Skip to main content

শিকড়ের সন্ধানে: আধুনিকতার স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে লোকজ শিল্প ।। ভাস্কর সিনহা

nabapravat

শিকড়ের সন্ধানে: আধুনিকতার স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে লোকজ শিল্প


ভাস্কর সিনহা


প্রস্তাবনা:

সময়ের প্রবাহে পরিবর্তন অনিবার্য। সভ্যতার ইতিহাসে পরিবর্তন ও বিবর্তনের পথ ধরে এগিয়ে আসে নিত্যনতুন আধুনিকতা, আর এই আধুনিকতার বেগেই অনেক সময় ধুয়ে যায় আমাদের লোকজ সংস্কৃতি, বিশেষত লোকজ শিল্পকলা। বাংলার মাটির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, প্রাণ-প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ লোকজ শিল্পসমূহ আজ ক্রমশ বিলুপ্তপ্রায়। পুরুলিয়ার ছৌনাচ, বাঁকুড়ার মৃৎশিল্প—বিশেষত মাটির ঘোড়া, গাজন উৎসবের মত শিল্প ও সংস্কৃতিগুলো আজ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এই প্রবন্ধে এই বিলুপ্তপ্রায় লোকশিল্পের ইতিহাস, বর্তমান অবস্থা, হারিয়ে যাওয়ার কারণ এবং ভবিষ্যতের পথনির্দেশ নিয়ে বিশ্লেষণ করা হবে।
লোকজ সংস্কৃতি ও শিল্পকলা মূলত গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি। বাংলার প্রাচীন গ্রামীণ সমাজে মাটির শিল্প, সঙ্গীত, নৃত্য ও উৎসব ছিল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। পুরুলিয়ার ছৌনাচ বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অনন্য নিদর্শন। এই নাচে মুখোশ, রঙিন পোশাক, বিশেষ শারীরিক ভঙ্গিমার সমন্বয়ে ফুটে উঠত পৌরাণিক কাহিনির বিভিন্ন চরিত্র। কিন্তু নগরায়ণের প্রভাবে গ্রামীণ জীবনযাত্রায় দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে, যার ফলে এই লোকশিল্পের গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা কমে যাচ্ছে। আজকের প্রজন্ম প্রযুক্তি-নির্ভর বিনোদনের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়েছে, যা ঐতিহ্যগত সংস্কৃতিকে সরিয়ে দিয়ে নতুন রূপে সমাজকে গড়ে তুলছে।
বাঁকুড়ার মৃৎশিল্প, বিশেষত মাটির ঘোড়া, বাঙালির সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে যুক্ত। এই শিল্পে রয়েছে শিল্পীর নিপুণ হাতের ছোঁয়া ও গভীর সৌন্দর্যবোধ। একসময় ঘরোয়া উপকরণ এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে মাটির পাত্র ও ঘোড়ার ব্যবহার ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আধুনিক প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় মাটির পাত্র ও ঘোড়ার চাহিদা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছেন, যার ফলে বংশানুক্রমিকভাবে চলে আসা এই শিল্প ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
গাজন উৎসব পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ জীবনে একটি প্রাচীন ধর্মীয় অনুষ্ঠান। চৈত্র মাসের শেষে শিবের পুজো উপলক্ষে এই উৎসবে বিশেষ নৃত্য, গান, মেলা ও লোকনাট্যের আয়োজন করা হয়। এই গাজন উৎসব সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক ছিল। আধুনিক সময়ে সমাজের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষণ কমে যাওয়ায় গাজনের মতো উৎসবগুলো ক্রমশ নিষ্প্রভ হয়ে যাচ্ছে। গ্রামের তরুণ সমাজ শহরের জীবনধারায় আকৃষ্ট হয়ে লোকজ উৎসবের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে।
লোকজ শিল্প হারানোর এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক উদাসীনতা, এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিবর্তন। তাছাড়া, এই শিল্পীদের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও সাংগঠনিক সহায়তা দেওয়া হয় না বললেই চলে। বর্তমানে লোকজ শিল্পী ও কারিগরদের জন্য পর্যাপ্ত বাজার ও বিপণন কৌশলের অভাবও শিল্পের টিকে থাকা কঠিন করে তুলেছে।
এমন পরিস্থিতিতে আমাদের উচিত লোকজ শিল্প ও সংস্কৃতির যথাযথ সংরক্ষণ এবং প্রচার করা। শিল্পীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই শিল্পের প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লোকজ শিল্পের বিশেষ পাঠ্যক্রম চালু এবং স্থানীয় পর্যায়ে উৎসব-প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি সম্ভব। সরকারি উদ্যোগে সাংস্কৃতিক পর্যটন বৃদ্ধির মাধ্যমে এই বিলুপ্তপ্রায় শিল্পগুলোর পুনরুজ্জীবন ঘটানো যেতে পারে।
শুধুমাত্র অতীতকে আঁকড়ে থাকা নয়, বরং অতীতের আলোকে বর্তমানকে সমৃদ্ধ করাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। শিল্প ও সংস্কৃতির সঠিক সংমিশ্রণেই সম্ভব একটি সুস্থ, ঐক্যবদ্ধ ও মননশীল জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশ। লোকজ শিল্পের পুনর্জাগরণে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রেখে যাওয়া আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। সুতরাং, আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়েই লোকজ শিল্পের প্রাণ ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে, আমরা শিকড়ের সন্ধানে আবার নতুন যাত্রার সূচনা করতে পারি।

