পালা বদল
অদিতি চ্যাটার্জি
---" রিম্পার ফোন আজ বন্ধই হচ্ছে না, এখনও রান্না ঘরের কাজ বাকি। কখন ও সব কাজ শেষ করবে , কখন আমি বেরোবো ? বিরক্তি আসছে রূপসার, রিম্পা একটু তাড়াতাড়ি করো না গো, আমি বেরোবো আজ।"
" ইসস বৌদি দেরী হয়ে গেল তোমার না! এই তো হয়ে যাবে। "
রূপসা দেখে রিম্পা রান্নাঘরের স্লাবটা যত্ন নিয়ে মুছছে, এইবার মেঝেটা মুছে নিলে , ওর কাজ শেষ । রোগা মেয়েটাকে দেখলে মায়া লাগে । এতোটাই রোগা দুটো বাচ্চার মা মনে হয় না, কত দূর থেকে আসে , সেই তালদি। পরিশ্রমী মেয়েটার খাওয়া বিশ্রাম কোনোটাই ঠিক মতো হয় না। বেচারি ! একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে রূপসা ।
নিজের ঘরের লাগোয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল রুপসা একটু অন্যমনস্ক। দুইবার ডাকার পর রিম্পা সাড়া পায় তাঁর বৌদির।
" কিছু বলছো"?
"বৌদি হয়ে গেছে।"
" আচ্ছা । ট্রেন কটায় তোমার?"
"ঐ তো তিনটে যাদবপুর থেকে ধরবো, আবার বালিগঞ্জ থেকে ট্রেন বদলে নেবো।"
বলবে না, বলবে না করে রুপসা জিগ্যেস করে ফেলে " কে এতো ফোন করছিল রিম্পা তোমাকে ? মা নাকি! বাড়িতে সবাই ঠিক আছে তো?"
একটু চুপ করে থাকে রিম্পা । কি বলবে বৌদি কে। একটা স্বার্থপর মানুষ, যে কিনা রিম্পার সন্তান দের বাবা সে ফোন করছিল ! অবশ্য সন্তানদের বাবা বলতেও লজ্জা হয় রিম্পার। রূপসা উসখুস করছে দেখে রিম্পা বলতে বাধ্য হয় মনোজ, আমার বর ফোন করেছিল ।
একটু ধাক্কা লাগে রূপসার কানে, মনে মনে ভাবে যাক , রিম্পার বরের মাথাটা যদি ঠান্ডা হয় মেয়েটা তবে একটু বাঁচে এতো পরিশ্রম আর দুশ্চিন্তার হাত থেকে। বেশ হাসি মুখেই রুপসা বলা শুরু করতে গেছিলো, " যাক রিম্পা তুমি তবে বেঁচে গেলে..."
"বৌদি একদম না, তুমি ঐ লোকটার কথা আমাকে একদম বলবে না ।"
রুপসা অবাক হয়ে দেখে শান্ত, কথা কম বলা হাসিখুশি মেয়েটার গলার কি দাপট, কান্না মেশা গলায় অবশ্য কি বলতে চাইছে আদ্ধেক কথাই রূপসার কানের পাশ দিয়ে, মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, ও অবাক চোখে দেখছে শান্ত রিম্পাটা আজ গোলা গুলিতে ভরিয়ে দিচ্ছে রুপসার সাধের খেলাঘর টাকে।
একটা সময় কাঁদতে কাঁদতে রিম্পা মেঝেতেই বসে পড়ে, রূপসা নিজের কৌতুহলের জন্য বড্ড লজ্জা পায়। এক গ্লাস জল এগিয়ে দেয় মেয়েটাকে।
"যাও চোখে মুখে জল দিয়ে এসো আগে রিম্পা ।" রুপসা জানে এই মুহূর্তে ওদের দুইজনের একটু আড়াল দরকার ।
"জুতোটা বাইরে আছে , তিনটের ট্রেনটা পাবো কি? দৌড়াতে হবে হয়তো স্টেশনে যাওয়ার জন্য ।"
দরজাটা খুলতে গিয়ে দেখে বৌদি দাঁড়িয়ে। রিম্পা একটু হেসে বলে " বৌদি , ওদের বাবার আবার সংসার করার শখ হয়েছে আমার সাথে ।
আমি না করে দিয়েছি। জানো ঐ লকডাউনের সময় আমাদের বিনা কারনে ছেড়ে ওর নিজের বাড়িতে গিয়ে উঠলো । কি যুক্তি দিল আমি যেহেতু আমার মা কে এনে রেখেছি, তাই ও থাকবে না । জানো বৌদি টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিলো। বলে আমি নাকি আমার মা-র পেছনে সব খরচ করে দেবো। "
একটু হাসে রিম্পা, " ও নিজের মা কে দেখছে না, আমি দেখলেই দোষ। বুড়িটার আমি ছাড়া কে আছে বলো তো! না খেতে পেয়ে মরবে না? আমি সন্তান হয়ে দেখবো সেটা? তুমি জানো না বৌদি বোঝানোর সময় পা অবধি ধরেছি। সেই এক গোঁ , তোমার মা থাকলে থাকবো না। আমার শাশুড়ি, ভাসুর অবধি বোঝায়নি মনোজ কে। বেশি রোজগারের গরম দেখিয়ে গেছে। এখন আসছে দয়া করতে । আমি বলে দিয়েছি আমি ভাড়া দি, আমার বাড়িতে তুমি আসবে না ।"
"তোমার মা কি বলে ?" রোগা মেয়েটার মনের জোর দেখে গলায় শব্দরা আসে না রূপসার ।
" মা তো বার বার বলছে জামাই কে আসতে বল বাড়িতে । কিন্তু আমি ঠিক জানি ও আমাদের সাথে থাকা শুরু করলেই আমার মা কে তাড়াতে চাইবে। বৌদি এইবার যাই, ট্রেনটা আর দেরী হলে পাবো না ।"
ঘাড় নেড়ে রূপসা বলে সাবধানে যেও । দরজা বন্ধ করে বারান্দায় আসে রূপসা, তিনতলার বারান্দা থেকে দেখে ওড়নাটা দুলিয়ে রিম্পা দৌড়াচ্ছে স্টেশনের দিকে। রূপসা এতো উঁচু থেকে বুঝতে পারে না ওটা কি রিম্পা নাকি ওর মধ্যে আছে কণিকা কাকিমা, পম্পা দির মা, মেম , সে নিজে এবং আরো কত কত মেয়ে, যারা নিজের খেলাঘর টা বাঁচাতে স্বামীর অন্যায় আবদার মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল , কোনো না কোনো সময়ে । আজ সবাই কে নিয়ে রিম্পা উড়ে চলে গেল খোলা আকাশে ।
" রিম্পা ওড়ো অনেক অনেক উঁচু তে উড়ো। আমি তোমাকে দেখে নিজের ডানা দুটো কে শক্ত করবো। " নিজের চোখটা মুছে ঘরে চলে আসে রূপসা ।
====================
Aditi Chatterjee
Ranaghat,Nadia

Comments
Post a Comment