প্রেম: মানুষের অন্তরে জ্বলে থাকা অনন্ত আলোর নাম
আদিল হোসেন মাহি
মানুষ পৃথিবীতে আসে অজ্ঞান, নিরপেক্ষ, নিঃশব্দ। কিন্তু সে শিখে—স্পর্শের ভাষা। মায়ের বুকে মুখ রাখলে যে নিশ্চিন্ত ঘুম আসে, তার মধ্যে ভেসে আসে প্রেমের প্রথম আলো। সেই আলো নীরব, নিঃসঙ্গ, কিন্তু শক্তিশালী; যা একবার জ্বলে গেলে মুছে যায় না। প্রেম তাই কোনো শিখানো বিদ্যা নয়; এটি মানুষের আত্মার ভিতরে জন্মানো এক প্রাথমিক সত্য।
প্রেমকে আমরা প্রায়ই সংজ্ঞায় আবদ্ধ করতে চাই। কেউ বলে এটি আকর্ষণ, কেউ বলে এটি আবেগ, কেউ বা বলে এটি রসায়ন। কিন্তু প্রেম এসবের বাইরে। প্রেম হলো সেই অদৃশ্য শক্তি, যা মানুষকে তার সীমা অতিক্রম করতে শেখায়। যে মানুষ ভালোবাসতে জানে, সে নিজের স্বার্থের বাইরে ভাবতে পারে। প্রেম তাকে তার একক সত্তা থেকে বৃহত্তর মানবিক সত্তায় নিয়ে যায়।
প্রেমের সবচেয়ে স্পষ্ট রূপ আমরা দেখি রোমান্টিক সম্পর্কের মধ্যে। কিন্তু প্রেম তার চেয়েও বহুগুণ গভীর। মায়ের নিঃশর্ত স্নেহ, পিতার নীরব ত্যাগ, বন্ধুর অকৃত্রিম পাশে থাকা, শিক্ষকের নিঃশব্দ পথপ্রদর্শন—এসবই প্রেমের বহুমাত্রিক রূপ। এমনকি একজন অচেনা মানুষের বিপদে এগিয়ে আসা—এটিও প্রেমেরই প্রমাণ। প্রেম মানে কেবল কারও সঙ্গে জীবন কাটানো নয়; প্রেম মানে কারও জীবনে আলো হয়ে ওঠার দায়িত্ব নেওয়া।
প্রেম মানুষকে বদলে দেয়—এই কথাটি আমরা শুনেছি। কিন্তু প্রকৃত বদল মানে কি? প্রেম মানুষের ভেতরের কঠোরতা ভেঙে দেয়। অহংকারের দেয়াল নরম হয়, স্বার্থপরতার কেন্দ্র সরিয়ে যায়। যে মানুষ সত্যিকারের ভালোবাসে, সে ক্ষমা করতে শেখে। কারণ প্রেম প্রতিশোধে নয়, পুনর্মিলনে বিশ্বাস করে। প্রেম জয় করতে চায় না; বুঝতে চায়, সংযোগ স্থাপন করতে চায়।
তবু প্রেম দুর্বলতা নয়। ভালোবাসা মানে নিজেকে উন্মুক্ত করা, আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা মেনে নেওয়া। প্রত্যাখ্যানের ভয়, হারানোর আশঙ্কা—এসব জেনে যে হৃদয় ভালোবাসে, তার মধ্যেই প্রকৃত সাহস নিহিত। প্রেম মানুষকে সংবেদনশীল করে, সংবেদনশীলতাই তাকে মানবিক করে তোলে।
প্রেমের একটি নৈতিক মাত্রা আছে। সেখানে অধিকার অপেক্ষা দায়িত্ব বড়, দাবি অপেক্ষা সম্মান বড়। যে প্রেম নিয়ন্ত্রণ করে, তা প্রেম নয়—তা আসক্তি। যে প্রেম স্বাধীনতা দেয়, বিকশিত হতে সাহায্য করে, অন্যের স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করে—সেই প্রেমই পরিণত। সত্যিকারের প্রেম কাউকে নিজের ছায়ায় ঢেকে দেয় না; বরং তাকে তার নিজস্ব আলোয় দাঁড়াতে শেখায়।
আধুনিক পৃথিবীতে মানুষ আগের চেয়ে সংযুক্ত হলেও হৃদয়ের গভীরতা কমে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো সম্পর্কের ভিড়, অথচ একাকিত্বের তীব্রতা। এই সময়ে প্রেমের প্রকৃত অর্থ আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা দরকার। প্রেম মানে শুধু একসাথে ছবি তোলা নয়; একসাথে নীরবতায় থাকা। প্রেম মানে শুধু সুখের দিনে হাত ধরা নয়; দুর্দিনেও পাশে থাকা।
