রঙিন বৃষ্টির ফেরিওয়ালা
সঙ্গীতা মহাপাত্র
অরুণাভ যখন এই ধুলোবালির ধূসর শহরে পা রাখল, তখন মানুষের জীবন ছিল একদম একঘেয়ে। এই শহরের আকাশ থেকে কেবল কালো জল ঝরত, আর মানুষের মন ছিল পাথরের মতো শক্ত। কেউ কারোর দিকে তাকিয়ে হাসত না, এমনকি শিশুদের চোখের মণিগুলোও ছিল বর্ণহীন। অরুণাভের কাঁধে থাকতো একটা পুরনো চামড়ার ঝোলা, যার ভেতর সে বয়ে বেড়াত অদ্ভুত কিছু কাঁচের গুলি।
একদিন ভর দুপুরে শহরের চৌমাথায় দাঁড়িয়ে অরুণাভ তার ঝোলা থেকে একটা উজ্জ্বল লাল রঙের গুলি বের করে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে মেঘের বুক চিরে টুপটুপ করে ঝরে পড়তে লাগল লাল রঙের বৃষ্টি। শহরবাসী অবাক হয়ে দেখল, সেই বৃষ্টি যেখানেই পড়ছে, সেখানেই প্রাণের ছোঁয়া লাগছে। শুকনো কংক্রিটের ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসছে রক্তজবা, আর মানুষের ধূসর জামাকাপড়গুলো হয়ে উঠছে টকটকে লাল।
শহরের শাসকরা ভয় পেয়ে গেল। তারা শান্তিভঙ্গের দায়ে অরুণাভকে বন্দী করল। তাদের দাবি, "আমাদের এই নিয়মমাফিক ধূসর জীবনে রঙের কোনো জায়গা নেই। রং মানুষকে আবেগপ্রবণ করে তোলে, আর আবেগ মানুষকে নিয়ন্ত্রণহীন করে।" অরুণাভ হাসল। সে বলল, "আবেগহীন মানুষ তো যন্ত্রের সমান। যন্ত্র দিয়ে তো আর সমাজ গড়া যায় না।"
কারাগারের ছোট্ট ঘুলঘুলি দিয়ে অরুণাভ রোজ একটা করে রঙিন গুলি বাইরে ছুঁড়ত। কোনোদিন নীল বৃষ্টি হতো, তো কোনোদিন সোনালী। ধীরে ধীরে শহরের মানুষ বদলে যেতে শুরু করল। তারা একে অপরের হাত ধরতে শিখল, তাদের মনের কঠোরতা গলে গিয়ে সেখানে সহমর্মিতার রং লাগল। তারা বুঝতে পারল, কেবল খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই জীবন নয়, জীবনের আসল সার্থকতা অনুভূতির বৈচিত্র্যে।
একদিন সকালে জেলরক্ষী এসে দেখল অরুণাভের ঘরটা শূন্য। শুধু মেঝেতে পড়ে আছে একটা রামধনু রঙের কাঁচের গুলি। সেদিন সারাদিন এই শহরে বৃষ্টি হয়নি, কিন্তু প্রতিটি মানুষের চোখের পাতায় ফুটে উঠেছিল এক অদ্ভুত মায়া। অরুণাভ চলে গেছে অন্য কোনো ধূসর শহরে রঙের ফেরি করতে, কিন্তু এই শহরটাকে সে দিয়ে গেছে চিরস্থায়ী এক বসন্ত। এখন সেখানে আর কালো বৃষ্টি হয় না, বরং মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকে হাজারো রঙের সম্ভাবনা।
====================
সঙ্গীতা মহাপাত্র
এ. কে মুখার্জি রোড, কলকাতা ৭০০০৯০
🙏🏻
ReplyDeleteখুব সুন্দর। মন ছুঁয়ে গেল।
ReplyDelete