চেনা প্রতিবেশী
অন্তিম (দশম) পর্ব
দীপক পাল
মামা লিফটের দরজা বন্ধ করতে আহিরের মনটা খারাপ হয়ে বেশ কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল। দরজা বন্ধ করে আহিরকে কোলে তুলে তড়িৎ গতিতে ত্রিহান বারান্দায়আগে থেকে দাঁড়ান ইমনের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। নিচে তাকিয়ে দেখে নির্ঝর গাড়ীর দরজা খুলে ওপরে তাকিয়ে হাত নাড়ছে। ত্রিহান বললো, 'আহির তুমি মামাকেটাটা করে দাও।' সবাই হাত নাড়াতে আহিরও হাত নাড়াতে থাকলো। নির্ঝর গাড়ি স্টার্ট করে গিয়ারে হাত দিয়ে শেষবারের মতো হাত নাড়িয়ে গাড়ি নিয়ে ফটকপেরিয়ে রাস্তায় গিয়ে পড়লো। বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ত্রিহান ইমনকে বললো, ' এখানে এসে প্রথম শনিবার রবিবারটা বেশ ভালই কাটলো কি বল ইমন।' ইমন বলে ওঠে,
'সে আর বলতে। তা যাক তুমি একটা কাজ করো ত্রিহান বরোটাতো বাজল তুমি আহিরকে স্নান করিয়ে ফ্রেশ করিয়ে দিয়ে তুমি নিজেও যদি স্নান করে নাও তাহলেভাল হয়। আমি ইতিমধ্যে রান্নাঘরের কাজগুলো শেষ করে বেরিয়ে আসি।' ত্রিহান বলে,
'ঠিক আছে ম্যাডাম তাই হবে। এসো আহির তোমাকে এবার স্নান করিয়ে দি তারপর আমি মা স্নান করে একসাথে খেতে বসবো আমরা।'
- ' বাবা,আজকেও চিকেন খাব আমরা?'
' নিশ্চই খাব বৈকি। চল এবার স্নান করতে।'
দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে ত্রিহান আহিরকে পাশে নিয়ে আবোল তাবোল গল্প বলতে বলতে ওকে ঘুম পাড়াবার চেষ্টা করতে লাগলো। আহির ঘুমের ঘোরে তাইশুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লো। ইমন সব কাজ সেরে এসে ত্রিহানের পাশে এসে শুয়ে পড়লো। ইমন ও ত্রিহান খুব ঘনিষ্ঠ হলো। দুজনের আলোচনা হতে থাকলোঅতীতের কত সব ঘটনার কথা। স্মৃতি সততই সুখের তা যতই কষ্টের হোক। আহিরকে ঘিরে স্বপ্ন। তাকে কি ভাবে গড়ে তুলবে ভবিষ্যত ওকে কোন দিকে নিয়ে যাবে।এইসব আলোচনা করতে করতে দুজনের চোখেই ঘুমের ছায়া নামলো।
হঠাৎ ইমনের ঘুম ভেঙে যেতে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সাড়ে চারটে বেজে গেছে। ত্রিহান ও আহির তখনও ঘুমচ্ছে। আহিরের একটা পা ত্রিহানের গায়ে তুলে দিয়েবালিশ ছেড়ে কিছুটা বেঁকে শুয়ে আছে নিস্চিন্তে। ত্রিহানও কেমন অকাতরে ঘুমিয়ে আছে। ওদের শোয়া দেখে ইমনের কেমন মায়া হলো। খাট থেকে খুব সাবধানেনেমে দাঁড়াল। বারান্দায় গিয়ে শুকনো জামা কাপড়গুলো গুছিয়ে এনে আলমারিতে রাখলো। যেগুলো এখনও ভেজা আছে সেগুলো উল্টে দিয়ে আসলো। তারপররান্নাঘরে ঢুকলো। চায়ের জল নিয়ে রাখলো আগে। তারপর আর একটা পাত্রে আহিরের জন্য গরম জল বসালো। দ্রুত হাতে ওর জন্য হেলথ ড্রিংক বানালো।