অপূর্ণতা
সুখেন সিনহা
নীল আর অবন্তীর প্রেমটা ছিল ঠিক যেন কোনো অসম্পূর্ণ ক্যানভাস। নীল পেশায় শিল্পী, কিন্তু তার নিজের জীবনের সবটুকু রঙ যেন সে অবন্তীর হাসিতে খুঁজে পেত। অবন্তীর একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল—সে কখনো নীলের আঁকা ছবিগুলো শেষ করতে দিত না। একটু বাকি থাকতেই তুলি কেড়ে নিয়ে বলত, সবটুকু পূর্ণ হয়ে গেলে তো গল্পটাই শেষ হয়ে যায়, নীল। অপূর্ণতা আছে বলেই তো মানুষ আবার ফিরে আসার ইচ্ছেটুকু বাঁচিয়ে রাখে।
নীল দেখত, অবন্তী যেন সেই শরতের মেঘ, যা বৃষ্টি হয়ে ঝরার আগেই মিলিয়ে যেতে চায়। তাদের প্রেমটা ছিল অনেকটা ভোর হওয়ার ঠিক আগের সেই ধূসর মুহূর্তটার মতো, যেখানে আলো আসার প্রতীক্ষা থাকে, কিন্তু অন্ধকারের মায়া তখনও কাটেনি। নীল বুঝত না, অবন্তী আসলে কোনো এক না-লেখা কবিতার সেই শেষ শব্দটা, যা ছাড়া পুরো কবিতাটাই অর্থহীন অথচ যার অনুপস্থিতিই কবিতাটাকে একটা চিরন্তন হাহাকারে পরিণত করে। সে ছিল সেই অসমাপ্ত সুর, যা কানে এসে থামলে বুকের ভেতরটা চিনচিন করে ওঠে, যেন কোনো এক বিশাল মরুভূমির ঠিক মাঝখানে এসে তৃষ্ণার্ত পথিক দেখল তার জলের পাত্রটা ফুটো হয়ে গেছে।
বছর দুয়েক আগে অবন্তীর ক্যান্সার ধরা পড়ে। শেষের দিনগুলোতে অবন্তীর চোখের কোলের কালি আর ঠোঁটের বিবর্ণতা নীলকে নীল করে দিত। হাসপাতালের সাদা দেয়ালে ঘেরা কেবিনে বসে নীল একদিন একটা ছবি আঁকছিল—একটা সূর্যাস্তের ছবি। অবন্তী খুব দুর্বল কণ্ঠে বলল, নীল, ছবিটা শেষ করো তো আজ। আমি দেখতে চাই পূর্ণতা কেমন হয়।
নীল অবাক হলো। যে মেয়েটি সারাজীবন অপূর্ণতার পূজা করে এসেছে, সে আজ শেষ দেখতে চাইছে? নীল পরম মমতায় তুলি চালাল। তখন তার মনে হলো, পূর্ণতা জিনিসটা বড় নিষ্ঠুর। একটা ছবির শেষ বিন্দুটা যখন আঁকা হয়ে যায়, তখন শিল্পী আর ক্যানভাসের মধ্যে কোনো দূরত্ব থাকে না—ঠিক যেমন গোধূলির শেষ আলোটুকু নিভে গেলেই কেবল নক্ষত্রদের সাথে দেখা হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। অবন্তী আজ পূর্ণতা চেয়েছিল সম্ভবত চিরতরে নক্ষত্র হওয়ার প্রস্তুতি হিসেবেই। যখন শেষ রঙটুকু দিয়ে তুলিটা নামিয়ে রাখল, দেখল অবন্তী একদৃষ্টিতে ছবিটার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। সেদিন রাতেই অবন্তী চলে গেল।
কয়েক মাস পর, নীলের প্রদর্শনীর সময় এক দর্শক সেই সূর্যাস্তের ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে থমকে গেলেন। তিনি নীলকে জিজ্ঞেস করলেন, ছবিটা তো অসাধারণ, কিন্তু সূর্যের মাঝখানে ওই ছোট্ট একটা সাদা দাগ কেন? আপনি কি রঙ করতে ভুলে গেছেন?
