খেলাঘর
অদিতি চ্যাটার্জি
শনিবার দিনটা সোহিনী ঠিক করেছিলেন গড়িয়াহাট যাবেন চৈত্র সংক্রান্তির সেল শুরু হয়েছে দিন দুই হলো, অন লাইনে কেনা কাটা করলেও ঐ বাড়ির পর্দা, কুশন কভার , বিছানার চাদর, দুটো কুর্তি গড়িয়াহাট থেকেই কিনবেন । দুটো দোকানে যাবেন, দশটা জিনিস হাতে নিয়ে দেখবেন, রঙবেরঙের মানুষ দেখবেন,তাঁদের গল্প কথা টুকরো টাকরা কানে নিয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরবেন । একা মানুষের একটা জমাটি শনিবার দিন কাটানো হবে। এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে অটো থেকে নামলেন বাসন্তী দেবী কলেজের সামনে। ভাড়াটা মিটিয়ে ফুটে উঠতেই প্রায় ধাক্কাই দিলেন একজন ভদ্রলোক কে সোহিনী । ব্যাগটা সামলাতে সামলাতে বললেন "আই অ্যাম সরি" কিন্তু একি!
চশমা চোখে জিনস আর হলুদ রঙের টি-শার্টে ভদ্রলোকটাকে তো চেনা চেনা লাগছে ভীষণ। আবারও কি সোহিনী ডুবছে ঐ খয়েরি চোখের মণিতে। কোনো খড়কুটো পাচ্ছে না তো আঁকড়ে ধরার মতো। ভদ্রলোকটিও থতমত খেয়ে গেছে, কত বছর পর! প্রায় কুড়িটা বছর পেরিয়ে সোহিনী কে দেখছে । সোহিনী তো! সেদিনের সেই ছটফটে মেয়েটা আজ বেশ শান্ত, অবাক করা চোখ দুটোর কি পরিবর্তন হয়েছে! মনে তো হয় না কোনো! সেই নিমগাছ তলায় বিকেল শেষে স্কার্ট টপে যে মেয়েটাকে দাঁড় করে রেখে সাইকেল নিয়ে চলে গেছিলেন আজ মনে হচ্ছে বাসন্তী দেবী কলেজের সামনে সেই দাঁড়িয়েছে এসে । এক্ষুনি বলে উঠবে " জিকো দা একটা কথা শুনবে?"
রানিকুঠির কাছে সরকারি আবাসনে চাকরি সূত্রে ফ্ল্যাট পেয়েছিলেন সোহিনীর বাবা। নব্বই দশকের বড় হওয়া সোহিনীর বিকেল গুলো অনেকটা বন্ধুদের জন্য থাকতো, যেদিন গানের ক্লাস থাকতো না কি পড়তে যাওয়া থাকতো না । ওরা জানতো আবাসনের জেঠু, কাকুরা শাসন করতে পারে। একটা শনিবারের কথা তো এখনো মনে আছে সোহিনীর , কিতকিত খেলা শেষ করে মাঠে বসে গোল হয়ে একটু গল্প করছে সোহিনী, আত্রেয়ী, মিশাদি , মামনি । শ্যামলদা ফুটবল খেলা শেষ করে ওদের সামনে এসে বলে গিয়েছিল, " এই সোনাই বাড়ি যা।" ক্লাস সিক্সের সোহিনী মোটেও রাগ করেনি , ওদের পাশের ফ্ল্যাটের শ্যামল দা ওকে বোনের মতোই ভালোবাসতো। মঞ্জু কাকিমা ভালো রান্না করলে দিয়ে যেতেন। তাই ভেবেছিল সোহিনী কে জানে ঐ জন্য হয়তো বাড়ি যাওয়ার আগে ডাকলো শ্যামল দা! কিন্তু কানে আসে মিশাদি আর মামনির গলা ওরা আত্রেয়ী কে ক্ষ্যাপা ছিল, " কি রে শ্যামল দা রকম বুদ্ধি