দেখা
রাজশ্রী দে
অনুপমা দেবী যাচ্ছেন কাশ্মীর ডলফিন ট্রাভেলসের সঙ্গে। দাদার ছেলে সৌভিক এসেছে ট্রেনে ওঠাতে। অনেকদিনের শখ কাশ্মীর ভ্রমণের। স্বামী অয়নের সঙ্গে বহু দেশ দেখা হয়েছে কিন্তু কাশ্মীর বাদ পরে গেছে। জঙ্গী হামলার ভয়ে অয়ন কাশ্মীর কিছুতেই যেতে চাইত না। দু বছর হল অয়ন আর নেই।
অনুপমা থাকেন নিউ আলিপুরে, পাশের ব্লকে থাকেন দাদা, বৌদিরা। ওনার ইচ্ছের কথা জানতে পেরে সৌভিক যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। রাজধানী ছুটে চলেছে দিল্লীর দিকে, সামনের পরিবারের সঙ্গে আলাপ হল। ট্রাভেল এজেন্সির লোকেরাও বার বার তদারকি করছে। ডিনার করে শুয়ে পড়ল অনুপমা।
দিল্লি থেকে সম্পর্কক্রান্তি এক্সপ্রেসে উঠে পরলো সকলে, পাটা একটু টন টন করছিল অনুপমার। আর্নিকা টিউব থেকে বের করে পা দুটোতে মালিশ করলেন একটু। এবার যাওয়া হবে জম্বু, তারপর শ্রীনগর। সামনের সিটে এখনও কেউ আসে নি। কিছুক্ষন পরে ডলফিনের একজন লোক নিয়ে এলেন এক ভদ্রলোককে। এককালে বেশ হ্যান্ডসম ছিলেন বোঝাই যাচ্ছে। বেশ চেনা চেনা লাগছে। কার যেন সঙ্গে মিল পাচ্ছেন অনুপমা, চোখে ভারী চশমা, গায়ের রঙ ব্ল্যাক, হাইট অনেকটা, মাথার চুল ছোট ছোট করে কাটা । পাশ ফিরে শুলেন অনুপমা। হটাৎ মনে পরল সুবিমলের কথা। সেই অল্প বয়েসের সেই যুবক ছেলেটা যেন তার পাশের সিটের লোকটা, একদম হুবহু এক। শুধু বয়েস বেড়ে গেছে। ট্রেনের দোলায় ঘুম যেন ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে, শুনেছিলেন সুবিমল দিল্লিতে চাকরি নিয়ে চলে গেছে। কলেজে সিনিয়র ছিল সুবিমল, রাজনীতি করত, সমাজের বদল আনাই ছিল লক্ষ্য। বুর্জোয়ারা ছিল তাদের শত্রু। সারারাত ধরে পোস্টার লিখত সুবিমল আর ওর বন্ধুরা। অনুপমা গ্রাম থেকে এসেছিল কলকাতায় মামা বাড়িতে কলেজে পড়তে। খুব ভালো স্টুডেন্ট ছিল সে, এক নামকরা কলেজে চান্স পেয়ে গেল অনায়াসে। সেই কলেজের এক ক্লাস সিনিয়র সুবিমল, থাকত টালিগঞ্জে। রাজনীতির সূত্র ধরেই আলাপ তারপর কখন যে ভালোবাসা হয়ে গিয়েছিল টের পায় নি তারা। কলেজ ছাড়া বেড়োনোর অনুমতি মিলত না মামাবাড়ি থেকে । তবে কলেজে ক্লাস না করে সব বন্ধুদের সঙ্গে মেট্রোতে সিনেমা দেখেছে দু একবার। এগুলো সবই সুবিমলের প্ল্যান। পাড়ায় কলেজের বন্ধু মৃণালিনীর বাড়িতে মাঝে মাঝে আড্ডা বসত, সেখানে সুবিমল আসত। মৃণালিনী মামাকে বলে ওদের বাড়িতে নিয়ে যেত। বেশিরভাগ হত রাজনীতি নিয়ে আলোচনা। তারপর এগিয়ে দিত সুবিমল, ল্যাম্প পোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে একটু সময় পেত তারা নিজেদের গল্প করার। নিঝুম নিস্তব্ধ পাড়া, ল্যাম্প পোস্টের ঝিম ধরা আলোয় কান্না পেত অনুপমার। মনে হত এই বুঝি শেষ দেখা, কারণ তখন সুবিমলের চারিদিকে শত্রু। পুলিশ ক্ষেপে গেছে। যখন তখন সন্দেহ হলেই গুলি চালাচ্ছে তরুণদের ওপর। কলকাতার অবস্থা সাংঘাতিক।
