মিস্টার ব্যানার্জী
আরজু মুন জারিন
অধ্যায়ঃ এক
মিস্টার ব্যানার্জীর সাথে প্রথম দেখা আমার বিশতম জন্মবার্ষিকীতে। উনি তখন চল্লিশ পেরোনো মধ্যবয়সী যুবক। প্রথমে আর সবার মত আমার ও দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিয়েছিলেন। অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে গায়ের রঙ আর তার সাথে রুক্ষ ব্যবহার। উনি হলেন আমার সবচেয়ে প্রিয় সখী শাবজান এর অভিভাবক। এখন ও বের করতে পারিনি উনি কি শাবজান এর বায়োলজিক্যাল ফাদার কিনা! শাবজান এর মাকে দেখিনি ওদিন। শুনেছি শাবজানদের প্রচুর টাকা পয়সা। ওর বাবা নাকি অনেক জাহাজ এর মালিক। এ সওদাগরী ব্যাবসা তাদের পৈতৃক। বাপ দাদার আমলে পাওয়া। আমরা চোখ বড় করে ওকে দেখতাম যখন ওদের গাড়ী ওকে কলেজে পৌছে দিত। আমার বাবা যখন নিত্যদিনের রেশন জোগাতে হিমশিম খেতেন সেখানে শাবজান এর বাবা নিত্যনতুন গাড়ীর মডেল বদলাতেন। আজ ওকে রোলস রয়েস এ দেখি, তো কাল দেখি মার্সিডিজ, তো পরের দিন সিবিক হোন্ডা। গাড়ীর নাম ও ওর থেকে শেখা। আমার বাবা তখন কাজ করে সরকারী এক দপ্তরে জুনিয়র অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসাবে। আমাদের আট সদস্যের পরিবার কে কলুর বলদের মত বাবা একাই টানছিলেন। আমরা সব ভাইবোন তখন পড়ালেখায়। পরে অবশ্যই ভাই হাল ধরেছিলেন কিছুটা। তাও কতদিন ধরবে কে জানে! ভাবী আর ভাই শলা পরামর্শ করে আলাদা হওয়ার। যাই হোক যা বলছিলাম। আমার এই নিম্নস্তরের ব্যাকগ্রাউন্ড এর সাথে শাবজান দের রাজকীয় ব্যাকগ্রাউন্ড এ আকাশ পাতাল ফারাক। এই বাবা মেয়ে কেন যে আমাকে এত দেখে রাখছিল ওই সময়ে কারণ বের করতে পারছিলাম না।
সেপ্টেম্বর ১৯ স্থানঃ বালিয়াগড়, সকালঃ ছয়টা
আমার জন্মদিন এর সকাল। বাড়ীর সামনে বড় গাড়ী। ড্রাইভার এসে দরজা ধাক্কা দিয়েছে। দরজা খুলে আমাদের সবাই দাড়িয়ে আছে। শাবজানদের বিরাট গাড়ীর ড্রাইভার। আমাদের সবার চোখে বিস্ময়ের।
"কি রে এত সকালে তোকে নিতে আসলো কেন?" বাবার প্রশ্ন। বাবার মনে নাই আমার আজ জন্মদিন। এ স্বাভাবিক। মধ্যবিত্ত পরিবারে আমরা ছয় ভাইবোন। এক একটা ভাই বোন জন্ম আমাদের ঔষধ, নথিপত্র সবখরচ করতে করতে বাবার প্রানান্ত হয়ে উঠতো। সেখানে আমাদের ছয় ভাই বোন এর জন্মদিন আলাদা করে মনে রাখার চেয়ে বাবার অ্যাকাউন্টিং এর হিসাব রাখা অনেক সহজ।
"জানিনা তো বাবা।" মুখ লুকিয়ে মাথা নীচু করে রাখলাম।
সেবার ই প্রথম শাবজান এর বাড়ীতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। তম্মধ্যে মিষ্টার ব্যানার্জির সাথে ও আমার প্রথম মোলাকাত। অবশ্য তিনি হয়তো ওই সময়ে আমাকে দেখেছিলেন খুব সাধারন ভাবে। ঘরের পরিচারিকা বা নাম না জানা শাবনাজ এর এক দুঃস্থ বান্ধবী মনে করেছেন। ওদের এখানে এই প্রথমবার ই দেখেছিলাম অনেক সাদা নারী পুরুষ বিভিন্ন জাতীয়তার মানুষ। ভেবেছিলাম আমার জন্মদিন উদযাপনের জন্য শাবজান গাড়ীটি পাঠিয়েছিল। ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। শাবজানের অভিভাবক মিষ্টার ব্যানার্জির বড় এক বানিজ্যিক সফলতার কারনে নাকি এই পার্টি। অবশ্য শাবজানের মনে আছে আমার জন্মদিন।
"শুভ জন্মদিন সখী।"
