চেনা প্রতিবেশী
( নবম পর্ব )
দীপক পাল
পরের দিন রবিবার। তাই ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরী হলো। সকালটা বেশ ভালো ভাবে শুরু হলো ত্রিহানের। শীতের সকালে চায়ে চুমুক দিয়েই একটুআরাম বোধ করলো। একটা বিস্কুট তুলে নিয়ে পাশে বসা ইমনকে বললো,
- ' চাটা বেশ ভাল করেছ ইমন। শীতের সকালে এরকম চাই দরকার বিশেষত কোন ছুটির দিন যদি হয়। যতই গায়ে শাল চাপাই না কেন ঠান্ডা কাটে একটা ভালচায়ে। এর সাথে যদি একটা টাটকা খবরের কাগজ থাকতো তাহলে তো কথাই ছিল না।'
- ' তবে আর কি, সেই ব্যবস্থাও করে ফেল আজকেই দেরী না করে। আজ তো রবিবার, এ ক্যাম্পাসে একজন কাগজওয়ালাকে ঢুকতে দেখেছি আমি রবিবার বলেহয়তো আজই তাকে পেতে পার চেষ্টা করলে।'
- ' ঠিক বলেছ। যাই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। যদি তেনার দেখা পাই।' বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো ত্রিহান। লক্ষ্য করলো একজন চশমা পরা ভদ্রলোক এর মধ্যেইবাজার করে ফিরছে। ঠিক ওনার পেছন পেছন সাইকেল নিয়ে একজন কাগজওয়ালা ঢুকে ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করে ঐ চশমা পরা লোকটাকে দিল।দুজনেই মাথা নেড়ে হাসলো। আর সময় নষ্ট না করে ত্রিহান জোরে জোরে হাততালি দিতেই কাগজওয়ালা ওপর দিকে তাকাল। ত্রিহান ইশারায় তাকে ওপরে আসতেবললো। সেও বাঁ হাতটা উঁচুতে উঠিয়ে আসার ইঙ্গিত করলো। ত্রিহানও বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকলো। ঢুকে ঢেকেঢুকে শুয়ে থাকা আহিরকে ডেকে ওঠালো। আহিরউঠেই বাবার কোলে উঠে উঠে পড়লো। আহিরকে একটা সোয়েটার পরিয়ে দিয়ে ছোট্ট একটা ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে আহিরের দাঁত মাজিয়ে দিতে দিতে বললো,
- 'এবার আমি আর আহির সোনা সোফায় বসে একসাথে ব্রেকফাস্ট করবো কেমন।'
এমন সময় দরজায় বেল বাজল। ইমনও এক হাতে আবিরের খাবার নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে একটু দাঁড়াল। ত্রিহান আহিরকে সোফায় বসিয়ে দরজা খুলে দেখে সেই কাগজওয়ালা। তার সাথে কথা বলে কাগজ নিয়ে তার নাম ও মোবাইল নং নোট করে নিলো। তারপর সোফায় আরাম করে বসে খবরের কাগজটাখুলে একমনে পড়তে লাগলো। ইমন আহিরকে খাওয়াতে থাকলো। আবার একবার কলিং বেল বাজলো। দরজা খুলতে শান্তি ঘরে ঢুকলো। সে থালা বাসন মাজে,ঘর দোর সাফ রাখে। সব্জি ও মাছ কেটেকুটে পরিস্কার করে দেয় ইমনকে। এতে ইমনের তাড়াতাড়ি রান্না করতে সুবিধা হয়। এমনি বেশ শান্ত ওর নামের সাথে যেনকোথায় একটা মিল পাওয়া যায়। ইমন কখনো কোন কিছু বাইরে থেকে আনতে দিলে সেটা এনেও দেয়। ইমন অবশ্য অন্য দিকে পুষিয়ে দেয় তাকে। আহিরেরখাওয়া হয়ে গেলে হঠাৎ বলে,
- ' বাবা আমার সাথে খেলবে ?'