লোকশিল্পের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতা:

বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও শিল্পের ইতিহাস হাজার বছরের ঐতিহ্যকে ধারণ করে। পুরুলিয়ার ছৌনাচ বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লোকনৃত্য, যার শিকড় রামায়ণ ও মহাভারতের পৌরাণিক কাহিনীতে নিহিত। মুখোশ পরে যুদ্ধের গল্প ফুটিয়ে তোলা ছৌনাচে রয়েছে লোকজ ধর্মবিশ্বাস ও জীবনযাপনের গভীর ছাপ। বাঁকুড়ার মাটির ঘোড়া শুধুই সৌন্দর্যবোধ নয়, লোকজ দেবতার বাহন হিসেবে এর ছিল গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় তাৎপর্য। গাজন উৎসব, শিবের আরাধনার সাথে গ্রামীণ বাংলার মানুষের মিলনের উৎসব হিসেবে বিবেচিত হয়, যা ঐক্য ও সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে ছিল। কিন্তু আজকের দিনে এই সংস্কৃতিগুলো বিলুপ্তির পথে কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই চোখে পড়ে নগরায়ণের প্রতিক্রিয়া। গ্রামীণ জীবনব্যবস্থার দ্রুত পরিবর্তনে লোকজ শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বিশেষত, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে শহুরে সংস্কৃতির আকর্ষণ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতি তাদের আগ্রহ নেই বললেই চলে। পুরুলিয়ার ছৌনাচ, যা একসময় ছিল গ্রামীণ উৎসবের প্রধান আকর্ষণ, তা এখন কিছু বিশেষ অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ছৌনাচের শিল্পীরা জীবিকা নির্বাহের তাগিদে তাদের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য থেকে সরে গিয়ে নতুন পেশার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে শিল্পের মধ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে যে দক্ষতা ও পারদর্শিতা বহমান ছিল, তা এখন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাঁকুড়ার বিখ্যাত মাটির ঘোড়া শিল্পের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। একটি সময় ছিল যখন গ্রামীণ সমাজে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে মাটির ঘোড়ার ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। এই শিল্পটি ছিল পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারক। প্রতিটি মৃৎশিল্পীর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে তৈরি হতো অনন্য এই শিল্পকর্ম। কিন্তু বর্তমানে প্লাস্টিক, ধাতব ও আধুনিক উপকরণের সহজলভ্যতা এবং স্বল্পমূল্যের কারণে মাটির জিনিসপত্রের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমেছে। ফলে মৃৎশিল্পীরা আর্থিক সংকটে পড়ে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। বহু পরিবার, যাদের একমাত্র রুটি-রুজি ছিল মৃৎশিল্প, আজ তারা অন্য পেশার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন।
গাজন উৎসবের ক্ষেত্রেও একই দৃশ্য। একসময়ের উৎসাহ-উদ্দীপনা ভরা এই উৎসব আজ অনেকটাই নিষ্প্রভ। গ্রামীণ ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐক্যের প্রতীক এই গাজন উৎসবে একসময় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতো। বর্তমানে শহুরে সভ্যতার প্রসারের ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান ও ধরনে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। নতুন প্রজন্মের অধিকাংশই গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে গ্রামের সাংস্কৃতিক জীবন শূন্যতায় ভুগছে। ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান ও লোকজ রীতিনীতির প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহের অভাবেও গাজন উৎসবের উৎসাহ অনেকটা ম্লান হয়ে পড়েছে।
লোকজ শিল্পের এই বিলুপ্তির কারণ হিসেবে আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য— তা হলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সহায়তা, শিল্পীদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ, এবং ব্যাপক বিপণনের সুযোগ না থাকায় লোকজ শিল্প ও শিল্পীদের ভবিষ্যৎ সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া, শিক্ষা ব্যবস্থায় লোকশিল্পের গুরুত্ব ও তাৎপর্য যথাযথভাবে তুলে না ধরার কারণে নতুন প্রজন্ম তাদের শিকড় ও ঐতিহ্য সম্পর্কে অজ্ঞই থেকে যাচ্ছে।
এসব শিল্পের বিলুপ্তি ঠেকাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি ও যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতা, আর্থিক সহায়তা, শিল্পীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও উন্নত বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। নতুন প্রজন্মের মাঝে এই শিল্পের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ পাঠ্যক্রম চালু এবং নিয়মিত লোকজ উৎসব আয়োজন অত্যন্ত কার্যকর হবে। এভাবেই আমাদের লোকশিল্প বাঁচিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে সম্ভব হবে আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের প্রকৃত সন্ধান।

