আবার বছর কুড়ি পরে
তপন তরফদার
বছর কুড়ি আগের ঘটনা। পুরঞ্জনের চোখের সামনে নানা ঘটনা জলছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠে। মাঠ থেকে ধান কেটে উঠানে রাখা হয়েছে। আগামীকাল থেকে মাড়াই করা শুরু হবে। হঠাৎ কালো মেঘে আকাশ ঢেকে গেল।শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি।বৃষ্টির তোড়ে সব ধান লন্ডভন্ড হয়ে যায়। এক দুঃসহ বছর কাটাতে হয়েছিল ওদের। অসময়ের বৃষ্টি কতটা ক্ষতিকারক তা হাড়ে হাড়ে টের পায় তারাই যাদের ক্ষতি হয়।
আজকাল অনিয়মই যেন নিয়ম হয়ে যাচ্ছে। ঋতু অনুযায়ী বৃষ্টি হচ্ছে না, শীতের ও দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। কার্তিক মাসের শেষে এমন ভাবে মুশলধারায় বৃষ্টি হতে পারে তা ভাবাই যায় না। আকাশ জুড়ে কালোমেঘের ছাউনি।
কালো মেঘগুলো পাখির মতো ডানা মেলে সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়েছে। বৃষ্টির
রিমঝিম শব্দের অনুরণন। সোঁদা মাটির গন্ধ, সবুজ গাছগাছালির নির্জন নগ্ন স্নান।
অকৃতদার পুরঞ্জনের চোখ জানালা দিয়ে দূরের রেল লাইনের দিকে। রেল লাইনের পাশের নয়নজুলি- পানা, শ্যাওলা, ফণীমনসায় পরিপূর্ণ। একটা লম্বা মালগাড়ি ধিকিধিকি শব্দ তুলে এগিয়ে চলেছে। এই সময়েই সুচেতনা বলে - স্যার, জীবনানন্দ সম্বন্ধে কিছু বলবেন বলেছিলেন।
পুরঞ্জন পাঁশকুড়ার বনমালী কলেজের পাশে পাল পাড়ায় ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে এবং টিউশনি করে। একাই থাকে। আগে হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা ছিল, এখন স্টেশনের পাশে পাইস হোটেলে গিয়ে পেট ভরায়।
সুচেতনা, ওই বনমালী কলেজেই বাংলায় অনার্স নিয়ে পড়ে। পুরঞ্জনের
ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলে এই সুচেতনা যেন কত জন্মের চেনা। পুরঞ্জন মনে করে অনেক
সময়ে ওই ষষ্ঠেন্দ্রিয়র কৃপায় নিজেকে বাঁচাতে পেরেছে। অনেক দিন বাদে
সুচেতনা পড়তে এসেছে। কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই বলেছে, "অসুখ করেছিল।" গত মাসের টাকাটা খামে ভরে দিয়েছে। পুরঞ্জন সুচেতনাকে বলে তুমি থেকে যাবে।
তুমি যে সময়টায় আসনি, ওদেরকে 'জীবনানন্দের কাব্য' পড়িয়েছি, তোমাকে ওপড়িয়ে দেবো - নোটও দেবো। পুরঞ্জনের ষষ্ঠেন্দ্রিয় ভাবতে শুরু করে ওকে একা পড়াবে - যদি কিছু হয়ে যায়। পানপাতার মতো মুখ, যামিনী রায়ের আঁকা দিঘলচোখ। ওই দিঘির চারপাশে নারকেল বীথির মতো ঘন, শান্ত আঁখি পল্লব। ভ্রমরকালো চোখের দিকে তাকালে মনে হয় কত চেনা। তৃষ্ণার্ত ছ তৃষ্ণা নিবারণ করবে। মনের অজান্তেই যদি সুচেতনার পুরুষ্টু মোহময়ী টসটসে গোলাপি ঠোঁট জোড়ার দিকে এগিয়ে যায়। একটা মানুষের দুটো দিক। পজিটিভ আর নেগেটিভ। জীবন যে বড়ই অনিত্য, এই গূঢ়ার্থকথন অনেকেই সঠিক সময়ে ভুলে যায়। পুরঞ্জয়ের সিক্সথসেন্স ধাক্কা দেয়, ও হাসিকে বলে তুমিও থাকবে - দুজনে একসঙ্গে যাবে।
