
ভালোবাসা প্রাইভেট লিমিটেড
অভীক চন্দ্র
প্রেম আসলে একটা স্টার্টআপ। পার্থক্য শুধু এই যে, এখানে আইডিয়া পিচ করতে হয় না; চোখের দৃষ্টি পিচ করলেই কাজ শুরু। বিনিয়োগকারীরা অদৃশ্য, কিন্তু ঝুঁকি একেবারে দৃশ্যমান। লাভ-লোকসানের হিসেব মেলাতে গেলে ক্যালকুলেটরের বদলে দরকার হয় টিস্যু।
প্রথমে আসে 'আইডিয়া স্টেজ'। বাসে, লাইব্রেরিতে, অফিসের কফি মেশিনের সামনে হঠাৎ করে মনে হয়, "এই মানুষটিকে ছাড়া পৃথিবীটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা!" এই ভাবনাটাই হলো মিনিমাম ভায়াবল্ প্রোডাক্ট। এরপর শুরু হয় মার্কেট রিসার্চ। সে কী খায়, কী দেখে, কার পোস্টে লাইক দেয়। প্রাচীন যুগে মানুষ নক্ষত্র দেখে ভাগ্য বিচার করত; আধুনিক প্রেমিক তার টাইমলাইন দেখে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
তারপর আসে ফান্ডিং রাউন্ড। এখানে বিনিয়োগ হল সময়, ঘুম আর আত্মসম্মান। "না না, আমি এমনিই অনলাইনে ছিলাম," এই বাক্যটি হলো প্রেমের প্রথম ভুয়ো ব্যালেন্স শিট। ঘুম কমে যায়, চার্জারের প্রয়োজনীয়তা বাড়ে। মোবাইলের ব্যাটারি যেমন দশ পার্সেন্টে নামলেই লাল সতর্কতা দেখায়, তেমনই প্রিয়জনের 'সিন' হয়ে উত্তর না এলে হৃদয়ে লাল বাতি জ্বলে ওঠে।
প্রেমের সিইও আসলে কেউ নয়, দুজনেই ইন্টার্ন। একজন ভাবে, "আমি বেশি ভালোবাসি।" অন্যজন ভাবে, "না, আমি-ই বেশি।" এই 'বেশি' শব্দটাই হলো কোম্পানির মূল শেয়ার। মাঝে মাঝে বোর্ড মিটিং বসে, যাকে গোদা বাংলায় আমরা বলি ঝগড়া। সেখানে পুরোনো স্ক্রিনশট, পুরোনো কথা, এমনকি মান্ধাতার আমলে করা একটি 'ঠিক আছে' মেসেজও প্রমাণ হিসেবে হাজির হয়।
প্রেমের আরেকটা দিকও আছে। এটা একটা সাবস্ক্রিপশন সার্ভিস। মাসিক রিনিউ না করলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া অবধারিত। এখানে রিচার্জ হলো ছোট ছোট যত্ন। এক কাপ চা এগিয়ে দেওয়া, হঠাৎ করে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই বলা "আজ তোমায় দেখতে খুব সুন্দর লাগছে" বা কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই একটা ফোন কল। যে সম্পর্ক নিয়মিত রিচার্জ পায় না, সেটা ধীরে ধীরে 'আউট অফ কভারেজ' হয়ে যায়।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, প্রেমে সবাই নিজেকে প্রথম প্রথম ইউনিক ভাবে। "আমাদের গল্পটা অন্যরকম," এটা পৃথিবীর অন্যতম সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত টেমপ্লেট। অথচ গল্পের কাঠামো প্রায় একই; দেখা, কথা, আশা, অভিমান, মিল, আবার আশা। যেন একই নাটকের আলাদা আলাদা কাস্ট।
তবু প্রেমকে আমরা ছাড়ি না। কারণ এটা একমাত্র স্টার্টআপ, যেখানে দেউলিয়া হলেও মানুষ আবার নতুন করে শুরু করতে চায়। কেউ কেউ আগের কোম্পানির অভিজ্ঞতা নিয়ে আরও দক্ষ হয়, কেউ আবার একই ভুলকে নতুন নাম দেয়।
