গুচ্ছকবিতা ।। স্নেহা ঘণ্টেশ্বরী
বিস্মৃত ঐতিহ্যের অবগাহন
পৌষের শেষ প্রহরে যখন কুয়াশার চাদর নামে ধরণীর গায়,
মহাকালের এক দীর্ঘশ্বাস প্রতিধ্বনিত হয় আদিগন্ত নীলিমায়।
পঞ্জিকার পাতা ওল্টানো মানে তো কেবলই তিথি বদল নয়,
সংক্রান্তি মানে জরাজীর্ণের মৃত্যু, এক নতুনের শুভ্র উদয়।
এ এক সন্ধিক্ষণ—যেখানে শীতের রিক্ততা আর বসন্তের হাতছানি,
মৃতপ্রায় পত্রপল্লবে জাগে প্রাণের এক গোপন শিরশিরানি।
উত্তরায়ণের সেই ধ্রুব আহ্বানে সূর্য ফেরেন মকর রাশিতে,
পৃথিবী হাসে এক শাশ্বত সত্য আর ত্যাগের আদিম হাসিতে।
গঙ্গাসাগরের পুণ্য তোরণে যখন আছড়ে পড়ে নোনা জল,
তীরে তীরে জেগে ওঠে লক্ষ মানুষের এক অমোঘ মোক্ষফল।
কপিল মুনির আশ্রম থেকে ধোঁয়া ওঠা আগুনের কুণ্ডলী—
সাক্ষী দেয়, আমরা ভুলেছি আমাদের শিকড়, ভুলেছি সব পদাবলী।
সেখানে রাজা সাগরের পুত্রের দীর্ঘশ্বাস আজও বাতাসে ভাসে,
বিগত দিনের পাপ আর গ্লানি কি মোছে কেবল গঙ্গার গ্রাসে?
আমাদের সংস্কৃতি—সে তো কেবল পিঠে-পুলির বিলাসিতা নয়,
সে তো এক সংগ্রামের ইতিহাস, যেথা মেধা আর শ্রমের হয় জয়।
মাটির হাঁড়িতে যখন ধোঁয়া ওঠে নতুন আমন ধানের সুঘ্রাণে,
এক বিষণ্ণ কৃষকের তৃপ্তি জেগে ওঠে মাটির নিভৃত কোণে।
যান্ত্রিক এই সভ্যতার ভিড়ে আজ হারিয়েছে সেই আলপথের টান,
কাঁচ আর কংক্রিটের অরণ্যে আজ ম্রিয়মাণ বাউলের গান।
সভ্যতার এই ছদ্মবেশে, আমরা আজ নিজভূমে পরবাসী মানি,
ঐতিহ্যের এই মহাপ্রাণে আমরা তো আজ কেবলই রক্ত-নাড়ি জানি।
আবালবৃদ্ধবনিতা আজিকে দাঁড়িয়েছে এক মহাপ্রান্তরের কিনারায়,
যেখানে ঐতিহ্যের প্রদীপ নিভছে আধুনিকতার নিষ্ঠুর ঝোড়ো হাওয়ায়।
সংস্কৃতি যদি না বাঁচে, তবে কিসের এই অট্টালিকা আর আড়ম্বর?
হৃৎপিণ্ডহীন কঙ্কালের মতো আমরা কি হয়ে থাকব শুধু এক অকেজো পাথর?
আসুক সংক্রান্তি, চুরমার হোক সব বৈষম্য আর হীনতার প্রাচীর,
মানুষের জয়গানে মুখরিত হোক আমাদের এই বাংলার আদিম স্থবির।
শিকড়হীন বৃক্ষ যেমন বাঁচে না ঝড়ের উন্মত্ত করাল গ্রাসে,
সংস্কৃতিহীন জাতিও তেমনি তলিয়ে যায় ইতিহাসের অতল পরিহাসে।
তাই এই পৌষের অন্তিমে হোক এক শুদ্ধতার মহতী শপথ—
ফিরে পাবো মোরা বাঙালির সেই হারানো আত্মজ গৌরবময় পথ।
শুদ্ধ হোক বিবেক, শুদ্ধ হোক আমাদের এই জীর্ণ অবক্ষয়িত মন,
সংক্রান্তির এই বহ্নিশিখায় পুড়ে ছাই হোক যত ক্ষুদ্র আয়োজন।
যেদিন নারী ফিরে দাঁড়ায়
এই সমাজে,
তোমরা নারীর মুখে চাপিয়ে দাও নীরবতা,
অবহেলার অলক্ষ্যে বাঁধো তার ডানা—
সুশীলতার নাম করে শিকল পরাও তার স্বপ্নে।
সেই নারী, যাকে তোমরা দেখো
শুধু ঘরের কোণে, হাসির পাত্রে,
দেহের অলংকারে—
সে যদি একদিন ফিরে দাঁড়ায়?
