গৌতম সমাজদার
মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের অধিকার প্রত্যেক মানুষের জন্মগত অধিকার এবং মাতৃভাষা প্রকৃতপক্ষে মাতৃদুগ্ধ। মাতৃভাষাই শিক্ষার বাহন হওয়া উচিত। মাতৃভাষার গুরুত্ব যাদের সবচেয়ে বেশী হবে, তারা উন্নতও বেশী হবে। যদিও বিশ্বায়নের যুগে ইংরাজীসহ অন্যান্য বিদেশী ভাষার ব্যবহার অবশ্যই কাজে লাগবে, কিন্তু নিজের ভাষা নিয়ে প্রত্যেককে গর্বিত হতে হবে। মাতৃভাষায় দুর্বল হলে বিদেশী ভাষায় সফলতা আশা করা যায় না। কবি মাইকেল মধুসূদন তার উদাহরণ। মায়ের ভাষায় কথা বলে যেভাবে মনের আবেগ, ব্যথা, বেদনা প্রকাশ করা যায়, তা অন্য ভাষায় সম্ভব নয়। সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক কারণে নিজের মাতৃভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য যখন বিসর্জন দেয়, তখন নিজের জাতি সত্ত্বাটাই হারিয়ে যায়। তবে মানবসভ্যতার বিকাশ ও সার্বিক উন্নয়নে শুদ্ধতম মাতৃভাষার চর্চা খুবই জরুরী। মাতৃভাষার চর্চা অন্য ভাষার শুদ্ধ চর্চা নিশ্চিত করে। মাতৃভাষা গভীর চেতনা ও চৈতন্যবোধের বিকাশ ঘটায়। ভাষাভাষীর দিক দিয়ে বর্তমানে বাংলা ভাষার অবস্থান ষষ্ঠ এবং বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৮ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। দুর্ভাগ্যবশতঃ বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার ও গুরুত্ব এখনো নিশ্চিত হয়নি। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাকে ইংরাজীর সাথে মিশ্রিত করে ব্যবহার ও ইংরাজী শব্দ দ্বারা বাংলা লেখার প্রবণতা বাড়ছে। এটাতে একদিকে যেমন ভাষা শহীদদের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায়, তেমনি বাংলা ভাষার অমর্যাদা লক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে ভাষার সঠিক গুরুত্ব, শুদ্ধ চর্চা, ভাষাকে উচ্চশিক্ষায় প্রয়োগ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এছাড়া সর্বত্র বাংলা ভাষা প্রয়োগের চেষ্টা করতে হবে।
নিজ দেশের জনগণের মাতৃভাষাকে কি হারে অবমাননা ও অপমান আমরা নিজেরাই করেছি, তা পুনরায় হিসাব করে দেখলেই বোঝা সম্ভব। এটাও ঠিক, বিশ্বায়নের এই যুগে পৃথিবী আজ আমাদের হাতের মুঠোয়। আর তাতে নিজ ভাষা গুরুত্বহীন হয়ে উঠছে। অন্য রাজ্যে যাতায়াতের ফলে তাকে হিন্দী, ইংরাজী ব্যবহার করতে হচ্ছে। বিনোদনের জগতেও হিন্দীর আধিক্য ব্যাপক। হিন্দী সিনেমা অনেক চাকচিক্যের মধ্য দিয়ে মাতৃভাষা ভুলিয়ে দিচ্ছে। অবাঙালী বাংলায় বসবাস করছে। হিন্দীতে কথা বললেই আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করি হিন্দীতে উত্তর দিতে। এটা মাতৃভাষার অবহেলা, অবমাননার সামিল। দোকানের সাইনবোর্ড, শপিং মল সব নামই ইংরাজীতে লেখা। অর্থাৎ অন্য ভাষার আগ্রাসন ক্রমবর্ধমান। মাতৃভাষাকে এই আত্মঘাতী প্রবণতা থেকে মুক্ত হতে হবে আমাদের। কারণ নিজ ভাষার সাথে আমাদের জড়িয়ে থাকে মূল্যবোধের শিক্ষা। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারী, বেসরকারী ক্ষেত্রে আরো বেশী করে মাতৃভাষার প্রয়োগে জোর দিতে হবে। নতুন প্রজন্মকে বারবার একুশে ফেব্রুয়ারীর ভাষা আন্দোলনের কথা গর্বের সাথে বলতে হবে। জানাতে হবে শত শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই গৌরবগাথা। ভাষার ঐতিহ্য, সাহিত্য সম্ভার সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। কারণ এরাই আগামী দিনে বাংলা গড়বে।
ভাষার সাথে আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ করতে হবে শিশু বয়স থেকেই। ভারতের সভ্যতা সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং সহনশীলতা শেখায়। রবি ঠাকুরের ভাষায় "ইংরাজী ভাষা জাহাজে করে এই দেশের শহরে, বন্দরে আসতে পারে। কিন্তু পল্লীর আনাচে কানাচে তাকে পৌঁছে দিতে হলে দেশী ভাষার ডিঙি নৌকার প্রয়োজন।" তাই বিভিন্নভাবে মাতৃভাষার প্রয়োগ বাড়াতে বাংলা সংস্করণে বেশী বেশী কম্পিউটার সফটওয়্যার বানানো এবং দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতে হবে। সাধারণের মধ্যে শিক্ষার আলোর প্রসার ও প্রচার ঘটাতে হলে শিক্ষাঙ্গনে অবশ্যই মাতৃভাষায় শিক্ষা দিতে হবে। পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার দাবিতে এত শহীদের মৃত্যুর কোন উদাহরণ নেই, যা বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে আছে। আমরা এও জানি, এই পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে অনেক ভাষা শুধুমাত্র অবহেলা অবমাননার কারণে। এক্ষেত্রে বিদেশী ভাষার আগ্রাসনও বিলুপ্তির অন্য কারণ। কোথাও কোথাও সাময়িক আনন্দের জন্য উৎসাহিত করা হয়ে থাকে বিকৃত মাতৃভাষার চর্চাকে। কোনরকম শুদ্ধ ভাষা চর্চার অবকাশ দিন দিন কমছে। আমাদেরই দায়িত্ব নিতে হবে মাতৃভাষার শুদ্ধতম চর্চার প্রয়োগে। আমাদের মধ্যে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি প্রেমের পাশাপাশি তাদের ভাষার প্রতি মোহও প্রবলভাবে লক্ষ্যণীয়। তরুণ প্রজন্ম ইংরাজীতে কথা বলাটাই তথাকথিত স্মার্টনেস বলে ভাবে।
এটা বাংলা ভাষার পক্ষে অপমানজনক। বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে প্রচলনের ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে যে বিড়ম্বনার সৃষ্টি হয়েছে, তা কিন্তু কোনভাবেই স্বস্তির নয়। বলতেই হয়, সারা দেশে আজ বাংলা ভাষার অবমাননা চলছে। তাই সর্বস্তরসহ রাজনীতিকদেরও বাংলা ভাষার ব্যাপারে আরো অনেক বেশী সচেতন হতে হবে। বর্তমান অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তরুণ প্রজন্মের প্রতি তোমার বাংলা ভাষাকে জায়গা করে দাও প্রতিটি বাঙালীর হৃদয়ে।
Goutam Samajder, 22/86 Raja Manindra Road, kolkata-37

Comments
Post a Comment