✍️ শিবাশিস মুখার্জী
১
আমার স্ত্রীর শহর ছিল লখনউ। লখনউই ওর বেড়ে ওঠার মাটি, ওর ভাবনার ভাষা, ওর নিঃশ্বাসের শহর।
আমি যখন প্রথম ওর গল্প শুনি, তখন বুঝিনি যে
একটা শহর কীভাবে একজন মানুষকে এত গভীরভাবে গড়ে তুলতে পারে।
আমার স্ত্রীর চোখে আমি প্রায়ই চারটে শহর দেখি।
চারটে নদী, চারটে ঋতু, চারটে ভাষা।
দারভাঙ্গা, ঝাঁসি, লখনউ, আর শেষে কলকাতা।
বাইরের মানুষ হয়তো কেবল মানচিত্রে রেখা টেনে
এই নামগুলোকে আলাদা করে রাখে, কিন্তু ওর ভেতরে কোনও শহরের দেয়াল নেই — সবকিছু একসঙ্গে বয়ে চলে, যেন কোনও প্রাচীন নদীর ডেল্টা।
দারভাঙ্গা তার শৈশব। ওর প্রথম হাঁটার শব্দ, প্রথম বৃষ্টিভেজা দুপুর। ওর কণ্ঠে যখন আমি সেই সময়ের গল্প শুনি, মনে হয় শহরটা যেন সবসময় কুয়াশার ভেতর ডুবে আছে। সব মিলিয়ে দারভাঙ্গা যেন এক অস্পষ্ট প্রস্তাবনা। ও বলত,
"সেই শহরে কোনও তাড়াহুড়ো ছিল না।
মানুষ যেন সময়ের সঙ্গে বসবাস করত,
সময়কে পেছনে ফেলে নয়।"
কিন্তু খুব ছোটবেলাতেই ওর পরিবার চলে আসে ঝাঁসি। শহরটা ছিল কঠিন।পাথরের দেয়াল, লাল মাটির দুর্গ, আর ইতিহাসের ভার যেন সবসময় কাঁধে চেপে বসে আছে।ঝাঁসি মানেই রানির লড়াই, তলোয়ারের ঝনঝনানি,শক্তির কিংবদন্তি।
ওর কিশোরবেলার ভাষায় তখন শক্ত একটা সুর চলে এল। দারভাঙ্গার সরল মিঠে মৈথিলীর সঙ্গে মিশে গেল ঝাঁসির হিন্দি উচ্চারণ। ও বলত, "ঝাঁসি আমাকে দাঁড়াতে শিখিয়েছিল, যখন সবকিছু ভেঙে পড়ছিল।"
কিন্তু জীবন থেমে থাকেনি। তারপর এলো লখনউ।
এই শহরটাই আমার কাছে সবচেয়ে জটিল, সবচেয়ে নরম, সবচেয়ে গভীর রহস্যে ভরা। আমাদের বিয়ের পর প্রথমবার যেদিন আমি লখনউ গিয়েছিলাম, চারবাগ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে নামতেই মনে হল আমি কোনও শহরে নই, বরং এক পুরনো কবিতার পাতায় পা দিয়েছি।
লখনউর বাতাসে যেন একটা ধীরে বয়ে যাওয়া ছন্দ।
এখানে কথার মধ্যেই নরম সিল্কের পরশ, শিষ্টতার ভেতরে লুকিয়ে থাকে হাহাকার, গলির কোণে এখনো ঝুলে থাকে বাইজি সংস্কৃতির শেষ প্রদীপ। আমিনাবাদের ভিড়,
চিকনকারির শাড়ির দোকান,
রাতের হাজরতগঞ্জের আলো —
সবই যেন একসঙ্গে বাস্তব আর স্বপ্ন।
কিন্তু ওর জীবনের আসল বাঁকটা এসেছিল লখনউতে। লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার দিনটার কথা ও প্রায়ই আমাকে বলেছে। তখনও লখনউ ওর কাছে শুধু একটা 'শহর' ছিল, কিন্তু গোমতী নদীর পাশ দিয়ে যখন প্রথমবার শহরে প্রবেশ করল, ও বুঝেছিল, এখানে ইতিহাস শুধু বইয়ে লেখা নেই — এখানে ইতিহাস বাতাসে মিশে আছে। পুরনো হেরিটেজ বিল্ডিং, ফিকে সাদা কুলুঙ্গিতে ঝুলে থাকা আলো, ইমামবাড়ার সবুজ গম্বুজ, আমিনাবাদের ছোট ছোট অলিগলি, চকের বাজারে মসলা পেষার শব্দ, হাজরতগঞ্জের ব্যস্ততা, নিশাতগঞ্জের নীরব রাত — সব মিলিয়ে লখনউ যেন একটা বিশাল গল্পের বই, যেখানে প্রতিটি মোড়ে নতুন একটা পৃষ্ঠা।
লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ে অরুণিমা সমাজতত্ত্ব পড়ত আর একটা আলাদা কৌতূহল গড়ে উঠেছিল আমাদের মধ্যে— মানুষের আচরণ, সম্পর্কের ভাঙাগড়া, শহরের ভাষার ভিন্নতা — সবকিছু। এই শহরে সমাজকে পড়া যায় দু'ভাবে — ক্লাসরুমে আর ফুটপাথে। ফুটপাথের পাশে বসা পুরনো গজলশিল্পীরা, নুক্কড়ের চায়ের দোকান, স্টেশনের কুলির ভিড়, আমিনাবাদের শাড়ির দোকানের দরদাম — সবকিছুই ওর কাছে ছিল সমাজতত্ত্বের পাঠ্যবই।
লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের পর ওর জীবনে এল আইটি কলেজে পড়ানোর।
সেই কলেজের করিডরে ও শিক্ষকতা শুরু করে।
ওর ছাত্ররা প্রায়ই হিন্দি মিশিয়ে ইংরেজি বলত,
আর ওর মাতৃভাষা বাংলা উচ্চারণ। তাদের কাছে ছিল এক ধরনের রহস্য। ভাষার এই পার্থক্য
আমার স্ত্রীর জীবনে একটা বড় শিক্ষা ছিল। আমি জানতাম একটা শহরকে বোঝার জন্য ওর ভাষা শেখা লাগে না, শুধু ওর শব্দগুলোর ভেতরে কীভাবে মানুষ বাঁচে সেটা দেখতে হয়।"
আমার বিয়ের পর প্রথমবার যখন লখনউ গেলাম,
ট্রেন পৌঁছল চারবাগ স্টেশনে। রাত তখন নামছে ধীরে ধীরে, স্টেশনের লাল ইটের দেওয়াল পুরনো কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আমার মনে হচ্ছিল
আমি যেন কোনও সিনেমার সেটে নেমেছি।
ও আমার হাত ধরে বলল, "এই শহরটা তোমাকে আমি আলাদা করে দেখাব।"
একদিন সন্ধ্যায় আমাকে নিয়ে গিয়েছিল ভাতখান্ডে সঙ্গীত বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে এক প্রবীণ উস্তাদ
হারমোনিয়ামে গজল গাইছিলেন। বলেছিল,
"তুমি জানো, এখানে গজল মানে শুধু সঙ্গীত নয়,
এটা একটা জীবনদর্শন।"
পরের দিন আমরা বের হলাম আমিনাবাদের ভিড়ভাট্টা দিয়ে। রাস্তার এক পাশে পুরনো টিনের চালের দোকান, পাশে মসলা মিশিয়ে রাখার ধোঁয়া,
আর বাতাসে ভাসছে লখনউর ইতিহাসের গন্ধ।
আমি আর আমার স্ত্রী তখন হেঁটে যাচ্ছিলাম লখনউয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত তুন্দে বিরিয়ানির দোকানের দিকে। দোকানের বাইরে সারি—লোকেরা দাঁড়িয়ে, চেয়ার খুঁজে, টেবিলে বসে, বিরিয়ানি খাচ্ছে। শহরের শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল কৌতূহল, আনন্দ, আর ক্ষণিকের নীরবতা।
আমার স্ত্রী বলল, "দেখছো, লখনউ মানে শুধু বাজার নয়, শব্দ নয়, মানুষ নয়— লখনউ মানে তুন্দে বিরিয়ানি। একবার চেখে দেখলে বুঝতে পারবে,
এই শহরের স্বাদও ইতিহাসের মতো গভীর।"
