প্রেমের গল্প
কথা শুরুর সূচনা দিবস
সনৎ ঘোষ
এখনো একটা গার্লফ্রেন্ড জোটাতে পারলি না ! দেবরূপের এই ব্যাঙ্গাত্মক কথাগুলো সুপ্রিয়র কানে যেন কাঁটার মতো বিঁধছে । ছেলের মেয়ে বন্ধু থাকবে না , মেয়ে দেখে উদাসীন এমনটা আবার ছেলেদের ক্ষেত্রে এমনটা হয় নাকি! মজার ছলে হলেও প্রতিটা কথা অন্তরে যেন এক একটা ঘা । সিতাংশু তো রীতিমত গার্লফ্রেন্ডের লিস্ট বলে দিলো ,কোনদিন কোন পার্ক রেস্তোরাঁয় কাকে নিয়ে যাবে তার খতিয়ান দিয়ে বললো , বাইকের পিছনে বসিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে যাওয়া, যেন পুরো পৃথিবীটাই তখন তার বাইকের পিছনে মনে হয় । গেয়ে ওঠে আমার এক দিকে শুধু তুমি, আর পৃথিবী অন্য দিকে । নির্জন নদী চর , রাস্তার কোন গাছের ছায়ায় রোমান্স। প্রেমের ষোল কলা পূর্ণ করে নিতে হয় বুঝলি , তবেই তো প্রেম ! সুপ্রিয় আনমনা হয়ে ওঠে , ভাবতে থাকে তার কেন প্রেম হয় না ! বরাবরই মুখচোরা সে , মেয়েদের সঙ্গে আগবাড়িয়ে কথা বলা দুরের কথা, তাদের কাছাকাছি থাকলেও কখন সেখান থেকে আড়াল নেবে তারা রাস্তা খোঁজে। কোন অনুষ্ঠানে সুন্দর সাজগোজে এক ঝাঁক রূপসী যখন হাসির হিল্লোলে হেঁটে যায় , সে দৃশ্য দেখে একটা অপার ভালো লাগা ও তাদের সান্নিধ্য পাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও মুখচোরা স্বভাবের জন্য প্রেমে ব্রাত্যই থেকেছে সে । অন্য কেউ বা কারা তাদের পিছু নিয়েছে। নিজে থেকে এগিয়ে আসে নি কোন মেয়ে , অথচ হৃদয়ে লুকিয়ে প্রেম । সাদা মাটা চেহারার ভাবুক প্রকৃতির সুপ্রিয় কোন দিন মেয়ে পটানোর কথা ভাবে নি । এই মেয়ে পটানো , কথাটা যদিও সিতাংশুর , আর এই পটানোর শব্দটায় তার আপত্তি। তাতে কোথাও যেন মেয়েদের প্রতি একটা অসম্মান লুকিয়ে থাকে। সিতাংশু দেবরূপদের দেখে নিজের ওপর কেমন রাগ হয় সুপ্রিয়র । মনে মনে ভাবে এসব এবার ভাঙতে হবে । হৃদয়ে গভীর প্রেম অথচ শরীরি ভাষায় তার প্রকাশ নেই। একে দ্বিচারিতা ছাড়া আর কি ই বা বলা যায়! নিজের দুর্বলতা ঢাকতে প্রেমকে অচ্ছুৎ ভেবে এসেছে সে । পাশাপাশি লক্ষ্য করেছে মেয়েদের প্রতি সিতাংশুর হ্যাংলাপনা বা বাঙালিপনা । তাদের অনুসরণ করা , খোঁজ খবর নেওয়া , কথা বলার ছুতো খোঁজা কাছাকাছি থাকা , সুযোগ পেলেই আলাপের চেষ্টা। এই সব কিছুই তার গা সওয়া। ছেলেদের এই হ্যাংলাপনাই কি মেয়েদের উল্লোসিত করে ! তাই কি কলেজ ক্যান্টিন থেকে ইউনিয়ন রুম সর্বত্রই একটা মেয়ে বৃত্তের মধ্যে থাকতে পারছে ! এর কোনটাই কোনদিন চেষ্টা করে নি সুপ্রিয়। একটা সংশয় ভয় তাড়া করে বেড়িয়েছে । এই মুহুর্তে সত্যিই তার একটা গার্লফ্রেন্ডের ভীষণ প্রয়োজন। কিন্তু কাকে আর কিভাবেই বা সে গার্লফ্রেন্ড জোটাবে ! আর এ ব্যাপারে কে ই বা তাকে সাহায্য করবে! প্রেমে পড়তে হয় , ফেলা যায় না। প্রেম পাচ্ছে বলেই যে প্রেম হবে এমনটাও নয় । প্রেমে সবাই এগিয়ে গেছে যে যার মতো করে , পিছিয়ে কেবল সে ই । এবার এগিয়ে যাওয়ার কাজটাই করতে হবে তাকে । দেবরূপের কথাগুলো মনে পড়ে যায়। তাই মনে মনে একজনকে ভেবে নেয় সুপ্রিয়, কলেজের সেকেন্ড ইয়ারের ব্যাচ , ইংলিশে অনার্স। চটকদারি সুন্দরী নয় , একটা ক্লাসিক সৌন্দর্য আছে , তা খুঁটিয়ে দেখলে তবেই সেই সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। চোখে মুখে বুদ্ধিমত্তার ছাপ স্পষ্ট , মেয়েদের গ্ৰুপেই থাকে ক্লাস শেষে বেরিয়ে যায় , নাম সুস্মিতা। তাই একটা সুযোগের খুব দরকার , সাহসী মন নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে । কমন রুমে হবে না , লাইব্রেরীতে ! ক্যান্টিনে দেখা হতে পারে কি ! অথবা কলেজে ঢোকার আগে কিংবা পরে ! এরকম যতই ভাবছে , ততই ঘামছে সুপ্রিয়। এখন কেবলই অপেক্ষা। কোথায় যেন শুনেছিল প্রেমে ধৈর্য্য আর লেগে থাকাটা দুটোরই ভীষণ প্রয়োজন। প্রেম সাধনার, অবশেষে সেই সুযোগ আসে একদিন । ফেব্রুয়ারী মাস ভালোবাসার মাস । সুস্মিতা লাইব্রেরীতে বইয়ের পাতায় স্থির চোখে মগ্ন । আলমারি থেকে সুপ্রিয় একটা বই হাতে নিয়ে বসে ঠিক তার পাশে । খোলা বইয়ের পাতা ওল্টায় , অথচ বইয়ের পাতা খোলাই থাকে , সমস্ত দৃষ্টি গিয়ে পড়ে সুস্মিতারই ওপর । এভাবেই কেটে যায় বেশ কিছুটা সময় । কি ভাবে শুরু করবে সে !
