যারা প্রাণ দিয়েছে রমনার উর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার তলায়,
যেখানে আগুনের ফুলকির মতো
এখানে ওখানে জ্বলছে অসংখ্য রক্তের ছাপ...”
মাহবুব উল আলম চৌধুরীর কবিতার এই লাইনগুলো বাংলা ভাষা আন্দোলনের এক রক্তাক্ত দলিল। “রমনার উর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচূড়ার তলায়”—এই ভৌগোলিক উল্লেখ কবিতাকে কেবল কল্পনার ভুবনে নয়, ইতিহাসের নির্দিষ্ট মুহূর্তে স্থাপন করে। কৃষ্ণচূড়া এখানে প্রকৃতির সৌন্দর্যের প্রতীক হয়েও শহীদের রক্তে রঞ্জিত এক নীরব সাক্ষী। “আগুনের ফুলকির মতো… জ্বলছে অসংখ্য রক্তের ছাপ”—এই উপমায় ভাষার জন্য আত্মদানের দৃশ্য আগুনের মতো জ্বলন্ত হয়ে ওঠে, যা সময়ের সাথে নিভে যায় না, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চেতনাকে প্রজ্বলিত রাখে। কবি ব্যক্তিগত শোককে ছাড়িয়ে সমষ্টিগত স্মৃতিকে কাব্যিক ভাষায় রূপ দিয়েছেন। ফলে এই পঙ্ক্তিগুলো শুধু শোকগাথা নয়—এগুলো প্রতিবাদ, প্রতিজ্ঞা ও ভাষার মর্যাদা রক্ষার এক চিরজাগ্রত আহ্বান।
মাতৃভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের শেকড়, আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ, জাতিসত্তার প্রধান স্তম্ভ। এটি সেই ভাষা যা আমরা জন্মলগ্ন থেকে মায়ের কোলে শুয়ে শুনি, যার মাধ্যমে প্রথমবার জগৎকে চিনি, স্বপ্ন দেখি, আবেগ প্রকাশ করি। মাতৃভাষা তাই কেবল শব্দ বা বাক্য সমষ্টি নয়, এটি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং সম্মিলিত স্মৃতির এক জীবন্ত দলিল। এর মাধ্যমেই একটি জাতি তার নিজস্বতা ধারণ করে, পরম্পরাকে বাঁচিয়ে রাখে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তার উত্তরাধিকার পৌঁছে দেয়।
ইতিহাস ও ঐতিহ্য: ভাষার ক্রমবিকাশ ও সমৃদ্ধি
নিকানো উঠোনে ঝরে রৌদ্র,
বারান্দায় লাগে জ্যোৎস্নার চন্দন।
বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে
অন্ধ বাউলের একতারা বাজে
উদার গৈরিক মাঠে,
খোলা পথে, উত্তাল নদীর
বাঁকে বাঁকে,
নদীও নর্তকী হয়। —শামসুর রাহমান
পৃথিবীর প্রতিটি ভাষারই রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস ও ক্রমবিকাশের পথ। বাংলা ভাষাও এর ব্যতিক্রম নয়। এর রয়েছে সহস্রাধিক বছরের গৌরবময় ইতিহাস। প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত হয়ে প্রাকৃত ও অপভ্রংশের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দশম-একাদশ শতাব্দীর দিকে বাংলা ভাষা তার স্বকীয় রূপ লাভ করে। চর্যাপদের মতো প্রাচীনতম সাহিত্য নিদর্শন প্রমাণ করে যে, বাংলা ভাষার ভিত্তি অনেক গভীরে প্রোথিত।
মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের বিপুল বিস্তার ঘটে। মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী, লোকগাথা, অনুবাদ সাহিত্য – সবকিছুই বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে। সে সময়ে মুসলমান শাসকরা বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করায় এর বিকাশ আরও বেগবান হয়। এরপর ব্রিটিশ শাসনকালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ সাহিত্যিকদের হাত ধরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নতুন দিগন্তে পৌঁছায়। তাঁরা শুধু সাহিত্য সৃষ্টি করেননি, ভাষার কাঠামোকে আরও সুসংগঠিত করেছেন, এর প্রকাশভঙ্গিকে দিয়েছেন আধুনিকতা। বাংলা আজ বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ও মধুর ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। এর বিশাল সাহিত্য ভান্ডার মানবসভ্যতার এক অমূল্য সম্পদ। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গান—সবক্ষেত্রেই বাংলা তার নিজস্ব মহিমা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে।