তিনতলা সিড়ি থেকে দৌড়ে নেমে আসতে থাকে আমাকে দেখে। শাবজানের দৌড়ের মাঝখানে ব্রেক কষিয়ে দিতে চেষ্টা করলেন এক ব্যাক্তি।
"খুকীজান সাবধানে আস। তুমি আর ছোট নাই। সামনে এই বিরাট ব্যাবসা তোমাকে দেখতে হবে।" ভর্ৎসনার স্বরে বলতে বলতে আমার পাশে এসে দাড়ালেন এক লোক।
"ঠিক আছে মিষ্টার ব্যানার্জি, আরও সাবধান হব।" সমীহের স্বরে বলে শাবজান। পরক্ষণে ওর চপল স্বরে বলে,"আপনি ই তো আমাকে খুকী বলে সম্বোধন করছেন।" লোকটি একটু হাসলো না হাসার মত। আবার কথা বললো কড়া গাম্ভীর্য্যের সুরে।
"তোমরা সবাই হলঘরে যাও। ওখানে সব খাওয়া দাওয়া ব্যাবস্থা পাবে।"
এরপরে শাবজান আমাদের বারান্দা পেরিয়ে যেখানে নিয়ে এল তা বিশাল এক দরবার যা আমাদের বাসার ছোট ড্রইং রুম এর কয়গুন বড়। বিদেশী বাড়ীর মত দেয়ালের কোনে ফায়ার প্লেস ও আছে। এ কি জিজ্ঞেস করায় শাবজান জানিয়েছিল ফায়ার প্লেস। আমাদের চারিপাশে সব ইউনিফর্ম পরা রুম অ্যাটেনডেন্ট বিভিন্ন বস্ত্র, জিনিস এবং খাওয়ার এ সাজিয়ে রাখছে। একজন বেয়ারা এক বিশাল বুকে এনে শাবজানের সামনে ধরে বললো, "মিষ্টার ব্যানার্জী এটা দিতে বললেন আপনাকে" শাবজান ওর হাত থেকে এ নিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল মুখে হাসি সহ
"নাও মনা এ নিয়ে আমাকে ধন্য কর। এ পার্সেল আমার জন্য থাইল্যান্ড থেকে অর্ডার করে এনেছেন মিষ্টার ব্যানার্জী"।
"ওমা কি ভাগ্য!" বাকী সকল বান্ধবী কলকাকলি করে উঠলো। আমাদের জন্য কি আনিয়েছিস? আসমা, কোহিনুর, সুনয়নী,
"আছে সবার জন্য কিছু কিছু। প্রথমে যার জন্মদিন তার ট্রিট আগে। শাবজান এর মা, বাবা, ভাই বোন বা অন্যান্য আত্মীয়স্বজন ধরনের কাউকে দেখলাম না, যা সত্যি বিস্ময়ের। টেবিল ভর্তি প্রচুর খাবার। অদ্ভুত ব্যাপার যে, আমার এখন একটুও ক্ষিধে পেল না। ঘরে অসুস্থ মা আমাদের আটজনের জন্য হিসাব করে আটটি পরোটা বানায় আর তার সাথে আলুভাজি। এ আমাদের রাজভোগ। প্রত্যেকে তার পরোটা শেষ করে আর একটু অংশ পরোটার জন্য উৎসূক চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। মাঝেমাঝে মা আর ও কয়টা বেশী বানান সাথে একটা দুইটা ডিম ভাজি। আমরা ত্বড়িৎ শেষ একে অপরের বাসনের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এক আফসোস এখানে এত খাওয়ার অবহেলায় পড়ে আছে কারও আকাংঙ্খা নাই ভোজনের। যেখানে জিনিস অপ্রতুল সেখানে প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। আমি মা বোনকে ছাড়া রাজভোগ ও খেতে পারি না। মা বাবা সহ আমার সকল ভাই বোনরা যেখানে যাই না কেন সামান্য খাওয়ার হলে ও ঘরে এনে সবাই মিলে ভাগ করে খাই। এজন্য যত ক্ষুধার্ত বোধ করি না কেন একা বাহিরে এলে খেতাম না কখনও।
"এই সব আয় ডাইনিং টেবিলে।" শাবনাজ তাড়া দেয় আমাদের। মা বাবার প্রিয় কচুড়ি হিং, ছোলা বাটোরা সহ আর ও সকল দেশী বিদেশী খাওয়ারে টেবিল বোঝাই। আমি একটা কচুরী নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকি।
"কি রে খাচ্ছিস না কেন? ভালো করে খা, গাড়ীতে তোর বাসার জন্য ভাই বোনদের জন্য খাওয়ার আর সামগ্রী ও রাখা আছে।" এত ভালো এই শাবজানটা। জড়িয়ে ধরলাম প্রিয় সখীকে এবার। কিভাবে যে এই ধনীর দুলালী আভিজাত্যে পালিত মেয়েটি সবার আবেগ অনুভূতি এত বোঝে!