সেদিন, তোমরা কোথায় যাবে?
যে ক্ষমতা তোমরা শুধু নিজের ভেবেছ,
যে সিংহাসনকে ভাবো পিতৃতন্ত্রের জন্মসিদ্ধ অধিকার—
যদি নারী নিজেই দাবি করে সে স্থান,
তোমাদের ভিতরে কাঁপন ধরবে, জানি।
কারণ তোমরা চাও না
নারী তোমাদের সমতুল্য হোক,
কি জানি— যদি তোমাদের চেয়ে উপরে উঠে যায়!
ভয় তো সেইখানে—
যেভাবে তোমরা হাসো তাদের দুর্বলতায়,
লাঞ্ছনা করো নীরবে অথবা গর্বে,
যদি তারা সেই শক্তি নিয়েই ফিরে আসে—
তোমাদের উপর ছড়িয়ে দেয় একই ব্যথা,
তাহলে কী হবে তোমাদের সহ্যশক্তি?
তোমরা পুরুষ, তাই না?
তাই ভাবো—
যা ইচ্ছে তাই চাপিয়ে দিতে পারো,
ইচ্ছার ছুরি চালাতে পারো অবলীলায়।
ইচ্ছা হলে প্রেম, না হলে শাসন, না হলে নীরব নিপীড়ন।
কিন্তু মনে রেখো—
নারী কোনও প্রাসাদে গড়া পুতুল নয়,
সে আগুন, সে ঝড়, সে মহাকাল।
যেদিন নারী উঠে দাঁড়ায়,
তার নীরবতা হয় যুদ্ধের উগ্র ঢাক,
তার পদক্ষেপে কাঁপে মাটির অহঙ্কার।
সেদিন তোমাদের এই পিতৃতন্ত্রের দুর্গ—
ধসে পড়বে, ধুলো হয়ে যাবে,
আর ইতিহাসে লেখা থাকবে—
"নারী কখনোই দুর্বল ছিল না, শুধু চুপ ছিল।"
কালির নিচে লুকোনো আগুন
আমি কলম—
তোমাদের বানানো নিয়মে চলে না আমার কালি।
আমি লিখি না শুধুই ভালোবাসা,
আমি লিখি যন্ত্রণার অক্ষরে
তোমাদের অন্যায়ের হিসেব।
জলেভেজা চোখ যখন বিচার চায়,
আমি সেদিকেই তাকিয়ে থাকি—
কারণ আমার ডগায় জমে থাকা কালিটাই
হয়ে ওঠে প্রতিবাদের তলোয়ার।
তুমি ধর্ষণ ঢাকো?
আমি লিখে দিই দেয়ালের গায়ে তার নাম।
তুমি মজুরি চেপে দাও?
আমি লিখি মজদুরের রক্তে "অধিকার"।
তুমি চুপ করাও কণ্ঠস্বর?
আমি কাগজের বুকে এক একটি বুলেট চালাই শব্দে শব্দে।
আমি লেখক নয় শুধু,
আমি সাক্ষী—
নির্যাতনের, বঞ্চনার, প্রতারনার।
আমার কলমে জেগে ওঠে
কৃষকের শূন্য থালা,
"মহিলার চোখে জমে থাকা কুয়াশা,
যেখানে প্রতিদিন মরেযায় একটা স্বপ্ন।
আর শিশুর পিঠে ঝোলা—খালি নয়,
ভরা এক বঞ্চনার ইতিহাসে।"
আমি শাসকের ভয়—
কারণ আমার শিরদাঁড়া সোজা।
আমি বিক্রি হই না বিজ্ঞাপনের মোড়কে,
আমি থেমে যাই না গুম-হুমকির ভয়ে।
আমি গর্জে উঠি প্রতিবার,
যখন কেউ বলার অধিকার হারায়—
আমি কলম,
আমার কালিতে জেগে ওঠে বিদ্রোহ।
নির্ভরতায় নিঃস্ব আমরা
ঘুমন্ত সকাল, উঠছে না কেউ,
চা-র কাপে আজ আর নেই
মায়ের হাতে বানানো আদা আর প্রেম,
এখন শুধু মেশিনের কণ্ঠ—"Alexa, boil water"।
ক্লাসে শিক্ষকের কণ্ঠ শোনার বদলে,
চোখ গিয়েছে স্ক্রিনের পাতায়—
চ্যাটবট দেয় ব্যাখ্যা,
ভাবতে হয় না, হৃদয় আর মাথা দুটোই ফাঁকা।
রান্না শেখা যায় ভিডিওতে,
আরো কতো সহজ আজ জীবন—
কিন্তু কি হারিয়ে ফেলছি আমরা?