মাতৃভাষার সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের লোকসংস্কৃতি, জারি-সারি গান, পালাগান, যাত্রা, ছড়া-ধাঁধা, রূপকথা – এ সবই মায়ের ভাষায় গাঁথা। এটি আমাদের চিন্তার ভিত্তি, মননের স্ফুরণ। অন্য কোনো ভাষা যতই দক্ষতা সহকারে ব্যবহার করা হোক না কেন, মাতৃভাষার মতো সহজ, স্বাভাবিক ও সাবলীলভাবে হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এটি আমাদের জ্ঞানার্জনের প্রধানতম সিঁড়ি, মেধার উন্মোচনের শ্রেষ্ঠ উপায়।
মাতৃভাষার লড়াই: আত্মমর্যাদার অমর গাঁথা
বাংলা ভাষার ইতিহাস কেবল সমৃদ্ধির ইতিহাস নয়, এটি আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাসও। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বিশ্বের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। মাতৃভাষার জন্য বুকের রক্ত ঢেলে দেওয়ার এমন নজির পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর যখন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তখন পূর্ববঙ্গ (যা পরে পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত হয়) নবগঠিত পাকিস্তানের একটি অংশ হয়। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ছিল বাঙালি, যাদের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী, যার মূল ক্ষমতা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে, উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা বাঙালি সংস্কৃতি ও ভাষার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে।
এই অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে পূর্ববঙ্গের আপামর জনতা। তরুণ ছাত্রসমাজ, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষ – সবাই একযোগে প্রতিবাদে মুখর হয়। ১৯৪৮ সাল থেকেই শুরু হয় ভাষার দাবিতে ছোট ছোট আন্দোলন। কিন্তু ১৯৫২ সালের গোড়ার দিকে যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, তখন আন্দোলন তীব্র রূপ ধারণ করে।
২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সাল। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী মিছিল নিয়ে রাজপথে নামে। তাদের একটাই দাবি ছিল – "রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই"। শান্তিপূর্ণ মিছিলে পাক-পুলিশ গুলি চালায়। রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউরসহ আরও অনেকে শহীদের মৃত্যু বরণ করেন। তাদের বুকের রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ। এই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তোলে, তাদের মধ্যে এক নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটায়। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
এই ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিপ্রস্তর। এটিই ছিল প্রথমবার যখন বাঙালিরা নিজেদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তা উপলব্ধি করে এবং নিজেদের অধিকারের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ায়। এই আন্দোলনের পথ ধরেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
মাতৃভাষার বর্তমান গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
একুশে ফেব্রুয়ারির আত্মত্যাগ আজ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এটি বাঙালির জন্য এক বিশাল গৌরব ও সম্মান বয়ে এনেছে। এই দিনটি এখন বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে নিজ নিজ মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানোর দিন।
আজও মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ শিশুর মেধা বিকাশের জন্য অত্যাবশ্যক। এটি সহজভাবে জ্ঞান আহরণ এবং সৃজনশীলতা প্রকাশের পথ খুলে দেয়। কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে মাতৃভাষার প্রতি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিদেশি ভাষার প্রতি অতিরিক্ত মোহ, ভুল উচ্চারণ, বানান ভুল, অশুদ্ধ শব্দ ব্যবহার – এ সবকিছুই আমাদের মাতৃভাষাকে দুর্বল করছে। ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষা শেখা জরুরি, কিন্তু নিজের মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে নয়।