দোকানের ভিতরে ঢুকেই ধোঁয়া, মশলার সুবাস, গরম বিরিয়ানির ধোঁয়া আমাদের মুখে এসে লেগে যায়। আমরা টেবিলে বসি, চামচ দিয়ে বিরিয়ানি মুখে ফেলি। এই মুহূর্তে আমি বুঝি, শহর, খাবার, মানুষ, ইতিহাস— সব মিলেই একজন মানুষের ভেতরের জীবনচক্র তৈরি করে।
এই পুরোনো দোকানে বসে দেখলাম কলকাতার বিরিয়ানির মতো এখানে আলু নেই। স্ত্রী হাসল, "তুমি ভাবছ, আলু না দিলে বিরিয়ানি হয় না?" আমি চুপচাপ মাথা নাড়লাম। তখন সে বলল, "এটাই তো লখনৌ। এখানে প্রতিটি গন্ধ, প্রতিটি স্বাদ, প্রতিটি ছোঁয়া অন্যভাবে শেখায়। নতুনকে গ্রহণ করা, পুরনোকে ছেড়ে দেওয়া।"
আমার শ্বশুরবাড়ি ডালিগঞ্জ।
প্রথমবার সেখানে গিয়ে যা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে,
তা হল আঙিনার ভিজে মাটির গন্ধ আর বেড়াল পট্টি। ছোট্ট, ছোপছোপ, লাল-ধূসর একদল বেড়াল।
তারা ছিল লখনউর অলিগলির মতোই ধীর, নিজের গতি অনুযায়ী চলত, কেউ না দেখলেও সে সবকিছু জানত। প্রথম দিনেই আমাকে চেনার চেষ্টা করল। ওদের চোখে ছিল এক অদ্ভুত দার্শনিক ভ্রাম্যমাণ দৃষ্টি। মাথা টিপে ঘুরে বেড়ানো, আমার জুতোতে ঘষে ঘষে কেবল অভ্যর্থনা, আর কখনও কখনও জানালার পাশে বসে নীরবভাবে বাইরে তাকানো — মনে হতো তারা শহরের অতীত আর বর্তমানকে একসাথে ধরতে চাচ্ছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছিল দম বিরিয়ানির ধোঁয়া, আর টেবিলে সাজানো ছিল শিরমালের রুটি।
রাতের খাওয়ার পর ছাদে উঠে গিয়ে আমরা দু'জনে বসেছিলাম। গোমতী নদীর হাওয়া দূরে বয়ে যাচ্ছিল,
আর আকাশে টিমটিমে তারা। ও তখন গল্প করছিল
লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনের, আইটি কলেজের ছাত্রদের, আর আমিনাবাদের ঠাসা বাজারের। আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন ওর ভেতরে গোপনে শহরের প্রতিটি কোণ দেখছি।
পরের দিন ও আমাকে নিয়ে গেল ইমামবাড়া।
দেয়ালের নকশা, প্রতিটি খিলান, আর সেই ভৌলভুলাইয়া করিডর — সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল
ইতিহাস এখনও নিঃশ্বাস নিচ্ছে। হয়তো নিজের শহরের গোপন সৌন্দর্য প্রিয়জনকে দেখানোর মধ্যে
একটা ব্যক্তিগত পরিতৃপ্তি থাকে।
বিকেলে আমরা গিয়েছিলাম হাজরতগঞ্জ,যেখানে রঙিন আলোয় ঢাকা দোকানপাট, বইয়ের দোকানের ধুলো গন্ধ, চায়ের দোকানে আর কুলফি, চাট আর রংবেরঙের দোকান।
সন্ধ্যায় ও আমাকে নিয়ে গেল রামকৃষ্ণ মঠে।
সেখানে প্রার্থনার ঘণ্টার ধ্বনি ও গোমতীর হাওয়া একসাথে মিশে যাচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছিল,
এই শহর শুধু মুসলিম কবি আর নবাবি ইতিহাসে নয়,
এই শহরের আকাশে বহু দর্শন পাশাপাশি বেঁচে আছে।