একসাথে বসার ডাক, চোখের ভাষা, নরম অনুভবের নিরব চিহ্ন।
প্রেমপত্র লেখে না কেউ,
AI বানায় কবিতা, চিঠি, গান।
মন থেকে নয়—code theke উঠে আসে প্রেমের বানী,
তবু হৃদয় বোঝে—এ প্রেমে নেই কোনো উষ্ণতা, নেই ছোঁয়ার টান।
নতুন এই দেবতা—AI
জানেনা আদর,বোঝেনা চোখের জল, তবু তার কাছেই আত্মসমর্পণ,
কারণ সে ক্লান্ত হয় না, ভুল করে না , স্বপ্ন দেখে না।
তবে বলো—
এই কি তবে প্রগতি?
নাকি আমাদের অস্তিত্বের ক্ষয়?
যেখানে মানুষ হয়ে কেবল বেঁচে থাকি,
কিন্তু আর বাঁচি না।
AI—তুমি কি আশীর্বাদ?
নাকি স্নিগ্ধ বিষ, আলোর মুখোশে অন্ধকার?
তুমি কি মুক্তি?
নাকি ধ্বংসের সুচনা, নিঃশব্দ এক পরাজয়?
জন্ম বাংলায়, স্বপ্ন ভিনভাষায়
আমরা একদিন শব্দে তৈরি হয়েছিলাম,
'মা' বলতেই শিখেছিলাম প্রথম—
সে 'মা' ছিল বাংলা,
যার দুধে বেড়ে উঠেছে কবিতা, গান, বিদ্রোহ।
কিন্তু আজ?
আজ আমরা গলা মেলাই বিদেশি স্বরে,
শিশু শেখে 'A for Apple'—
'অ' শিখতে শেখে না,
কারণ সেটা নাকি 'কাজের' নয়।
আমরা বলি, "I'm not comfortable in Bengali"
আর গর্বে বুক ফুলিয়ে হাঁটি
যেমন হাঁটে এক পাখি
নিজের বাসা পুড়িয়ে অন্যের জানালায় আশ্রয় নিতে।
আমাদের মুখে রবীন্দ্রনাথ নেই,
আমাদের গান এখন প্লে-লিস্টে 'Top 50 Global'
বাংলা গান শুনলে বোকা ঠাহরায়,
নিজের ভাষার লজ্জায় মিশে যায় মুখের ভাষা।
মনে নেই 'একুশে ফেব্রুয়ারি' মানে কী?
মনে নেই সালাম, বরকত, রফিক কাদের জন্য রক্ত দিয়েছিল?
তারা কি স্বপ্ন দেখেছিল এমন এক জাতির,
যাদের ছেলেমেয়ে বাংলা পড়লে "lower class" bole?
আমরা কি তবে শ্রাদ্ধ করছি নিজের শিকড়ের?
আমরা কি একটি জিনিসও পারি
যা নিজস্ব, স্বকীয়, স্বভিমানী?
হ্যাঁ, ইংরেজি শেখো, দরকার আছে,
তবু মাতৃভাষা কি কেবল ইতিহাসের পাতায় থাকবে?
কোথায় সেই আত্মা,
যে বলে—"আমি বাঙালি, আমি বাংলা বলি, আমি বাংলা গাই!"
তুমি কি চাও,
আগামী প্রজন্ম হারিয়ে ফেলুক শিকড়?
শুধুই 'Hi' বলুক আয়নায় দাঁড়িয়ে,
না, তারা শিখুক—"নমস্কার",
ভাষার ভেতর লুকিয়ে থাকা চেতনার বাহার।
আজও সময় আছে,
নইলে কাল হয়তো থাকবে শুধু নাম—
একটা মৃত ভাষার জাতি,
যারা একদিন ছিল, অথচ নিজেকে বাঁচাতে পারেনি।
Yet You Remain
Sneha Ghanteswari
You're no longer at the other end of the call,
No longer walk through the rhythm of my days—
Yet in every breath, every silent hour,
It is you I think of, endlessly, wordlessly.
Five seasons have passed me by,
Still, your shadow lingers on the canvas of memory.
Among crowded lanes of social media,
I search your profile's quiet flicker—
A new post, perhaps just a photo,
Where you smile, and your world glows without me.
You're no longer mine—
But you remain,
Like the dry scent pressed between pages of old letters,
Like a story of love we never finished.
Love, it seems, never truly leaves.
It stays—unseen, untouched,
A silent fire burning beneath the skin.
You are gone, yet you fill me—
In every empty hour,
In the quiet of lonely evenings,
In the fading light…
You remain,
Like a soft curse I never wished away.
=================
Comments
Post a Comment