- ' এই রে, কি খেলবো? আমি যে কাগজ পড়ছিলাম। এই দেখ কাগজে কত ছবি।'
- ' না তুমি আমার সাথে লুকোচুরি খেলবে এখন।'
- ' বেশ আগে তুমি লুকোও কেমন। তারপর আমি লুকোবো। আমি চোখ বন্ধ করছি।' আহির অমনি দৌড়ে শোওয়ার ঘরে এই ঠান্ডায় খাটের তলায় ঢুকে বলে, 'বাবাটুকি।'
ত্রিহান এই সুযোগে যে খবরটা পড়ছিল সেটা শেষ করে ফেললো। আবার 'টুকি' শব্দ।
- ' কি আমিতো তোমায় খুঁজে পাচ্ছি না।' ত্রিহান ঘরে ঢুকে ওকে খাটের তলায় দেখে,
- 'এইতো আমার আহির সোনা। কিন্তু তুমি খাটের তলায় এই ঠান্ডা মেঝেয় কেন বসে আছো? যদি ঠান্ডা লেগে অসুখ করে জ্বর হয় তবে তো ডাক্তার ইঞ্জেকশনদেবে।'
- ' না আমি ইঞ্জেসন দেব না।'
' তাহলে খাটের তলা থেকে বেরিয়ে এসো শিগ্গীর।'
আহির খাটের তলা থেকে বেরিয়ে ত্রিহানকে জড়িয়ে ধরে বলে,
- ' বাবা আমি আবার লুকি?'
' ঠিক আছে আগে চটিটা পরে নাও তারপর লুকোও।'
আহির দৌড়ে গিয়ে চটি পরেই অন্য ঘরে গিয়ে ঢুকলো। তারপর আওয়াজ আসলো
- ' বাবা লু.....কি।' ত্রিহান ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকে আপন মনে বলে যেতে থাকলো,
- ' আহির তো মনে হলো এই ঘরে ঢুকলো কিন্তু কোথায় তাকে তো দেখতে পাচ্ছিনা।'
ত্রিহান ঘরে ঢুকেই কিন্তু বুঝেছে আহির দরজার পেছনে চুপচাপ সেঁটে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু মনে মনে ত্রিহান আপন মনে বলেই চলেছে, ' খাটের তলাতেও নেই, আলমারির পাশেও নেই, তবে কি জানলা দিয়ে উড়ে গেল আহির? দেখি তো একবার।' বলে সত্যি সত্যি জনলায় গিয়ে উঁকি মেরে এদিক ওদিক তাকাতেই আহির দরজার পাশ থেকে খিল্ খিল্ করে হাসতে হাসতে বেরিয়ে এসে বলে,'বাবা আমি এখানে।' 'আরে তাই তো কোথায় ছিলে তুমি? দেখতে পাইনি আমি।' 'ঐখানে।' দরজার পেছনটা দেখিয়ে দিল।
- 'বাবা এবার তুমি লুকি।' ' আচ্ছা ঠিক আছে তুমি চোখ বন্ধ করে পেছন দিকে ঘোর।' আহির পেছন ফিরতে ত্রিহান টুক করে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে সদর দরজারদিকের সোফার আড়ালে লুকিয়ে পড়লো। আহির দুই ঘর বারান্দা আতিপাতি করে খুঁজে না পেয়ে বিমূঢ় হয়ে রান্নাঘরে ঢুকে ইমনকে বললো, ' মা বাবা নেই।' ইমনতখন পাউরুটি সেঁকছিল, মাখন আর চিনির কৌটো খোলা। সেঁকার পরে সঙ্গে সঙ্গে মাখন লাগাবে।
- 'আহির তুমি একটা কাজ করো। আমি বাবার পাউরুটিতে মাখন লাগিয়ে দিচ্ছি তুমি সেই খাবারটা নিয়ে সোফার কাছে গিয়ে বলবে বাবা পাউরুটি নাও, মা কফি বানাচ্ছে।'
- 'বাবাতো নেই!' 'আছেরে আছে, সোফার পেছনে লুকিয়ে আছে তোকে যা বলছি কর।'
আহির গুটি গুটি পায়ে সোফার কাছে গিয়ে ত্রিহানকে ডেকে বলে, ' বাবা এই নাও পাঁউরুটি মা এখন কফি করছে।' বলে খাবারটা সোফার ওপর রেখে দৌড়ে এলো।