লোকশিল্পের বর্তমান অবস্থা ও বিলুপ্তির কারণসমূহ :

বর্তমানে পুরুলিয়ার ছৌনাচ শিল্পীরা আর্থিক সংকট ও উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। প্রায় একই চিত্র বাঁকুড়ার মৃৎশিল্পের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। শিল্পীরা জীবিকা নির্বাহের জন্য বাধ্য হচ্ছেন শহরমুখী হতে। গ্রামীণ জীবনধারার পরিবর্তন, আধুনিক প্রযুক্তির আগমন ও নতুন প্রজন্মের গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া—এ সবকিছুই এই লোকশিল্পের বিলুপ্তির প্রধান কারণ। আধুনিক প্রজন্মের কাছে এসব শিল্প তাদের জীবনধারার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, ফলে ক্রমাগত উপেক্ষিত হচ্ছে এসব লোকজ শিল্প।
পুরুলিয়ার ছৌনাচ একসময় গ্রামীণ জীবনের আনন্দ-বেদনা প্রকাশের অপরিহার্য মাধ্যম ছিল। উৎসব-অনুষ্ঠানে নৃত্যশিল্পীদের ব্যাপক চাহিদা থাকত। কিন্তু এখন সময়ের প্রবাহে শিল্পীদের পরিবেশনার সুযোগ সীমিত হয়ে এসেছে। স্থানীয় সংস্কৃতির পরিবর্তনে এবং গণমাধ্যমে বিনোদনের নতুন রূপের উপস্থিতিতে গ্রামীণ দর্শক-শ্রোতারাও বিমুখ হয়ে পড়েছে। আধুনিকতার প্রভাবে তরুণ প্রজন্ম টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ফলে গ্রামীণ লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি তাদের আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে। ছৌনাচের শিল্পীরা আর্থিক সংকটে পড়ে, জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছেন, এবং উত্তরাধিকার সূত্রে পরবর্তী প্রজন্মকে এই শিল্পে পারদর্শী করে তোলার ইচ্ছেও হারিয়ে ফেলছেন।
অন্যদিকে, বাঁকুড়ার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের ক্ষেত্রেও একই রকম সংকট দৃশ্যমান। এক সময় বাঁকুড়ার মাটির ঘোড়া বাংলার প্রতিটি ঘরের সৌন্দর্য বাড়াত, লোকায়ত দেবতার প্রতীক হিসেবে তার ব্যবহার ছিল সর্বজনীন। কিন্তু প্লাস্টিক, স্টিল ও অন্যান্য আধুনিক উপকরণ সহজলভ্য ও অপেক্ষাকৃত কমদামী হওয়ায় মানুষ এখন মাটির তৈরি জিনিসের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। গ্রামীণ হাট-বাজারে মাটির পণ্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় মৃৎশিল্পীরা দিন দিন পেশা পরিবর্তন করছেন। শিল্পীদের আয়ের উৎস সীমিত হওয়ায় তারা বাধ্য হচ্ছেন শহরের শ্রমিক, দোকানদার বা ছোটো চাকরির দিকে ঝুঁকতে। একসময়ের গর্বিত ও জনপ্রিয় এই শিল্প আজ শিল্পীদের কাছেই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়াও গ্রামীণ জীবনের সংস্কৃতির প্রতি নতুন প্রজন্মের বিরাগের কারণেও এই শিল্পগুলি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় গ্রামীণ লোকশিল্প সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা না থাকায়, তরুণরা এই ঐতিহ্যের গুরুত্ব বুঝতে পারছে না। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যত বাড়ছে, লোকজ শিল্পের স্থান তত সংকুচিত হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, বিপণনের অভাব এবং শিল্পীদের প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নের উদ্যোগ না থাকায় শিল্পগুলির ভবিষ্যৎ আরো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রয়াস ছাড়া এই লোকশিল্পের অস্তিত্ব আগামী দিনে আরও সংকটে পড়তে বাধ্য। তাই এই শিল্পগুলিকে বাঁচানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

