শাপগ্রস্ত কূপ
মনোরঞ্জন ঘোষাল
অদ্রিজা ছিল একজন সমাজকর্মী, যিনি তার পারিবারিক ম্যানশন 'আশ্রয়' সংস্কার করার জন্য গ্রামে ফিরেছিলেন। ম্যানশনটির কেন্দ্রে ছিল একটি পুরোনো, শ্যাওলা-ধরা পাথরের কূপ, যা বহু বছর ধরে শুকনো। এই কূপটি সম্পর্কে গ্রামে একটি পুরোনো জনশ্রুতি প্রচলিত ছিল। স্থানীয়রা বলত, এটি ছিল 'অশ্রু-শোষণকারী কূপ'। কথিত আছে, অতীতে এই ম্যানশনের জমিদার বংশের মহিলারা তাদের সব দুঃখ এই কূপে এসে কাঁদতেন, আর কূপটি সেই দুঃখের জল শুষে নিয়েছিল।
লোককথা ছিল: যে এই কূপের জল স্পর্শ করে, তার ভেতরের সব দুঃখ কূপটি শুষে নেয়। কিন্তু বিনিময়ে, কূপটি তার ভেতরে অন্য কারও, অনেক পুরোনো, জমাট বাঁধা দুঃখ ভরে দেয়।
কূপটির পাথরের দেওয়ালে একটি অস্পষ্ট লতানো নকশা খোদাই করা ছিল, যা দেখতে অনেকটা কান্নার জলধারা বা উল্টো দিকে প্রবাহিত নদীর মতো।
একদিন রাতে, প্রচণ্ড বৃষ্টিতে কূপটি প্রায় ভরে গেল। সেই জলের রং ছিল অস্বাভাবিকভাবে গাঢ়, প্রায় কালো, এবং জল থেকে এক তীব্র, লোনা গন্ধ আসছিল।
অদ্রিজা কৌতূহলবশত কূপের কাছে গেলেন এবং হাত দিয়ে সেই কালো জল স্পর্শ করলেন। জল ছিল অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ, যেন সেই জলের ভেতরে বহু বছরের আবেগ জমে আছে।
কূপের জল স্পর্শ করার পর থেকেই অদ্রিজার জীবনে অদ্ভুত পরিবর্তন আসতে শুরু করল।
তার ভেতরের সব দুঃখ, উদ্বেগ এবং ছোটখাটো বিরক্তি যেন মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল! তিনি এখন অত্যন্ত হালকা এবং আবেগহীন অনুভব করতে লাগলেন। তার জীবন এখন আনন্দ এবং প্রশান্তিতে ভরা, যা ছিল অস্বাভাবিক।
কিন্তু সেই প্রশান্তির সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরে অন্য কারও গভীর, জমাট বাঁধা দুঃখ প্রবেশ করল।
তিনি যখন ঘুমাচ্ছিলেন, তখন তার স্বপ্নে দেখা দিত এক ক্রন্দনরত মহিলার আবছা প্রতিচ্ছবি। সেই মহিলা কূপের সামনে বসে কাঁদছে, আর তার সেই ক্রন্দন ছিল অসহনীয় এবং হাজার বছরের পুরোনো।
অদ্রিজা যখন ঘুম থেকে উঠতেন, তখন তার বুক ভারী লাগত। তিনি অনুভব করতেন: তার নিজেদের কোনো কারণ নেই, তবুও তিনি অত্যন্ত গভীর এক কষ্ট অনুভব করছেন!
একদিন সকালে, অদ্রিজা তার মায়ের ছবির দিকে তাকালেন। তিনি দেখলেন, ছবির প্রতি তার সহজ ভালোবাসা এবং আবেগ যেন দুর্বল হয়ে গেছে। কিন্তু তার বুকের ভেতরে সেই অজানা মহিলার ক্রন্দন তীব্র হচ্ছে।
অদ্রিজা দ্রুত কূপের কাছে গেলেন। তিনি দেখলেন, কূপের কালো জল যেন আরও ঘন হয়ে উঠেছে, আর জলের ওপর অসংখ্য ক্ষুদ্র, ঢেউ তৈরি হচ্ছে—যা ছিল কান্নার জলের ক্ষুদ্র প্রতিফলন!
অদ্রিজা বুঝলেন, কূপটি তার আবেগিক ভারসাম্য চুরি করে নিয়েছে এবং তাকে অন্য কারও দুঃখের ধারক বানিয়েছে। তিনি সেই কূপে হাত দিয়েছিলেন, আর কূপটি তার নিজস্ব নিয়ম প্রয়োগ করেছে।
তিনি যখনই তার নিজের জীবনের কোনো আনন্দের মুহূর্ত মনে করতেন, তখনই তার মনে হতো সেই পুরোনো, ক্রন্দনরত মহিলার উপস্থিতি যেন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে এবং সেই আনন্দকে তিক্ততায় পরিণত করছে।
অদ্রিজা তার ল্যাবরেটরি থেকে একটি থার্মাল ক্যামেরা আনলেন। ক্যামেরায় তিনি দেখলেন: কূপের জল থেকে ধীরে ধীরে উষ্ণ বাষ্প বের হচ্ছে, কিন্তু সেই বাষ্পের আকৃতি ছিল ক্রন্দনরত মহিলার মতো!
