১৪ই ফেব্রুয়ারি: আত্মার সেই শাশ্বত বিরহ-মিলনের স্মরণে
স্নেহা ঘণ্টেশ্বরী
চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি আজ লৌকিক উৎসবে মত্ত, পণ্য-প্রেমের উল্লাসে,
অথচ মহাকাল থমকে আছে বৃন্দাবনের সেই নিভৃত দীর্ঘশ্বাসে।
যেখানে কৃষ্ণ নিছক কোনো নাম নয়, এক অসীম শূন্যতার হাহাকার,
আর রাধা—সেই শূন্যতাকে পূর্ণ করা এক অবিনশ্বর অঙ্গীকার।
রাধা তো দেহাতীত এক চেতনার নাম, ত্যাগের চরম শিখরে যার স্থিতি,
যিনি জানতেন, মিলন মানেই সমাপ্তি, আর বিরহেই অমর হয় গীতি।
আজকের যুগে 'পাওয়া' মানেই যখন প্রেমের একমাত্র সংজ্ঞা ও মান,
রাধা তখন অপ্রাপ্তির দহনে শোধিত করেন তাঁর হৃদয়ের অমল প্রাণ।
অধরা কালাচাঁদ অগম্য সুদূর—সে যে মহাবিশ্বের সেই বাঁশির সুর,
রাধিকা সেই তৃষিত চেতনা, যার নিত্য অভিসার দহন-মধুর।
বাস্তবতা এখানে বড় রুক্ষ, যেখানে শরীরী মোহকেই ভাবি ভালোবাসা,
অথচ নিরাকার সেই প্রেমের কাছে তুচ্ছ সকল পার্থিব যাওয়া-আসা।
কেন তবে এই না-পাওয়ার হাহাকার? কেন এই বিচ্ছেদের কালজয়ী গান?
কারণ, অপ্রাপ্তিই তো আত্মার তৃষ্ণা বাড়ায়, ত্যাগে আসে দিব্য জ্ঞান।
রাধা আর কৃষ্ণ—দুটি তনু, এক প্রাণ; মাঝে ব্যবধান শুধু এক জন্মের,
এই বিচ্ছেদই তো প্রমাণ দেয়, প্রেম কোনো দাস নয় কোনো নিয়মের।
এই অলীক সময়ের উৎসবে আসুক সেই রাধা-ভাবের গাম্ভীর্য নেমে,
শরীর ছাড়িয়ে আত্মা হারাক এক আধ্যাত্মিক, নীল বর্ণহীন প্রেমে।
মিলন তো কেবল ক্ষণিকের তৃপ্তি, বিরহ এক অনন্ত উপাসনা—
রাধা শিখিয়েছিলেন, ঈশ্বরকে পেতে হলে দেহজ মোহ ত্যাজ্য করা।
শরৎ-শশী সম প্রেম থাক ধ্রুবতারার ন্যায় নিশ্চল ও অচঞ্চল,
কৃষ্ণ-প্রাপ্তি নয়, কৃষ্ণত্বে বিলুপ্তিই যেখানে প্রেমের শ্রেষ্ঠ প্রতিফল।
১৪ই ফেব্রুয়ারি: পরনির্ভরশীলতার অবসান হোক, উৎসব হোক আত্মানুসন্ধানের
স্নেহা ঘণ্টেশ্বরী
চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি আজ লৌকিক মোহে অন্ধ, মরীচিকার পিছে ছোটে ভিড়,
অন্যের হৃদয়ে নীড় খুঁজতে গিয়ে, আমরা কি হারাইনি নিজের মন্দির?
যুগান্তরের সহস্র রাত তো কেটেছে পরের তরে দীর্ঘশ্বাসের মিছিলে,
আজকের দিনটা না হয় তোলা থাক—নিজেকেই নতুন করে চিনে নেব বলে।
কার হাতে গোলাপ খুঁজছ বন্ধু? কার চোখের তারায় খুঁজছ নিজের অস্তিত্ব?
আয়নার ওপারে যে দাঁড়িয়ে, তারই তো ছিল এ প্রাণের সবটুকু রাজত্ব।
পরের দেওয়া মূল্যায়নে কেন তবে নিজেকে হারানো প্রতিদিন?
আজকের ভ্যালেন্টাইন হোক আমার—নিজেকেই অর্ঘ্য দেব আমি চিরদিন।
কত শত বসন্ত বিসর্জন দিয়েছি পরের তরে, সয়েছি কতশত অবহেলা,
নিজের মেরুদণ্ড ভেঙে গড়েছি অন্যের প্রাসাদ, এ তো এক বড় নিষ্ঠুর খেলা।
আজ না হয় নিজের ক্ষতের ওপর নিজেই জাগাই এক অমর প্রশান্তি,
রৌদ্রতপ্ত এই মরুপথে আমিই আমার পরম শীতল বটবৃক্ষের ছায়া।
প্রেম কি কেবল অন্য তনুতে বিলীন হওয়া? না কি নিজেরে চেনার এক ব্রত?