লোকশিল্প বনাম আধুনিক শিল্পের সম্পর্ক ও পরিবর্তন:

আধুনিক শিল্পকলার সঙ্গে লোকশিল্পের সম্পর্ক গভীর ও জটিল। আধুনিক শিল্প মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক, শিল্পীর ব্যক্তিগত ভাবনা ও সৃষ্টিশীলতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। অন্যদিকে লোকশিল্প সামষ্টিক জীবনধারা, বিশ্বাস ও লোকাচারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। এই মৌলিক পার্থক্যই এই দুই শিল্পধারার সম্পর্ককে কঠিন ও জটিল করেছে। আধুনিক শিল্প সমাজের নগরায়ন, বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে, কিন্তু লোকশিল্প এই দ্রুত পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
লোকশিল্পের মূল শক্তি তার সহজ-সরল অভিব্যক্তি, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নিখুঁতভাবে তুলে ধরার মধ্যে। এই শিল্পের মধ্যে নিহিত রয়েছে গ্রামীণ মানুষের জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ, প্রকৃতি ও মানবের নিবিড় সম্পর্ক এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাস। কিন্তু আধুনিক শিল্পের সাথে এই সরলতা ও স্বতঃস্ফূর্ততার বিরোধ তৈরি হয়। আধুনিক শিল্প কলায় শিল্পীর ব্যক্তিগত দর্শন ও মানসিক দ্বন্দ্বকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে চলে যায়। এর ফলে আধুনিক শিল্প ও লোকশিল্পের মধ্যে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে, যা দুই ধারার শিল্পীদের একে অপরের প্রতি নির্লিপ্ত করে তুলছে।
আধুনিক শিল্পের নগরকেন্দ্রিক বিস্তার এবং বাজারনির্ভর বিপণন পদ্ধতির কারণে লোকশিল্পীরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছেন। শিল্পের বিপণন ও প্রচার কৌশলে আধুনিক শিল্পীরা প্রযুক্তিগত সুবিধা পাচ্ছেন, যা গ্রামীণ লোকশিল্পীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। পাশাপাশি, আধুনিক শিল্পীরা আর্থিকভাবে বেশি সক্ষম ও প্রভাবশালী হওয়ায় সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও বেশি পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে, লোকশিল্পীরা আর্থিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে তাদের শিল্পকর্ম তুলে ধরার সুযোগ পান না।
লোকশিল্পের সৌন্দর্য ও গভীরতা সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগের অভাবও এই দুই ধারার দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা শিল্পকলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লোকশিল্পের গুরুত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি করা হয় না। ফলে আধুনিক শিল্পের চমকপ্রদ উপস্থাপনা ও উচ্চ সামাজিক মর্যাদার প্রতি আকর্ষণ ক্রমেই বাড়ছে, এবং লোকশিল্প ঐতিহ্যগত আবেদনের বাইরে রয়ে যাচ্ছে। আধুনিক শিল্পের জগতে সাফল্য ও অর্থনৈতিক লাভের হাতছানি থাকলেও, লোকশিল্পে সেই সুযোগ না থাকায় নতুন শিল্পীরা এই পথ বেছে নিতে অনুৎসাহিত হচ্ছেন।
ফলে এই দুই ধারার মধ্যে সম্পর্কের অবনতির ফলে সৃষ্টি হয়েছে এক গভীর সাংস্কৃতিক সংকট। তবে এই অবস্থার উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত সাংস্কৃতিক নীতি ও সচেতনতা বৃদ্ধি। আধুনিক শিল্পের বিকাশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি লোকশিল্পের রক্ষা ও সংরক্ষণও জরুরি। একটি সম্প্রীতির সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য দুই ধারার শিল্পীদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। এই ধরনের উদ্যোগই পারে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ ও বর্ণাঢ্য করতে এবং দুই ধারার মধ্যে একটি কার্যকরী সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে।