এখন হাসি আর সুচেতনা। বৃষ্টির শব্দই জোরালো। জীবনানন্দের "অপ্রাপণীয়ার সোনালি স্তন, চাঁদের মতো চন্দ্রাহত" লাইনটা মনে পড়ে যায় পুরঞ্জয়ের। মনে মনে বলে অসময়ে 'এমনও বরিষনে' নিজেকে সংযত রাখাই একান্ত প্রয়োজন। একবার তো পারেই নি - সেই ক্ষত এখনও দগদগে হয়ে স্মৃতিতে ভেসে ওঠে।ওই ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের সিদ্ধান্তই হাসিকে বলেছে থেকে যেতে - যাতে কোন অনর্থ না হয়। সুচেতনা তো নিজে থেকেই মিথ্যে '# মি টু' বলতে পারে।
পুরঞ্জনের ওই ষষ্ঠেন্দ্রিয়র বিষয়ে একসময় কৌতুহল জেগেছিল - তখন জেনেছে সিক্সথসেন্স- 'দ্য ওনলি রিয়েল ভ্যালুয়েবল থিং ইস ইন্টুউশান।' কথাটা ১৯৩০ সালে আইনস্টাইন বলেছেন। আরো বলেছেন - এরা একাকিত্ব পছন্দ করে, সৃজনশীল হয় - তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা রাখে, খুঁটিয়ে দেখার প্রবণতা থাকে। এই ষষ্ঠেন্দ্রিয় নিয়ে আরও রিসার্চ চলছে। এরা মনে করে ফরাসি শব্দে 'দে জা ভু' অর্থাৎ পূর্ব পরিচিত, যেমন পুরঞ্জনের মনে হয় সুচেতনাকে। খুব চেনা -পূর্বজন্ম থেকেই। এই জন্যই মনোবিদরা এটা রোগ মনে করে বলছেন বিষয়টা প্যারা-সাইকোলজির অন্তর্ভুক্ত। এটা ইন্টিউশন বা সঞ্জাত হওয়ার শক্তি।
পুরঞ্জন মনে মনে বলে - ভালই করেছি হাসিকে থেকে যেতে বলে – এমনও বাদল হাওয়ায়, এই মনোরঞ্জক মুহূর্তে মন ও শরীর বিপথে যেতে পারে। সম্বিত ফিরে পায় সুচেতনার প্রশ্নে - স্যার, জীবনানন্দের প্রথম কাব্যগ্রন্থ কি?
- 'ঝরা পালক' ১৯২৭ সালে জীবনানন্দের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
কবিতায় নতুন ভাব, ভাষা ও ভাষ্য আনলেন। লিখলেন - "সব চিন্তা - প্রার্থনার
সকল সময় শূণ্য মনে হয়।" 'কবিতার কথা'য় লিখলেন - পৃথিবীর সমস্ত জল ছেড়ে যদি এক নতুন প্রদীপের কল্পনা করা যায়, নতুন অথচ জীবনের সঙ্গে যার গোপনীয় সুড়ঙ্গ লালিত সম্পূর্ণ সম্বন্ধ, সম্বন্ধের ধূসরতা ও নতুনতা। তাঁর 'ধূসর পাণ্ডুলিপি' প্রকাশিত হতেই বাংলা কবিতায় অন্য মাত্রার জোয়ার এনে দেয়। এক "নতুনতর জলের" ভিতর "নতুন প্রদীপের" মতো।
কিছু কথা বড় সহজে বলা যায়, কিন্তু বুঝতে সময় লাগে অনেক। হাসির চোখ-মুখ দেখে পুরঞ্জন বুঝতে পারে ওর মাথায় কিছুই ঢোকেনি। সুচেতনার চোখে এক 'নতুন প্রদীপের' আলো। সুচেতনা হয়ত বলবে - "হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে।" "আমি একদিন এই পৃথিবী পরিপূর্ণ প্রেমীর মতো / দেখেছি জলের স্বচ্ছ অন্তরঙ্গ মহানুভাবতা।" মনে হচ্ছে জীবনানন্দের বনলতা সেন পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে জিজ্ঞাসা করবে - 'এতদিন কোথায় ছিলেন!'