দুটো আহিরের প্রিয় বিস্কুট নিয়ে ঘরে ঢুকলো। ঢুকে দেখলো আহির উঠে ত্রিহানের গায়ে বাম হাতটা রেখে ডান হাতের উল্টো দিক দিয়ে চোখ কচলাচ্ছে। ত্রিহানতখনও ঘুমচ্ছে। ইমন ত্রিহানকে ডাকলো,
- ' ত্রিহান ওঠো ওঠো , এটা আহিরকে খাইয়ে দাও। আমি ওদিকে চায়ের জল বসিয়ে এসেছি। যদিও আঁচটা একদম কমিয়ে এসেছি তবুও এখন হয়তো ফুটে উঠেছে।'
ত্রিহান উঠে পাত্রটা ইমনের হাত থেকে নিয়ে আহিরকে খাওয়াতে থাকলো। কিছুক্ষণ পরে ইমন ট্রেতে করে চা আর ছোট ছোট নোনতা বিস্কুট নিয়ে হাজির হলো। খাওয়ার পর্ব সারা হলে ইমন কাপ ডিসগুলো তুলে নিয়ে রান্নাঘরে গেল। ত্রিহান কোলে করে আহিরকে নিয়ে একটু বারান্দায় দাঁড়াল। বেশ ঠান্ডা লাগছে। বাইরে যেকটা ভেজা জামা প্যান্ট ছিল সেগুলো নিয়ে এসে খাবার টেবিলে রাখলো তারপর বারান্দার দরজাটা দিয়ে এসে আবার খাটের ওপরে গিয়ে বসলো। আহির খাট থেকে নিচে নেমে কতগুলো খেলনা এনে বিছানার ওপর রেখে ত্রিহানের দিকে দুটো হাত বারিয়ে দিলো। ত্রিহান আহিরকে টেনে খাটের ওপর তুলে দিলো। তারপরত্রিহানকে ওর সাথে খেলতে বাধ্য করলো। কিছুক্ষন পরে ইমন দুটো প্লেট ও একটা বাটিতে মিষ্টি নিয়ে এলো। প্লেটে রসগোল্লা, সন্দেশ ও জয়নগরের মোয়া আর আহিরের জন্য বাটিতে জয়নগরের মোয়া আর সন্দেশ। খেতে খেতে ত্রিহান বললো,
- ' আজকের সন্ধ্যেটা বড় ভালো লাগছে ইমন। এরকম একটা সন্ধ্যায় বড়ো গান শুনতে ইচ্ছে করছে।'
- ' বেশ তো, তোমার টেপ রেকর্ড চালিয়ে যার যত খুশি গান শোনা কে বারণ করছে।'
- ' না তা ঠিক নয়। আসলে তুমি যদি একটু গান শোনাও তবে আমার ভাল লাগবে। একটু গাও না, বহু দিনতো গান গাও না, এদিকে হারমোনিয়মটা তো জং পড়ে গেল।'
- ' সন্ধ্যেটাতো আমারও ভাল লাগছে কিন্তু ত্রিহান, অনেকদিন হলো হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাই না জানিনা কতটা কি পারবো। আচ্ছা আমি চট করে এগুলোধুয়ে আসি। তুমি হারমোনিয়ামটা এই খাটের ওপর রাখ। আমি এখানে বসেই গান গাইবো। কিন্তু ঐ দেখ আহিরটা কি করেছে বিছানাটার হাল। কি করে বসবো এখানে বলতো?'