লোকশিল্পের বিলুপ্তি ও আধুনিক শিল্পের বিকাশ:

লোকশিল্পের বিলুপ্তি আধুনিক শিল্পের বিকাশের সাথে সরাসরি যুক্ত। আধুনিকতার স্রোতে গ্রামীণ জীবন ও লোকাচার ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। নগরকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার কারণে মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় গ্রামীণ সংস্কৃতির জীবনধারা ও শিল্প ঐতিহ্য ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই হারিয়ে যাওয়া শিল্পই ছিল আমাদের জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বস্তুত, শিল্পের বিলুপ্তি প্রক্রিয়ায় কেবলমাত্র প্রযুক্তি কিংবা নগরায়ন দায়ী নয়, বরং দায়ী সমাজের ক্রমাগত সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। আধুনিক জীবনধারার প্রত্যাশা ও ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রভাবে লোকশিল্পের প্রতি আগ্রহ ও শ্রদ্ধা ক্রমশ কমে গেছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই শিল্পের প্রতি উদাসীনতার অন্যতম কারণ হলো, এগুলো তাদের কাছে তথাকথিত ঽআধুনিকঽ জীবনধারার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। গ্রামীণ পরিবেশ ও প্রাচীন সংস্কৃতির সঙ্গে আজকের যুবসমাজের সংযোগ কমে যাওয়ায়, লোকশিল্পের সঙ্গে তাদের অনুভূতিগত সংযোগ তৈরি হচ্ছে না।
এছাড়া, শিল্পের এই বিলুপ্তির পেছনে অন্যতম বড় কারণ হল অর্থনৈতিক অসাম্য। লোকশিল্পীরা তাদের শিল্পকর্ম থেকে যথাযথ আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন না, কারণ তাদের সৃষ্টি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হয়ে উঠতে পারছে না। আধুনিক শিল্পের ব্যাপক বাণিজ্যিকীকরণের ফলে, পৃষ্ঠপোষকদের আগ্রহ এবং অর্থনৈতিক বিনিয়োগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নগরকেন্দ্রিক শিল্পের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে লোকশিল্পীরা আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছেন এবং তাদের শিল্পকর্ম ক্রমশ অবহেলিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, লোকশিল্পের উপকরণ ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাও এই শিল্পকে পিছিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আধুনিক শিল্পীরা তাদের শিল্পকে উন্নত প্রযুক্তি, ডিজিটাল মাধ্যম, এবং আধুনিক উপকরণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দিতে পারছেন। এই সুবিধা লোকশিল্পীরা পান না বললেই চলে। ফলে লোকশিল্পের প্রসার ও প্রচার ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করলেও, সেগুলো বেশিরভাগই যথেষ্ট নয় বা বাস্তবায়নে ঘাটতি দেখা যায়। লোকশিল্পের সাথে সম্পৃক্ত শিল্পীদের জন্য যথাযথ বাজার সৃষ্টি না হওয়া, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও শিল্পের গুরুত্ব সম্পর্কে ব্যাপক সামাজিক সচেতনতার অভাব এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ঘাটতি—এসবই লোকশিল্পের বিলুপ্তিকে ত্বরান্বিত করছে।
লোকশিল্পের বিলুপ্তি কেবলমাত্র একটি শিল্পের ক্ষতি নয়, বরং একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও আত্মিক মূল্যবোধের বিরাট ক্ষতি। আধুনিক শিল্পের বিকাশে যেমন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মর্যাদা ও স্বীকৃতি অর্জিত হয়, তেমনি লোকশিল্পের বিলুপ্তিতে হারিয়ে যায় জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের মূল্যবান সম্পদ। তাই আধুনিক শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি লোকশিল্পের সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবন সমান গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে, যাতে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষিত ও সুরক্ষিত থাকে।