লখনউতে কাটানো দিনগুলো আমাকে অদ্ভুতভাবে বদলে দিয়েছিল। আমি শিখেছিলাম শহরকে বোঝা মানে তার অলিগলির ভাষা শোনা, তার বাজারের কোলাহলে কান পাতানো, তার নিঃশব্দ রাতের ভেতর
নিজেকে একবার নতুন করে খুঁজে পাওয়া।
আমার স্ত্রী একদিন বলেছিল, "শহর আসলে মানুষের মতো, ওরও একটা স্মৃতি আছে, ওরও একটা নীরবতা আছে।" আমি তখন ওর মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম আর মনে হয়েছিল, ও শুধু লখনউতে থাকেনি, ও লখনউ হয়ে গেছে।
আমরা কলকাতায় থাকি, কিন্তু কখনও কখনও যখন ও গজল গুনগুন করে, বা চুপচাপ নিশ্বাস ফেলে আমিনাবাদের অলিগলির কথা ভাবে, আমার মনে হয় লখনউ এখনও আমাদের ঘরে আছে। তার গন্ধে, তার সুরে, তার অন্তহীন ইতিহাসে।
২
কলকাতার সকাল। জানলার কাচে জমে থাকা আলোয় শহরটাকে দূর থেকে দেখতে ইচ্ছে করে। রাস্তায় তীব্র কোলাহল, অথচ ভেতরে কোথাও এক অদ্ভুত নীরবতা। চায়ের দোকানের ধোঁয়া, বাসের হর্ন, বইয়ের ব্যাগ কাঁধে ছুটে চলা ছাত্রছাত্রীরা—সবকিছু প্রতিদিনের মতো এক অদৃশ্য ছন্দে বাঁধা। কিন্তু সেই ছন্দের ফাঁকেই লুকিয়ে থাকে কিছু অশ্রুত শব্দ, কিছু অদেখা মুহূর্ত, যা কেবল অন্তর্গত মনে বাজে।
আমার জীবনও এই শহরের মতো—কোলাহলের ভেতরেই নীরবতার বাস। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই আমি। সকাল থেকে দুপুর, একের পর এক ক্লাস, ছাত্রছাত্রীদের ভিড়, তাদের প্রশ্ন, তাদের অজস্র সম্ভাবনা—মনে হয় সময়টা যেন অন্য কারও জন্য বয়ে যাচ্ছে। অথচ আমার ভেতরে থাকে এক অন্তহীন নিঃশব্দ নদী। আমি কথা বলি, অথচ নীরব থাকি।
আমরা এখন কলকাতায় থাকি। শহরের চেনা ভিড়, লাল-সবুজ আলো, রাস্তার ধারে সারিবদ্ধ গাছ, ফুটপাতের দোকান, বইপত্র, পথের ধুলো—সবই আমাদের প্রতিদিনের অংশ। আমার স্ত্রীর জীবন আমার থেকে একেবারে আলাদা। হারমোনিয়ামের রিড এ আঙুল ছোঁয়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ছোট্ট ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়ে অন্য এক আলো। ওর গলায় যে গান ধ্বনিত হয়, তা কেবল সুর নয়, এক ধরনের মুক্তি। আমি পাশের ঘরে বসে নোটস লিখি, তবু মনে হয়—তার গানের ভেতরেই আমার নিঃশব্দ সময় বেঁচে থাকে।
আমার স্ত্রীর পৃথিবী আমার থেকে বহুগুণ রঙিন। গান শেখা, ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ছোটখাটো বেড়াতে যাওয়া—তার প্রতিটি দিনই নতুন। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ের প্রতি ওর এক অদ্ভুত টান। প্রায়ই বলে, "যদি একদিন পাহাড়ের কোলে থাকতে পারতাম! সকালের কুয়াশা, চা-বাগানের গন্ধ, নিস্তব্ধতার ভেতরে গান গাইতাম।"
আমি শুনি। কিছু বলি না। ও জানে না, তার এই অসম্পূর্ণ স্বপ্নের প্রতিটি রেখা আমার হৃদয়ে নীরবে জমা হয়।
