অসমাপ্ত ভালোবাসা
✍️শিবাশিস মুখার্জী
কলকাতার এক পুরনো বাড়িতে বসে জানলার ফাঁক দিয়ে ভিজে হাওয়া টেনে নিয়ে বাবাইদা একদিন আমাকে বলেছিল
দেখিস, প্রেম হলো মেঘের মতো।
আসবে যাবে কিন্তু বাতাসের মতো কাউকে না কাউকে স্পর্শ করবেই।
সেদিন কথাটা শুনে হেসেছিলাম।
তখনও বুঝিনি কিছু কথা সময়ের ভিতর নীরবে বেঁচে থাকে
একদিন হঠাৎ সত্যি হয়ে ওঠার জন্য।
বয়সে তখন বাবাইদা পঞ্চাশ ছুঁয়েছে।
চুলে পাক ধরেছে চোখে কাচের চশমা
তবু হাসলে মনে হতো এক তরুণ এখনও ভেতরে বেঁচে আছে।
সময়ের ধুলো তাকে ছুঁতে পারেনি
শুধু একটু ক্লান্ত করেছে।
আর আমি তখন সদ্য লেখক
প্রেম সম্পর্কে অল্প জানা
জীবন সম্পর্কে অর্ধেক অন্ধ।
একদিন হঠাৎ মেসেঞ্জারে একটা বার্তা এলো
বাবাইদা কেন তুমি আমাকে ভালোবাসলে না
তাহলে আমার জীবনটা অন্যরকম হত।
লিখেছিল পরিণীতা।
চব্বিশ বছরের এক তরুণী
সফটওয়্যার কোম্পানিতে কাজ করে
সকাল-সন্ধে ট্রাম-বাসে ছুটে চলে
আর অন্তরে নিঃশব্দে কবিতা লেখে।
বাবাইদা অনেক আগেই বুঝেছিল
মেয়েটার ভেতরে আছে ঝড়।
এক গভীর ভালোবাসার ক্ষমতা
যা মানুষকে বাঁচায়, আবার শেষও করে দেয়।
কিন্তু সেই ঝড়কে বুকে টেনে নেওয়ার সাহস
তার নিজের মধ্যে ছিল না।
বয়স অভিজ্ঞতা, ব্যর্থতা
সব মিলিয়ে সে জানত
এই ভালোবাসা তাকে শান্তি দেবে না
বরং আরও এক অনন্ত দহন।
তাই একদিন ইচ্ছে করেই দূরে সরে গিয়েছিল।
কিন্তু ভালোবাসা কি কখনও দূরত্ব মানে
পরিণীতা ভোলেনি।
প্রতিটা বৃষ্টির রাতে প্রতিটা বাতাসের ছোঁয়ায়
তার মনে হতো
যদি বাবাইদা একটু ভালোবাসতো
তাহলে পৃথিবীটা অন্যরকম হতো।
অনেকক্ষণ চুপ থেকে বাবাইদা লিখেছিল
পরিণীতা আমি তোকে ভালোবাসিনি
কারণ আমি জানতাম আমি তোকে আগুন হয়ে পুড়িয়ে ফেলবো।
আমার ভেতরে যতটুকু আলো আছে
তার চেয়ে অনেক বেশি অন্ধকার।
তুই সুখ খুঁজবি
আর আমি তোকে দুঃখ ছাড়া কিছু দিতে পারতাম না।
কিন্তু হৃদয় যুক্তি বোঝে না।
পরিণীতা আবার লিখল
তাহলে তুমি নিজেকে বাঁচালে
আমায় পুড়িয়ে দিলে
এই প্রশ্নটা বাবাইদার বুক ভেদ করে গেল।
সে বুঝল
ভালোবাসা থেকে পালানো মানে
ভালোবাসাকে বাঁচানো নয়
বরং তাকে অসম্পূর্ণ করে দেওয়া।
রাতভর ঘুমোতে পারেনি সে।
মনে হচ্ছিল, জীবনের সবচেয়ে বড় অন্যায়
সে নিজেই করেছে
ভালোবাসাকে স্বীকার না করে
ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
দূরে কোথাও টম হ্যাঙ্কসের কণ্ঠে বাজছিল
I am not a smart man but I know what love is.