সকালে আটটায় এসেছি। আমি ঘরে যাওয়ার জন্য উচাটন হয়ে আছি। যতবার ঘরে যাওয়ার জন্য উঠতে যাই শাবজান হাত চেপে ধরে।
"আজ তো ক্লাস নাই এত তাড়াহুড়া করছিস কেন? আজ রাতে তোরা থাকবি এখানে? আমি বলেছি মিষ্টার ব্যানার্জীকে। উনি ছাদে থিয়েটার এর আয়োজন করছেন। সারা রাত সিনেমা দেখবো।"
"এই না না।" আঁতকে উঠে বললাম।
"বাবা ঘরের বাহিরে থাকা পছন্দ করে না। রাতে যে করে হোক বাসায় ফিরতে হবে।"
"রাত তো এখন দেরী আছে। অন্তত বিকাল পর্যন্ত থাক। জন্মদিন এর আনন্দ টা কর ঠিকমত।"
সব বান্ধবীরা শোরগোল করে উঠলো।
"এই কি রে? আমরা আজ সবাই একসঙ্গে মজা করবো।" অন্যবান্ধবী রা যে যা সামনে পাচ্ছে হাতে নিয়ে দেখছে। আমি একটা বই নিয়ে ব্যালকনির দরজা নিয়ে বেরিয়ে এলাম পিছনের খোলা মাঠে। মাঠের এদিকে আসতে থমকে দাড়িয়ে পড়লাম কিছু লোক কফিন এর মত কাধে করে নিয়ে যাচ্ছে। এত কি আছে ভাবতে ভাবতে এগোতে একজন এর সাথে ধাক্কা খাওয়ার উপক্রম করলাম।
"এই তুমি কে? এখানে কেন?" কুটিল দৃষ্টিতে লোকটি জরীপ করছে আমাকে। বুকে ব্যাজ এ মনে হল সিকিউরিটি অফিসার বা পাহারাদার।
"ভিতরে যাও।" ধমকে লোকটি আবার আমাকে বলে। বারান্দা থেকে ভিতরের শাবজান এর রুম পর্যন্ত অনেকগুলি রুম পার হতে হল আমাকে। বড় ঘর। ধাধার মত লাগল আমার। এত এত ঘর। কিছুক্ষণ এ ঘর ও ঘর করতে করতে একসময়ে একটা রুম এ পৌছলাম যা দেখে অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র রাখার ঘর বলে মনে হল। কৌতুহলবশত এদিক ওদিক দেখতে লাগলাম। তখন একদিকের দরজা দিয়ে অ্যাপ্রোন পরিহিত মিষ্টার ব্যানার্জী বেরোতে গিয়ে চোখের কোনা দিয়ে দেখলো আমাকে। দেখলাম ওনার এক হাতে কয়টা ক্যানভাস আরেক হাতে রঙ তুলির বক্স।
"এই মেয়ে ষ্টোর রুমে কি করছো?" ধমকের ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো আমাকে। পরক্ষণে আবার একই সুরে একটু জরুরীর ভঙ্গিতে বললো আমার হাতের কিছু জিনিস ধর তো। আমি দৌড়ে ওনার হাতের ক্যানভাস ধরে ফেললাম। নাহলে পড়ে যাচ্ছিল।
"বাহ ধন্যবাদ। তোমার বডি রিফ্লেক্স তো বেশ ভালো। তুমি খেলাধুলা কর?" ঠোটের কোনে মুচকি হাসি।
এই মানুষ যে হাসতে পারে তা ধারনায় ছিলনা। হাসিতে মুখটা বেশ মোলায়েম হয়ে গেল ওনার।
"না এই ক্যারম আর লুডু খেলি।"
"শুধু ক্যারম আর লুডু!" শব্দ করে হেসে উঠলেন।
"ব্যাডমিন্টন খেলি মাঝে মাঝে বাবার সাথে।" বললাম আবার সাহসের সাথে।
"তাহলে একটা কাজ কর আমার অফিস রুম এর পাশের আরেক রুম আছে ওখানে যাও।"
"আপনার অফিস কোথায় জানিনা তো।" এবার আবার ভয় পেলাম একটু।
"না থাক ওখানে যাওয়া লাগবে না। হাতের জিনিস রাখ। এই ষ্টোর এ ব্যাডমিন্টন এর ব্যাট পাওয়া যাবে। চল খুঁজি।" উত্তেজনায় বলে উঠলেন তিনি।
কেন জানি আমার ভয় কেটে যেতে শুরু করেছে এখন। মনে হচ্ছিল ওনার এই রুক্ষতা লোক দেখানো। ভিতরের মানুষটি বরং স্নেহপরায়ন আর বন্ধুবৎসল বেশী। খূঁজতে খূঁজতে কিছুক্ষণের মধ্যে আমি দুজোড়া আর উনি এক জোড়া ব্যাট কর্ক ফেদার সহ পেয়ে গেলাম। খুশীতে আমরা দুজনে হাত তালি দিয়ে উঠলাম।
"চল একটু খেলি?" আমি একটু দ্বিধাগ্রস্ত শাবজান এর কথা ভেবে কি জানি ও কি মনে করে। ওর অভিভাবকের সাথে এই ঘনিষ্ঠতা।