আমাদের বাড়ি চুঁচুড়ায়। গঙ্গার ধারে সেই পুরনো বাড়ি, যেখানে শৈশবের প্রতিটি দুপুর আজও নীরবতার মতো ঝুলে আছে। নদীর ঘাটে বসে জলস্রোত দেখা, পাড়ার গলিতে ক্রিকেট খেলা, বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় ভিজে ফেরা—সবকিছু আজও ভেতরে কোথাও জীবন্ত। কলকাতার এই কোলাহলে থেকেও আমি প্রতিদিন চুঁচুড়ার সেই ঘাটে ফিরে যাই। কখনও স্ত্রীকে বলি না। বলা যায় না, কারণ কিছু স্মৃতি শব্দ সহ্য করতে পারে না।
আমাদের সম্পর্কে আছে নীরবতা, আবার আছে গোপন উষ্ণতা। কখনও আমরা ঝগড়া করি—তুচ্ছ কারণ, সামান্য ভুল বোঝাবুঝি। কিন্তু প্রতিবারই আমরা জানি, সেই ঝগড়ার নিচে আছে এক গোপন প্রবাহ, যা কখনও থামে না। রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে আমরা দু'জনেই চুপচাপ খাই। মনে হয়, আমাদের প্রেমের ভাষা এই নীরব সুরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
আমার স্ত্রী ভক্ত হনুমানজির। প্রতিদিন সকালে রাম নাম লেখে। একটার পর একটা নাম, পাতার পর পাতা। ওর বিশ্বাসের ভেতরে আমি দাঁড়িয়ে থাকি, দূর থেকে দেখি। আমার বিশ্বাস আলাদা, কিন্তু তার ভক্তির ভেতর দিয়ে আমি নিজের নীরব প্রার্থনা খুঁজে পাই। মনে হয়, জীবনের সমস্ত ক্লান্তি, দুঃখ, আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুই এই রাম নামের ভেতরে আশ্রয় নেয়।
মাঝে মাঝে আমরা চন্দননগরে যাই। শ্বশুরবাড়ির পুরনো বাড়ি, গঙ্গার ধারের আলো, ফরাসি কলোনির নিস্তব্ধতা—সবকিছুই অন্য এক আবহ তৈরি করে। স্ত্রী চন্দননগরে গেলেই যেন নতুন মানুষ হয়ে ওঠে। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করে পুরনো দিনের স্মৃতি রঙিন করে। আমি পাশে বসে দেখি। মনে হয়, আমাদের সম্পর্কের অদেখা শিকড়গুলোও এখানে কোথাও লুকিয়ে আছে।
আমাদের সংসারে বড় কোনও চমক নেই, নেই নাটক। আমাদের প্রেম বেঁচে থাকে ছোট ছোট মুহূর্তে। সকালের একসঙ্গে চা খাওয়া, বইয়ের পাতায় আঙুল ছোঁয়ানো, সন্ধ্যায় হারমোনিয়ামের সুর, কিংবা ঝগড়ার পর নীরব হাসি—এসবই আমাদের অনুচ্চারিত ভাষা।
রাতে, শহর ঘুমিয়ে গেলে, আমি বারান্দায় বসে থাকি। দূরে আলো ঝলমল করে, হাওয়ার মধ্যে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। স্ত্রী এসে পাশে বসে, কিছু বলে না। সেই নীরবতার মধ্যে আমি শুনি—চুঁচুড়ার গঙ্গার জল, উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি বাতাস, ছাত্রছাত্রীদের স্বপ্ন, তার গানের সুর—সবকিছু এক নদীর মতো মিশে যায়।
