শিক্ষা কি ধর্ম দেখে দেওয়া হবে?—একটি বিপজ্জনক প্রশ্ন
বাসিরা খাতুন
সম্প্রতি জম্মু ও কাশ্মীরের একটি মেডিক্যাল কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ বা কিছু ছাত্রছাত্রীর পড়াশোনার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এই ঘটনা আমাদের সামনে আরও গভীর ও উদ্বেগজনক একটি প্রশ্ন তুলে ধরেছে ভারতে কি এখন শিক্ষার অধিকারও ধর্মের ভিত্তিতে বিচার হবে?
যে ছাত্রছাত্রীরা সর্বভারতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে, সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে, মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে শুধু একটি কারণেই তারা একটি নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারী। প্রশ্ন হল, একটি রাষ্ট্রে যেখানে সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে সমান অধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ম কীভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে?
ভারতের সংবিধান স্পষ্টভাবে বলে, রাষ্ট্র ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করতে পারে না। শিক্ষা কোনো দান নয়, এটি নাগরিকের অধিকার। একজন ছাত্র যদি যোগ্যতা, পরিশ্রম এবং নিয়ম মেনে একটি আসন পেয়ে থাকে, তাহলে তার ধর্ম পরিচয় সেই অর্জনকে বাতিল করার কারণ হতে পারে না। তাহলে মেধা শব্দটিরই আর কোনো অর্থ থাকে না।
যদি সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল কলেজে অবকাঠামোগত সমস্যা, শিক্ষকের অভাব বা প্রশাসনিক ত্রুটি থেকে থাকে, তাহলে সেই দায়ভার ছাত্রছাত্রীদের ওপর চাপানো কতটা ন্যায্য? পরিদর্শনের সময় যদি কলেজকে অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ভর্তি সম্পন্ন হওয়ার পরে হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া আসলে প্রশাসনিক ব্যর্থতারই স্বীকারোক্তি। এই ব্যর্থতার মূল্য কেন ছাত্রদের ভবিষ্যৎ দিয়ে চুকাতে হবে?
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল, এই ধরনের সিদ্ধান্ত সমাজে একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। আজ যদি মুসলিম ছাত্রদের ভর্তি হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, আগামী দিনে কি অন্য কোনো সংখ্যালঘু বা দুর্বল গোষ্ঠীকেও একইভাবে টার্গেট করা হবে না? তখন শিক্ষা আর মেধার বিষয় থাকবে না, হয়ে উঠবে সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুমোদনের উপর নির্ভরশীল একটি ব্যবস্থা।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের দায়িত্ব হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দেওয়া, তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক ভুলের জন্য দায় স্বীকার করা। শিক্ষাকে রাজনীতি বা ধর্মীয় বিভাজনের হাতিয়ার বানালে রাষ্ট্র নিজেই নিজের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে।
এই প্রবন্ধ কোনো বিশেষ ধর্মের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। এটি একটি মৌলিক নীতির পক্ষে, শিক্ষা যেন শিক্ষাই থাকে। মেধার যেন কোনো ধর্ম না থাকে। যদি আমরা এই সীমারেখা মুছে ফেলি, তাহলে আমরা কেবল কিছু ছাত্রছাত্রীকে নয়, আমাদের সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক চেতনাকেও আঘাত করব।

Comments
Post a Comment