অনার্সের পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পরে অনুপমা গ্রামে ফিরে গেল। তার খুব ইচ্ছে ইংরেজি নিয়ে এম এ পড়ার। কিন্তু মামার ইচ্ছে নেই অনুপমা কলকাতা ফিরে আসুক। কারণ কলকাতা তখন জ্বলছে। অনুপমার দাদা বোম্বেতে চাকরি করে । সুবিমলের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। ওর বাড়ির ঠিকানায় দু চারটে চিঠি দিয়েছিল কিন্তু কোনো উত্তর পায় নি। মৃণালিনী চিঠি দিয়ে জানিয়েছে ওদের দলের অনেকে উত্তরবঙ্গে গা ঢাকা দিয়েছে কিন্তু সুবিমলের কথা ও জানে না। হটাৎ করে অনুপমার পিসি সম্বন্ধ করল অয়নের সঙ্গে। আসামে পোস্টিং, ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। বাড়ি বর্ধমানে। অনুপমারা বোলপুর থেকে দূরে মাধাইপুর নামে একটা গ্রামে থাকত। মাকে অনেক করে বলেছিল সে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করার কথা। সুবিমলের কথা শুনে মা আতঙ্কে অস্থির। বললেন শেষ পর্যন্ত তুই একটা দেশদ্রোহীকে ভালোবাসলি। মাকে বোঝানোর হাজার চেষ্টা করেও বিফল হয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসল অনুপমা। একরাশ অভিমান নিয়ে সে চলে গেল আসামে। তারপর একবার শুনেছিল সুবিমল দিল্লিতে চলে গেছে কোনো নিউস পেপারে চাকরি নিয়ে। সুবিমলকে ভালোবেসে অন্য কাউকে বিয়ে করতে তার মন চায় নি। এত গভীর তাদের ভালোবাসা। বিয়ে করব না কিন্তু কোথাও থাকবে অনুপমা। চাকরি পাওয়ার কোনো সুযোগই নেই, কলকাতার অবস্থা ভয়ঙ্কর।
সকাল হল, ব্রেকফাস্ট দিয়ে গেছে। সামনের ভদ্রলোক এখনও ঘুম থেকে ওঠেন নি। ব্রেকফাস্ট খেয়ে অনুপমা একটা ম্যাগাজিনে চোখ বোলাচ্ছিলেন। ট্রেন ছুটে চলেছে। ট্রাভেল এজেন্সির লোক এসে ডাকছে ভদ্রলোককে, কোনো সাড়া নেই। অনুপমা কায়দা করে জেনে নিয়েছে উনি সুবিমল সেন, ইংরেজি কাগজে কাজ করতেন, বিশিষ্ট লেখক, কলকাতায় আসল বাড়ি,দিল্লিতে থাকেন বহু বছর। কেঁপে উঠেছেন অনুপমা এত কাছ থেকে এত বছর পরে সুবিমলকে দেখতে পাওয়া, ভাবতেই পারছেন না।
ম্যানেজারের সঙ্গে কয়েকজন এসে চেষ্টা করছেন সুবিমলকে ওঠানোর, একজন ডাক্তার পরীক্ষা করে দেখছেন। অনুপমাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তিনি শুনলেন সুবিমল ঘুমের মধ্যেই হার্ট অ্যাটাক করেছেন।
অনুপমার চোখে কোনো জল নেই, তিনি পাথর হয়ে গেছেন। এত বছরের অভিমান জমে আছে তার ভেতরে, কিছুই বলা হল না । বহু বছর আগে সুবিমল চলে গিয়েছিলেন তার কাছ থেকে, তাকে ঠকিয়েছিলেন ভাবতে কষ্ট হয় অনুপমার। কারণ সুবিমল একদম অন্য মানুষ ছিলেন, তিনি কাউকে ঠকাতে পারেন না, এই বিশ্বাস অনুপমার । আজ চিরতরে চলে গেলেন। দেখা দিলেন কথা হল না।
শেষ দেখা।
..............................

Comments
Post a Comment