বাবাইদার মনে হলো
ফরেস্ট গাম্পও তো তার মতোই।
জীবনে অনেক ভুল করেছে
তবু ভালোবাসা কী তা অন্তরে জানে।
তফাত শুধু একটাই
ফরেস্টের জেনি ফিরে এসেছিল
কিন্তু পরিণীতা আর কোনোদিন ফিরবে না।
সে চিরকাল মনে রাখবে
কেউ একদিন তাকে ভালোবাসতে পারতো
কিন্তু সাহস পায়নি।
দুটো প্রাণের মাঝখানে থেকে গেলো এক অদৃশ্য প্রাচীর।
একজন চেয়েছিল স্বীকৃতি
সমাজের কাছে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ।
অন্যজনের চাওয়া ছিল শুধু নিখাদ ভালোবাসা।
কিন্তু জীবন সরল সমীকরণে মেলে না।
স্বীকৃতি আর ভালোবাসা
দুটো সমান্তরাল রেখার মতো পাশাপাশি চলে
কখনও কাছে আসে
কিন্তু স্পর্শ করে না।
তাই জন্ম নেয় এক অদ্ভুত বেদনা
একজনের অপ্রাপ্তি
আরেকজনের নিঃস্বতা।
দুটো ভিন্ন আকাঙ্ক্ষা মিলেমিশে
হয়ে ওঠে একটাই নীরব নদী।
একদিন আবার ফোন করেছিল পরিণীতা
আমি তো প্রমাণ চাইনি
শুধু চাইছিলাম তুমি বলো হ্যাঁ আমিও তোকে ভালোবাসি।
তাহলে আজ আমি এই দমবন্ধ জীবনে আটকে থাকতাম না।
তুমি কেন ভালোবাসলে না
বাবাইদা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল।
মৃদু স্বরে বলেছিল
আমি হয়তো বুদ্ধিমান নই।
আমি জানি না জীবনের জটিল সমীকরণ মেলাতে।
কিন্তু আমি জানি তোকে আমি ভালোবাসি।
প্রকাশ করতে পারিনি
কিন্তু সেই ভালোবাসা প্রতিদিন আমাকে পোড়ায়।
সেপ্টেম্বরের এক বৃষ্টিভেজা রাতে
বাবাইদা জানলার ধারে বসেছিল।
ফোন বেজে উঠল পরিণীতা।
কিন্তু ফোন ধরেনি।
কারণ সে জানত
প্রতিটি কথোপকথন নতুন আগুন জ্বালাবে
আর সেই আগুন দু'জনকেই শেষ করে দেবে।
সে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
মেঘ জমেছে, বাতাস বইছে
কিন্তু বৃষ্টি নামছে না।
নিজের মুখে ভেসে উঠল জীবনানন্দের সেই পঙ্ক্তি
আমিও তোমাকে খুঁজি না
তুমিও আমাকে খোঁজ না
অথচ আমরা রয়েছি একই নক্ষত্রের নীচে।
বাবাইদা মৃদু হাসল।
ভাবল
এই নক্ষত্রই হয়তো সাক্ষী থাকবে
তার অসমাপ্ত ভালোবাসার।
পরিণীতা মনে রাখবে
সে ভালোবাসতে পারত, কিন্তু সাহস পায়নি।
আর বাবাইদা মনে রাখবে
আমি সাহস করলে অন্য মানুষ হতে পারতাম।
এভাবেই জীবন কেটে যায়।
অপূর্ণ প্রেমের মতো মেঘ আকাশে জমে থাকে
বাতাস বার্তা বয়ে নিয়ে যায়
আর মানুষ নিঃশব্দে পোড়ে।
হয়তো ভালোবাসা এত কঠিন নয়
আমরাই তাকে জটিল করে তুলি।
আমরাই ভয় পাই তার গভীরতা
তার দায়িত্বর পরিণতি।
শেষমেশ সত্যিটা খুব সহজ
ভালোবাসা কখনও অসম্পূর্ণ নয়
অসম্পূর্ণ আমরা।
তাই আজও সেই সংলাপটাই
সবচেয়ে সত্যি হয়ে ওঠে
I am not a smart man but I know what love is.
আর কোথাও দূরে
দুটি অসম্পূর্ণ মানুষ
একই নক্ষত্রের নীচে
নিঃশব্দে বেঁচে থাকে।
....................................
✍️শিবাশিস মুখার্জী
এটলস মোড়, কলকাতা ৭০০১৪৬

Comments
Post a Comment