- ' কিরে, দৌড়ে এলি কেন বাবাকে দিয়েছিস?' ' বাবা নেই।' ' কি বলছিস বাবা নেই, দেখি চলতো।' রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দেখে ত্রিহান সোফায় বসে বাটার টোস্টখাচ্ছে।
-' কিরে তুইযে বললি বাবা নেই ওইতো বাবা।' আহির ছুটে গিয়ে ত্রিহানের কোলে উঠে পরলো। ইমন বললো, ' ত্রিহান এখুনি আমাদের খাবার আর কফি নিয়েআসছি।' ত্রিহান বলে, 'এইজন্য ই তো বলি যাদের ইমন নেই তাদের কেউ নেই।'
- ' থাক আর বেশী বলতে হবে না।' আহির বলে, ' বাবা তুমি আর টুকি করবে না।'
- ' আচ্ছা আর লুকি করবোনা।' ব্রেকফাস্ট করতে করতে ইমন বলে, ' জান, ত্রিহান, আজকের রবিবারটা আমার খুব ভাল লাগছে কেন বলতো?' ডিমসেদ্ধয়একটা কামড় দিয়ে ত্রিহান বলে,'নিজস্ব একটা ফ্ল্যাট বলে।'
- ' সেতো আছেই, কিন্তু তোমাদের অফিসের পবন আর কমলকে নিয়ে কালকে যা মজা হলো সে কথাগুলো মনে পড়লেই বারে বারে আমার হাসি পাচ্ছে আজকেও।'
- ' ওদের নিয়ে আরো যে কত মজার গল্প আছে তা একে একে সব জানতে পারবে। আচ্ছা ব্রেকফাস্টের পরে আমি একটু বাইরে বেরবো। ভালো করে চারিদিকটা একটুদেখে আসি। কাছাকাছি কোন স্কুল থাকলে সেটাও দেখে রাখবো।'
ত্রিহান ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যে দিকে রোদ পড়েছে সেদিক দিয়ে হাঁটতে থাকলো। রোদে হাঁটতে বেশ আরাম লাগছে। দুদিকের নানা রকমের দোকান পাটদেখতে দেখতে শিয়ালদহ যাবার রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে সবে উঠেছে, বাঁ দিকের পকেটের মোবাইলটা বেজে উঠলো। পকেট থেকে মোবাইল বার করে দেখে ইমন করেছে।' হ্যালো কি ব্যাপার?' ' তুমি কোথায়?' ' আমি গড়িয়া প্ল্যাটফর্মে, কেন?'
তুমি তাড়াতাড়ি ফিরে এসো, দাদা এসেছে। আসার পথে কিছু কিনে নিয়ে এসো।'
- ' নির্ঝরদা এসেছে তো, আমি এখনই ফিরছি।' প্ল্যাটফর্ম থেকেই মাটির হাঁড়িতে জয়নগরের মোয়া নিয়ে বসেছিল একজন লোক তার সাথে ছিল খালি প্যাকেট ওবিভিন্ন সাইজের ঠোঙা। ত্রিহান এক প্যাকেট জয়নগরের মোয়া নিল ও নিল দু রকমের বড় বড় মিষ্টি একটা মিষ্টির দোকান থেকে। বাড়ি ফিরে কলিং বেলবাজালো। ভেতর থেকে আহিরের চিৎকার শোনা গেল ' মা বাবা এসেছে দরজা খোল।' ইমন নির্ঝরের সাথে কথা বলছিলো। উঠে গিয়ে দরজা খুলে ত্রিহানের হাতথেকে মিষ্টিগুলো নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলো। সোফায় নির্ঝরের হাতে খবরের কাগজ কিন্তু সে পড়ছেনা। কারণ আহিরেরে বকবকানি মামার সাথে। নির্ঝর হো হো করেহাসছে আহিরের কথা শুনে। ত্রিহান ধপ করে সোফায় নির্ঝরের পাশে বসে তাকে উদ্দেশ্য করে বললো, ' বলো নির্ঝরদা হঠাৎ কি মনে করে।'
- ' তোমাদের ফ্ল্যাটে আসবো যখন খুশি এতে মনে করার কি আছে বল।'
- ' না না আমি এমনি বলছিলাম, তুমি কিছু মনে কোরনা। নিশ্চয় যখন খুশি তুমি আসবে। বাড়ীর সবাই ভালো আছে তো, তুমি নিজে ভাল আছতো ?'