করলো দেখলি ! গোলাপী আকাশের গোলাপী রঙ লেগে গিয়েছিল আত্রেয়ীর গালে। সোহিনী বুঝতে পারছিল না , আমাদের মা-রা তো বার বার শেখায় হাউজিং-র ছেলেরা আমাদের দাদা, ভাই কি বন্ধু । তাহলে ক্লাস নাইনের শ্যামল দা আর আত্রেয়ী এটা কি করলো! কিন্তু বোকা মেয়েটাও আরো বছর তিনেক পর মা-র সাবধান বাণী ভুলে খয়েরি চোখের মণিতে ডুবে যেতে যেতে বুঝেছিল আত্রেয়ী আর শ্যামল দা-র কিছু করার ছিল না, কিছু করার থাকে না । খেয়ালই ছিল না সামনে জিকোদা দাঁড়িয়ে, " কি রে কি দেখছিস? চল কোথাও বসি নাকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলবি এই ভিড়ে? " লজ্জাই পায় সোহিনী, ইসস দ্যাখো মনে মনে সেই কিশোরী বেলাতে চলে গেছি। আরে ভাই তুই একজন চাকরি করা বছর আটত্রিশের মহিলা কি সব খুকি গিরি করছিস! বকুনি দেয় নিজে কে ।
--" না না চলো হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি, তারপর না হয় বসবো। কাকু কাকিমা কেমন আছেন? বৌদি?"
একটু থেমে জিকো ওরফে সৌমিক বলেন , "মা বাবা ঐ সুগার হাঁটু ব্যাথা নিয়ে আছে। আর বৌদি! তুই বিয়ের খবরটা পেয়েছিলি না? ঐ আর কি বনলো না। ও দিল্লি চলে গেল, আর বিয়েটাও শেষ করে দিলাম। ভালোই আছি বুঝলি । চাকরি করি মজাসে আর ঘুরতে যাই আরমসে। তোর কথা বল? বিয়ে করলি? কাকিমা? কাকুর খবরটা শুনেছিলাম রে।"
--" মা তো গেছে বহরমপুরে, মাসির বাড়িতে । আমি একটা ব্যাঙ্কে আছি। ছুটির পেলে বন্ধু দের সাথে কি একা ঘুরতে যাই। ব্যস ।"
হাঁটতে হাঁটতে গোলপার্কের কাছাকাছি চলে এসেছে ওরা। সামনেই একটা বিখ্যাত রোলের দোকান । সোহিনীর জিকোদার খুব ইচ্ছে একটা করে এগরোল হয়ে যাক, সোহিনীর বুকের ভেতর তো হাজার হাজার ঘোড়া দৌড়াচ্ছে, না ও কেন বলবে! কিন্তু জিকো দার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতাও বেশি আর অবশিষ্ট নেই । বইয়ের দোকানে যেতে বলে সোহিনী , জিকো না বলে। সোহিনী জানতোই জিকোদা নিজের কাজের বই ছাড়া আর কিচ্ছু পড়ে না। এই কুড়ি বছরে পাল্টাবে আশাও করেনি।
জিকো দেখেন এই সোহিনী কি সেই সোনাই, যে শ্যামল কে ডাকতে আসলে কিছু বাহানায় বারান্দায় চলে আসতো। বিকেলে যখন ফুটবল খেলতো কি সাইকেল চালাতো দুটো চোখ যে লক্ষ্য রাখে বুঝতেন তিনি । মজাই পেতেন। আসলে কম বয়স আর সোহিনীর মা-র কড়া চোখ । সোনাই কে নিয়ে ভাবতে দেয়নি। যাদবপুরে পড়তে গিয়ে জীবনে এলো সঞ্চিতা । জীবন, কেরিয়ার সোনাই-র মতো নরম মেয়েটা কে অনেক দূরে সরিয়ে দিলো । রোল রেডি।