"আচ্ছা শাবজানদের ডেকে আনি।" আমি সরে যাওয়ার চেষ্টা করলাম।
"আচ্ছা আমি শাবজানদের ডেকে পাঠাচ্ছি।" অসীম দ্রুততায় ব্যাডমিন্টন এর নেট লাগিয়ে ফেললেন মাঠে। তারপর আমার দিকে কর্ক ছুড়ে দিয়ে বললেন, "তুমি আগে।" একবার দুইবার করতে করতে আমাদের খেলা জমে উঠলো বেশ। এর মধ্যে সব বন্ধুরা সহ শাবজান ও চলে এল মাঠে।
"ওমা তুই কখন এখানে এলি? যে মানুষের ধার কাছে কেউ ঘেষেনা তার সাথে এত সুন্দর জমিয়ে ফেললি?" অন্য বান্ধবীরা তেরছা দৃষ্টি দিতে লাগলো আমার দিকে। বলাবাহুল্য আমার এই ঘনিষ্ঠতা তাদের ভালো লাগেনি। পরপর তিন গেম খেলেছি। দুটোতে আমি জিতেছি আর একটাতে উনি জিতেছেন। খেলা শেষে উনি আমার কাছে এসে পিঠে চাপড় মেরে বললেন,"Bravo তুমি তো সাংঘাতিক খেল।"
আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না উনি কি ইচ্ছে করে হারছিলেন ?আমি আজ জীবনের সবচেয়ে ভালো খেলা খেলছিলাম। খেলা শেষে তিনি ভিতরে চলে গেলেন।
"ব্যাডমিন্টন এ মিষ্টার ব্যানার্জী এই জেলার চ্যাম্পিয়ন।" অবাক বিস্ময়ে বলে এবার শাবজান।
"মনে হয় গরীব বান্ধবীকে জিতিয়ে তোকে খুশী করতে চাচ্ছেন।" এক বান্ধবী বিদ্রুপ করে বলে।
"না তা ও ওনার করার কথা নয়। কেননা এ নিয়ে ওনার অহংকার আছে। কেউ ওনার সাথে জিততে পারেনা।"
"তবে তো ভারী অদ্ভুত!" অদ্ভুত আজকে আমি কেন যে এত ভালো খেললাম! তারপর শাবজান বাকী তিন বন্ধুর সাথে খেলতে লাগলো। আমার ভীষন ক্লান্ত লাগছিল এখন।
"খুব ঘুম পাচ্ছে শাবজান। বাসায় চলে যেতে চাই।"
"না এখন যাওয়ার অনুমতি নাই। আমাদের সুইমিং পুল দেখলি না তো। শাবজান বলে। একটা কাজ কর। ভিতরে বিছানায় গিয়ে বিশ্রাম কর। আমি ভিতরের রুম খূঁজছিলাম বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। দোতলায় উঠে বারন্দায় দিয়ে শাবজান এর ঘরের দিকে যাওয়ার সময় দেখলো মিষ্টার ব্যানার্জী এক ইজেলে কি যেন দেখছেন গভীর মনোযোগ এর সাথে। চোখাচোখি হয়ে গেল ওনার সাথে।
"এই কি যেন নাম তোমার? চ্যাম্পিয়ন এদিকে আসো।" আমি হতবুদ্ধি হয়ে দৌড়ে এলাম ওনার কাছে।
"দেখ তো ছবিটি ঠিক আছে নাকি?" আমি হতভম্ব হয়ে ছবিটি দেখলাম। ইজেলে অবিকল আমার ব্যাট হাতে লাফ দেওয়া ছবি।
"তুমি বসে থাক তো এখানে। তোমার মুখটা এখন ও নিঁখূত হয়নি।" কি যন্ত্রনা। আমি এখন পালাতে পারলে বাঁচি। আবার শাবজান, অন্য বান্ধবীরা রুমে যাওয়ার সময় আমাকে দেখে বিস্মিত।
"এই তোমরা সব যাও। বিরক্ত করনা। পোর্টেট টা করছি। ও এখানে থাকবে। সবাই প্রায় পালিয়ে বাঁচলো। আমার অবস্থা ভারী করুণ। বন্ধুরা কি মনে করছে কে জানে। নড়াচড়া করা যাচ্ছেনা। টানা দুইঘন্টা মূর্তির মত বসে রইলাম। একজন সেক্রেটারী এসে উকি দিলেন। সাহস করে বলে ফেললেন " নীচে অতিথিরা অপেক্ষা করছেন। লাঞ্চ করবেন না? আপা বলছেন ওনার বান্ধবী কিছু খায়নি।
"ওর আর আমার খাওয়ার এখানে নিয়ে আস। পরক্ষণে কি মনে করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন "আচ্ছা যাও। লাঞ্চ করে নাও। আমি ডাকবো পরে। লাঞ্চ করতে এসে দেখি সবার মুখ গম্ভীর। এমনকি এখন ও শাবজান এর মুখ ও প্রসন্ন নয়।
"কি রে আমরা একসাথে ফান করবো। এখন তোকে ই পাচ্ছি না।"
