জন্যও তিনি সৌনককে ছাড়া থাকেননি।
প্রবল দুর্যোগের রাতে সৌনক বাবাকে আঁকড়ে ধরেছে। সঞ্জীববাবু ছেলেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন স্নেহে। কখনও কখনও ছেলের শরীর খারাপ হলে মাথায় জলপট্টি দিয়ে রাত জাগতেন।
আজ সেই সৌনক পাশে ঘরে বউ নিয়ে। সৌনকের মাথার বালিশ ও পাশবালিশগুলো পড়ে আছে সঞ্জীববাবুর খাটের একপাশে, যেন অনাথ। আজ থেকে তিনি বরাবরের মতো একা হয়ে গেছেন—এই চিন্তায় মনটা বিষণ্ণ হয়ে উঠল।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে সঞ্জীববাবু নিজেকে ধমক দিলেন—
—"এ কেমন চিন্তা, ভাবনা! নিজের ছেলেকে বিয়ে দিয়ে সুখী দেখা তো প্রতিটি বাবার স্বপ্ন,তা আজ পূরণ হলো। আমার মনের মধ্যে এসব বাজে চিন্তা কেন আসে?"
বলে নিজে নিজেকে ঘুরিয়ে নিয়ে জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। বাইরের আলো আসছিল, আর সঞ্জীববাবুর মনে যেন শান্তি ফিরতে শুরু করল।
এবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন সঞ্জীববাবু, সোজা হয়ে শুয়ে চোখের সামনে দেখলেন সুরঞ্জনার বড়ো ফটোটা জ্বলজ্বল করছে, ছেলে-বৌমা আজকে নতুন মালা পরিয়েছে , ছবির দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে - ছেলের বিয়ে সুসম্পন্ন হয়েছে তাই সুরঞ্জনা আজ খুব খুশি, হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছেন সঞ্জীববাবুর দিকে, সঞ্জীববাবু বললেন "খুব হাসি আজ তোমার মুখে, খুব আনন্দ তাই না? ছেলের বিয়ে ভালোভাবে মিটেছে আর এই বুড়ো এবার একলা হয়ে গেছে, তাই খুব হাসি পাচ্ছে তাই না? শোনো আমার কিন্তু কাজ শেষ, আর বলতে পারবে না যে আমি অর্ধেক কাজ ফেলে রেখে পালিয়ে এসেছি, আমার কাজ শেষ হয়েছে, এবার নিশ্চিন্তে আমি তোমার কাছে যাব, তৈরি হও গিন্নি, খুব শীঘ্রই আমি আসছি" - বলে সঞ্জীববাবু ঘুমিয়ে পড়লেন|
তিন বছর পরের এক রাত, সঞ্জীববাবু শুয়ে আছেন বিছানায়, মনটা আনন্দে ভরপুর। বিছানা থেকে সৌনকের বালিশ সরে গেছে ঠিক, কিন্তু তার বদলে এসেছে ছোট ছোট দুইটি পাশবালিশ ও একটি ছোটো মাথার বালিশ, যেখানে শুয়ে আছে সঞ্জীববাবুর অতি আদরের ধন দুই বছর বয়সের সৌমাল্য, দাদুর আদরের জিকো। জিকো দাদুর হাতের একটি আঙুল নিজের ছোট হাতের মুষ্টিতে ভরে নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। দুই বছরের জিকোর দাদু ছাড়া এক মুহূর্তও চলে না।
সঞ্জীববাবু সুরঞ্জনার ছবির দিকে তাকিয়ে বললেন—
—"আমাকে ক্ষমা করো গিন্নি, আজ থেকে তিন বছর আগে আমি তোমার কাছে যেতে চেয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু আজ আর যেতে চাই না। দাদু ভাই মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে দিয়েছে। আরও কিছুদিন দাদুভাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে চাই। এখনও যে আমার অনেক কাজ বাকি।"
-----
সৈকত প্রসাদ রায়
রানাঘাট, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ।

Comments
Post a Comment