আমাদের প্রত্যেকের উচিত মাতৃভাষাকে সর্বস্তরে ব্যবহার করা, এর বিশুদ্ধতা বজায় রাখা, নতুন প্রজন্মকে মাতৃভাষার প্রতি আগ্রহী করে তোলা। সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং পরিবার – সবারই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা উচিত। আমাদের লেখায়, কথায়, শিক্ষায়, অফিস-আদালতে, বিজ্ঞাপনে – সর্বত্র বাংলা ভাষার সঠিক ও সম্মানজনক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধন: মাতৃভাষা মানুষকে তার শেকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত করে, জাতিসত্তার অনুভূতিকে দৃঢ় করে। এটি কেবল কথার সমষ্টি নয়, বরং ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোককথা, সঙ্গীত এবং শিল্পকলার ধারক ও বাহক। মাতৃভাষার মাধ্যমেই একটি প্রজন্ম তার পূর্বসুরীদের জ্ঞান, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শন সম্পর্কে অবগত হয়। এটি বিশ্বজুড়ে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
চিন্তার গভীরতা ও সৃজনশীলতা: গবেষণায় দেখা গেছে যে, মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ শিশুদের চিন্তাশক্তির বিকাশ, জটিল ধারণা উপলব্ধি এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে সহায়ক। যখন শিক্ষার্থীরা তাদের পরিচিত ভাষায় জ্ঞান অর্জন করে, তখন তারা বিষয়বস্তুকে আরও সহজে আত্মস্থ করতে পারে এবং নতুন ধারণা তৈরি করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে। এটি কেবল মুখস্থবিদ্যা নয়, বরং মৌলিক বিশ্লেষণ এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার জন্ম দেয়। ইউনিসেফ এবং ইউনেস্কোর মতো সংস্থাগুলোও শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষার ব্যবহারকে সর্বজনীনভাবে সমর্থন করে।
মানসিক ও আবেগিক সুস্থতা: মাতৃভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করা মানুষের মানসিক শান্তি ও আত্মবিশ্বাসের জন্য অপরিহার্য। এটি মানুষকে আবেগগতভাবে সুস্থ ও সংযুক্ত রাখে। অন্য ভাষায় মনের গভীরতম অনুভূতি প্রকাশ করা প্রায়শই কঠিন হয়, যা মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। মাতৃভাষা সেই সংবেদনশীল সেতু, যা মানুষের অন্তরজগতের সঙ্গে বাহ্যিক জগতের সংযোগ স্থাপন করে।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ:
মাতৃভাষার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে:
বিশ্বায়নের চাপ ও ভাষিক আগ্রাসন: বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজি বা অন্যান্য প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক ভাষার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার মাতৃভাষার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই ভাষাগুলোর প্রাধান্য মাতৃভাষাকে কোণঠাসা করছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা সন্তানদের ইংরেজিতে পড়াতে আগ্রহী হচ্ছেন, যা মাতৃভাষার প্রতি এক ধরনের অনীহা তৈরি করছে।
ডিজিটাল মাধ্যমে অপ্রতুলতা: ইন্টারনেটে, বিশেষ করে জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিগত কন্টেন্টের ক্ষেত্রে মাতৃভাষার অভাব এখনও প্রকট। বিভিন্ন অ্যাপ, সফটওয়্যার, অপারেটিং সিস্টেম বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্ল্যাটফর্মে পর্যাপ্ত মাতৃভাষার সমর্থন না থাকলে নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে বিদেশি ভাষার প্রতি ঝুঁকবে। ফন্ট, ইউনিকোড এবং ডিজিটাল প্রকাশনার মানোন্নয়ন অপরিহার্য। ডিজিটাল মাধ্যমে মাতৃভাষার চ্যালেঞ্জ (আরও কংক্রিট উদাহরণসহ)
আজকের ডিজিটাল যুগে মাতৃভাষা বাংলার সামনে আরেকটা বড় চ্যালেঞ্জ এসেছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর ক্ষেত্রে। অনেক AI টুল (যেমন ChatGPT, Google Bard বা Gemini) ইংরেজিতে খুব ভালো কাজ করে, কিন্তু বাংলায় এখনও অনেক দুর্বল। কেন এমন হয়?
