সে আমার ছোট বোন
সঙ্ঘমিত্রা দাস
রিমলি ঝিমলি ওরা দুটি বোন। দুই বছরের ছোট বড়। অন্য আর পাঁচটা বোনেদের মতো সম্পর্ক ওদের নয়। দুজন একেবারে আলাদা। রিমলি পড়াশোনা, গান বাজনা সবদিকে খুব ভালো। বোন ঝিমলির মন সাজগোজ, বন্ধুদের সাথে আড্ডা হইহুল্লোড় আর ঘোরাঘুরিতে। একই ঘরে দুজনে একসাথে থাকলেও মনের থেকে অনেক দূরে। রিমলি ঝিমলির সব কাজে ক্ষুত ধরে, কারণে অকারণে বকা খাওয়ায় মা বাবার কাছে। কোন জিনিষ খুঁজে না পেলেই বোনের ঘাড়ে দোষ চাপায়। ওর অগোছালো ভুলো মনের জন্য ঝিমলি বকাও খায় খুব। তবে এতে ঝিমলি মন খারাপ করে না। ও হেসে খেলে হইহুল্লোড় করেই কাটিয়ে দেয়।
সন্ধ্যে থেকেই রিমলি চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করেছে। ও ক্যালকুলেটর খুঁজে পাচ্ছে না। ওর ধারণা বোন নিজের টা হারিয়ে একই রকম দেখতে হওয়ায় ওরটা নিয়ে নিয়েছে। প্রথমে ঝগড়া তারপর হাতাহাতি। বোনের চুলের মুঠি টেনে চড় মেরে ওর কাছ থেকে ক্যালকুলেটর কেড়ে নেবার চেষ্টা করে। ঝিমলিও মানতে নারাজ। সে দিদির ক্যালকুলেটর দেখেই নি নাকি! ওটা ওরই। কিন্তু ঝিমলির হারানোর অভ্যাসের কারণে ওদের মা ও ওর কথা বিশ্বাস করতে চাইছে না। রিমলি তো ছোট্ট একটা পেন্সিলের টুকরোও কোনদিন স্কুলে হারিয়ে আসেনি।
ঝিমলিই বরং খুবই অগোছালো। ছোটবেলায় কত জিনিষ যে স্কুলে ফেলে আসতো। বাবা অফিস থেকে ফিরে সব শুনে ঝিমলিকে ডেকে চোখের জল মুছিয়ে দেন। তারপর অনেক বুঝিয়ে ওর কাছে থাকা ক্যালকুলেটর দিদিকে দিয়ে দিতে বলেন। আগামীকাল ওকে একটা নতুন ক্যালকুলেটর কিনে দেবেন প্রমিস করেন। ঝিমলি এমনিই , খুব তাড়াতাড়ি অল্পেই খুশি। রাতে খাবার টেবিলে ও দিদিকে ক্যালকুলেটর দিয়ে দেয়।
রিমলি পরের দিন সকালে রেডি হয়ে স্কুলে রওনা দিল। ঝিমলি শুয়ে আছে তখনো আজ সে স্কুলে যাবে না। কালকের পর মনটা বেশ খারাপ। তাছাড়া সামনেই মাধ্যমিকের টেষ্ট পরীক্ষা, বাড়িতেই পড়বে। ও জানে দিদির মতো ভালো রেজাল্ট ওর হবে না। তবুও ভালোভাবে পাস না করলে বাবা মা কষ্ট পাবেন। দিদি বেরিয়ে গেলে ও ওঠে। সকালে চা বিস্কুট খেয়ে জানলার কাছে রোদ পড়েছে, ওখানেই বই নিয়ে বসে। কাল দিদি ওর কথা বিশ্বাস করলো না। এমনকি মা ও!
