প্রেমের গল্প
জুলি এবং আমি
মাখনলাল প্রধান
বাবার শেষকৃত্যের পরের দিন সকাল ৯টার সময় ডগ ক্সোয়াডের পরামর্শে আমি জুলির মৃত্যুর অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করেছিলাম।
ভাবছিলাম—মৃত মানুষের জিনিসপত্র যেমন গুছিয়ে রাখা হয়, তেমনই একটি জীবন্ত স্মৃতিকেও গুছিয়ে ফেল।
বাবা চলে গেছেন । অতীতকে অযথা বাড়াবাড়ি করতে দেওয়া ঠিক হবে না।
কিন্তু জুলি —ধূসর-সাদা হাস্কি, যার চোখে এমন এক নীরবতা, যেন সে পৃথিবীর সব শোকের ভাষা জানে, শুধু উচ্চারণ করে না। বসে আছে মানে স্মৃতিচারণ করছে , এমন একটা দৃশ্য আমি বরাবর সহ্য করতে প্রস্তুত ছিলাম না।
আমি বিশ্বাস করতাম, ও কেবল একটা কুকুর। কিন্তু সেই বিশ্বাসটা ভাঙতে শুরু করল যেদিন ও আমাকে প্রথম টেনে নিয়ে গেল।
সকালে গলায় দড়ি পরাতে গিয়ে দেখলাম, ওর কলার থেকে ঝুলছে একটা চামড়ার থলি।
রোদে বিবর্ণ, হাতে সেলাই করা।
ওটা যেন আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।
“চল,” আমি বললাম। “শেষবারের মতো।”
বাড়ির বাইরে পা রাখতেই জুলি থেমে আকাশের দিকে তাকাল।
সেই মুহূর্তে অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটল—সূর্যের আলো যেন সামান্য নেমে এসে ওর পিঠে বসে পড়ল। আমি শপথ করে বলতে পারি, আলোটা স্থির হয়ে ছিল।
ও আমাকে টানেনি। পথ দেখিয়েছে।
প্রথমে ক্যানেল রোডের অটো গ্যারেজ।
তেলের গন্ধে ভেজা এক মহিলা বেরিয়ে এলেন।
জুলিকে দেখে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।
তিনি থলির ভেতর টাকা ঢোকাতে গিয়ে ফিসফিস করলেন “আজও শুক্রবার।”
আমি অবাক হয়ে বললাম “কী?”
তিনি বললেন “তোমার বাবা বলতেন, কিছু কথা মুখে বলা যায় না। তাই ওকে পাঠাতেন।”
আমি দেখলাম, টাকা ঢোকানোর সঙ্গে সঙ্গে থলিটার ভেতর থেকে এক মুহূর্তের জন্য নরম নীল আলো বেরোল—ঠিক যেমন শীতের রাতে দূরের জানালায় দেখা যায়।
আমি চোখ কচলালাম। আলো নেই।
তারপর বাসস্টপ।
স্কুল ইউনিফর্ম পরা একটি কিশোরী, কাঁধ শক্ত, চোখে ক্লান্তি ।
জুলিকে দেখেই সে কেঁদে ফেলল যেন বহু প্রতীক্ষিত এই সাক্ষাৎকার ।
জুলি একদম স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
মেয়েটা ফিসফিস করে বলল “আজ আমি ভয় পাইনি।”
আমি দেখলাম, ওদের চারপাশে বাতাস যেন একটু ঘন হয়ে গেছে—কেউ কথা বলছে না, তবু শব্দ আছে। হয়তো সাহসের শব্দ এমনই হয়।
বাস ড্রাইভার আমাকে বলল “ওই থলিতে শুধু টাকা না , চিরকুটও থাকে। আজ খুলে দেখবেন।”
আমি তখনও বিশ্বাস করতে চাইছিলাম না। কিন্তু দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো জুলির পেছনে পেছনে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম , অদ্ভুত সব মানুষের কাছে।
কুদঘাটে এক রাঁধুনি—তার হাঁড়ির ভেতর হঠাৎ খাবার বাড়তি হয়ে যায়, যতবার জুলি বসে থাকে পাশে।