"আমি কি করবো রে? তোর বাবা যদি আমাকে কোন ও কাজ করতে বলে, তোর বন্ধু হিসাবে বেয়াদবী করতে পারিনা তো।" আমার মুখ দিয়ে বেফাস কথা বেরিয়ে এল উত্তেজনায়।
"ও আমার বাবা নন।" শাবজান গম্ভীর গলায় বলে।
"তবে তোর বাবা?" আজ জিজ্ঞেস করে ফেললাম।
"তুই জানিস আমি বাবা মা সংক্রান্ত কথা বলা পছন্দ করি না।" এরপরে কিছুক্ষণের ছন্দপতন হল আমাদের দলে। শাবজান গোমড়া মুখ করে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে শুয়ে রইলো। অন্য বান্ধবীরা আমাকে উপেক্ষা করে নিজেদের মধ্যে গল্প করতে লাগলো। আমি একটা ওয়াশরুম দেখে ঢুকে পড়লাম। শরীর মন জুড়িয়ে গেল ঠান্ডা পানির স্পর্শে। এদের ওয়াশরুম টা দেখার মত। স্কয়ার ডিজাইনের ওয়াশরুম এ এক অংশে এক কাবার্ড তাতে টাওয়াল সহ প্রয়োজনীয় সরন্জামে পরিপূর্ণ। তার বিপরীত দিকে ছোট চৌবাচ্চা পানিতে পূর্ন। পাশে সাধারন ট্যাপ ঝরনা আরেক পাশে শৌচাগার এর অন্য সামগ্রী। ফ্রেশ হয়ে ভিতরে আসতে দেখলাম শাবজান এখন আবার চপল হাসিখুশী।
"এই তোর আবার খোঁজ পড়েছে। তাড়াতাড়ি লাঞ্চ শেষ করে যা। নাহলে রক্ষা থাকবে না।"
"কেন রে?" আমি স্নেহের স্বরে বললাম।
"উনি তো ভিতরে মোটেই রাগী নন।"
"কি জানি রে আমরা তো ছোটবেলা থেকে ওর বদরাগের সাথে অভ্যস্ত।" তাড়াতাড়ি নাকে মুখে দেওয়ার মত করে পাঁচমিনিটের মধ্যে দৌড়ে দোতলায় এলাম। উনি দেখলাম এর মধ্যে সকালের কোর্ট স্যূট খুলে পাঞ্জাবী ধূতি পরে নিয়েছেন। তাতে বেশ ছিমছাম আর কমনীয় দেখাচ্ছিল ওনাকে।
"বাহ তোমাকে তো এখন বেশ ফ্রেশ দেখাচ্ছে। মুখ ধুয়েছো তাই না?" আমার কাধ হাত দিয়ে সামনের চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। নিজের অজান্তে কেঁপে উঠলাম ভিতরে। এর পর মূর্তির মত বসে থাকা আর ও ঘন্টাখানিক। অপরাহ্ন শেষ হয়ে গেল এই ছবি আঁকা আঁকি আর নীচতলা দোতলা করে। এর পরে আমাদের বন্ধুদের আড্ডা যদি ও আর জমলো না। তারপরে বিকাল জলখাবার আর সুইমিং ঘুরে সেদিন ঘরে পৌছলাম রাত আটটায়। শাবনাজদের গাড়ী নামিয়ে দিল। আসার সময় মিষ্টার ব্যানার্জীকে আর দেখলাম না। গাড়ীতে দুনিয়ার জিনিস বোঝাই করে দিয়ে দিল। দরজা দিয়ে ঢুকতে শুনি বাবা চেচামেচি করছেন।
"আমি এসব পছন্দ করি না। সকালে গিয়েছে এখন রাত নয়টা দেখ কান্ড।" আমি তাড়াতাড়ি ঝট করে নিজের রুমে ঢুকে গেলাম বাবাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে। তাড়াতাড়ি কাপড় পরিবর্তন করে কিচেন এ এসে মাকে খূঁজছিলাম। মাকে কোথাও না পেয়ে বাহিরে ঘরের দিকে আসতে দেখতে পেলাম ঘরের মাঝখানে শাবজানদের দেওয়া সব জিনিস ঘিরে বাসার সবাই দাড়িয়ে।
"এই সব তোর বন্ধুর ড্রাইভার দিয়ে গেল।" বাবা ভাই বোন সবার চোখে মুখে বিস্ময়।
"কি করে ওর বাবা?" ভাই জিজ্ঞাসা করে।
"জানি না।" আমি সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলাম।
"এই সব কি তোমার বার্থডে উপলক্ষ্যে দিল?" ছোটবোন জিজ্ঞেস করলো এবার।
"তোর বার্থডে নাকি?" বাবা লজ্জা পেয়ে হাসলো। হ্যাপি বার্থডে অন্জু। আয় মা কাছে আয়। আশীর্বাদ করে দিই। বাবা জড়িয়ে ধরে দোয়া করে দিলেন ছোটবেলার মত। লজ্জা পেয়ে গেলাম। শাবজানদের ঘর থেকে প্রচুর খাওয়ার দিয়ে দিয়েছে প্রচুর ক্যান্ডি, চকলেট, আইসক্রিম সহ।
"দিদি আমাকে কয়েকটা চকলেট দিবে বন্ধুদের দিব?"