প্রেমের আরেকটি দিক হলো আত্মপ্রেম। যে মানুষ নিজেকে সম্মান করতে জানে না, সে অন্যকেও সম্মান দিতে পারে না। আত্মপ্রেম মানে আত্মকেন্দ্রিকতা নয়; বরং নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে নিজেকে উন্নত করার আন্তরিক প্রচেষ্টা। নিজের ভেতরের ভাঙাচোরা অংশগুলোও গ্রহণ করতে শেখা—এও প্রেম।
সমাজও প্রেমের ওপর নির্ভরশীল। একটি পরিবার টিকে থাকে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ভালোবাসার ওপর। একটি জাতি এগিয়ে যায় নাগরিকদের সহমর্মিতা ও আস্থার ওপর। ইতিহাস দেখায়—ঘৃণা সাময়িক উন্মাদনা দিতে পারে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি এনে দেয় প্রেম। যে সমাজে মানুষ একে অপরকে মানুষের মতো ভালোবাসতে শেখে, সেই সমাজই সত্যিকারের সভ্য।
প্রেমের মধ্যে আছে সৃষ্টিশীলতার উৎস। কবি কলম ধরেন, শিল্পী রঙ মিশান, সুরকার সুরে হৃদয়ের স্পন্দন তুলে ধরেন—সবই প্রেমের প্রভাবে। প্রেম মানুষকে অনুভব করতে শেখায়, আর অনুভবের গভীরতাই শিল্পের জন্ম দেয়।
প্রেম সবসময় সরল নয়। এতে আছে প্রত্যাশা, ভুল বোঝাবুঝি, দূরত্ব। কিন্তু এই পরীক্ষাই প্রেমকে পরিণত করে। সহজে পাওয়া প্রেম গভীর হয় না; ধৈর্য, বোঝাপড়া ও সময়ে গড়ে ওঠা প্রেমই স্থায়ী।
শেষ পর্যন্ত প্রেম কোনো ঘটনামাত্র নয়; এটি একটি চর্চা। প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্ন, আন্তরিক কথায়, নীরব উপস্থিতিতেই প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। প্রেম মানে কেবল উচ্চারণ নয়; উপস্থিতি। কেবল প্রতিশ্রুতি নয়; পালন। কেবল অনুভূতি নয়; দায়িত্ব।
মানুষ ভেঙে পড়ে, তবু আবার ভালোবাসে। বিশ্বাস হারায়, তবু আবার বিশ্বাস করতে শেখে। এই পুনরাবৃত্তিই প্রমাণ করে—প্রেম মানুষের অন্তরে জ্বলে থাকা এক অনন্ত আলোর নাম। অন্ধকার যত গভীরই হোক, সেই আলো নিভে যায় না।
প্রেমহীন জীবন হয়তো চলতে পারে, কিন্তু তা পূর্ণতা পায় না। প্রেমই মানুষকে তার সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে অসীমের দিকে ডাকে। প্রেমই তাকে শেখায়—বেঁচে থাকা মানে কেবল শ্বাস নেওয়া নয়, হৃদয় দিয়ে অনুভব করা।
"মানুষের ইতিহাস যুদ্ধের নয়, প্রেমের ইতিহাস; কারণ যুদ্ধ সাম্রাজ্য বদলায়, কিন্তু প্রেম বদলে দেয় মানুষ।"
========================
আদিল হোসেন মাহি। দশম শ্রেণীর ছাত্র
ঠিকানা= সানকিপাড়া ময়মনসিংহ।
মোবাইল নম্বর=০১৩১৭৫৪৪৫০২।
(কিছু দিন আগে তার লেখা কবিতা দৈনিক দেশের খবর দৈনিক নিউ টাইমস এবং পোর্টাল দৈনিক বাংলাদেশ যুগান্তর থেকে প্রকাশিত হয়েছিল)

Comments
Post a Comment