না , আগ বাড়িয়ে শুরু করতে হলো না তাকে । একসময় সুস্মিতাই চোখ তুলে জিঞ্জেস করে , কি পড়ছো ?
সুপ্রিয় , সুস্মিতার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে নিয়ে বলে , শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ। এরপরই জিঞ্জেস করে এখন তোমার ক্লাস নেই !
সুস্মিতার সংক্ষিপ্ত উত্তর , না। একসময় জড়তা কাটিয়ে সুপ্রিয়ই পড়াশোনা সহ টুকিটাকি নানান কথা বার্তা বলতে শুরু করে , একটা সাবলীলতা আসে । পাশাপাশি অদ্ভুত একটা ভালোলাগা তৈরি হয় , সেটা বোধহয় দু তরফেই। একসময় জিঞ্জেস করে সুপ্রিয় , লাইব্রেরীতে কতক্ষণ থাকবে !
থাকছি , ক্লাস তো নেই এখন , বলে সুস্মিতা । কেন বলো তো !
না , এমনি জিঞ্জেস করলাম। আসছি এখুনি বলে বেরিয়ে যায় সুপ্রিয়।
বাজার লাগোয়া ফুলের দোকানে গোলাপ কুঁড়ি গুলো বেশ টাটকা , পাতাও বোঁটা সহযোগে তারই বেশ কয়েকটা নিয়ে গোছা করে দেয় দোকানি , সাথে নেয় একটা ক্যটবেরি । এসে দেখে লাইব্রেরীতে সুস্মিতা তখনো বইয়ের পাতায় চোখ রেখে স্থির । এরপর অপার ভালোলাগার মধ্য দিয়ে কিছুটা দ্বিধা ও দ্বন্দের মধ্যেই গোলাপের গোছাটা সুস্মিতার দিকে বাড়িয়ে দেয় সুপ্রিয়। আকস্মিক সেই ঘটনায় ঘাবড়ে যায় সুস্মিতা, ঠিক প্রস্তুত ছিলো না সে । পরে সামলে নিয়ে বলে কি ব্যাপার ? এসব কেন ! ছাড়ার পাত্র নয় সুপ্রিয়, ব্যাপারটা হালকা করে নিয়ে বলে , না না তেমন কিছু নয় । আসলে প্রতিদিন দেখা হলেও , কথা হয় নি । আজ আমাদের সেই কথা বলার সুচনার দিন ভাবতে পারো । ধরে নাও এটা তারই উদযাপন । একটা মিষ্টি হাসির রোল প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো প্রায় শুন্য লাইব্রেরীতে। পরে বলে সুস্মিতা , তা বেশ মজার ব্যাপার তো ! কিন্তু তোমাকে দেখলে বেশ বোকা বোকাই মনে হয় , কিন্তু ভালোবাসার পাঠটা ভালোই বোঝো দেখছি । সুপ্রিয় খানিক লজ্জাই পায় , কিন্তু তার সংকোচ ভাবটা কেটে গেছে এখন। বলে পাঠ নেওয়া আর হলো কই! প্রেমের কি কোন পাঠশালা থাকে ! এ ব্যাপারে আমি বরাবরই কাঁচা। প্রেম করতে গিয়ে যদি প্রেমিক হতে পারি , সেই আশাতেই বলতে পারো । সুস্মিতার এবারের হাসিটা অনেকটা উচ্ছ্বাস ও সুরেলা মনে হলো সুপ্রিয়র। সুস্মিতা বলে ওঠে যা দেখছি তুমি শুধুই প্রেমিক নও , রসিক প্রেমিক। একসময় সুস্মিতা ও হাতটা বাড়িয়ে দেয় , গোলাপ গোছার দিকে । পোজ দেওয়ার মতো করে বেশ কিছুক্ষণ চার হাতের মাঝে ধরা থাকে গোলাপের সেই গোছা, সুপ্রিয় নিজের অজান্তেই কখন যেন নতজানু হয়ে পড়েছে সুস্মিতার কাছে , অন্য হাতে ধরা ক্যাটবেরি। পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে দুজন , সেই মুহুর্তে যেন কেউ তাদের সেই ছবি মোবাইলে ক্যামেরা বন্দী করছে ।
গল্পকার সনৎ ঘোষ
খালোড় বাগনান হাওড়া ৭১১৩০৩
ফোন / হোয়াটসঅ্যাপ ৯২৩২৬০৬৩৯৫

Comments
Post a Comment