কোনো এক রাত, বারান্দায় বসে আমি ভাবি, আমাদের জীবন যেন এক বহুমাত্রিক নদী। তার ভেতরে প্রতিটি স্মৃতি, প্রত্যেকটি প্রত্যাশা, প্রতিটি অনুভূতি—সবকিছু একসাথে বয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রেমের কোনো উচ্চারণ নেই, তবু তার গভীরতা সীমাহীন। আমরা বেঁচে আছি সম্ভাবনার ভেতরে। যেমন কবি এমিলি ডিকেনসন বলেছেন "I dwell with possibility"। নীরবতা আমাদের আশ্রয়, গান আমাদের সেতু, বিশ্বাস আমাদের আলো। সময় বয়ে যায়। নদী বদলায়, ঋতু পাল্টায়। তবু কিছু সম্পর্ক নদীর তলদেশের মতো—চোখে দেখা যায় না, তবু সমস্ত প্রবাহকে বহন করে। আমাদের সম্পর্কও ঠিক তেমন।
যা বলা হয়নি,
যা গোপন,
যা নীরব—
তার ভেতরেই বাস করে এক অদৃশ্য প্রেম,
যা শব্দ ছাড়িয়ে যায়,
যা সময়েরও ঊর্ধ্বে।
রাত্রির শেষ প্রান্তে, আমি জানি—আমাদের নিঃশব্দ নদী কোনোদিন থামবে না। সম্ভাবনার প্রতিটি ঢেউ, প্রত্যেকটি গোপন স্বপ্ন, প্রত্যেকটি অচেনা স্মৃতি—সব মিলিয়ে আমাদের জীবনের নীরব, রঙিন ছন্দ তৈরি করছে।
এটাই আমাদের প্রেম, আমাদের জীবন, আমাদের "সম্ভাবনার নদী"।
৩
কিছু সম্পর্ক কখনও শেষ হয় না। মানুষ হারিয়ে যায়, ঘর বদলে যায়, শহর পাল্টে যায়, কিন্তু কিছু সুর, কিছু গন্ধ, কিছু দৃষ্টি — আমাদের মধ্যে থেকে যায়। আমি যতই সময়ের স্রোতে ভেসে যাই, ততই বুঝি, জীবনের গভীরে লুকিয়ে থাকা স্মৃতিরা একদিনও পুরোনো হয় না।
আমার শ্বশুরমশাই ছিলেন এক অদ্ভুত মানুষ। তার ভেতরে যে রকম সংযম, সেই রকম দৃঢ়তা, সেই রকম মানবিকতা — আজকের দিনে খুঁজে পাওয়া কঠিন। আমাকে প্রথম দেখাতেই খুব পছন্দ করেছিলেন। বলেছিলেন, "জীবনে ভরসা রাখবে নিজের পরিশ্রমের ওপর। ভরসা রাখবে জ্ঞানের ওপর। সব হারালেও এ দুটো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।"
আমার জীবনে কোনো একটা সময়ে অনিশ্চয়তা ছিল। বাইশ বছর বয়সে বাবা চলে গিয়েছিলেন। সেই অভাব, সেই শূন্যতা আমার ভেতরে আজও রয়ে গেছে। কিন্তু শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে কাটানো সময়গুলো আমাকে শিখিয়েছিল — মানুষের আসল শক্তি তার মূল্যবোধে। তিনি সংসারকে, সম্পর্ককে, ভালোবাসাকে, দায়িত্বকে যেভাবে বাঁচাতেন, তা যেন এক নিঃশব্দ শিক্ষার মতো।
শাশুড়িমা ছিলেন ভিন্ন স্বভাবের। নিতান্ত সংসারী মানুষ, কিন্তু তার গানের সুর ছিল যেন অন্য জগতের। এক রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে শুরু করলেই ঘরের মধ্যে এক আশ্চর্য নীরবতা নেমে আসত। মনে হতো, সেই মুহূর্তে সময় থমকে গেছে। এখন তিনি নেই, কিন্তু মাঝে মাঝে সন্ধ্যাবেলায় হারমোনিয়ামের শব্দ কানে বাজে। মনে হয়, কেউ যেন পর্দার আড়াল থেকে ডাকছে।
