সুখে দুঃখে মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি
সামসুজ জামান
চলন্ত ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে নিত্য যাত্রীদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা গল্প তর্ক-বিতর্ক চলে। সেদিনের প্রসঙ্গ ছিল মাতৃভাষা তাই মাতৃভাষা নিয়ে খুব জোর তর্ক-বিতর্ক জমে উঠেছিল। অনেকের মতে আজকের দিনে আমাদের বাংলা ভাষার মতো মাতৃভাষার আর কোনো গুরুত্ব নেই। বলা হচ্ছিল একজন তথাকথিত একেবারে অন্তজ শ্রেণীর মানুষ, রিক্সাওয়ালা , কুলি-মজুর সকলেই নিজেরা ইংরেজি না জানলেও নিজের ছেলে মেয়েদের ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে জীবন উন্নত করার ভাবনা ভাবে। কেউ আবার এতে যোগ করলেন কিছু বিরোধী ভাবনা। তাঁর বক্তব্য - হ্যাঁ, এটাও তো দেখেছেন এই সব ঘরের মানুষরা তাদের ছেলেমেয়ের স্কুলের ভাষা ইংরেজি বলতে পারেনা কিন্তু তাদের বাংলা ভাষার উপর এত ঘেন্না যে ঘরেও নিজেরা নিজের পক্ষে হিন্দি ভাষার মাধ্যমে কথাবার্তা বলে। অন্য কেউ আবার যোগ করলেন - আরে সেটা তো আমার আপনার ঘরেই দেখা যায়, বাংলা ভাষা এখন এমন 'হতচ্ছেদ্দা'র ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের কাছে, যে তারা নিজেদের মাতৃভাষা বাংলা না বলে হিন্দি ভাষায় কথা বলছে এতে নিজেরা আত্মশ্লাঘা অনুভব করেন। ইংরেজ আমলে আমাদের মাতৃভাষার উপর অত্যাচার দেখে দাদা ঠাকুরের ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য -"আ মরি বাংলা ভাষা/ তোমার বাঁচার নেইকো আশা"- উদ্ধৃত করে কেউ আবার মজা পাচ্ছিলেন। কারও আক্রমণ সানানোর অস্ত্র- অপূর্ব দত্তের তীর্যক কবিতা --"স্কুলে কেন বেঙ্গলিটা পড়ায় না ইংলিশে"? ঠিক সেই সময় বাউলের মনমোহিনী কন্ঠ আবেগমথিত করল -"আমার ভিতরে বাহিরে, অন্তরে অন্তরে, তুমি আছো হৃদয় জুড়ে"। "কোলাহল তো বারণ হল"। এত উত্তেজনা মূলক তর্ক- বিতর্কের আগুনে যেন কেউ জল ঢেলে দিল মনে হল। চিৎকার চেঁচামেচি, ঠিক তো তার প্রসঙ্গ ভুলে গিয়ে সকলে কেউ কণ্ঠ মেলালেন মনে মনে কেউ আবার তাল মিলিয়ে সুরের দোলায় দুলতে লাগলেন।
সঙ্গে সঙ্গে মনে হল-"এই তুমি আছ" আসলে কে? তুমি কি আমাদের জাদুমাখা মাতৃভাষা! যাকে নিয়ে অতুলপ্রসাদ লিখেছিলেন -"কি জাদু বাংলা গানে/ গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে/ গেয়ে গান নাচে বাউল/ গান গেয়ে ধান কাটে চাষা"! তিনি আন্তরিকভাবেই একেবারে প্রাণের ভিতর থেকে উচ্চারণ করেছিলেন -'মোদের গরব মোদের আশা/ আ মরি বাংলা ভাষা"!!
ইচ্ছে যাচ্ছিল কিন্তু লোক লজ্জায় বাউলকে জড়িয়ে ধরতে পারিনি। তবে সত্যিই এমন উপলব্ধি হয়েছিল যে- সুখে-দুঃখে মাতৃভাষা আমাদের হৃদয় ছুঁতে পারে এমনিভাবে?!
মনে পড়েছিল ভোপালে জাতীয় যুব-উৎসবে যোগদান করেছিলাম আমার ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে। রাজকীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করা হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে। একেবারে জামাই আদর বললেও কম বলা হয়। স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন ১২ ই জানুয়ারি থেকে যুবক সুতরাং তখন শীতকাল। যে ফ্ল্যাটে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেখানে গরম জল, ঠান্ডা জল , লেপ কম্বলের উপযুক্ত ব্যবস্থা, ঘুরে ফিরে বেড়ানোর জন্যে নিজেদের গাড়ির ব্যবস্থা -- কি ছিল না বলা মুশকিল। আর খাবার-দাবারের যে আয়োজন সে তো আমাদের মত চুনোপুটি মানুষদের মহা ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু... এত শত পেয়েও আমাদের এক প্রিয় ছাত্র অশোকের সুতীব্র হাহাকার – "কবে যে দ্যাশে ফিরব, কবে যে উস্তা আর পার্শা মাছ খাব!"