"এ সব তোদের। আমার কিছুই দরকার নেই।"
মা বোন সবাই সব প্যাকেট খুলে দেখছে। সবার মুখ আনন্দে ঝলমল করছে। আমার ভিতর টা ও হঠাৎ ই আনন্দে ভরে উঠলো আজ দিনের প্রতিটি মূহূর্ত মনে পড়ায়। এই আনন্দের কারন উপলব্ধি করতে লজ্জা আর অস্বস্তিতে ভরে উঠলো মন। কেমন যেন এক বিজাতীয় আকর্ষন অনুভব করতে লাগলাম শাবজান এর অভিভাবক অদ্ভুত রুক্ষ ধরনের মানুষটি মিষ্টার ব্যানার্জীর উপরে। সেই শুরু প্রথম দিন থেকে আরও পাঁচ বছর পার হয়ে গেল। পড়াশোনা শেষ করেছি। কাজ করছি মিষ্টার ব্যানার্জির কর্পোরেট অফিস এর হেড অব অ্যাডমিনিষ্ট্রেশান হিসাবে। এই জব শুরুর পর থেকে আমাদের সংসারে এক স্বাচ্ছন্দ্যের হাওয়া লেগেছে। বাবা রিটায়ার্ড করেছে আগের বছর। ওই স্থানে আমার পরের বোন এর জব হয়ে গেছে। মা বারবার বিয়ের তাগাদা দেয়। কেন জানি বিয়ের কথা শুনলে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠি। আমার সাথে মানানসই যে ধরনের ছেলেরা আমাকে বিয়ে করতে চায় তাদের আমার একটুকুন ও ভালো লাগেনা। দুইবছর আগে শাবজান এর বিয়ে হয়েছে বড় মেরিন ইন্জিনিয়ারের সাথে। এই দুই বছরে বাকী তিনবন্ধুর ও বিয়ে হয়ে গেল। আমাদের পাঁচজন এর গ্রুপে আমি রয়ে গেছি বিয়ের বাকী। মনে মনে প্রতিদিন ভাবি মিষ্টার ব্যানার্জীর বিয়ে দেখে তারপর না হয় মা বাবার কথামত একজনের গলায় না হয় মালা দিয়ে দিব। কিন্তু এই অদ্ভুতুড়ে লোকটিকে কখন ও না দেখা গেছে কোন মেয়ের সাথে না খবর পেয়েছি তার কোন ও সম্পর্কের ব্যাপারে।
অধ্যায়ঃ দুই
আমি অঞ্জলী চৈতন। শেষ নাম চৈতন বাবার কাছে থেকে পাওয়া জন্মসূত্রে। এ নাম নিয়ে বেশ কৌতুক হত বন্ধুদের আড্ডায়। এই চৈতনে আয়। আমার অন্যমনস্ক স্বভাব নিয়ে মজা করে বলা হত। ম্যানেজমেন্ট এ মাষ্টার্স করে এ বছর ই ব্যানার্জীদের বড় গ্রুপ অব কোম্পানীতে জয়েন করেছি পিআরও হিসাবে। একই সঙ্গে অফিসের সকল ধরনের ম্যানেজমেন্ট ও অ্যাডমিনিষ্ট্রেশান সম্পর্কিত কাজগুলি আমি দেখি। এই পজিশনে আগের ব্যাক্তি ছিলেন প্রবীণ একজন। তাকে সরিয়ে আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগ নিয়ে সারা অফিসে কিছুদিন তুলকালাম হয়েছিল। অফিসের অধিকাংশ ই ছিল এই বরখাস্ত আর আমার নিয়োগদানের বিপক্ষ্যে। এক অংশ ষ্ট্রাইক ও চলে গিয়েছিল। অবিলম্বে তাদের ও জব থেকে বরখাস্ত করা হবে এই ওয়ার্নিং এ সবাই জব এ ফিরে আসতে বাধ্য হলে ও আমার প্রতি কেউ তেমন প্রসন্ন ছিলনা। লাঞ্চ টাইমে সবাই ক্যাফেটারিয়ায় খাওয়ার রেওয়াজ। আমি খেতে গেলে সবাই সরে অন্যত্র গিয়ে বসত। দুপুর বেলায় আজ খেতে আসলাম ক্যাফেটেরিয়ায়। কোথাও খালি টেবিল না পেয়ে এক টেবিলে দুজনের পাশে বসতে বাধ্য হলাম। দুজন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়াল। এই সময় মিষ্টার ব্যানার্জী ক্যাফেটারিয়ায় এসে ঢুকলেন। অনুমতি না নিয়ে আমার সামনের চেয়ার দখল করে বসলেন। চারিদিকে ফিসফাস গুঞ্জন শুরু হল তাতে। উনি মুখ ঘুরিয়ে সবাইকে দেখতে লাগলেন। তাতে সবাই চুপ হয়ে গেল। আমার টেবিলে বসলে ও আমার সাথে কথা বললেন না একেবারে। খেয়ে কফির কাপটা হাতে নিয়ে চলে গেলেন। অফিসে অবশ্য ওনাকে স্যার বলার আদেশ দিয়েছেন। গত চারবছর ধরে আমি শিক্ষানবীশ হিসাবে সকল কাজ ই করে দিতাম। ওনার সকল হিসাব দেখতে দেখতে যাতে অনেক গড়মিল পেয়ে ওনাকে দেখাই। যার ফলশ্রুতিতে সিনিয়ার অ্যাডমিনকে বরখাস্ত করেন মিষ্টার ব্যানার্জী। এতে আমার আর মিষ্টার বানার্জীর কোন ও দোষ নাই। বরং এই সিনিয়র ম্যানেজার অফিসের অনেক টাকা গাফ করেছেন মিথ্যে খরচ দেখিয়ে। মিষ্টার ব্যানার্জী ব্যাস্ত থাকতেন ওনার ছবি আঁকা, এক্সিবিশান আর ট্যূর নিয়ে। না দেখে সব চেক সাইন করে দিতেন। চল্লিশ লাখ, পঞ্চাশ লাখ এর চেক সাইন করিয়েছেন জিনিস কেনার নাম করে সেসব জিনিস বস্তুত কেনা হয়নি। আমার ও অনেক খারাপ লেগেছে বয়স্ক লোককে বরখাস্ত করাতে।
