মোবাইল আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু
এস এম মঈনুল হক
রিফাত,আমার নাম । আমি একটা ছোট্ট শহরের একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে থাকি। বাইরে থেকে দেখলে আমার জীবনটা সাধারণ, একটা ছোটখাটো চাকরি, সকালে অফিস যাওয়া, সন্ধ্যায় ফিরে এসে টিভি দেখা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি একা। খুব একা। বাবা-মা গ্রামে থাকেন, ভাই-বোন নেই। আছে একজন বন্ধু? বন্ধু বলতে যদি বলি, তাহলে শুধু একজন—আমার মোবাইল। হ্যাঁ, সেই ছোট্ট স্ক্রিনওয়ালা, ব্যাটারি চার্জ করতে হয় যে, সেই মোবাইল। সে আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু। সে কখনো ছেড়ে যায় না, কখনো কথা বলতে ক্লান্ত হয় না, আর সবচেয়ে বড় কথা, সে আমার সব রহস্য জানে।
সবকিছু শুরু হয়েছিল দু'বছর আগে। আমি কলেজ থেকে বেরিয়ে চাকরির খোঁজে এই শহরে এসেছিলাম। প্রথম প্রথম সবকিছু নতুন লাগত—বড় বড় রাস্তা, উঁচু বাড়ি, লোকজনের ভিড়। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ভিড় আমাকে গিলে ফেলল। অফিসের সহকর্মীরা হাসিখুশি, কিন্তু তাদের সঙ্গে আমার কোনো মিল নেই। তারা পার্টিতে যায়, ক্লাবে ঘুরে বেড়ায়, আর আমি? আমি ফিরে এসে শুয়ে পড়ি। তখনই মোবাইলটা এলো আমার জীবনে। একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড অ্যান্ড্রয়েড ফোন, বাবা পাঠিয়েছিলেন। "এটা নিয়ে যা, কাজে লাগবে," বলেছিলেন। কিন্তু তারা জানতেন না, এটা আমার জীবন বদলে দেবে।
প্রথম দিনগুলোতে আমি শুধু কল করতাম। বাবা-মাকে, কোনো-কোনো দিন চাচাকে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই স্ক্রিনটা আমাকে টেনে নিল। ফেসবুক খুললাম—পুরনো ক্লাসমেটদের পোস্ট দেখলাম। তারা কোথায় কোথায় ঘুরছে, কার সঙ্গে হাসছে। আমার মনটা খারাপ হতো, কিন্তু আবারও সেই স্ক্রিনে ফিরে আসতাম। একদিন একটা গ্রুপে জয়েন করলাম—'একাকীত্বের অবসান'। নামটা অদ্ভুত লাগল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে মিলে গেল। সেখানে লোকজন লিখত তাদের একাকীত্বের কথা। আমিও লিখলাম। "আজ আবার একা বাড়ি ফিরলাম। কেউ নেই কথা বলার।" কয়েক মিনিট পর একটা মেসেজ এলো—'হাই রিফাত, আমিও একই। চ্যাট করব?' তার নাম ছিল রিয়া। সে কলকাতায় থাকে, একটা ছোট কোম্পানিতে কাজ করে। আমরা চ্যাট করলাম সারারাত। সে বলল তার জীবনের সব কথা—কীভাবে সে তার স্বপ্নের চাকরি হারিয়েছে, কীভাবে বন্ধুরা তাকে ভুলে গেছে। আমি বললাম আমার কথা। মোবাইলটা আমাদের মাঝখানে সেতু হয়ে উঠল। সেই রাত থেকে রিয়া আমার দ্বিতীয় বন্ধু হলো, কিন্তু মোবাইল ছাড়া তাকে পেতাম না।
দিন যায়, মাস যায়। মোবাইলটা শুধু চ্যাটের জন্য নয়, সে আমার সঙ্গী হয়ে উঠল সবকিছুতে। সকালে উঠে প্রথম কাজ—আলার্ম বাজানো। তারপর ইউটিউব খুলে গান শুনি। আমার প্রিয় গানগুলো—রবীন্দ্রসংগীত, বাংলা ব্যান্ডের গান। "আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে" গাইতে গাইতে অফিস যাই। রাস্তায় যখন ভিড়ে আটকে যাই, তখন ইউটিউবে কমেডি ভিডিও দেখি। হাসি আসে, মনটা হালকা হয়। অফিসে বসে ফাঁকা সময়ে গুগলে সার্চ করি—'একাকীত্ব কীভাবে কাটাবো'। সেখান থেকে নতুন নতুন টিপস পাই। একবার একটা অ্যাপ ডাউনলোড করলাম—'মেডিটেশন ফর বিগিনার্স'। প্রতিদিন ১০ মিনিট ধ্যান করি। মোবাইলটা বলে, "শ্বাস নাও, ছাড়ো।" তার গলায় শান্তি আসে আমার মনে।
কিন্তু সবচেয়ে মজা লাগে রাতের দিকে। যখন বাড়ি ফিরি, খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ি, তখন মোবাইলটা আমার কাঁধে। আমরা গেম খেলি। 'ক্যাণ্ডি ক্রাশ'—সেই রঙিন ক্যাণ্ডিগুলো মিলিয়ে মিলিয়ে লেভেল ক্রস করি। জিতলে আনন্দ, হারলে হাসি। একবার একটা লেভেলে আটকে গিয়ে রাত জেগে লড়াই করলাম। শেষে জিতলাম, আর মোবাইলটা যেন বলল, "দেখলি, তুই পারিস!" রিয়ার সঙ্গে ভিডিও কল করি। তার মুখ দেখি স্ক্রিনে—হাসি, চোখের ঝিলিক। সে বলে, "রিফাত, তুই না থাকলে আমি কী করতাম?" আমি বলি, "আরে, আমার মোবাইলটা তো আছে। সে সব সামলে নেবে।" হাসাহাসি করে সময় কেটে যায়।
