
চৈনিক লোককথা
এক কৃপণ কৃষকের কিসসা
ইংরেজি থেকে বাংলা রূপান্তর : চন্দন মিত্র
এক কৃষকের ছিল নাশপাতি এক বাগান। তাঁর বাগানের নাশপাতি ছিল স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়। তিনি ঠেলাগাড়িতে ডালপাতাসহ নাশপাতি চাপিয়ে বাজারে গিয়ে বিক্রি করতেন। টাটকাতাজা নাশপাতি কেনার জন্য তার গাড়ির সামনে ভিড় জমে যেত। একদিন এক বৌদ্ধ ভিক্ষু কৃষকের গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে একটি নাশপাতি চাইলেন। ভিক্ষুর মাথায় ছেঁড়া টুপি ও পরনে জীর্ণ চীবর দেখে কৃষক বুঝলেন নাশপাতি কিনে খাওয়ার ক্ষমতা তাঁর নেই। কৃষক তাঁকে সরে যেতে বললেন, কিন্তু তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন, এক পাও নড়লেন না। কৃষক এবার ভিক্ষুকে গালিগালাজ শুরু করলেন। ভিক্ষু অকম্পিত কণ্ঠে ধীরভাবে বললেন, আপনার গাড়িতে কয়েকশ নাশপাতি আছে, সেখান থেকে একটা ছোটো মতো আমাকে দিলে আপনার খুব বেশি ক্ষতি হত না বোধহয়। ঠিক আছে বুঝলাম আপনি কৃপণ মানুষ। কিন্তু আমাকে গালিগালাজ করছেন কেন? উপস্থিত লোকজন কৃষককে বললেন, ভাই একটা ছোটো দেখে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। কৃষক অনড়, কারও কথায় তিনি কর্ণপাত করলেন না।
ভিড়ের ভিতর থেকে একজন কারিগর এসে একটি নাশপাতি কিনে ভিক্ষুর হাতে তুলে দিলেন। ভিক্ষু তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে উপস্থিত লোকজনের উদ্দেশে বললেন, আমার মতো সর্বস্বত্যাগী ভিক্ষুর কৃপণ হওয়া মানায় না। আমারও অনেক সুস্বাদু নাশপাতি আছে, আমি আপনাদের সবাইকেই নাশপাতি খাওয়াব।
কেউ একজন ব্যঙ্গ করে বললেন, আপনার কাছে সত্যিই যদি নাশপাতি থাকে তাহলে আপনি কাঙালের মতো একটি নাশপাতির জন্য হাত পাতছিলেন কেন?
ভিক্ষু বললেন, আসলে নাশপাতিগাছ তৈরির জন্য আমার একটি বীজের প্রয়োজন ছিল।
ভিক্ষুর এই হেঁয়ালি কারও মাথায় ঢুকল না। এর মধ্যে নাশপাতির গাড়ির পাশে দাঁড়ানো ভিক্ষুকে ঘিরে ভিড় তৈরি হয়ে গেছে। নাশপাতিওয়ালা কৃষকও ভিক্ষুর কথাবার্তা শুনে বেচাকেনা বন্ধ করে সেই জনমণ্ডলীতে সামিল হয়েছেন।
ভিক্ষু হাতের নাশপাতিতে কামড় মেরে ভিতর থেকে একটি বীজ বের করে বামহাতের তালুতে রাখলেন, তারপর তারিয়ে তারিয়ে নাশপাতির মজা নিতে লাগলেন। খাওয়া শেষ করে ভিক্ষু তাঁর কাঁধের ঝোলা থেকে ছোটো একটি শাবল বের করে মাটিতে একটি গর্ত করলেন। সেই গর্তে বীজটি রেখে মাটি চাপা দিলেন। 'আমাকে কেউ একটু জল এনে দিতে পারেন' ভিক্ষুর এই আবেদনে সাড়া দিয়ে একজন লোক স্থানীয় ছাত্রাবাস থেকে একটি মগে করে গরম জল এনে দিলেন, তাতে তখনও ধোঁয়া উঠছে।
ভিক্ষু বললেন, 'ঠিক আছে এতেই চলে যাবে।'
ভিক্ষু সেই জলটুকু গর্তের উপর ঢেলে দিলেন। হাজারখানেক চোখ আশ্চর্য হয়ে দেখল, বীজ থেকে একটি অঙ্কুর মাটির উপরে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে সেই অঙ্কুর একটি ফলেভরা ছোটোখাটো নাশপাতি গাছের রূপ ধারণ করল। লোকজন ভতভম্ব হয়ে হাততালি দিয়ে উঠলেন, এমনকি সেই কৃপণ কৃষকও। ভিক্ষু একটুও দেরি না-করে গাছ থেকে পটাপট নাশপাতি তুলে সবার মধ্যে বিলিয়ে দিলেন। তারপর শাবলের কয়েকটি ঘায়ে গাছটি কেটে কাঁধে চাপিয়ে দ্রুত প্রস্থান করলেন।
লোকজন নাশপাতি খেতে খেতে ভিক্ষুর অলৌকিক ক্ষমতার গুণগানে মেতে উঠলেন। নাশপাতিওয়ালা মন্ত্রমুগ্ধের মতো ভিক্ষুর ভেলকি দেখছিলেন। দোকানের দিকে খেয়ালই করেননি। সংবিৎ ফিরতে তিনি নাশপাতির গাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, গাড়ি ফাঁকা- একটাও নাশপাতি নেই। তিনি বুঝতে পারলেন একটু আগে ভিক্ষু যে নাশপাতিগুলি বিলি করেছেন, সেগুলি আসলে তার গাড়ি থেকে নেওয়া। শুধু তাই নয় তার গাড়ির লম্বা হাতলদুটির একটি নেই। কৃষকের বুঝতে অসুবিধা হল না, ভিক্ষু গাছকাটার ধাঁধাঁ দেখিয়ে আসলে তাঁর গাড়ির হাতলটি কেটে নিয়ে গেছেন। রাগে কাঁপতে কাঁপতে তিনি ভিক্ষুকে ধরার জন্য দৌড় শুরু করলেন। কিন্তু শুনশান পথে তিনি কাউকে দেখতে পেলেন না; বাধ্য হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ঠিক সেইসময় রাস্তার এক পাশে অনাদরে পড়ে থাকা কর্তিত হাতলটি তাঁর চোখে পড়ল।
Comments
Post a Comment