বৃষ্টির দাপট কমে আসছে, এখনই থেমে যাবে। এই সময়েই হাসির মোবাইলটা বেজে ওঠে - অপর প্রান্ত থেকে কি বললো, শুনতে পেল না কেউ। হাসি বললো – আমি এখুনি যাচ্ছি। ফোন ছেড়েই বলে - স্যার, আমার মা উঠানে পা পিছলে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙে গেছে। এখুনি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। হাসি সাইকেলে চেপেই দ্রুত রাস্তায় মিলিয়ে গেল। পুরঞ্জন নিজের মনেই বলে - ম্যান প্রপোজেস, গড ডিস্পোজেস।
মেঘলা আকাশে সূর্য্যর অবস্থানটা বোঝা যাচ্ছেনা, তবে ঘড়ি বলছে সন্ধ্যা আগত। টিপটিপ করে আবার বৃষ্টি শুরু হলো। যা ভয় করেছিল পুরঞ্জন তাই হতে চলেছে। একা সুচেতনা যার চোখ সেই শ্রাবস্তীর বিদিশার নেশা ধরিয়ে দেয়। পুরঞ্জনের শুধুই মনে হচ্ছে একে অন্তর থেকে জানি, চিনি। নিজেকে সংযত করেই বলল - আজ, এই পর্যন্ত থাক। সুচেতনা বলল, টিপটিপ করে বৃষ্টি এখনও পড়ছে।
পুরঞ্জন সমস্যাটা অনুধাবন করতে পেরে বলে - চলো, তোমাকে রেললাইনটা পার করে দিই। সুচেতনা বুঝতে পারে স্যার এখন যেতে বলছেন। সুচেতনা পেন-খাতা ব্যাকপ্যাকে পুরে নেয়। পুরঞ্জন মনে মনে ঠিক করে দোকানে চা খেয়ে নেবে। সুচেতনতাকে বলে - চলো কোন অসুবিধা হবে না, আমার বড় ছাতা আছে। রঙিন ছাতাটাই দেখার মতো। দুজন কেন তিনজন ও স্বচ্ছন্দে মাথা বাঁচিয়ে যেতে পারে।পুরঞ্জন ছাতাটা কিনেছিল পন্ডিচেরী থেকে। ওখানে গিয়েছিল কোনো একজনকে খুঁজতে।
চলতে চলতেই সুচেতনা জীবনানন্দ নিয়ে প্রশ্ন করতে থাকে। পুরঞ্জন টিউশনি করে ছাত্র-ছাত্রীদের ধরে রাখতে সিলেবাসের বাইরেও অনেক কিছু নোট করে রাখে - যাতে সুনাম বাড়ে। পুরঞ্জন বলে, ক্রান্তদর্শী জীবনানন্দ - বাংলা ভাষা সাহিত্যের জন্যে উদ্বেগ, সম্ভাবনার কথা 'বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ' প্রবন্ধে লিখে গেছেন। জীবনানন্দের অপ্রকাশিত লেখা হারিয়ে যাওয়া একটা ট্রাঙ্ক থেকে উদ্ধার হয়। সেই লেখাগুলি আরও দাগ কেটে যায় আমাদের মনে। উদাসি স্বরে বলে, মনে রেখো জীবনানন্দের প্রথম প্রকাশিত কবিতা ১৯১৯ সালে এই "বর্ষা আহবান"।
পুরঞ্জনের ঈষৎ ক্ষয়াটে গাল, কোটরাগত দুটি চোখ কিন্তু উজ্জ্বল।সুচেতনা, বিদিশার নেশা ধরানো চোখে পুরঞ্জনের চোখের সঙ্গে চোখ মেলায়। একই ছাতার তলায় দুজনে। রসিক পান দোকানীর রেডিও থেকে ভেসে আসছে 'ছাতা ধর হে দেওরা .....এতনা..... সুন্দর শাড়ি ভিগ .....'। গায়ে গা না লাগলেও দুজনে কাছাকাছি। সুচেতনার নিঃশ্বাসের বায়ু সরাসরি পুরঞ্জনের শরীরে। নাকের পাটাটা কেমন কেঁপে উঠছে। পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে বনলতা সেন যদি বলে - "এতদিন কোথায় ছিলেন!"