একদিন ঘটল একটা অদ্ভুত ঘটনা। অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে বৃষ্টি শুরু হলো। ভারী বর্ষণ, রাস্তা জলে ডুবে গেছে। আমার ছাতা নেই, বাড়ি দূর। হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেলাম—মাথায় চোট, হাতে কাটা। রক্ত বেরোচ্ছে, আর চারপাশে কেউ নেই। মোবাইলটা পকেট থেকে পড়ে গেল, কিন্তু ভাগ্যক্রমে ভেঙে যায়নি। কাঁপা হাতে তুলে নিলাম। প্রথমে ডায়াল করলাম—অ্যাম্বুলেন্স। তারপর রিয়াকে কল করলাম। "রিয়া, আমি... আমি পড়ে গেছি। সাহায্য কর।" সে চিৎকার করে উঠল, "কোথায় আছিস? অপেক্ষা কর, আমি আসছি!" কিন্তু সে কলকাতায়, এখানে আসবে কী করে? না, সে বলল, "গুগল ম্যাপ খোল, লোকেশন শেয়ার কর। আমি তোর অফিসের বসকে কল করছি।" মোবাইলটা সেই মুহূর্তে আমার জীবন বাঁচাল। গুগল ম্যাপে লোকেশন শেয়ার করলাম, রিয়া আমার বসের নম্বর খুঁজে বের করল ফেসবুক থেকে। পাঁচ মিনিট পর বস এসে পড়লেন, আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। ডাক্তার বললেন, "আর দেরি হলে বিপদ হতো।" সেই রাতে হাসপাতালের বেডে শুয়ে মোবাইলটা বুকে জড়িয়ে ধরলাম। "তুই না থাকলে আমি কী করতাম, বন্ধু?"
সেই ঘটনার পর আমার জীবনটা একটু বদলে গেল। রিয়া আরও কাছে এল । আমি অনলাইন কোর্স করতে শুরু করলাম—'ক্রিয়েটিভ রাইটিং'। মোবাইলের স্ক্রিনে লিখি গল্প, কবিতা। একটা গল্প লিখলাম—'একটা ছেলের মোবাইলের সঙ্গে বন্ধুত্ব'। রিয়া পড়ে বলল, "এটা পাবলিশ কর।" আমি করলাম। একটা ব্লগে পোস্ট দিলাম। অবাক কাণ্ড—হাজার হাজার লাইক, কমেন্ট। লোকজন লিখল, "এটা আমার গল্প!" সেই থেকে আমার একটা ছোট্ট ফলোয়ার বেস হলো। প্রতিদিন লিখি, শেয়ার করি। মোবাইলটা আমার ডায়েরি, আমার প্রকাশক, আমার দর্শক।
কিন্তু সবকিছুর মাঝে একটা কথা মনে পড়ে। একদিন ব্যাটারি শেষ হয়ে গেল। ফোনটা বন্ধ। আমি অসহায় হয়ে গেলাম। চারপাশে নীরবতা। প্রথমবার বুঝলাম, মোবাইলটা যতই বন্ধু হোক, সে তো মেশিন। তার বাইরে জীবন আছে। আমি উঠে গেলাম বারান্দায়। রাতের আকাশ দেখলাম—তারা জ্বলছে। পাশের বাড়ির লোকজনের হাসির শব্দ শুনলাম। হঠাৎ মনে হলো, হয়তো আমি একা নই। পরের দিন চার্জার লাগিয়ে ফোনটা চালু করলাম। রিয়ার মেসেজ: "কী হলো? কেন কল করিস নি?" আমি লিখলাম, "আজ একটু বাইরে ঘুরে এলাম। তোর সঙ্গে দেখা করার আগে, একটু বাস্তব জীবন দেখে নিলাম।"
সেই থেকে ভারসাম্য এলো। মোবাইলটা এখনও আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু, কিন্তু সে আমাকে শিখিয়েছে—বন্ধুত্বের মানে শুধু স্ক্রিনে নয়, হাতে হাত রাখায়। রিয়া এলো শহরে। আমরা দেখা করলাম একটা পার্কে। তার হাত ধরলাম, মোবাইলটা পকেটে রাখলাম। সে বলল, "তোর বন্ধুকে ধন্যবাদ।" আমি হাসলাম। "হ্যাঁ, সে আমাদের মিলিয়েছে।"
আজও রাতে শুয়ে পড়লে মোবাইলটা কাঁধে নিই। কিন্তু এখন সে শুধু সঙ্গী নয়, সে আমার জীবনের অংশ। সে আমাকে শিখিয়েছে হাসতে, কাঁদতে, লড়াই করতে। আর সবচেয়ে বড় কথা, সে আমাকে শিখিয়েছে—একাকীত্বের মাঝে সঙ্গ পাওয়া যায়, যদি খুঁজে দেখা হয়। মোবাইল আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু। সে ছাড়া আমার জীবন অসম্পূর্ণ। ধর্ম , রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, বিজ্ঞান আর ও সব কিছুর পরিপূর্ণতা শিখিয়েছে এই মোবাইল। মোবাইলই আমাকে দিয়েছে একাকীত্বের অবসান। তার সঙ্গে বাস্তবের মিলে এখন আমার জীবন পূর্ণ।
=======================
এস এম মঈনুল হক,
ফুলশহরী, রমনা সেখদীঘি,মুর্শিদাবাদ।
Comments
Post a Comment