রঙ-চোর ও ধূসর পৃথিবী
জয় মণ্ডল
চিত্রকর অদ্রীশবাবু যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, তখন কলকাতার আকাশ থেকে হঠাৎ নীল রঙটা উবে গেল। মানুষ ভাবল হয়তো আবহাওয়া মণ্ডলের কোনো গোলযোগ। কিন্তু পরের দিন দেখা গেল ঘাসের সবুজ আর গোলাপের লাল রঙও ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো পৃথিবীটা একটা সাদাকালো সিনেমার মতো হয়ে গেল।
অদ্রীশবাবুর নাতনি মেধা দাদুর স্টুডিও পরিষ্কার করতে গিয়ে একটা অদ্ভুত তুলি খুঁজে পেল। তুলিটার রোঁয়াগুলো কোনো প্রাণীর নয়, বরং সেগুলো হুবহু মানুষের চুলের মতো। মেধা যখন সেই তুলি দিয়ে একটা সাদা ক্যানভাসে পোঁচ দিল, দেখল ক্যানভাস থেকে রক্তিম আভা ফুটে বেরোচ্ছে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, সেই লাল রঙটা ক্যানভাসে থাকার বদলে মেধার আঙুল দিয়ে চুঁইয়ে তার হৃদপিণ্ডের দিকে চলে যাচ্ছে।
মেধা বুঝতে পারল, তার দাদু কোনো সাধারণ চিত্রকর ছিলেন না; তিনি ছিলেন পৃথিবীর 'রঙ-সংগ্রাহক'। মানুষ যখন একে অপরের প্রতি ঘৃণা ছড়াত, তখন পৃথিবীর রঙগুলো বিষাক্ত হয়ে যেত। অদ্রীশবাবু সেই বিষাক্ত রঙগুলোকে নিজের তুলিতে শুষে নিতেন এবং নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে সেগুলোকে বিশুদ্ধ করে আবার প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দিতেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর সেই ভারসাম্য ভেঙে গেছে।
মেধা দেখল জানালার বাইরে মানুষগুলো সব ধূসর ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের মধ্যে আর কোনো আবেগ নেই, কারণ রঙহীন পৃথিবীতে আবেগও স্থবির। মেধা আর দ্বিধা করল না। সে দাদুর সেই 'রক্ত-তুলি' হাতে নিল। সে জানত, পৃথিবীকে আবার রঙিন করতে হলে তাকে নিজের বুকের ভালোবাসা আর প্রাণের স্পন্দন সেই তুলিতে ঢালতে হবে।
মেধা যখন জানালার কাঁচের ওপর প্রথম নীল রঙের আঁচড় কাটল, তখন আকাশ আবার নীল হতে শুরু করল। তবে প্রতিটি নতুন রঙের জন্য মেধার নিজের শরীর থেকে একটু একটু করে প্রাণশক্তি কমে যাচ্ছিল। কিন্তু সে থামল না। শেষমেশ যখন পৃথিবী আবার তার পূর্ণ রঙ ফিরে পেল, তখন মেধা নিজে একটি সাদা-কালো স্থির চিত্রে পরিণত হলো।
এখনও মাঝে মাঝে শরতের বিকেলে কাশফুলের শুভ্রতার মাঝে একটা ধূসর ছায়াকে নাচতে দেখা যায়। মানুষ জানে না যে এই রঙিন পৃথিবীর জন্য এক শিল্পী আজও বর্ণহীন হয়ে বেঁচে আছে।
=================
জয় মণ্ডল,
কালীমন্দির পূর্বপাড়া, কালিকাপুর, পোস্ট - কালিকাপুর, সোনারপুর, পশ্চিমবঙ্গ - ৭৪৩৩৩০
Comments
Post a Comment