গুচ্ছ কবিতা
অভিজিৎ হালদার
হলুদ প্রহরের দীর্ঘশ্বাস ও অবিনশ্বর দহন
শহরের প্রতিটি ইটের পাঁজরে আজ পলাশেরা উদ্ধত রক্তিমতায় জেগে উঠেছে, যেন কোনো এক প্রাচীন যুদ্ধের বিজয় নিশান। আমি সেই চেনা গলির মোড়ে আজও খুঁজি সেই বিশেষ হলুদ প্রহরটি, যা একদা তোমার বাসন্তী শাড়ির ভাঁজে আর চঞ্চল হাসিতে মিশে ছিল। বসন্ত কি তবে কেবল বৃক্ষের নতুন করে সেজে ওঠা? নাকি এটি এক প্রচ্ছন্ন নীল বেদনা, যা হৃদয়ের নির্জনতম কোণে গোপনে জলসিঞ্চন করে ক্ষতকে সতেজ রাখে?
প্রিয়তমা, এই যে দক্ষিণা বাতাস আজ অবাধ্য হয়ে বয়ে যাচ্ছে চারিপাশে— তাতে তোমার চুলের সেই পরিচিত ঘ্রাণ নেই, বরং আছে এক অস্থির বিচ্ছেদের হাহাকার। প্রেমিক আজ ভিড়ের মাঝেও একা, কারণ সে জানে এই রঙের উৎসবে তার কোনো অংশীদার নেই। প্রতিটি ঝরা পাতা যেন একেকটি না-বলা চিঠির বয়ান, যা মাটির বুকে আছড়ে পড়ে গুমরে মরে। এই হলুদ দহন থেকে মুক্তির কোনো পথ নেই, কারণ বসন্ত নিজেই এখানে দাহনকারী।
নীল ডায়েরির পাতায় বিমূর্ত বিরহগাথা
অভিজিতের কলম আজ থমকে গেছে এক অলীক শূন্যতার কিনারে, যেখানে শব্দেরা আর ছন্দ মেলাতে চায় না। বসন্তের এই প্রথম ভোরে সে আর প্রেমিকার কোমল হাত ছোঁয় না, বরং তার সেই বিখ্যাত নীল ডায়েরির পাতাগুলো ওল্টায় নিভৃতে। সেখানে জমা হয়ে আছে বহু বসন্ত আগেকার শুকনো শিউলির ঘ্রাণ আর ধুলোবালি। যেখানে প্রেম ছিল এক রাজকীয় উপাখ্যান, আজ সেখানে বিরহ হলো একমাত্র অমোঘ পরিণতি।
হলুদ পাঞ্জাবিটা আজ আলনার এক কোণে ধুলো মাখে, যেন একাকীত্বের দীর্ঘ মিছিলে সে এক ক্লান্ত সৈনিক। প্রেমিক আজ নিজের ছায়া দেখেও আঁতকে ওঠে, কারণ সেই ছায়ায় প্রিয়তমার কোনো অবয়ব আর মিশে নেই। বসন্ত এখানে এক নিষ্ঠুর জাদুকর, যে পুরনো স্মৃতিগুলোকে রঙিন আবির দিয়ে ঢেকে দিতে চায়, কিন্তু কবির ডায়েরির নীল রঙ সেই আবিরকে বারবার ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়।
কৃষ্ণচূড়ার রক্তক্ষরণ ও এক মরীচিকার শহর
তুমি কথা দিয়েছিলে ঠিক এই বসন্তেই ফিরবে, যখন কৃষ্ণচূড়া তার সর্বস্ব দিয়ে আকাশ ছোঁয়ার নেশায় মাতবে। অথচ আজ ডালজুড়ে শুধুই আগুনের ফুলকি, তোমার পদধ্বনির বদলে আমি শুনি কেবল শুকনো পাতার মর্মর করুণ ধ্বনি। প্রেমিকের বিষণ্ন চোখে আজ মহুয়া ফুলের নেশা নেই, বরং আছে এক অন্তহীন প্রতীক্ষার ধূসর প্রলেপ। রাস্তার ধারের প্রতিটি ল্যাম্পপোস্ট যেন এক একজন হলুদ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বিচ্ছেদের।
আমাদের সেই প্রেম ছিল বসন্তের কোনো এক বিমূর্ত কবিতার মতো— যা পাঠ করা যায় অনায়াসেই, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত হাহাকার বুঝতে হলে বুকের পাজর পোড়াতে হয়। প্রিয়তমা, তুমি কি জানো? এই শহরে এখন মরীচিকার চাষ হয়। যেখানে তোমার শাড়ির আঁচল উড়ছে বলে ভ্রম হয়, আসলে সেখানে বসন্তের বাতাস ধুলো উড়িয়ে খেলা করে। এই মরীচিকায় তৃষ্ণা মেটে না, শুধু বাড়তে থাকে বেঁচে থাকার ক্লান্তি।
ঋতুরাজের সিংহাসনে একাকী বিচ্ছেদের রাজত্ব