আমাদের সংসার ছোট ছিল, কিন্তু তার ভেতরে ছিল সুর, ছিল আলো। শ্বশুরমশাইয়ের অনুপ্রেরণা, শাশুড়িমার সুর, স্ত্রীর হাসি, মেয়েদের ছোট ছোট দৌড়ঝাঁপ — সব মিলিয়ে জীবনের চলমানতা একটা ছন্দ তৈরি করেছিল। কিন্তু সময় কখনও থেমে থাকে না। একে একে সবাই চলে গেলেন। এখন সংসারে অনেক নতুন মানুষ এসেছে, নতুন গল্প, নতুন হাসি। তবু ভিতরের শূন্যতা কিছুতেই ভরে না।
আমার শালী দিল্লিতে থাকে। সরোদ বাজায়। তার আঙুলের ছোঁয়ায় সুরগুলো যে জন্ম নেয়, তাতে আছে স্মৃতি আর অভিমান, আলো আর অন্ধকার, ঘরে ফেরা আর হারিয়ে যাওয়ার মায়া। মাঝেমধ্যে যখন কলকাতায় আসে, আমাদের বাড়ি ভরে যায় সেই সুরে। আমি বসে শুনি। মনে হয়, কোনও অতীতের দরজা খুলে গেছে।
হঠাৎ মনে পড়ল লখনউ-এর সেই দিনগুলোর কথা। তখন প্রায়ই সেখানে যেতাম। সেই শহরের রাস্তাগুলো, পুরোনো বাড়িগুলোর ছায়া, বিকেলের গলিপথে জমে থাকা রোদ — সবকিছু আজও জীবন্ত। বিশেষ করে আমাদের বাড়ির সেই বেড়ালগুলো! তারা ছিল পরিবারেরই অংশ। ছোট ছোট চোখ, নিরীহ মুখ, কিন্তু ভীষণ দুষ্টু। কখনও জানালার ধারে বসে থাকত, কখনও অকারণে ঘরে ঢুকে পড়ত। খাওয়ার সময় প্লেট থেকে মাছের টুকরো চুরি করে নিয়ে যাওয়ার পরও রাগ করতে পারতাম না।
আর ছিল তুলতুল — আমাদের কুকুর। তাকে রাস্তা থেকে একদিন আমরা তুলে এনেছিলাম। মনে আছে, সেদিন ঠান্ডায় কাঁপছিল, চোখে অসহায়ত্ব। কোলে তুলে এনেছিলাম, ভেবেছিলাম হয়তো কয়েকদিন রাখব। কিন্তু তুলতুল থেকে গেল — চিরদিনের জন্য।
তুলতুল কেবল কুকুর ছিল না। আমাদের পরিবারের এক অদৃশ্য রক্ষক, এক অব্যক্ত ভাষার সঙ্গী। আমার মেয়েদের চারপাশে সে ছায়ার মতো ঘুরত। কেউ দরজায় এলে প্রথম তুলতুল ছুটে যেত। কখনও তার চোখে এমন এক নির্ভরতার দৃষ্টি দেখেছি, যা মানুষের চোখে খুঁজে পাইনি।
কিন্তু এখন সময় চলে গেছে। মেয়েরা বড় হয়েছে। সংসারের আলো ছায়া বদলেছে। শ্বশুরমশাই নেই, শাশুড়িমা নেই, তুলতুলও নেই। বেড়ালগুলোও একদিন হারিয়ে গেছে। লখনউ-এর সেই বাড়িটিও আর নেই। কিন্তু স্মৃতি বদলায় না। এই স্মৃতিগুলো আমার ভেতরে নীরব নদীর মতো বয়ে চলে। রাতে যখন শহর ঘুমিয়ে পড়ে, আমি বারান্দায় বসি। আকাশে তাকাই। দূরে আলো, হাওয়ার মধ্যে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। তখনই মনে পড়ে — জীবনে কত মানুষ এসেছে, কত মানুষ চলে গেছে, কত সুর থেমে গেছে, কত সুর বেজে উঠেছে। স্ত্রী পাশে এসে বসে। কিছু বলে না। আমি তাকিয়ে থাকি। আমাদের নীরবতা তখনও কথার চেয়ে গভীর। মনে হয়, আমাদের সমস্ত সম্পর্ক, সমস্ত ভালোবাসা, সমস্ত বেদনা, সমস্ত প্রার্থনা এই নীরবতার ভেতরে গোপনে আশ্রয় নিয়েছে।