- ' হ্যাঁ হ্যাঁ সবাই ভাল আছে। আর আমাকে দেখে তোমার কি মনে হচ্ছে বল?'
- ' একদম ঠিক। তুমি একটু বসে কাগজ পড়ো আমি একটু রেডী হয়ে আসি।
- ' তোমার ছেলে কি কাগজ পড়তে দেবে। বাড়ি থেকে যখন বেরোই তখন পেপার আসেনি। এখানে এসে কাগজ আমার হাতেই আছে, এখনো খোলার সুযোগপাইনি। প্রথমে ইমনের খোঁজ খবরের উত্তর তারপর আহিরের অদ্ভুত সব কথা হাসবো না পেপার পড়বো বলো।' হঠাৎ আহির ' বাবা বাবা ' বলে দৌড়ে ঘরে ঢুকেএকটা বেশ বড় টেডি বিয়ারের কান ধরে টানতে টানতে এনে হাজির। বলে ' ঐ মামা দিয়েছে।' ত্রিহান বলে, ' বাঃ কি সুন্দর।' ইমন প্লেটে করে পাঁচটা লুচিজয়নগরের মোয়া রসগোল্লা সন্দেশ সব দুটো করে এনে নির্ঝরের সামনে টি টেবিলটায় রেখে বললো,
- ' নে দাদা এইটুকু খেয়ে নে। সেই কোন সকালে বেরিয়েছিস।' নির্ঝর বলে,
- 'এই আমাকে কি পেয়েছিস তুই, রাক্ষস অ্যাঁ? লুচি থাক, বাকি মোয়া আর মিষ্টি সব একটা একটা করে তুলেনে। না তুললে আমি কিন্তু কিছুই খাবো না।'
ত্রিহান ড্রেস পাল্টাবার জন্য ঘরে ঢুকলো তারপর বাথরুমে পা ধুতে। ওখান থেকে বেরিয়ে এসে সোজা নির্ঝরের উল্টো দিকের সোফায় গিয়ে বসলো।
-'নির্ঝরদা, আজকে দুপুরে লাঞ্চে একসাথে সবাই বসে বেশ গল্প করতে করতে খাওয়াটা বেশ জমবে। কি বল?'
- 'না শালাবাবু, ইমনকে সব বলেছি। আজ সকালে এখানে আসার সময় জাহ্ণবীকে কোচিং ক্লাসে ঢুকিয়ে এখানে এসেছি। এক্ষুনি না বেরোলে ও হয়তো অপেক্ষাকরে থাকবে। এখুনি ওর ফোন আসতে পারে। ওর কাছে পৌঁছতেও তো টাইম লাগবে এখান থেকে যেতে। এরপর ও আর ওর মাকে নিয়ে বিকেল চারটায় আবারবেরোতে হবে কি সব কেনা কাটা আছে যেন। আমি উঠলাম, এবার হাত ধুয়ে পালাবো।' উঠে পড়লো নির্ঝর,হাত ধুয়ে জল খেয়ে তৈরী হয়ে বলে, 'আসি রে ইমনশালাবাবু আসি।' তারপর আহিরের গালে একটা চুমু খেতে গিয়ে আহির চট্ করে মামার সোয়েটারটা ধরে বলে,
- ' মামা তুমি যাবে না।'
- 'ওরে বাপরে কি বলেরে ইমন, ওকে ধর। কোনমতে সোয়েটার আহিরের কব্জা থেকে বার করে দরজা খুলে টা টা বলে লিফটের কাছে দাঁড়াল।
ইমন বলে, 'দাদা সবাইকে নিয়ে আয় না একদিন।' ' আসবো নিশ্চয়, তোরাও যাস অতি অবশ্য। এই আহির আমাদের বাড়ীতে যাবি কেমন।' আহির বলে, 'যাবো।' লিফট্ আসতেই উঠে পড়লো নির্ঝর।
(চলবে)
========================
Dipak Kr. Paul, Joka, Kol-700104.

Comments
Post a Comment