কথায় কথায় অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে রেলকোয়ার্টারের মোরম বিছানো রাস্তায়। সুচেতনা বলে - আমাদের ঘরে চলুন স্যার। একটু চা খেয়ে যাবেন, মা ও খুশি হবে। এখানে শুধু আমি আর মা থাকি।
- তোমার বাবা।
- বাবা তো মারা গেছেন অনেকদিন। মা বাবার চাকরিটা পেয়েছেন।
- সুচেতনা, আমি খুব দুঃখিত। মর্মাহত। আমি জানতাম না। না জেনে তোমাকে আঘাত করলাম।
- না স্যার, আপনি আন্তরিকভাবে খোঁজ নিতে চেয়েছেন। আপনার কোন দোষ নেই। সারিবদ্ধ কোয়ার্টারের দ্বিতীয়টার লোহার গ্রিল দেওয়া গেটটা খুলতেই ক্যাঁচ করে একটা কর্কশ আওয়াজ উঠলো। ক্ষীণ আলোয় পুরঞ্জন দেখতে পায়, দেওয়াল বেয়ে ওঠা মাধবীলতায় যেন সব ফুল ফুটে গেছে একসঙ্গে।"লক্ষ্মীপেঁচা ডাকিতেছে শিমুলের ডালে।" মগজে ষষ্ঠেন্দ্রিয় ধাক্কা মারছে, বলছে ভুল। ভুলের এ জীবনটা ভুল করতে করতেই কাটছে। ঘরের ভিতর থেকে আওয়াজ উঠলো - কে? সুচির ফিরলি।
গলার স্বরটা শুনেই পুরঞ্জনের ষষ্ঠেন্দ্রিয় সজাগ হয়ে ওঠে - ভাবতে থাকে গলার স্বরটা এত চেনা চেনা কেন মনে হচ্ছে। সুচির জোর গলায় বলল - হ্যাঁ মা, আমি। আমার সঙ্গে স্যার এসেছেন। মা দরজা খুলতে এগিয়ে আসলো না। বাতাসে ভেসে আসা মৃদু শব্দের তরঙ্গ শুনে মনে হল এলোমেলো ঘরটাকে একটু গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিছুটা সময় অপেক্ষা করে সুচি দরজায় ধাক্কা ঞ। সবুজ রঙের কাঠের দরজা হাট হয়ে খুলে গেল।
ঘরে ঢুকে বোঝা গেল এটা একটা বারান্দা। বারান্দাকেই ঘিরে একটা ঘর করা হয়েছে। স্টিলের ফোল্ডিং চেয়ার, ফোল্ডিং টেবিলের উপর পাতা কুরুশকাঠির কাজ করা চাদর, চেয়ারে সমুদ্র-সবুজ রঙিন ঢাকনা।গৃহিনীর পরনে সুতির সাদা খোলের পাটভাঙা শাড়ি। চওড়া নীল পাড়। নীল রঙের ব্লাউজের হাতা কনুই অবধি ঢাকা। গলায় মোটা রূপোলি চেন। চেনে ঝুলছে ঝিনুকের মতো একটা লকেট। আনুষাঙ্গিক পরিবেশে বুঝতে এতটুকু দেরি হয়না, ইনিই সুচেতনার মা। কি একটা অন্তরঙ্গ হাসি থাকে মানুষের মধ্যে, গোপনের, যেটা সকলের জন্য নয়। শুধু কিছু আপন মানুষের জন্য, আপন কিছু সময়ের জন্য। করজোড়ে দুজনেই দুজনের চোখ থেকে চোখ সরাতে পারে না। দুজনেই রোমন্থন করে সেই স্থানের, সেই সময়ের।
(২)
রংধামালীর স্কুলের শিক্ষক ছিলেন পুরঞ্জনের বাবা সত্যানন্দ, মা কুসুম কুমারী।সংসারে অর্থের আধিক্য ছিলনা কিন্তু সাংস্কৃতিক মনস্ক পরিবারে শান্তি ছিল। পুরঞ্জন পড়াশুনায় ভাল ছিল বলে কলেজে পড়ার সময়ই নাটোরের ক্লাস টেনে পড়া মেয়ে লাবণ্যকে পড়াতে হত। লাইফ সায়েন্সের "রিপ্রোডাকশন" কথাটা বুঝতে ও বোঝাতে গিয়ে দুজনেরই মুখ লাল হয়ে যায়। এই লাল 'লাভ' এ পরিণত হয়। ওরা লুকিয়ে লুকিয়ে মিলিত হত তিস্তার শাখা নদী "করলা"র মোহনায়, যেখানে নদীর জলের রং মচকা ফুলের মতো। হিজল, বট, তমালের বুনো গন্ধ, নীল ছায়ায় বসে বলতো 'শালিখের মতো' প্রাণের কথা।