
রবীন্দ্রনাথের গান "তাই তোমার আনন্দ আমার পর"—একটি ব্যক্তিগত অনুভব ও বিশ্লেষণ
ভুবনেশ্বর মন্ডল
রবীন্দ্রনাথের গান শুনলে এবং পাঠ করলে একটা বিশেষ অনুভূতি জাগে মনের মধ্যে। রবীন্দ্র সংগীতের জন্ম যেন রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ের অতল গভীর থেকে। আমার মনে হয় এ এই গান কৃত্রিমভাবে সাজানো কোন কথা নয়। এক বিশেষ মুহূর্তের বিশেষ উপলব্ধি জাত সত্য। কবি যেন ধ্যানতন্ময় হয়ে অনুভূতির গভীরে ডুবে হৃদয় সমুদ্র মন্থন করে থেকে রত্ন তুলে এনেছেন তাঁর গানে। রবীন্দ্রনাথের গান যেন কোন বিশেষ ব্যক্তির কথা নয়। এ এক বিশ্বজনীন অনুভূতি ও সত্য। বিশ্বের যে কোন মানুষই নিজেকে মেলাতে পারেন কবির ওই অনুভূতির সঙ্গে। তাঁর মনে হবে এ যেন আমারই কথা, আমারই অনুভব, আমারই উপলব্ধি জাত সত্য। রবীন্দ্রনাথের গানে রয়েছে এক মহাব্যাপ্তি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে যেন সত্য দ্রষ্টা ঋষি তুল্য। মনের সূক্ষ কোমল অনুভূতি গুলি নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন তাঁর গানে। গানগুলি স্বতঃস্ফূর্ত ঝর্ণাধারার মতো। কবি যেন আত্মসমাহিত। তাঁর বিভিন্ন পর্যায়ের গান রয়েছে। প্রেম, প্রকৃতি, পূজা,আনুষ্ঠানিক, স্বদেশ প্রেম মূলক ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথের উপর উপনিষদের গভীর প্রভাব রয়েছে। সে প্রভাব পড়েছে তাঁর গানে। তবে উপনিষদের চিন্তা দর্শন কবির অন্তরে জারিত হয়ে এক নব রস নব রূপ লাভ করেছে। তাই তাঁর গান তাঁর একান্ত নিজস্ব সম্পদ। এরকমই একটি গান আমার অন্তরকে নাড়া দিয়ে যায়। গানটি হল - "তাই তোমার আনন্দ আমার পর/তুমি তাই এসেছ নিচে/আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর/তোমার প্রেম হতো যে মিছে।" গানটি কবি লিখেছিলেন ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে জানিপুরে। গানটির রাগ হল দেশ। ভক্ত এবং ভগবানের আন্তরিক গভীর সম্পর্কের কথা এখানে ধ্বনিত হয়েছে এ গানে।
ঈশ্বরের আনন্দ তার ভক্তের জন্যই। কবি বলছেন - "তোমার আনন্দ আমার পর"-ঈশ্বর এক আনন্দময় সত্তা। শাস্ত্র অনুসারে আনন্দ লাভের জন্যই ঈশ্বরের যাবতীয় লীলা। কিন্তু আনন্দ তো একা একা হয় না। আনন্দের জন্য প্রিয়জনের দরকার। ঈশ্বরের প্রিয়জন তার ভক্ত,অনুরাগী। রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর অবস্থান করেন হৃদয়ে। হৃদয়ই তাঁর মন্দির মসজিদ গির্জা উপাসনালয়। রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর মনোময়। জীবনদেবতা কবির হৃদয়ের ঈশ্বর। জীবন দেবতা সম্পর্কে কবি বলছেন - "অন্তর মাঝে বসি অহরহ/মুখ হতে তুমি ভাষা কেড়ে লহ/মোর কথা লয়ে তুমি কথা কহ/মিশায়ে আপন সুরে।" এই একই ভাবনা ও অনুভূতির প্রকাশ "তোমার আনন্দ আমার পর" গানেও দেখতে পাই। ভক্ত অনুরাগীকে ছেড়ে ঈশ্বর দূরে কিংবা সুউচ্চ শিখরে থাকতে পারেন না। তিনি উচ্চ শিখর থেকে নেমে আসেন ভক্তের কাছে,ভক্তের হৃদয়ে। ভক্তের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তিনি আনন্দময় লীলা করেন। "চৈতন্যচরিতামৃতে" কৃষ্ণদাস কবিরাজ রাধা এবং কৃষ্ণকে একই সত্তার দুই রূপ বলেছেন। তিনি বলছেন "লীলা রস আস্বাদিতে ধরে দুই রূপ।" অর্থাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ লীলারস আস্বাদনের জন্য রাধারূপ ধারণ করেছেন। এ যেন নিজের সঙ্গে নিজের খেলা। আপন সত্তাকে নানা রূপে নানা ভাবে অনুভব করা। তাই রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে লিখেছেন "আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না।" আমাদের মন এক অনন্ত রহস্যময় সত্তা। সেই সত্তার অনুসন্ধান আমরা অনন্তকাল ধরে করে চলেছি। একজন কবি অনুভব করে যা লেখেন তা যেন তাঁর নিজের সত্তারই পোস্টমর্টেম। বহুকাল আগে বৈষ্ণব কবি জ্ঞানদাসের রাধা কৃষ্ণের রূপ দেখে বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন - "এক অঙ্গে এত রূপ নয়নে না ধরে।" তেমনি প্রতিটি মানুষেরই অনন্ত রূপ। পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী, সময় অনুযায়ী, ঘাত প্রতিঘাত অনুযায়ী আমাদের বিভিন্ন রূপ প্রকাশিত হয়। কখন কোন অবস্থায় আমরা কখন কোন রূপে অবতীর্ণ হব সেটা আমাদের অজানা। মানব মন ও মনস্তত্ত্ব বড় জটিল এক অপার সমুদ্র। এ কারণেই হয়তো রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন "আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না।" কথাটির আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাও হয়। এর মধ্যে আছে আমি তত্ত্ব। আমি কে? আমার স্বরূপ কী? ভারতীয় পুরাণের এক অমর বালক চরিত্র নচিকেতা আমি তত্ত্ব বা আত্মতত্ত্ব জানতে যমের দুয়ারেও গিয়েছিলেন। সেখান থেকে লাভ করেছিলেন আত্মজ্ঞান। পুরাণ অনুসারে যম মৃত্যুর দেবতা।এ যেন মৃত্যুর কাছে আত্মতত্ত্ব শিক্ষা। মৃত্যুও তো একজন বড় শিক্ষক। তাই ঈশ্বরও নিজেকে ভাঙেন। খন্ডবিখন্ড করেন অণু পরমাণুরূপ নানা মানবীয় মূর্তিতে। নিজেকে আস্বাদন করার জন্য, উপলব্ধি করার জন্য, আত্মতত্ত্বকে অনুভব করার জন্য। তাই তিনি তাঁর হৃদয়ের সত্তা ভক্তকে দূরে সরাবেন কী করে? নিজেকে জানতে হলে তাঁকে যে ভক্তের কাছে, তাঁর সত্তার বিশেষ একটি অংশের কাছে আসতেই হবে। আমরা সব সময় সুখ খুঁজছি আনন্দ খুঁজছি। কেউ টাকাতে, কেউ নামে, কেউ যশে, কেউ খ্যাতিতে, কেউ কীর্তিতে, কেউ ক্ষমতা ইত্যাদি নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে।এসবের পিছনে ছোটার মূল কারণ সুখ ও আনন্দ লাভ। কিন্তু এ সুখ জাগতিক সুখ। সীমাবদ্ধ সুখ। এর কোন লিমিট নেই। কারণ একটা সুখ থেকে আর একটা সুখের দিকে আমরা ছুটছি। কিন্তু কোথাও তৃপ্তি নেই,সন্তুষ্টি নেই, স্থায়ী শান্তিও নেই। একটা আকাঙ্ক্ষা থেকেই আর একটা আকাঙ্ক্ষায় আমরা ঝাঁপ দিচ্ছি। তারপর যখন অনিবার্য মৃত্যুর কথা ভাবি, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াই, তখন জাগতিক সুখকে মনে হয় বড় ক্ষণস্থায়ী, এ বড় নশ্বর। আর তখনই শুরু হয় আধ্যাত্মিক অন্বেষণ। নিজেকে ভেঙে ভেঙে দেখা, নিজেই নিজের পোস্টমর্টেম করা।ভাবি আমার আনন্দের স্থায়ী উৎসটি কোথায়? কোথায় স্থায়ী সুখ? শেষ পর্যন্ত একটা দর্শনে হয়তো আমরা অনেকেই পৌঁছায় তা হল আত্মার আনন্দ। আধ্যাত্মিক দর্শন বলে যাবতীয় সুখের উৎস তুমি নিজেই। তাই শুরু হয় নিজের সঙ্গে নিজেই আনন্দময় খেলা। এ আনন্দময় খেলায় যিনি অংশ নেন তিনি সাধক, তিনি কবি, তিনি ঈশ্বর। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মত তিনি নিজেকে লীলা রস আস্বাদন করতে দুইরূপে বিভক্ত করেন। তাঁর আনন্দময় সত্তা থেকে জন্ম হয় হ্লাদিনী শক্তি রাধার। এ রাধা ভক্ত বা জীবাত্মার প্রতীক। এঁকে না হলে ভগবানের খেলা জমে না,পূর্ণতা পায়না। তাই রবীন্দ্রনাথ বলেন - "তোমার আনন্দ আমার পর / তুমি তাই এসেছো নিচে / আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর / তোমার প্রেম হত যে মিছে।"
___________________________________
ভুবনেশ্বর মন্ডল
সাঁইথিয়া লেবুবাগান
পোস্ট সাঁইথিয়া
জেলা বীরভূম
Comments
Post a Comment