আসলে ভেবে দেখুন তো- সেই ছেলেটির হাহাকার কি শুধু 'উস্তা আর পার্শা মাছ'-এর জন্যই ছিল? নাকি এর পিছনে নিজের মাতৃভূমি মাতৃভাষা এসবের টান কাজ করছিল? তার প্রাণে কি আকাশ বাতাস কোন বাঁশি বাজাচ্ছিল না? ওই যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি/ চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি" । আরো লিখেছেন- "সার্থক জনম আমার আমি জন্মেছি এই দেশে/ সার্থক জনম মাগো তোমায় ভালোবেসে"! নজরুল বড় প্রাণ থেকে লিখেছিলেন -"ও ভাই , খাঁটি সোনার চেয়েও খাঁটি, আমার দেশের মাটি।" রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দের কবিতার ছত্রে ছত্রে এই বাংলা ভূমির জন্য হাহাকার -"বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই/ পৃথিবীর রূপ, খুঁজিতে যাই না আর"..। তাঁর জীবন বাণীর বড় মনোরম আর হৃদয়স্পর্শী কামনা ছিল- "তবু যেন মরি আমি এই মাঠ ঘাটের ভিতর...."। আর সেই মাটি মায়ের বুকে চলতে ফিরতে ফিরতেই তিনি ট্রামের ধাক্কায় এই কলকাতার মাটির উপরেই শেষ শয্যায় শায়িত হয়েছিলেন। আর কবি জয়দেব সেনের লেখা যে কবিতাটা শিল্পী নির্মলা মিশ্রের কন্ঠে অবিস্মরণীয় গান হয়ে ঘুরছে -"এই বাংলার মাটিতে মাগো জন্ম আমায় দিও।/ এই আকাশ নদী পাহাড় আমার বড় প্রিয়"! মাতৃভাষা আর জন্মভূমির প্রসঙ্গ বলতে গিয়ে এসব কথা কি আর ভোলা যায়?
পৃথিবী মাতৃময়ী। সর্বত্রই মাতৃস্বরূপ বিরাজমান। বড় অমৃতময়, অনিন্দ্যসুন্দর শব্দবন্ধ-"মাতৃরূপেণ সংস্থিতা।" মাতৃগর্ভে জন্মক্ষন থেকে, যে মায়ের নাড়ির সঙ্গে আমাদের নিবিড় যোগাযোগ, সেই মায়ের ভাষাই তো মাতৃভাষা। আমার অহংকার- আমি সেই স্নিগ্ধ নিরুপম ভাষাতে কথা ব'লে ধন্য হই। এ ভাষার অমর্যাদা হলে রক্ত গঙ্গা বয়ে যায়। মাতৃরূপেণ সংস্থিতা বলেই তো উর্দু ভাষাকে বেআইনিভাবে চাপিয়ে দেবার প্রতিবাদে বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারী ঢাকায় পাঁচ বীর ছাড়াও কত মানুষের শহীদ হওয়া, '৬১তে শিলচরে ১১ জন ভাষা-শহীদের আত্ম বলিদানের অবিস্মরনীয় স্মৃতি!! এই স্মৃতি থেকেই একদিন কবিতায় লিখেছিলাম- "বাংলা তোকে বিদেশীরা করলো রে নিঃস্ব ।/ বাংলা তোকে তবুও তো আর ভুলেনি বিশ্ব/ .... বাংলাতে তোর অশ্রু জলে ভিজলো ভায়ের কবর।/ বাংলা তোকে করতে আদর হয়েছি খবর"।
যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম লেখনি- মাতৃভাষার কথা। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো কবি ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতে গিয়েও স্বপ্ন পূরণ করতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত বললেন -"কেলিনু শৈবাল ভুলি কমল কাননে"! পরবর্তীতে সাধে কি আর কবি রামনিধি গুপ্ত বলেছেন-" নানান দেশের নানান ভাষা/ বিনা স্বদেশী ভাষা, মেটে কি আশা!" এই মাতৃভাষা সুখে, এই মাতৃভাষা দুঃখে। সুখ দুঃখের সেই সম্মিলন থেকেই তো সৃষ্ট আহামরি সেই গান-" আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি ।/আমি কি ভুলিতে পারি?" তাই আবার নিজস্ব কবিতা দিয়ে আজকের মত ইতি টানতে চাই -" বাংলা তোকে কারতে এলে করব এবার পণ।/ বাংলা তোকে বলছি আমার হৃদয় রণাঙ্গন।/ বাংলা তোকে জান দিয়েছি একুশে ফেব্রুয়ারি।/ বাংলা রে তোর সোনার ও মুখ ভুলতে কি আর পারি!!"
........................................
সামসুজ জামান
"সেতারা"টোলা (দক্ষিন পাড়া), বৈদ্যপুর, পূর্ব বর্ধমান

Comments
Post a Comment