নীল ম্লান হেসে উত্তর দিল, ওটা ভুল নয়। ওটা অবন্তীর রেখে যাওয়া সেই অপূর্ণতা। আসলে ও আমার জীবনের ছবিটা শেষ করতে দিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু নিজের অস্তিত্বের একটা রঙ ও সাথে করে নিয়ে গেছে। এখন এই অপূর্ণতাটুকুই আমার কাছে ওর সবচেয়ে বড় উপস্থিতি।
নীল ভাবল, সবাই শুধু রঙের সমারোহ দেখে, কেউ ওই সাদা বিন্দুর নৈঃশব্দ্যটা শুনতে পায় না। ওই সাদা দাগটা হলো সময়ের এক চিলতে বিরতি। গিটারের তারে যখন আঙ্গুল থেমে যায়, ঠিক তখনই যে সুরটা মনের গহীনে রেশ রেখে যায়, ওই সাদা বিন্দুটা হলো সেই নীরব সুর। পূর্ণ রঙের ভিড়ে ওই শূন্যতাটুকুই হলো অবন্তীর নিঃশ্বাস, যা ক্যানভাসকে আজও জীবন্ত করে রেখেছে।
নীল জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবল, অবন্তী ঠিকই বলত— সবটুকু পূর্ণ হয়ে গেলে তো গল্পটাই শেষ হয়ে যায়।" আজ অবন্তী নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া সেই অসম্পূর্ণতাই নীলকে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দেয় যে তারা একসময় 'ছিল'। নীল নিজের ডায়েরির পাতায় লিখে রাখল কিছু হাহাকার মাখা লাইন—
মানুষ চলে গেলে তার শূন্যস্থান পূরণ হয় না, বরং সময়ের সাথে সাথে সেই শূন্যতাটাই হৃদয়ের সবচেয়ে আপন অংশ হয়ে ওঠে। কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে কেবল ক্যানভাসে একটা চিরস্থায়ী সাদা দাগ রেখে যাওয়ার জন্য, যা পৃথিবীর সব রঙ দিয়েও কখনো ঢেকে দেওয়া যায় না। পূর্ণতা যদি হয় সূর্যের প্রখর তেজ, তবে অপূর্ণতা হলো স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না—যা দহন করে না, কিন্তু অস্তিত্বকে শান্ত এক বিষাদে আচ্ছন্ন করে রাখে।
নীল বুঝতে পারল, অসম্পূর্ণ ভালোবাসাগুলোই আসলে সবচেয়ে বেশি দীর্ঘজীবী হয়। পূর্ণতার স্বাদ পেলে হয়তো সে তৃপ্ত হয়ে একদিন অবন্তীকে ভুলে যেত, কিন্তু এই চিরস্থায়ী অপূর্ণতা তাকে প্রতি রাতে তাড়িয়ে বেড়ায়, তাকে শিল্পী হিসেবে বাঁচিয়ে রাখে। পূর্ণতা কেবল ইতিহাস সৃষ্টি করে, কিন্তু অপূর্ণতা জন্ম দেয় কবিতার। বিদায়বেলায় অবন্তীর চোখের কোণে যে জলটুকু জমে ছিল, নীল আজ বোঝে—ওটাই ছিল ভালোবাসার শেষ রঙ, যা কখনো শুকায় না, কখনো ম্লান হয় না।
সেদিন প্রদর্শনী শেষে যখন গ্যালারির সব আলো নিভে গেল, অন্ধকার ঘরে সেই সাদা দাগটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নীলের মনে হলো সেই সাদা বিন্দুটা যেন একটা ব্ল্যাক হোল—যা পৃথিবীর সমস্ত আলো শুষে নিচ্ছে না, বরং নিজের ভেতর থেকে এক অলৌকিক দ্যুতি ছড়াচ্ছে। নীল ফিসফিস করে বলল, পৃথিবীর সব গল্প যদি মিলন দিয়ে শেষ হতো অবন্তী, তবে আমাদের এই বিরহটা আজ গৃহহীন হয়ে পড়ত। তুমি নেই বলেই, তুমি আমার সবটুকু জুড়ে আছ।
গ্যালারির নিস্তব্ধতায় নীল একা দাঁড়িয়ে অনুভব করল, এই অপূর্ণতা আসলে কোনো অভাব নয়, বরং এক ভয়ংকর সুন্দর উপস্থিতি। অবন্তী এখন তার কাছে সেই নাবিকের ধ্রুবতারা, যে তারাটা আকাশ থেকে খসে গেছে ঠিকই, কিন্তু তার হাহাকারটুকু সমুদ্রের নোনা জলে মিশে নীল হয়ে আছে। এই সাদা বিন্দুটা আসলে শীতের রাতে ঝরে পড়া সেই শেষ পাতাটির দীর্ঘশ্বাস, যা বসন্তের আগমনের কোনো খবর রাখে না, শুধু নিজের রিক্ততাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে। নীল বুঝল, পূর্ণতা যদি হয় কোনো পাথুরে সমাধি, তবে অসম্পূর্ণতা হলো সেই নামহীন বুনোফুল, যা কবরের ওপর ফুটে থেকে ফিসফিস করে বলে — ভালোবাসা শেষ হয়নি, শুধু রূপ বদলেছে। গভীর রাতে যখন চারপাশ নিথর হয়ে যায়, নীল সেই সাদা দাগটির দিকে তাকিয়ে দেখতে পায়, ওটা আসলে কোনো রঙহীন জায়গা নয়; ওটা হলো এক ফালি সাদা কাফন, যা দিয়ে নীল তার জীবনের সমস্ত না-পাওয়াকে সযত্নে ঢেকে রেখেছে। যা পূর্ণ হতে পারল না, তা-ই আসলে অমর হয়ে রয়ে গেল। যে ফুল ঝরে যায়, তার ঘ্রাণই সবচেয়ে বেশি বেদনার; আর যে প্রেম অপূর্ণ থেকে যায়, তার আয়ুষ্কালই হয় মহাকালের সমান।
..................................
সুখেন সিনহা
গ্রাম +পোস্ট - কাপিষ্ঠা
জেলা - বাঁকুড়া
পিন - ৭২২১৩৩ ( পশ্চিমবঙ্গ )

Comments
Post a Comment