"ওনাকে এক সপ্তাহের সাসপেন্ড করে আবার কাজে বহাল করা যায় না?" আমি বললাম বিবেচনার জন্য। কেননা অফিসের সবাই আমাকে ভিলেন বানিয়ে বসে আছে এ ব্যাপারে। আমি তো শুধু হিসেবের গড়মিল দেখিয়েছি।
"এই হচ্ছে মেয়েলী বুদ্ধি।" ওনার গতানুগতিক গা জ্বালানো কথাটি বললো। পরক্ষণে আমার হাত ধরে টেনে কাছের চেয়ার এ বসালো। বরাবরের মতই ওনার নির্দোষ স্পর্শে আমার শরীর কেঁপে উঠলো। একইসঙ্গে এই আচরনের জন্য বেশী জুড়ে আছি ওনার সাথে।
বললেন আবার ও,"শোন আমি জানি তোমার খারাপ লাগছে। এ কঠিন সিদ্ধান্ত বাবার বয়সী লোককে এভাবে জব থেকে অব্যাহতি দেওয়া। দেখ ওনার অন্যায় চিন্তা করলে জেল জরিমানা হওয়া উচিত। তা না করা ই মাপ করে দেওয়ার মতন। তোমাকে বলছি এই কাঠিন্য তোমাকে ও আজ থেকে আয়ত্ত করতে হবে। না হলে নিয়ন্ত্রন চলে যাবে তোমার হাতে থেকে। আজ এই অন্যায়ের শাস্তি ভবিষ্যতে আমার হিসাব বিভাগ আর প্রশাসন সতর্ক থাকবে যে ঠিকমত কাজ না করলে সাজা হবে।"
আমি তবুও বলার চেষ্টা করতে আবার ও উনি বলতে লাগলেন,"দেখ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, দেশ সব জায়গায় এই নীতি অনুসরন করবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। দূর্নীতি আর অন্যায়কে কখন ও প্রশ্রয় দিবে না।"
"তাই বলে কি কখন ক্ষমা বা মাপ জিনিসের কোন ও প্রয়োগ হবে না"? আমি তর্ক করার চেষ্টা করলাম তখন ও।
"ক্ষমা করেছি বলে ওনার জেল জরিমানা করিনি, চুরির টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলিনি।"
সেইদিন বিকালে ই আচমকা ম্যানেজার অ্যাডমিন এর জায়গায় আমার নিয়োগ দিলেন। এর আগে আমি কর্পোরাল সেক্রেটারীর মত ই কাজ করছিলাম। বেতনের অংক দেখে আমার মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সাড়ে সাত লাখ, এক গাড়ী ব্যাক্তিগত ব্যাবহারের জন্য তার সাথে আরও আড়াই লাখ ঔষধ, যাতায়াত এর জন্য। ঘরে সবার চক্ষু চড়ক গাছ।
"অঞ্জু তোর বেতন কি এরকম বেশী? না কি এই প্রতিষ্ঠান এর সকল এর বেতন উচ্চ পর্যায়ের?"
"সবার বেতন অন্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশী।" আমি বললাম খুশী হয়ে। জয়েন এর প্রথম দিন অফিস গিয়ে মিষ্টার ব্যানার্জীকে পেলাম না। শুনলাম থাইল্যান্ড ট্যূরে গিয়েছেন। নুতুন জব এ জয়েন এর আনন্দ দুর হয়ে গেল আমার মন থেকে ওনাকে না পেয়ে। একদিন, দুদিন পুরো সপ্তাহ আর ওনাকে পেলাম না। পরের সপ্তাহে অফিস ত্যাগ করার মূহূর্তে আচমকা দেখা হয়ে গেল মিষ্টার ব্যানার্জীর সাথে।
"এই যে অভিনন্দন। নুতুন কাজ কেমন চলছে মিস অঞ্জু?" হঠাৎ করে এভাবে দেখা হওয়ায় বুক আন্দোলিত হয়ে উঠলো আমার।
"চলছে। আপনার তো দেখা ই পেলাম না কয়দিন।" একটু অভিমান এর সূর গোপন রইলো না মনে হয় ওনার কানে।
"এই তো এলাম। চল চল।" তাড়া লাগাতে লাগলেন তিনি।
"কোথায়?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।
"তোমার নতুন জব এর উদযাপন আর মিষ্টি খেতে।" হেসে বলেন তিনি।
"মানে?" বুঝতে পারলেও না বোঝার ভান করলাম। বড় লিমোজিন গাড়ীর দরজা খুলে গেল। আমি ভিতরে ঢুকে বসতে পাশের দরজা খুলে আমার পাশে এসে বসলেন। বলা যায় গা ঘেষে ই বসলেন। আমার নিজেকে সিন্ডেরেলার মত মনে হল। ওনার অফিসের শত শত ঈর্ষাপরায়ন কৌতুহলী দৃষ্টির সামনে আমাদের গাড়ী পার হয়ে গেল। দিনটি লিখে রেখেছি ডায়েরীর পাতায় তারিখ, সময়, মূহূর্ত সহ। উনি যে এত বাচাল, এত কথা বলতে পারেন তা ওদিন ই জানলাম। পুরো সময় আমার কাছে স্বপ্নদৃশ্যের মত লাগছিল। উনি বলছিলেন তা ই শুধু অনুভব করছিলাম। কি বলছিলেন কিছু শুনছিলাম না। এক প্রচন্ড ঘোর আবেশে আমি আবিষ্ট হয়েছিলাম। উনি আমার এক হাত ধরে কথা বলছিলেন। চমৎকার এক মিউজিক হচ্ছিল সিডি প্লেয়ারে। তার সাথে গাড়ীর ভিতরে মাতাল করা কোলন এর সৌরভ ভেসে আসছিল ওনার শরীর থেকে। রেষ্টোরেন্ট এ খেতে বসতে উনি কথা বললেন বোমা ফাটানোর মত যদি এ শোনার জন্য আমার তৃষিত কান বহুকাল ধরে অপেক্ষায় ছিল।
"অঞ্জু আমার জীবনের ভার নিতে পারবে?"