আমি ভাবি, জীবন আসলে একটাই নদী। তার স্রোতে আছে হাসি, কান্না, সুর, অভিমান, বিশ্বাস, হারানো, পাওয়া, ভালোবাসা। আমরা কেবল ভেসে চলি। নদীর তলদেশে লুকিয়ে থাকে যে নীরব সত্য, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
কখনও স্ত্রীর গানের সুরে আমি শাশুড়িমার কণ্ঠ খুঁজে পাই। কখনও শ্বশুরমশাইয়ের উপদেশে ফিরে যাই নিজের বাবার কাছে। কখনও তুলতুলের স্মৃতিতে নিঃশব্দে হাসি। কখনও আবার সরোদের সুরে শালীকে দেখতে দেখতে মনে হয় — আমাদের জীবনটাই আসলে এক সঙ্গীত।
যা নেই, তার অভাব থেকে যায়। কিন্তু যা আছে, তার আলোয় আমরা টিকে থাকি। এই আলো, এই নীরবতা, এই সুর — এগুলোই আমাদের বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় ভাষা।
৪
জীবনের সমস্ত সম্পর্ক, স্মৃতি, ভালোবাসা — সবকিছু মিলেই যেন এক অদৃশ্য নদীর স্রোত। এই নদীর কোনও শুরু নেই, শেষও নেই। আমাদের প্রিয়জনেরা কেউ চলে যায়, কেউ আসে; কেউ সুরের ভেতরে বেঁচে থাকে, কেউ গন্ধের, কেউ এক টুকরো নিরবতার মধ্যে। তবু এই নদী থেমে থাকে না।
আমি যত বয়সে বড় হই, তত বুঝি — মানুষ আসলে তার হারানোদের দিয়েই তৈরি হয়। যাদের আমরা হারিয়েছি, যাদের স্পর্শ আজ আর নেই, যাদের কণ্ঠস্বর কেবলই স্মৃতির ভেতরে বেঁচে আছে — তারা-ই আমাদের ভিতরের নকশা তৈরি করে। আমার শ্বশুরমশাইয়ের মূল্যবোধ, শাশুড়িমার গান, সরোদের সুর, তুলতুলের নীরব ভালোবাসা — সব মিলেই আমরা যে মানুষ, তার ভিত্তি গড়ে উঠেছে।
সময় আমাদের শেখায়, স্থায়িত্ব বলে কিছু নেই, কেবল স্মৃতির পুনর্জন্ম আছে। প্রতিটি সম্পর্কেরও এক অদৃশ্য রূপান্তর ঘটে। যা হারিয়ে গেছে, তা হয়তো অন্যভাবে থেকে যায় — কোনও পুরোনো চিঠির গন্ধে, কোনও গানের সুরে, কোনও ফেলে দেওয়া চেয়ারের কাঠে, বা কোনও কুকুরের ভেজা চোখে।
আমার স্ত্রী যখন নীরব হয়ে পাশে বসে থাকে, তখন আমি দেখি — আমাদের সম্পর্কের ভাষা বদলে গেছে। আগের মতো তর্ক, অভিমান, রাগ সব আছে, কিন্তু তার ভেতরেই আছে এক গভীর সহযাত্রা। আমরা একে অপরের মধ্যে অনেকটা হারিয়েছি, আবার একে অপরের মধ্যে অনেকটা খুঁজে পেয়েছি।
আমার কাছে মনে হয়, ভালোবাসা আসলে এক ধরনের নীরবতা। সে কোনও উচ্চারণ চায় না, কোনও প্রমাণ চায় না। সে থাকে ভিতরের নদীর মতো — ক্রমাগত বয়ে চলে, আমাদের ছুঁয়ে যায়, আমাদের পরিবর্তন করে, আবার আমাদের নিজের কাছেই ফিরিয়ে আনে।
আজও রাতে যখন আকাশের দিকে তাকাই, মনে হয় — উপরে অসংখ্য নক্ষত্রের আলো ঝলমল করছে, অথচ প্রতিটি আলোই অতীতের। আমরা যে জীবন বাঁচি, সেটাও অনেকটা সেইরকম। আমরা হারানোদের আলোয় বেঁচে থাকি।
✍️ শিবাশিস মুখার্জী
ফ্যাকাল্টি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
এন এস সি বোস রোড,
এটলাস মোড়, কলকাতা ৭০০ ১৪৬

Comments
Post a Comment