হরিদেবপুরে এক ভিটেহারা—তার মুদি দোকানের খাতায় হঠাৎ পাওনাদারের নাম মুছে যায়, কেউ জানে না কীভাবে।
নাকতলায় কবি সুপ্রিয় বাগচি—তিনি পড়তে পড়তে থেমে যান, কারণ জুলি পাশে বসলে তার কবিতার লাইনগুলো নিজেরাই ছন্দ খুঁজে পায়।
প্রতিবারই থলির ভেতর থেকে মৃদু উষ্ণতা বেরোয়।
আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম—ওটা কোনো বস্তু নয়। ওটা একটা সঞ্চিত হৃদস্পন্দন।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে ফিরতে আকাশের রঙ বদলে যাচ্ছিল।আমার মাথা ঘুরছিল।
রাতে জ্বর এলো। তারপর অন্ধকার।
দীর্ঘ দু’মাস আমি কোমায় ছিলাম—এ কথা পরে শুনেছি। কিন্তু আমার কাছে সেই সময়টা কেটেছে এক অদ্ভুত স্বপ্নে।
স্বপ্নে দেখতাম, জুলি শহরের রাস্তায় হাঁটছে।
যার দরজায় থামে, সেখানকার বাতাস একটু উষ্ণ হয়ে যায়।
যে মানুষ ওর মাথায় হাত রাখে, তার বুকের ভেতর জমাটবাঁধা বরফ গলে জল হয়ে নামে।
আর প্রত্যেকবার কেউ থলির ভেতর কিছু ঢোকালে—টাকা, চিরকুট, কিংবা কেবল একটি দীর্ঘশ্বাস—সেটা রূপ নিত ছোট্ট আলোককণায়।
সেই আলোককণাগুলো ভেসে ভেসে এসে হাসপাতালের জানালায় জমত।
তারপর সেখান থেকে সাদা আলো হয়ে ঢুকে পড়ত আমার শরীরে।
আমি জানতাম না—আমি বেঁচে আছি কারণ মানুষ আমাকে ভালোবাসে,
নাকি আমি বেঁচে আছি কারণ এক কুকুর তাদের ভালোবাসতে শিখিয়েছে।
চোখ খুলে প্রথম যাকে দেখলাম, ডাক্তার বললেন “চিন্তা করবেন না। জুলি আছে।”
হঠাৎ বাড়ির কলিং বেলটা বেজে উঠল ।
বাইরে গাড়ি। আমি ক্ষমা চেয়ে নিলাম।
সেই পশুচিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করে দিলাম।
জুলির গলা থেকে থলিটা খুলতে গিয়ে আমার হাত কাঁপছিল।
ভেতরে শুধু টাকা নয়।
ছিল অসংখ্য ভাঁজ করা চিরকুট।
আর একদম নীচে—বাবার হাতের লেখা এক লাইন: “আমি যদি বলতে না পারি, ও বলে দেবে।”
থলির তলা ছুঁতেই বুঝলাম—ওটা উষ্ণ।
যেন এখনও কেউ হৃদস্পন্দন রেখে গেছে।
আমি কবে দিল্লি ছেড়ে দিয়েছি।
গড়িয়ার খালপাড় ধরে প্রতিদিন সকাল ৮টায় আমি আর জুলি হাঁটি।
লোকেরা আমাকে অভিবাদন জানায়।
কেউ কেউ চুপচাপ এসে জুলির মাথায় হাত রাখে।
কখনও কখনও কেউ ওর গলায় নতুন চিরকুট গুঁজে দেয়।
আর আমি লক্ষ্য করি—যেদিন কোনো মানুষ সত্যিই ভেঙে পড়ে, সেদিন জুলি নিজে থেকেই তার পাশে গিয়ে বসে।
ও কথা বলে না। তবু বাতাস বদলে যায়।
আমি এখন জানি—বাবা 'ভালোবাসি'
বলতে জানতেন না।
তাই তিনি তাকে রূপ দিয়েছিলেন চারটে পায়ে, নীল চোখে, আর একটি ছোট চামড়ার থলিতে।
জুলি কেবল কুকুর নয়। সে এক চলমান উত্তরাধিকার—যেখানে শোক আলো হয়ে ওঠে, আর ভালোবাসা কখনও মরে না, শুধু রূপ বদলায়।
আর মাঝে মাঝে, খুব ভোরে, আমি স্পষ্ট শুনতে পাই—বাবার গলা নয়, কিন্তু জুলির নিঃশ্বাসের ভেতর দিয়ে ভেসে আসে সেই কথা—“আমি আছি।”
....................................
Makhan Lal pradhan
Sukantapally, boral
Kol 700154

Comments
Post a Comment