স্মৃতির স্বরলিপি
সঙ্গীতা মহাপাত্র
শহরের নাম এথেলগার্ড। চারদিকে ঝকঝকে তুষারপাত আর অচেনা এক যান্ত্রিক ভাষার কোলাহল। অভিরূপ এখানে থিতু হয়েছে প্রায় সাত বছর। অফিস, বন্ধু-বান্ধব আর প্রাত্যহিক জীবনের সবটুকু এখন ভিনদেশি বুলিতে মোড়া। এমনকি ওর ভাবনার জগতটাও ইদানীং পরদেশি শব্দে সাজানো থাকে।
সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে পার্কের এক কোণে একটা ছোট্ট শিশুকে দেখল অভিরূপ। তার মা তাকে নিয়ে বেঞ্চে বসে আছেন। বাচ্চাটা পড়ে গিয়ে হাঁটু ছড়ে ফেলেছে, আর ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন অন্য ভাষায়। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ থমকে দাঁড়াল অভিরূপ। ওর মনে হলো, বাচ্চাটা যখন যন্ত্রণায় কাঁদছে, সেই কান্নার সুরটা ঠিক ওর ছোটবেলার মতো।
বাচ্চাটা হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে উঠে তার মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, "মা, লাগছে!"
অভিরূপের বুকটা এক নিমেষে কেঁপে উঠল। মা আর বাচ্চাটি আসলে বাঙালি পর্যটক। দীর্ঘ সাত বছর পর নিজের মাটির শব্দগুলো যখন কানে আছড়ে পড়ল, ওর মনে হলো ও এতক্ষণ কোনো এক যান্ত্রিক মরুভূমিতে ছিল। যে শব্দগুলো ও প্রতিদিনের ডায়েরিতে হারিয়ে ফেলেছিল, সেগুলোই আজ ওর রক্তে নাচন ধরিয়ে দিল।
সে রাতে অভিরূপ বাড়িতে ফোন করল। মা ওপাশ থেকে বলতেই— "কিরে খোকা, কেমন আছিস?"
ও কোনো কথা বলতে পারল না। চোখের কোণে জমা জলটা টপ করে ফোনের স্ক্রিনে পড়ল। ও বুঝল, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেন, ওর শরীরের প্রতিটি কোষ আসলে আজও ওই একটি ভাষাতেই শ্বাস নেয়। যে ভাষায় প্রথমবার 'মা' বলে ডেকেছিল, সেই ভাষাই ওর আত্মার শেষ আশ্রয়।
..................................
সঙ্গীতা মহাপাত্র,
এ. কে. মুখার্জি রোড, কলকাতা - ৭০০ ০৯০

Comments
Post a Comment