প্রেম তো লাভের ব্যবসা নয়, অভিজ্ঞতার। এখানে ব্যর্থতাও স্মৃতি হয়ে থাকে, আর স্মৃতিই হল সেই শেয়ার, যা কখনও পুরোপুরি শূন্যে নামে না।
প্রেমকে আমরা খুব ব্যক্তিগত ভাবি। কিন্তু এক্ষেত্রেও যথেষ্ট সন্দেহ আছে, তাই একে একটা সামাজিক ষড়যন্ত্র বলা যায়। ছোটবেলা থেকে গল্পে, সিনেমায়, গানে, সব জায়গায় প্রেমকে এমনভাবে পরিবেশন করা হয়, যেন এটা ছাড়া জীবন অসম্পূর্ণ। যেন বার্থ সার্টিফিকেটের পরেই আরেকটা সার্টিফিকেট থাকা উচিত ছিল; অমুকের নাম, আর তলায় তমুকের 'ভবিষ্যৎ প্রেমিক বা প্রেমিকা।' অবশ্য মর্ত্যবাসীদের পক্ষে তো দ্বিতীয় নামটা তখনই জানা সম্ভব নয়।
স্কুলে যখন অ্যালজেব্রা শিখেছিলাম, কেউ বলেনি যে জীবনে 'এক্স' মানে অজানা প্রেমও হতে পারে। তার ভ্যালু একেকজনের কাছে একেকরকম হতে পারে। কলেজে গিয়ে হঠাৎ দেখি, চারপাশে সবাই যেন গোপনে কোনো ক্লাবে ভর্তি হয়েছে। কারও হাতে ফুল, কারও মুখে কবিতা, আর যারা একা তারা সন্দেহভাজন, "তোর কিছু চলছে না?"
প্রেমের সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্র হল, সে মানুষকে রাতারাতি সাহিত্যিক বানায়। যে ছেলেটি জীবনে কোনোদিন কবিতা লেখেনি, সেও অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাসে ভর করে হঠাৎ লিখে ফেলে, "তোমার চোখে সমুদ্রের নীল।" যে মেয়েটি সারা বছর কারও খোঁজ নেয় না, সে হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করে, "খেয়েছ?" এই 'খেয়েছ' শব্দটি বাংলার সবচেয়ে ছোট্ট কিন্তু গভীর প্রেমপত্র।
প্রেমে পড়লে নাকি মানুষ গোয়েন্দাও হয়ে যায়। প্রিয়জনের কণ্ঠের সামান্য ওঠানামা থেকেও সন্দেহের থিসিস তৈরি হয়। "আজ তোমায় একটু অন্যরকম দেখাচ্ছে," এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে পাঁচ অধ্যায়ের বিশ্লেষণ।
শেষ পর্যন্ত বুঝি, প্রেম কোনো সমাধান নয়, অনেকগুলো প্রশ্নের এক হয়ে বেঁচে থাকা। "তুমি কি আমার পাশে থাকবে?" এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই মানুষ এত নাটক, এত কবিতা, এত ঝগড়া করে। প্রেম হয়তো সবার জন্য স্থায়ী নয়, কিন্তু প্রেমের চেষ্টা চিরন্তন।
আর কেউ যদি এই লেখা পড়েন, তিনি হয়তো ভাববেন, "এ তো প্রেম নিয়ে রীতিমতো ইয়ার্কি!" কিন্তু একটু গভীরে গেলে দেখবেন, আমরা হাসতে হাসতেই স্বীকার করছি যে প্রেম ছাড়া মানুষ সম্পূর্ণ যুক্তিবাদী হয়ে যেত, আর পৃথিবীটা হতো ভীষণ নীরস।
তাই প্রেমকে দোষ দিই, ঠাট্টা করি, যাই করি; তবু মনে মনে চাই, আবার যেন একটু ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়ি!
=============
অভীক চন্দ্র, তোলাফটক, চুঁচুড়া, হুগলী – ৭১২১০১
Comments
Post a Comment