পুরঞ্জন ওর নাম দিয়েছে সুরঞ্জনা। সেদিনও পুরঞ্জনের ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলেছিল 'কিছু একটা হবে।' সেদিন ছিল গান্ধী জয়ন্তী - কিন্তু অসময়ে হঠাৎ বৃষ্টি পড়তে লাগলো। লাবণ্যের মোরগ ফুলের মতো লাল মেখলা ভিজে গায়ে বসে যায়। কাপড় ভেদ করে বুকের শঙ্খ দুটি যেন ফাঁদ পেতেছে। ওরা দুজনেই শুনশান ঘাটের নগ্ন নির্জন চাতালের আড়ালে রহস্যময়ী ঝুপসি আঁধারে গিয়ে আরাধনা ছায়াছবির সেই 'রিপ্রোডাকশনের' খেলায় মেতে উঠে। লাবণ্যর মা রমলা কিন্তু বুঝতে পারে। ওনার সিক্সথসেন্স বলে - কিছু একটা গড়বড় হয়েছে। মেয়ের ফর্সা পিঠে নখের আঁচড় দেখে চেপে ধরে সব ঘটনা জেনে যায়। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।
সত্যি সত্যি আকাশ ভেঙে পড়েছে, আকাশ ফুটো হয়ে গেছে। সারারাত ধরে বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। একটানা বৃষ্টির ফলে অক্টোবরের চার তারিখে তিস্তা নদীর জল প্রবল বেগে ঢুকতে থাকে। দুই থেকে সাড়ে চার মিটার জলের তলায় চলে যায় রাস্তা ঘাট, মাঠ ময়দান। ল্যাবণ্যদের টিনের ঘর ভেসে যাওয়ার উপক্রম হতেই ওরা কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস বেঁধে নিয়ে শিলিগুড়িতে মামার কাছে আশ্রয়ের সন্ধানে পালিয়ে যায়। লাবণ্যকে রেলের এক গ্যাংম্যানের সঙ্গে তড়িঘড়ি বিয়ে দিয়ে সব অঘটনকে ধামাচাপা দেয়।
(৩)
পুরঞ্জন ও লাবণ্যদের খুঁজে খুঁজে হয়রান।পশ্চিম-বঙ্গ সহ ভারতের বিভিন্ন স্থান চষে বেরিয়েছে লাবণ্যের জন্য। নিরাশ হয়ে বেশ কিছুদিন হল মফসসলে নিরিবিলি এই পাঁশকুড়ায় এসে থিতু হয়েছে। তবু আশা ছাড়েনি, ওর ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলে - 'মহাপৃথিবী'টা গোল, এখন আরও ছোট হয়ে হাতের মুঠোয়।একদিন না একদিন দেখা হবেই। ভালবাসা যেন স্বপ্নের মতো। কেউ ভোরে দেখে, কেউ মাঝরাতে। অনেকে ভালোবেসে ফতুর হয়, পেয়েও হারিয়ে ফেলে।কেউ কেউ সারা জীবন গহীন স্বপ্নেই বেঁচে থাকে।
পুরঞ্জন কোন কথা না বলে অপলক দৃষ্টিতে লাবণ্যর সমস্ত সুধারস উপভোগ করছে। সুচেতনা কিছুই বুঝতে না পেরে দুজনের দিকেই ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে আছে। লাবণ্য বলতে পারে না, সুচেতনা পুরঞ্জনেরই মেয়ে। চাপা স্বরে বলে - "এত দিন কোথায় ছিলেন!"
পুরঞ্জন বলে, "সুরঞ্জনা, আজো তুমি আমাদের পৃথিবীতে আছো।"
=================
তপন তরফদার,
প্রেমবাজার (আই আই টি) খড়্গপুর 721306

Comments
Post a Comment