রিমলি স্কুলে ঢুকতেই তমালী ছুটে এলো।
"এই সরি সরি রে। কাল তোর ক্যালকুলেটরটা আমি ভুলে নিয়ে গেছি। আমি আনতে ভুলে গেছিলাম। তোকে ছুটির সময় যে ফেরৎ দেবো, সেকথা আর মনে নেই। রাতে বিয়েবাড়ি নিমন্ত্রণে গিয়েছি তাই ব্যাগও খুলিনি, মনেও পড়েনি। সকালে ব্যাগ গোছাতে গিয়ে পেলাম। এই নে"
ওর হাতে ক্যালকুলেটর গুঁজে দিয়ে আবার ক্লাসের দিকে দৌড় দেয়। তমালী রিমলির বেষ্ট ফ্রেন্ড। এখন টুয়েলভে ওদের সেকশন আলাদা হয়ে গেছে। তাই সবসময় দেখা হয় না, ওই স্কুলে ঢুকে, আর টিফিনের সময়। কখন যে ব্যাগ থেকে ক্যালকুলেটরটা নিয়ে গেছে রিমলি জানতেও পারেনি। খুব খারাপ লাগলো ওর বোন ঝিমলির জন্য। এই বোধহয় প্রথমবার বোনের জন্য ওর মন কেমন করলো। কাল ওকে কত খারাপ কথা বলেছে, মেরেছে পর্যন্ত। মেয়েটা তো বারবার বলছিল ওটা ওর। রিমলিই বিশ্বাস করেনি। আজ বাড়ি ফিরে ওর কাছে সবটা স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে নেবে। ছোট বোন তো। আদর করে দেবে ওকে। মনে মনে প্রমিস করে আর কোনদিন বোনকে অবিশ্বাস করবে না। ও একটু অন্যরকম। কিন্তু নিজের বোন তো। বড় অন্যায় করেছে এতোদিন। সারাটা দিন স্কুলে এসবই ভাবতে থাকে রিমলি।
স্কুল থেকে সোজা টিউশন সেরে ফেরার পথে রিমলি আজ বোনের জন্য ওর ফেবারিট দোকান থেকে একটা এগচিকেন রোল কিনে নিল। ওটা দিয়েই ওর সাথে ভাব করে নেবে বরাবরের মতো। জড়িয়ে ধরে আদর করে দেবে। ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরলো। ঝিমলি খাবার টেবিলে বসে ছিল , দিদিকে দেখে উঠে যাচ্ছিল। রিমলি ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে ছুটে জড়িয়ে ধরলো বোনকে। বারবার ক্ষমা চাইতে থাকলো কালকের ভুল বোঝার জন্য। ক্যালকুলেটর যে স্কুলে বন্ধুর কাছে ছিল তাও জানালো। ওর হাতে রোলটা দিয়ে অনেক আদর করে দিল। ঝিমলি তো রোল পেয়ে খুব খুশি। তবু প্রথমে একটু রাগ ভাব দেখালেও নিমেষে তা গলে জল হয়ে গেল। রাতে বাবা অফিস থেকে ফিরে মেয়েদের পড়ার ঘরে গেলেন। ঝিমলির হাতে নতুন ক্যালকুলেটর দিলেন। রিমলি ওমনি ছুটে এসে ওটা ঝিমলির থেকে নিয়ে নেয়।
"বোনেরটা আমি ফেরত দিয়ে দিয়েছি। নতুনটা আমি নেবো বাবা"
কথাটা বলেই ওর সকালে করা প্রমিস মনে পড়ে যায়। হাত বাড়িয়ে বোনের দিকে ফিরিয়ে দেয় ক্যালকুলেটরটা। ঝিমলি হেসে বলে এটা আমরা দুজনেই বাড়িতে ব্যবহার করবো। আমাকে দিতে হবে না। দুই বোন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। মা ও এসে দাঁড়িয়েছে দরজার কাছে। মেয়েদের মিল দেখে বাবা মা দুজনেই খুব খুশি। এগিয়ে এসে মাথায় হাত রাখেন ওরা, এভাবেই যেন ওদের সন্তানরা একে অপরের অবলম্বন হয়ে থাকে।
---------------------
সঙ্ঘমিত্রা দাস
নব বারাকপুর
কোলকাতা ৭০০১৩১

Comments
Post a Comment