বাঙালি মানসে পৌষ সংক্রান্তি
পাভেল আমান
যেকোনও উৎসবের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে মানুষের মিলনের আনন্দ বার্তা। উৎসব মানেই প্রতিমুহূর্তে জুড়ে যায় একে অপরের সাথে আত্মিকতার মেলবন্ধন।আত্মীয়-পরিজনের আগমনে উৎসব পূর্ণতা লাভ করে। পৌষের সংক্রান্তির কথা উঠলেই ভেসে উঠে পিঠে, পুলি, পায়েস দিয়ে রসনাতৃপ্তি এবং ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে সংক্রান্তির স্নান শেষে ধানের থেতে খড়ের বুড়ি মা-র ঘরে আগুন দিয়ে গ্রাম জুড়ে আট থেকে আশির শরীর উষ্ণ করার ছবি।পৌষ সংক্রান্তিতে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় স্নিগ্ধ সবুজ গ্রাম। শহরের ব্যস্ত জীবনেও দোকানে দোকানে সেজে উঠা তিল, কদমা, প্যাকেটের চালের গুঁড়োর প্যাকেট, ঝোলা গুড়ের হাঁড়ি জানান দেয় চলে এসেছে পৌষ সংক্রান্তি। এভাবেই পৌষ সংক্রান্তি ঘিরে বাঙালি মানুষে নানান স্মৃতি বারে বারে উঁকি দিয়ে থাকে। আজ পৌষ সংক্রান্তি। উৎসবপ্রিয় ভোজনরসিক বাঙালির বারো- মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে আরও এক পার্বণ হলো পৌষ-সংক্রান্তি। পৌষ সংক্রান্তিকে 'মকর সংক্রান্তি' বা 'উত্তরায়ণ সংক্রান্তি'ও বলা হয়। । এই পার্বণের অর্থ হলো পিঠে পুলির উৎসব। পৌষ পার্বণ বা মকর সংক্রান্তি বাঙালি সংস্কৃতিতে বিশেষ একটি দিন। বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পৌষ মাসের শেষ দিনে এই উৎসবটি পালন করা হয়। হিন্দু শাস্ত্র মতে পৌষ পার্বণ দিনটি অত্যন্ত পুণ্যকর দিন বলে মনে করা হয়। এদিন সকাল থেকেই ঘরে ঘরে শুরু হয়ে যায় উৎসবের আমেজ। যা মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহ জুড়ে চলতে থাকে। পৌষসংক্রান্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালিদের আরও বেশ কয়েকটি নিয়মাচার। এই দিনে সাধারণত গৃহস্থ বাঙালি বাড়িতে তুলসীতলায় বাস্তুপুজো হয়। নতুন গুড় এবং তিলা কদমা অর্পণ করা হয় বাড়ির সদস্যদের মঙ্গলকামনায়।
মকরসংক্রান্তি হল সেই ক্ষণ, যাকে ঘিরে এই উৎসব পালিত হয়।প্রাচীনকাল থেকেই এই উৎসব চলে আসছে। তবে সুস্পষ্টভাবে কোনও তথ্য পাওয়া যায় না। হতে পারে এটা হাজার বছরের উৎসব বা তারও আগের তবে পুরাণেও এর উল্লেখ আছে। মকর সংক্রান্তির এই মহাতিথিতেই মহাভারতের পিতামহ ভীষ্ম শরশয্যায় ইচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করেছিলেন। আবার অন্য মত অনুযায়ী, এই দিনই দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের যুদ্ধ শেষ হয়েছিল। বিষ্ণু অসুরদের বধ করে তাঁদের কাটা মুন্ডু মন্দিরা পর্বতে পুঁতে দিয়েছিলেন, তাই মকর সংক্রান্তির দিনই সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাস হয়ে শুভ শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে আজও মানা হয়ে থাকে। আবার অন্য মতে, সূর্য এ দিন নিজের ছেলে মকর রাশির অধিপতি শনির বাড়ি এক মাসের জন্য ঘুরতে গিয়েছিলেন। তাই এই দিনটিকে বাবা-ছেলের সম্পর্কের একটি বিশেষ দিন হিসাবেও ধরা হয়।সংক্রান্তি অর্থ সঞ্চার বা গমন করা। সূর্যের এক রাশি হতে অন্য রাশিতে সঞ্চার বা গমন করাকেও সংক্রান্তি বলা যায়। সংক্রান্তি শব্দটি বিশ্লেষণ করলেও একই অর্থ পাওয়া যায়। সং+ক্রান্তি, সং অর্থ সঙ সাজা এবং ক্রান্তি অর্থ সংক্রমণ। অর্থাৎ, ভিন্ন রূপে সেজে অন্যত্র সংক্রমিত হওয়া বা নতুন সাজে, নতুন রূপে অন্যত্র সঞ্চার হওয়া বা গমন করাকে বোঝায়। সূর্য এ দিনই ধনু থেকে মকর রাশিতে প্রবেশ করে। এর থেকেই মকর সংক্রান্তির উৎপত্তি।এছাড়াও পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় মেলা হয়। বীরভূমের কেন্দুলি গ্রামে এ দিনটি জয়দেবের মেলা হয়। বাউল গান এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ। এদিনই টুসু উৎসব বা মকর পরবে মেতে ওঠেন মেদিনীপুর ঝাড়গ্রাম বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও সংলগ্ন এলাকার মানুষ। নাচে গানে মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন তারা। টুসু এক লৌকিক দেবী, যাকে কুমারী হিসেবে কল্পনা করা হয় বলে প্রধানত কুমারী মেয়েরা টুসুপূজার প্রধান ব্রতী ও উদ্যোগী হয়ে থাকেন।টুসু বা মকর উপলক্ষ্যে এলাকায় একাধিক মেলাও বসে। যার অন্যতম পোরকুলের মেলা। এভাবেই ঐতিহ্য সংস্কৃতিকে আকড়ে ধরে বাঙালিরা পৌষ সংক্রান্তি পালন করে আসছে উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে। বর্তমান ইন্টারনেট মোবাইলের যুগে কর্মব্যস্ততা বেড়ে গেল এখনো গ্রাম-বাংলায় আবহমান কাল ধরেই পরম্পরা ঐতিহ্যকে লালন পালনে চলে আসছে পৌষ সংক্রান্তি। উৎসব রীতিনীতি আচার ঐতিহ্যকে সাদরে লালন করেই বাঙালিরা এখনো আনন্দে মেতে ওঠে সংক্রান্তিতে।
=====================
রচনা -পাভেল আমান -হরিহরপাড়া- মুর্শিদাবাদ

Comments
Post a Comment