আমিই তো আমার শ্রেষ্ঠ প্রণয়ী, এ সত্য কেন মানি না নিজের মনের মতো?
আজকের এই উৎসবের চপলতা ধুয়ে মুছে যাক আমারই আত্মবিশ্বাসের বানে,
আমিই আমার গন্তব্য, আমিই সুর খুঁজে পাই আমারই নির্জনতার গানে।
অন্যের জন্য তো জীবনভর সঞ্চিত থাকে সহস্র ত্যাগের করুণ উপাখ্যান,
আজকের দিনটা সঁপে দিই নিজের তরে, গাহি নিজেরই সত্তার জয়গান।
আমিই আমার ধ্রুবতারা, আমিই আমার তরী, আমিই আমার অসীম আকাশ,
নিজেকে চেনার এই মহাপ্রয়াণে, আমিই না হয় হই আমার পরম অবিনাশ।
২১শে ফেব্রুয়ারি: দেশাতীত, কালজয়ী এক বিশ্ব-সম্প্রীতির স্মরণে
স্নেহা ঘণ্টেশ্বরী
না কি বিশ্বজনীন চেতনার গহিনে এক অবিনশ্বর প্রাণের সন্ধান?
মাতৃভাষা তো কোনো ভৌগোলিক সীমানা নয়, নয় কোনো রাজকীয় ফরমান,
সে তো অস্তিত্বের আদিম মন্ত্র—প্রাণের স্পন্দনে যার শাশ্বত অধিষ্ঠান।
আমার বাংলা যদি হয় আমার চৈতন্যের এক অনন্ত নীল আকাশ,
তবে পরজাত বুলিও তো অন্য কারো সত্তার নিগূঢ় নির্যাস।
কেউ বলে 'মা', কেউ 'আম্মা', কেউবা 'মাদার'—শব্দে আছে ভিন্নতর তান,
অথচ প্রতিটি ডাকের গভীরেই সুপ্ত থাকে সেই একই আদিম ঘ্রাণ।
কেন তবে শ্রেষ্ঠত্বের আস্ফালন? কেন ভাষার নামে এই রক্তপাত?
সৃষ্টিকর্তা তো প্রতিটি বুলিকেই দিয়েছিলেন আপন মহিমার আশীর্বাদ।
প্রতিটি মরে যাওয়া উপভাষা, প্রতিটি প্রান্তিক বর্ণমালার ক্রন্দন—
মহাকালের কাছে তারা সবাই তো এক একটি অমূল্য রত্ন-বন্ধন।
যেদিন রাজপথ সিক্ত হলো লোহিত ধারায়, উত্তরসূরিদের প্রাণের অধিকারে,
সে তো ছিল রুদ্ধ বাকশক্তির এক মহাজাগরণ—অস্তিত্ব রক্ষার শাশ্বত হুঙ্কারে।
সেই সংগ্রাম কেবল বাংলার ছিল না, ছিল প্রতিটি অবদমিত কণ্ঠস্বরের,
যাতে কেউ আর দাস না থাকে কোনো জোর করে চাপিয়ে দেওয়া অক্ষরের।
একুশে ফেব্রুয়ারি আজ হোক সেই পবিত্র শপথের এক মিলন মেলা,
যেখানে ভাষিক বৈচিত্র্য হবে শাশ্বত ধ্রুবতারা, না মানিবে কোনো কৃত্রিম অবহেলা।
আমার ভাষার আভিজাত্য যেন অন্যের ভাষাকে না করে কভু ছোট,
পৃথিবীর সব ভাষাই তো এক অখণ্ড মৌন থেকে বিচ্ছুরিত ভিন্ন ভিন্ন জ্যোতি।
সালাম জানাই সেই সব অক্ষরকে, যারা মানুষের শিকড় চিনে রাখে,
বিনম্র প্রণাম জানাই সেই সব সুরকে, যারা ঘরছাড়া মানুষকে ঘরে ডাকে।
একুশ মানেই তো স্বকীয়তার দীপ জ্বেলে, পরকেও আপন আলোয় করা বরণ,
বিশ্বের প্রতিটি ভাষাই হোক মহাকালের বুকে এক একটি অমর সংস্করণ।
=================
sneha-ghanteswari, Joykrishnapur, Arambagh, Hooghly
8927926358


Comments
Post a Comment