নীরব সম্পর্ক
মিঠুন মুখার্জী
পিকনিক স্পটে এসে চমকে উঠল বিতান। ভদ্রেশ্বরের এই আমবাগানে ওদের পাশের স্পটেই কে ও! শর্মিলি না? পা স্থির হয়ে গিয়েছে বিতানের। তিন বছর আগের সব ঘটনা মনে পড়ে গেল। বিয়ের রাতে বাবা-মার মুখে চুনকালি মাখিয়ে টোটো চালক অমলের হাত ধরে পালিয়ে গিয়েছিল সে। কি লজ্জায় পড়তে হয়েছিল সবাইকে সেদিন। পাত্রপক্ষ যখন সব জানতে পেরেছিল তখন লজ্জায় মাথা নত হয়েছিল বিতানের বাবার। বাবাকে পাত্রের পিতা বলেছিলেন ---- " আপনাদের জন্য আমার পরিবারের মান-সম্মান একেবারে মাটিতে মিশে গেল। পাড়ার ও আত্মীয় স্বজনের সামনে মুখ দেখাব কি করে? আমি আপনাদের পরিবারের সকলের নামে থানায় মানহানির মামলা করব।" লজ্জায় কষ্টে সেই যে বিতানের বাবার স্ট্রোক হয়ে একপাশ প্যারালাইসিস হয়ে গিয়েছিল আজও কোনো উন্নতি তার হয় নি। শর্মিলির কোনো খোঁজ তারা নেন নি । বিতানের মা সেদিন বলেছিলেন --- " আজ থেকে শর্মিলি আমাদের কাছে মৃত। বাড়ির কেউ যদি ওর সঙ্গে সম্পর্ক রাখে কিম্বা কথা বলে তাহলে সে আমার মরা মুখ দেখবে।" মা-কে হারানোর ভয়ে কেউই তার কোনো খোঁজ রাখে নি। বিতানদের বাড়ি থেকে অমলের বাড়ি সাত-আট কিলোমিটার হবে, তবুও তিন বছর হয়ে গেছে কেউ কারো সংস্পর্শে আসে নি।
বিতান ও শর্মিলির চোখে চোখ পড়ে যায় পিকনিক স্পটে। শর্মিলির হাসি মুখে একরাশ অন্ধকার নেমে আসে। সে অপলক নয়নে বিতানের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু বিতান একেবারে এড়িয়ে যায় তাকে। চার ঘন্টা তারা পিকনিক স্পটে থাকে। তার মধ্যে অনেক বার তাদের দুজনের চোখে চোখ পড়ে। বিতানের মুখে একরাশ অভিমান লক্ষ করে শর্মিলি। সে বুঝতে পারে তার দাদাভাই ও বাড়ির আপনজনেরা কেউ এখনো তাকে ক্ষমা করেন নি। যন্ত্রনায় বুকের ভিতরটা ফেটে যায় তার। দুচোখ বেয়ে জল পড়ে । অমল তার পাশেই ছিল। সে তাকে জিজ্ঞেস করে ---- " কি হয়েছে শর্মিলি, তোমার চোখে জল? এই আনন্দের মধ্যে তোমার চোখে জল কেন? আমার কি কোনও ভুল হয়েছে?" অমলের কথার উত্তরে শর্মিলি জানায়--- " না না তোমার কোনো কথায় ও ব্যবহারে আমি কষ্ট পাই নি। আসলে আপন মানুষেরা যখন ভুল বুঝে বছরের পর বছর সম্পর্ক রাখে না, হঠাৎ দেখা হলে এমনটি হয়।" এরপর আঙুল দিয়ে শর্মিলি অমলকে বিতানকে দেখায়। অমলের মুখটাও কালো হয়ে যায়। সে বলে ---- " তুমি কষ্ট পেওনা। নিজেদের ভুল যেদিন ওরা বুঝতে পারবে সেদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। পিতা-মাতা সন্তানকে সারাজীবন ভুল বোঝে না। সন্তানের সুখই তাদের সুখ।"
বাড়ি ফেরার জন্য বিতান যখন বাসে উঠতে যাবে হঠাৎ তার পায়ে দুটো ঠান্ডা হাতের স্পর্শ অনুভব করে। তাকিয়ে দেখে বোন শর্মিলি তার পা দুটো জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। শর্মিলি তাকে বলে---- " আমাকে এখনো ক্ষমা করোনি দাদাভাই? আমি অমলের সঙ্গে সুখেই আছি। তোমাদের এভাবে সম্মান হানির জন্য আমায় ও অমলকে তোমরা ক্ষমা করো। মা-বাবা কেমন আছেন?" বোনের পা ধরে ক্ষমা চাওয়ায় তার রাগ অনেকটা জল হয়ে যায়। অভিমানের সুরে তার পালিয়ে যাওয়ার পরের ঘটনা শর্মিলিকে শোনায় সে। তার কথা শুনে দুচোখে জল দেখা যায় শর্মিলির। বাবার এই অবস্থার জন্য সে নিজেকে দায়ী করে। অমলের হাত ধরে বিতানের সামনে এসে দাঁড়ায় শর্মিলির দুই বছরের ছেলে। তাকে দেখে শর্মিলি বলে ---- "তোমার ভাগ্নে দাদাভাই।" এবার দুচোখে জল দেখা যায় বিতানের। সে তাকে কোলে নিয়ে খুব আদর করে। তাদের বলে ---- " দুই পরিবার মেলানো কষ্টের, তবু আমি চেষ্টা করবো।"
=============
মিঠুন মুখার্জী, C/O -- গোবিন্দ মুখার্জী, পোস্ট+থানা - গোবরডাঙা , উত্তর ২৪ পরগনা, পিন- ৭৪৩২৫২,

Comments
Post a Comment