- ' ঠিক আছে ঠিক আছে আমি দেখছি তুমি যাও রান্নাঘরে।' ইমন চলে যেতে ত্রিহান খুব দ্রুততায় বিছানাটায় সন্দেশের গুঁড়ো আর জয়নগরের মোয়ার অবশেষটুকুআহিরের মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে বিছানাটা পরিস্কার করে আহিরকে কোলে তুলে ওর মুখ হাত ধুইয়ে টাওয়েলে মুছিয়ে আবার খাটে বসিয়ে দিল খেলনাগুলোর কাছে।এদিকে ইমনও ফিরে এলো ঘরে। সব দেখে খুশী হয়ে খাটের ওপর উঠলো আহিরের গালে একটা চুমু খেল। ত্রিহান হারমোনিয়ামটা নামিয়ে ঝেড়ে মুছে খাটের ওপরইমনের সামনে রাখলো। গীতবিতানটাও রাখলো হারমোনিয়ামের পাশে। আর দুটো সুগন্ধী চন্দন ধূপ জ্বালিয়ে ড্রেসিং টেবিলে ধূপদানীতে রাখলো। সারা ঘর ধূপের মাতোয়ারা । ইমন গীতবিতান খুলে পাতা উল্টাতে লাগলো। ব্লো করে কিছুক্ষণ রীডগুলোর ওপর আঙুল বুলিয়ে একটু গলা সেধে নিয়ে গান ধরলো…
শীতের হাওয়ায় লাগলো নাচন আমলকীর এই ডালে ডালে ।
পাতাগুলি শিরশিরিয়ে ঝরিয়ে দিল তালে তালে ।।
উড়িয়ে দেবার মাতন এসে কাঙাল তারে করলো শেষে,
তখন তাহার ফলের বাহার রইল না আর অন্তরালে ।।
গানটা শেষ করলেও তার রেশ রয়ে গেল ঘরের সর্বত্র। ত্রিহান বললো, ' চমৎকার গেয়েছো। থেমোনা চালিয়ে যাও পরিবেশটা যেন সুন্দর হয়ে উঠলো।' ইমন আবার শুরু করলো গলা খাঁকারি দিয়ে….
যৌবন সরসীনিরে মিলন শতদল যৌবন সরসীনিরে
কোন চঞ্চল বন্যায় টলোমল টলোমল ।।
শরম রক্ত রাগে তার গোপন স্বপ্ন জাগে,
তারই গন্ধকেশর মাঝে
এক বিন্দু নয়নজল ।। .......
গানটা শেষ করে ত্রিহানকে বললো, ' কি কেমন লাগলো?' মুগ্ধ ত্রিহান বললো,
- ' অপূর্ব! তুমি কিছু ভোলনি ইমন। তুমি আবার নতুন করে শুরু কর ইমন। আর একটা গান কর প্লিজ।'
' তোমায় আর প্লিজ বলতে হবে না, আমি করছি কিন্তু তোমায় আমার একটা রিকোয়েস্ট রাখতে হবে যে এটাই কিন্তু শেষ কেমন।'
- ' আচ্ছা তুমি শুরু কর। তোমার একটা উপহার পাওনা আছে।'
ইমন আবার শুরু করলো….
মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে,
মধুর মলয়সমীরে মধুর মিলন রটাতে ।।
কূহকলেখনী ছুটায়ে কুসুম তুলিছে ফুটায়ে
লিখেছেন প্রণয়কাহিনী বিবিধ বরনছটাতে।। .....
গানটা শেষ হতেই ত্রিহান ইমনকে জড়িয়ে ধরে তার ঠোঁটে চুমু খেল। আহিরের ওদিকে কি হলো, আপন মনে খেলছিল হঠাৎ দৌড়ে এসে দুজনের মাঝে এসে ঝাঁপিয়েপরে ইমনের গালে চুমু খেলো। ওরা দুজনেই অবাক। ত্রিহান তাই আহিরের গালে একটা চুমু খেল। আহিরও ত্রিহানের গালে চুমু খেল। এরপর আরেক মজা আহিরহাততালি দিতে দিতে ইমনকে বললো, ' মা তুমি বাবাকে চুমু খাও।' ইমন নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, ' এই তুই চুপ কর, এখুনি ভাত বসাতে হবে রান্নাঘরে।নাহতো রাতে সবাইকে না খেয়ে থাকতে হবে বুঝলি হাঁদাগঙ্গারাম।' বলে একরকম দৌড়ে গিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলো। ইমন কেমন মুসরে পড়ে ত্রিহানকে বলে, ' বাবা, মাচলে গেল।'
( সমাপ্ত )
----------------
Dipak Kumar Paul
DTC Southern Heights,
Block-8 Flat-1B,
Diamond Harbour Road
Kolkata - 700104
Contact: 9007139853.

Comments
Post a Comment