সৌমিক ডাকলেন, " সোনাই আয় রে, রোল রেডি"। কতদিন পর জোরে এই নামটা নিলেন সৌমিক, সেই শ্যামল দের ফ্ল্যাটে প্রথম দেখা ছোট চুলের ফর্সা ছটফটে মেয়েটা আজ কি ধীর , ঠোঁটে একটা মিষ্টি হাসি, কাছে আসলে মনে হয় এই মানুষটার ভরসা করা যায় বোধহয় ! রোলটা শেষ করে সৌমিক বললেন, " শোন না আমার তাড়া আছে, তোর নম্বরটা বল , সেভ করে মিসড কল দিচ্ছি , আমারটা সেভ কর। কাকিমা আসলে মা-র সাথে কথা বলাস। আর যোগাযোগটা রাখিস। "
চৈত্রের সন্ধ্যায় গড়িয়াহাট - গোলপার্ক ক্রসিংটার ভিড়, আওয়াজটা কি এক মুহূর্তের জন্য হলেও থেমে গেল ! বুঝতে পারলো না সোহিনী ।
'2471-8759' এই নম্বরে কতবার ফোন করেছে সোনাই আজ সারাদিনে দুইবার হবে, সামনেই উচচমাধ্যমিকের টেস্ট , কিন্তু পড়াতে কিছুতেই মন বসছে না । খুব ইচ্ছে করছে জিকোদার সাথে যদি একবার, একবার কথা বলা যায় কিন্তু কাকিমা ফোন ধরেছে। বাড়িতে তো গেল জিকোদা । ফোন ধরতে কি হয়! নাহ্ মামনি ঠিকই বলেছে , এইবার জিকোদা বলতেই হবে মনের কথাটা। কিন্তু যদি না বলে দেয়, যদি মা কে বলে দেয়, যদি হাউজিং-এ সবাই কে বলে দেয়! না না। মাথাটা চেপে ধরে সোনাই। চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে পড়ার টেবিলে এসে বসে ও। রেডিও টা এখানেই রাখা থাকে, ওন করে সোনাই। এফ এম ইয়েলোটা চালায়, সোনু নিগম গাইছেন সোহিনীর প্রিয় গান " হর পল ইয়াহা জি ভর জিও/ জো হ্যা সামা কল হো না হো...."
শুনতে শুনতে কেঁদেই ফেলে সোহিনী, গোটা ঘরে সোনু নিগমের স্বর সঙ্গ দিচ্ছে ওকে।
তারপর ...সেই নিম গাছ তলায় কত সাহস সঞ্চয় করে ডেকেছিল জিকো দা কে । জিকো দা মনে হয় জানতোই, হাসতে হাসতে বলেছিল" উচচমাধ্যমিকে মন দে আগে। রেজাল্ট খারাপ হলে চাঁটি দেবো।"
পরীক্ষার আগেই সোনাই দেখেছিল সঞ্চিতাদিকে, আত্রেয়ী শ্যামলদার কাছে শুনেছিল 'গার্ল ফ্রেনড'। নাহ্ সোনাই কাঁদেনি আর, তবে সেদিন আর পড়তে পারেনি। এফ.এম ইয়েলো চালিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করেছিল ।
আজ জিকোদা নিজে থেকে যোগাযোগ রাখার কথা বলে গেল, রাখবে যোগাযোগটা সোহিনী? বড় লোভ একদম নিজের খেলুড়ির সাথে খেলাঘর সাজাতে। সেখানে খেলতে। চেষ্টা করবে আবার? নাকি কুড়ি বছর আগের সোনাই -র প্রতিশোধ নিয়ে হয়তো নতুন গড়তে ওঠা খেলাঘরটা এক নিমেষে ভেঙে দেবে সোহিনী ?
ভাবতে থাকে ও....
Aditi Chatterjee
Ranaghat, Nadia

Comments
Post a Comment