সে-ই ছিল সেই 'দুঃখ-চোর' বা 'জলের সত্তা'।
সত্তাটি তখন তার মায়া বিস্তার করল।
কূপের জল থেকে একটি আবছা, লোনা হাতের মতো আকৃতি বেরিয়ে এলো এবং অদ্রিজার দিকে এগিয়ে এলো। সেই আকৃতি যখনই তার শরীরের কাছাকাছি এলো, অদ্রিজা অনুভব করলেন: তার শরীরের উষ্ণতা যেন তীব্র গতিতে শীতল হয়ে যাচ্ছে!
জলের সত্তাটি ফিসফিস করে উঠল: "তোমার দুঃখ আমাকে শক্তি দিয়েছে, আর এখন আমি তোমার উষ্ণতা শুষে নেব। তুমি চিরকালের জন্য আমার স্থির, শীতল দুঃখের সঙ্গী হবে!"
সত্তাটি কেবল দুঃখ চুরি করে না, এটি সেই দুঃখের বিনিময়ে পাওয়া প্রশান্তিকে ব্যবহার করে শিকারের জীবনীশক্তিও গ্রাস করে।
অদ্রিজা জানতেন, এই জলের সত্তাকে হারাতে হলে তাকে জল এবং আবেগের সেই চক্র ভাঙতে হবে। জলকে অপবিত্র করতে হবে, আর দুঃখকে ব্যক্ত করতে হবে।
তিনি তার ঠাকুরদার পুরোনো ডায়েরি খুঁজে পেলেন। সেখানে লেখা ছিল: "কূপের জল বিশুদ্ধ দুঃখ ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করে না। কৃত্রিম লবণ সেই জলের অভিশাপ।"
অদ্রিজা দ্রুত তার ম্যানশনের পুরোনো রান্নাঘরের ভান্ডার থেকে বিশাল বস্তাভর্তি সাধারণ লবণ সংগ্রহ করলেন। তিনি জানতেন, এই কৃত্রিম লবণ বিশুদ্ধ, আবেগের জলকে বিষাক্ত করবে।
জলের সত্তাটি তখন তার বরফের হাত নিয়ে অদ্রিজার দিকে এগিয়ে আসছে। সত্তাটির মুখে এখন অসহনীয় ক্রোধ—কারণ সে দেখছে অদ্রিজা তার মায়া কাটিয়ে উঠছে।
সত্তাটি চিৎকার করে উঠল: "তুমি আমার শান্তি ভাঙতে পারবে না! আমার দুঃখ শাশ্বত!"
অদ্রিজা তার সব শক্তি দিয়ে লবণের বস্তাগুলো কূপের কালো জলের দিকে ছুড়ে মারলেন!
বিশাল পরিমাণ লবণ কূপের কালো জলকে স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই, কূপের জল তীব্রভাবে ফুঁসতে শুরু করল! জল থেকে গাঢ়, লোনা বাষ্প বের হলো, যা দেখতে ছিল তীব্র যন্ত্রণার ধোঁয়ার মতো।
লবণের প্রভাবে জলের সত্তাটি বিকৃত হয়ে গেল। তার লোনা, হাতের আকৃতি মুহূর্তের মধ্যে সংকুচিত হলো এবং কালো জলের গভীরে তলিয়ে গেল।
কালো জল তখন আস্তে আস্তে পরিষ্কার হতে শুরু করল। জলের রং আর কালো নেই, বরং তা স্বাভাবিক, স্বচ্ছ হয়ে উঠল।
কূপের জল স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অদ্রিজা অনুভব করলেন: তার ভেতরের সেই পুরোনো, জমাট বাঁধা দুঃখ যেন হঠাৎ করেই তীব্রভাবে মুক্তি পেল! তিনি অসহনীয় যন্ত্রণায় কাঁদতে শুরু করলেন। কিন্তু এই কান্না ছিল তার নিজের, অন্য কারও নয়।
কান্না থামার পর অদ্রিজা অনুভব করলেন, তিনি হালকা হয়ে গেছেন। তার আবেগিক ভারসাম্য ফিরে এসেছে। তার ভেতরে এখন আনন্দও আছে, আবার দুঃখও আছে—যা একজন মানুষের জন্য স্বাভাবিক।
অদ্রিজা সেই কূপটি চিরতরে পাথরের স্ল্যাব দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। তিনি জানতেন, দুঃখ চুরি করার ক্ষমতা হয়তো কূপের নেই, কিন্তু মানুষের দুর্বলতাকে ব্যবহার করে সেই কূপ অন্যের জীবনের ভার বহন করত। তিনি আর কখনও আবেগহীন প্রশান্তি চাননি।

Comments
Post a Comment