ডেটার অভাব: AI শেখার জন্য বিশাল পরিমাণ টেক্সট দরকার। ইংরেজিতে ইন্টারনেটে কোটি কোটি লেখা-পড়া আছে, কিন্তু বাংলায় তুলনায় অনেক কম। ফলে AI বাংলার অনেক সূক্ষ্ম অর্থ, প্রবাদ-প্রবচন, উপভাষা বা সাংস্কৃতিক ন্যুয়ান্স ঠিকমতো বুঝতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, বাংলায় একই শব্দের বিভিন্ন অর্থ বা আবেগের গভীরতা ধরতে AI প্রায়ই ভুল করে।
ব্যাকরণ ও উচ্চারণের জটিলতা: বাংলা ভাষার ব্যাকরণ খুব সমৃদ্ধ—ক্রিয়ার রূপ, বিভক্তি, যৌগিক বাক্য অনেক জটিল। AI-এর জন্য এগুলো বোঝা কঠিন। যেমন, ChatGPT-এর মতো টুল বাংলায় লিখলে প্রায়ই বানান ভুল, অদ্ভুত বাক্য গঠন বা অস্বাভাবিক শব্দ ব্যবহার করে। এমনকি সাধারণ প্রশ্নের উত্তরও কখনো অসম্পূর্ণ বা ভুল হয়ে যায়।
অ্যাপ-সফটওয়্যারে সমর্থনের অভাব: অনেক স্মার্টফোন, কম্পিউটার বা অ্যাপে বাংলা ফন্ট, ভয়েস টাইপিং বা AI চ্যাট সঠিকভাবে কাজ করে না। ফলে নতুন প্রজন্ম ইংরেজি বা হিংলিশে বেশি ঝুঁকে পড়ে। এতে বাংলা ধীরে ধীরে ডিজিটাল জগতে পিছিয়ে পড়ছে।
এই সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে হলে আমাদের দরকার—বাংলায় আরও বেশি ডেটা সংগ্রহ, ওপেন সোর্স প্রজেক্ট (যেমন Bengali.AI-এর মতো), এবং সরকার-বেসরকারি উদ্যোগে AI-কে বাংলা শেখানো। না হলে ডিজিটাল দুনিয়ায় আমাদের মাতৃভাষা কোণঠাসা হয়ে পড়বে।
নীতিগত দুর্বলতা ও বিনিয়োগের অভাব:অনেক দেশে মাতৃভাষার গবেষণা, উন্নয়ন, সাহিত্যচর্চা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় পর্যাপ্ত সরকারি নীতিগত সমর্থন ও বিনিয়োগের অভাব দেখা যায়। পাঠ্যপুস্তক আধুনিকীকরণ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ভাষার জন্য গবেষণার সুযোগ সীমিত হলে মাতৃভাষা তার প্রাণবন্ততা হারায়।
আন্তঃপ্রজন্মগত ব্যবধান: শহরায়ন এবং অভিবাসনের ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মাতৃভাষা ব্যবহারের প্রবণতা কমে যাচ্ছে। পরিবারে বা সমাজে মাতৃভাষার অনুশীলন কমে গেলে এটি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়তে পারে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি প্রযোজ্য।
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন—রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার, শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। কেবলমাত্র সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই মাতৃভাষার গুরুত্ব ও অস্তিত্ব ভবিষ্যতেও অটুট রাখা সম্ভব।
শেষ তবু শেষ নয়:
আমার ভাইয়ের রক্তে
রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।।
—আব্দুল গাফফার চৌধুরী
এ গান, এ কবিতা, এখনো আমাদের জাগিয়ে রাখে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে। তাই মাতৃভাষা কেবল অক্ষর বা ধ্বনির সমষ্টি নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, আত্মপরিচয় এবং স্বাধীনতার প্রতীক। ২১শে ফেব্রুয়ারির মহান আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে যে, ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করা যায়, আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য যেকোনো সংগ্রাম করা যায়। আসুন, আমরা সকলে মিলে আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলাকে হৃদয়ে ধারণ করি, এর সঠিক চর্চা করি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এর গৌরব ও ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ন রাখি। কারণ, মাতৃভাষা বাঁচলে বাঁচবে আমাদের সংস্কৃতি, বাঁচবে আমাদের জাতিসত্তা। এটি আমাদের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আমাদের গৌরব ও অহংকারের প্রতীক।মাতৃভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং জ্ঞানচর্চার মূল ভিত্তি। এর বর্তমান গুরুত্ব অপরিসীম কারণ এটি ব্যক্তি ও সমষ্টিগত মননে গভীর প্রভাব ফেলে।
==================
উৎপল সরকার, নিউটাউন, আলিপুরদুয়ার, জেলা :- আলিপুরদুয়ার। পিন ৭৩৬১২১
ইমেইল আইডি: utpalwbmo@gmail.com

Comments
Post a Comment