সবাই বলে ঋতুরাজ বসন্ত নিয়ে আসে আনন্দের জোয়ার, চারদিকে প্রাণের স্পন্দন আর কুহুতান। কিন্তু আমি দেখি এ এক চরম এবং নিপুণ নিষ্ঠুরতার উৎসব। এখানে প্রতিটি নতুন কুঁড়ি মনে করিয়ে দেয় ফেলে আসা কোনো হারানো ক্ষতের কথা, প্রতিটি পলাশের লাল রঙ যেন প্রেমিকার সেই শেষ বিকেলের অভিমানী ঠোঁটের রক্তিম আভা। এই ঋতুতে সব কিছু নতুন হয়, শুধু আমাদের পুরনো দুঃখগুলো আরও বেশি প্রগাঢ় হয়ে ওঠে।
প্রেমিক আজ এক যাযাবর পথিক, যে জনসমুদ্রের মাঝেও খুঁজে ফেরে সেই একটি নির্দিষ্ট মুহূর্ত— যখন পৃথিবীর সমস্ত রঙ, সমস্ত আলো কেবল আমাদের দুজনের জন্যই বরাদ্দ ছিল। প্রিয়তমা আজ অন্য কোনো আকাশের নক্ষত্র, আর প্রেমিক এই ধুলোবালি মাখা পৃথিবীর এক নিঃসঙ্গ প্রহরী। বসন্তের এই সিংহাসন আজ শূন্য, কারণ রাজত্ব করার মতো কোনো প্রেম আর অবশিষ্ট নেই, রয়ে গেছে শুধু স্মৃতির কঙ্কাল।
শেষ বসন্তের পাণ্ডুলিপি ও এক বুক নীল বেদনা
প্রিয়তমা, যদি কোনোদিন কোনো এক উদাস হলুদ বিকেলে পথ ভুলে তুমি ফিরে আসো এই চেনা প্রাঙ্গণে, তবে দেখবে আমি আজও সেই জীর্ণ শিমুল তলায় অবিকল দাঁড়িয়ে আছি। আমার হাতে আজ দেওয়ার মতো কোনো তাজা গোলাপ নেই, নেই কোনো সুগন্ধি উপহার; আছে শুধু এক বুক অতল নীল বেদনা— যা এই বসন্তের উজ্জ্বলতম রঙকেও মুহূর্তে ম্লান করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
আসলে প্রেম ছিল এক ঋতু পরিবর্তনের সংক্ষিপ্ত খেলা মাত্র, যেখানে সময়ের সাথে সাথে রূপ বদলায় আবেগ। প্রেমিক ফুরিয়ে যায় নিঃশব্দে, কিন্তু তার হাহাকার রয়ে যায় বসন্তের উদাস বাতাসে। কবির শেষ কবিতায় তাই কোনো মিল থাকে না, থাকে কেবল এক অসমাপ্ত দীর্ঘশ্বাস। বসন্ত আসে, বসন্ত যায়— শুধু নীল ডায়েরির পাতায় অমর হয়ে থাকে তোমার দেওয়া সেই বিচ্ছেদের উপহার।
লেখক পরিচিতি:-
লেখক অভিজিৎ হালদার-এর জন্ম নদীয়া জেলার অন্তর্গত মোবারকপুর গ্রামে ২০০১ সালের ১লা সেপ্টেম্বর।
পিতা কার্ত্তিক হালদার ও মাতা আরতি হালদার।
প্রাথমিক শিক্ষা মোবারকপুর প্রাইমারী বিদ্যালয়, মাধ্যমিক শিক্ষা ভাজনঘাট উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, সুধীরঞ্জন লাহিড়ী মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং বর্তমানে আই টি আই এর ছাত্র।
লেখালেখির সূএপাত: স্কুল জীবন থেকে। লেখালেখি:- বিভিন্ন – পএ পত্রিকা, ম্যাগাজিন , ওয়েবজিন, ফেসবুক পেজ/ ফেসবুক গ্রুপ, ব্লগসাইট, ওয়েবসাইট, অনলাইন প্লাটফর্ম, এছাড়া বিভিন্ন ফোরামে।
প্রথম বই: "প্রথম আলো "
পেশা ও পরিচয়: তরুণ কবি, গল্পকার, উপন্যাসিক, গীতিকার, লেখক ও অন্যান্য।
সাহিত্যিক ধারা: আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক কবিতা, প্রেম ও বিরহ, অস্তিত্ববাদী ভাবনা, গ্রামীণ ও শহুরে জীবনচিত্র , বাস্তববাদী, দার্শনিক চিন্তাধারা, কল্পনাবিলাসী , রূপকথা , বাস্তব পেক্ষাপট ও সমসাময়িক।
বিশেষ উক্তি:
"এই শহরকে ভালো না বেসে যদি আমি চাঁদের মাটিকে ভালোবাসতাম
তবে আমি নীল ডায়েরি না হয়ে নীল আর্মস্ট্রং হতাম।"

Comments
Post a Comment