"অর্থাৎ?" আমি কাঁপা গলায় বললাম।
"তুমি বলা যায় সেই প্রথম দিন থেকে আমাকে সামলে চলেছো। আমি চাই আমার সব কিছু এই সকল বিষয় সম্পত্তি, এমনকি আমার দেহ মন এর সব অধিকার তোমার হাতে সঁপে দিতে চাই। তুমি দেখেছো আমি বিষয় সম্পত্তি বুঝিনা। মানুষ আমাকে ঠকিয়ে যায়।"
আমি আবেগে ভেসে যেতে লাগলাম। আমি তো কবে হ্যাঁ করে বসে আছি। তা না বলে নীরবে চেয়ে থাকলাম ওনার দিকে।
"এবার আমি তোমাকে আমার জীবনের এক অজানা অন্ধকার দিক আজ শোনাতে যাচ্ছি যার পরে ই তুমি সিদ্ধান্ত নিবে আমার ভার নিতে ইচ্ছুক হবে কিনা?" আর আমার বয়সী শরীর মন যদি কনসিডার কর। বেশ উদগ্রীব হয়ে চাইলেন আমার দিকে।
আমি তাকিয়ে রইলাম ওনার দিকে তীব্র আবেগে। এরপর তিনি নিয়ে এলেন শহরতলীর এক ছোট বাড়ীতে। কলিংবেল টিপতে একজন পরিচারিকা ধরনের দরজা খুলে দিলেন।
"কি সব ঠিকঠাক তো?"
"না দাদা বাবু, আজ অনেক অশান্তি করেছেন দিদিমনি।" পরিচারিকাটি বললেন। এই দিদিমনিটি কে বুঝতে না পেরে সংশয়ে দুলে উঠলো বুক। ভিতরে রুমে গিয়ে দেখলাম একজন এলোমেলো চুলের পাগলিনীর মত বসে আছে বিছানায়।
"কে ইনি?" কাঁপা বুকে জিজ্ঞেস করলাম।
"আমার স্ত্রী।" আমাকে চমকে দিয়ে বললেন উনি।
"ঠিক দশ বছর আগে আজকের এই দিনে আমার দুইবছর এর ছেলে ষ্ট্রলার থেকে নেমে আচমকা হাটতে শুরু করে। আমাদের দুইজনের চোখের সামনে এই দানব ট্রাক আমার বাচ্চাকে……."
আর তিনি বলতে পারলেন না। কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লেন তিনি সামনের চৌকিতে। বাচ্চাকে বাঁচাতে ও দৌড়াতে গিয়ে মাথায় বাড়ি খায় ওর। সেই থেকে ওর ও বাকশক্তি, স্মৃতিশক্তি চলে গেছে চিরতরে। এখন ওর খাওয়া আর ঘুম ছাড়া কোন বোধ নাই। সেদিনের পর আর ও দশবছর পার হল। আজ পয়ত্রিশ বছর পূর্ণ হল। হ্যাঁ সেদিনের পর থেকে ওনার পুরো জীবনের দায়িত্ব নিয়েছি। না তখন ও আমরা বিয়ে করিনি। তাতে অসুবিধা বোধ করিনি। দিনশেষে উনি আমার দিকে যখন গভীর ভালোবাসা মিশ্রিত কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকাতেন বড় পরিতৃপ্ত বোধ হত। পরের বছর এর এক দিনে মিসেস ব্যানার্জীর দাহক্রিয়া হল।
"ভালো হল। এ কে তো বেঁচে থাকা বলে না।" ক্লান্তিতে আর বিমর্ষ হয়ে বললেন তিনি। সেই বছরের ডিসেম্বর এক বিকালে অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। আমি মিস অঞ্জু চৈতন থেকে মিসেস ব্যানার্জী হয়ে গেলাম। সময় গড়িয়ে আমরা প্রবীণ হয়েছি।
মিস্টার ব্যানার্জী আজ শততম বর্ষে পড়েছে। আমি পঁচাত্তরে পড়েছি। আমরা সেই যে বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি এরপরে একদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন হইনি। দুজন দুজন এর সঙ্গের প্রতি মুহূর্ত উপভোগ করি। আজকাল ও চোখে বেশ ভালো দেখতে পায় না। আমি ওকে বই পড়ে শোনাই। আজ পালন করেছি ওর শততম জন্মবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠান শেষে বসে আছি দুজন মুখোমুখি ওর প্রিয় ফায়ারপ্লেস এর স্থানটিতে। জিজ্ঞেস করে ও আমাকে মুচকি হাসিতে
"কি মিসেস ব্যানার্জী কোন ইচ্ছা কি এখন ও অপূর্ণ আছে? বলে ফেল এই মূহূর্তে তাড়াতাড়ি"
"ভাবছি।" আমি হেসে উঠলাম কপট ভঙ্গি করে।
-----------------------
Hosne Ara Arzu
40 Teesdale Place, Unit 1903
Scarborough, Ont, M1L1L3 Toronto
Canada

Comments
Post a Comment