গভীর এক উপলব্ধির প্রেমের উপন্যাস 'এক নদী দুই স্রোত'
জয়শ্রী ব্যানার্জি
এই গল্প গড়ে উঠেছে শ্রীমন্ত, লক্ষ্মী,হাসিনাকে কেন্দ্র করে। তাদের ত্রিকোণ প্রেমের বাতাবরণে যেমন এক গভীর গোপন ভালোবাসার জন্ম নিয়েছে তেমনই প্রকাশিত হয়েছে মানুষের মধ্যে ঈর্ষা, সংকীর্ণতা, দুর্বলের প্রতি সবলদের দম্ভ !
যেসব চরিত্রগুলো উঠে এসেছে তাদের সবাই আর পাঁচজনের মতোই আলো আঁধারে মিশে আছে ।
কখনও ভালো কখনও কিছু মন্দ দিক দেখি ।
শ্রীমন্ত যাকে ভালো শান্ত, পরোপকারী হিসাবে দেখি, হাসিনার প্রতি তার যে গোপন এক ভালোবাসা, ভালোলাগা ..আবার লক্ষ্মীকেও সে ঠিক উপেক্ষা করতে পারে না, এর মধ্যে কোথাও কোনো বাড়াবাড়ি নেই। ঠিক যেনো পাড়ার ছেলেটি! তার ভালোবাসা স্বপ্ন, ইচ্ছা, হতাশা অভিমান, অপেক্ষা, রাগ ক্ষোভ তার বেকারত্ব তার প্রতি কিছুজনের কটূক্তি বা উপেক্ষা তার ভিতরের পুরুষকে কখনো জাগিয়ে তোলে কখনও যেন দমিয়ে রাখে!
অপরদিকে মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠা হাসিনাকে দেখি লাজুক, শান্ত পড়াশোনায় ভালো মেয়েটি । সেও যেনো খুব চেনা কোনো মেয়েটি ।
শ্রীমন্তর প্রতি তার যে আকর্ষণ তা পবিত্র লাগে ।
ওর জন্য নিজের জীবন দেওয়া হাসিনার ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশ করে ।
তার প্রকাশ না করতে পারার সঙ্কোচ ব্যর্থতাতে একরকম মায়া জন্ম নেয় ।
আবার অনাথ লক্ষ্মী যে শ্রীমন্তদের বাড়িতে থাকে মনে মনে একনিষ্ঠে শ্রীমন্তের প্রতি তার যে গভীর সমর্পণ সেও এক অদ্ভুত । সে কোথাও উপেক্ষিতা যেন তার ভালোবাসার কাছে! সে বোঝে শ্রীমন্ত হাসিনার প্রতি অনুরক্ত তবু সে অপেক্ষা করে থাকে তার প্রিয়তমর জন্য ।
প্রতিটা চরিত্র এমন দেখি যেন আমাদের আসেপাশের।
লেখকের বর্ণনা অত্যন্ত সাবলীল। অতীব দক্ষতার সাথে সব চরিত্রগুলো পরিস্ফুট করেছেন ।
খুব ভালো লেগেছে গ্রাম্য মেলার বর্ণনা। লেখক এত সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন যেন জীবন্ত!
আবুলের মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহের কথা যেভাবে তুলে ধরেছেন, মাছ ধরা বর্ণিত করেছেন বোঝা যায় তাঁর লেখার হাত কতখানি দক্ষ ! প্রতিটা ছোট ছোট জিনিস তিনি পাঠকদের সামনে নিখুঁত ভাবে সামনে এনেছেন ।
পুজো উপলক্ষে গ্রাম্য থিয়েটার / নাটক করার যে উৎসাহ উদ্দীপনা, সেখানে মেয়েদের অভিনয় নিয়ে যে দোলাচল লেখক এখানেও সাবলীল তাঁর বর্ণনায়। আবার মুসলিম পরিবারের জীবন যাপন, কথা, বিয়ের বর্ণনা তাঁর পটু হাতে উদ্ভাসিত ।
শশী ঠাকুরদার মধ্যেও আমরা দুরকম সত্তা দেখি। একদিকে তাঁর গোঁড়ামি, আবার তিনি যখন শ্রীমন্তদের বাড়িতে যান তার সম্পর্কে তার মাকে কিছু সাবধান করতে, সেখানে কিন্তু নরমভাব দেখি, বিশেষ করে লক্ষ্মীর প্রতি এক সহানুভূতি স্নেহমাখা মন !
শ্রীমন্তর মা কল্যানী দেবীর মধ্যেও দেখি একদিকে যেমন স্নেহশীলা রমনী, আবার অপরদিকে আর পাঁচটা মায়ের মতো সন্তানের নিন্দা তিনি শুনতে চান না। সেটা কোন দিক থেকে বলতে চাওয়া তিনি বুঝতে চান না নিজের মানসিকতায় ।
পরাগ, পরাণ বঙ্কু সুকান্ত ইত্যাদি চরিত্রগুলোর মধ্যেও চেনা এক সুর যেন!
এক নদী দুই স্রোত বলতে গেলে একদিকে যেমন নদী যেন এক সমাজ তার দুই স্রোত দুই সত্তা ।
দুই মানসিকতার দুই সংস্কৃতির মানুষজন !
সেই ভাবে যেন গড়ে উঠেছে কাহিনী আবার আমাদের ভিতরে যে অন্তঃসলিলা বয়ে চলছে তার প্রবাহ যে একই সেখানে কি নিয়ম চলে সব কিছুর! অন্তর তা মানে না ।
তাই দেখতে পাই মানুষের সংকীর্ণ মন থেকে জন্ম নেওয়া অকারণ এক আস্ফালনের ! আর সেখানে বলি হয়ে যায় ভালোবাসা ।
বিশ্বাস মরে যায় । জন্ম নেয় শূন্যতা। এক ঘটনা বদলে দেয় অনেক কিছু । অনেকের জীবন ।
গভীর এক উপলব্ধি।
সুন্দর একটি বই। দক্ষ লেখক। নিখুঁত লেখা। অসাধারণ প্রচ্ছদ। মুদ্রণ ও বাঁধাই পরিপাটি।
ভালো লাগবে অবশ্যই ।
........................
লেখক - বিশ্বনাথ প্রামাণিক
প্রকাশনা - নবপ্রভাত প্রকাশনী
প্রচ্ছদ - চঞ্চল খান
মুদ্রিত মূল্য- ২০০ টাকা

Comments
Post a Comment