লোকশিল্পের পুনর্জাগরণে করণীয়:

লোকশিল্পের পুনরুজ্জীবনের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ। শিল্পীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও জীবিকা নিশ্চিত করার মাধ্যমে লোকশিল্পের প্রতি আগ্রহী নতুন প্রজন্ম তৈরি করা সম্ভব। পাশাপাশি আধুনিক শিল্প ও প্রযুক্তির সঙ্গে লোকশিল্পের সম্মিলন ঘটানো যেতে পারে। ডিজিটাল মাধ্যমের সাহায্যে এসব শিল্পকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরে নতুন বাজার সৃষ্টি করা সম্ভব। এছাড়া স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে লোকশিল্পের গুরুত্ব বাড়ানো দরকার।
একটি জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি পর্যায়ে শিক্ষা নীতিতে লোকশিল্পের অন্তর্ভুক্তি বাধ্যতামূলক করে তোলা হলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে লোকশিল্পের প্রতি আগ্রহ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে নিয়মিত কর্মশালা, প্রদর্শনী ও শিল্পীদের সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে লোকশিল্প সম্পর্কে তাদের মধ্যে গভীর উপলব্ধি সৃষ্টি হবে।
সরকারি উদ্যোগে লোকশিল্প গ্রাম বা শিল্পকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিল্পীদের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটনশিল্পেরও বিকাশ ঘটানো সম্ভব। যেমন, বাঁকুড়ার মাটির ঘোড়া বা পুরুলিয়ার ছৌনাচের জন্য নির্দিষ্ট শিল্পগ্রাম বা সংস্কৃতি কেন্দ্র স্থাপন করলে দর্শক এবং পর্যটকদের আগমন বৃদ্ধি পাবে, যা শিল্পীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা প্রদান করবে। বেসরকারি উদ্যোক্তারা এই উদ্যোগে যোগ দিয়ে আরও শক্তিশালী বিপণন ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেন, যা লোকশিল্পকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরবে।
এছাড়া, লোকশিল্পের ডিজিটাল আর্কাইভ বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী প্রচার ও প্রসার ঘটানো সম্ভব। লোকশিল্পের ভিডিও, ডকুমেন্টারি, ইন্টারঅ্যাকটিভ ওয়েবসাইট বা অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করা যাবে। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় শিল্পীদের কার্যক্রম এবং তাদের জীবনগল্প তুলে ধরে ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালানো যেতে পারে। এতে লোকশিল্পের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব সর্বজনীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
তাছাড়া, তরুণদের জন্য শিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করে লোকশিল্পের ঐতিহ্যবাহী কৌশল ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা দরকার। এর ফলে তারা শুধু শিল্পী হিসেবে নয়, বরং উদ্যোক্তা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবেন। লোকশিল্পের পুনর্জাগরণ শুধু একটি জাতীয় দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি মূল্যবান সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জও বটে। এই সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে হারিয়ে যেতে বসা লোকশিল্পকে আবারও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে।

লোকশিল্পের ভবিষ্যৎ:

লোকশিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমাদের সচেতনতা ও উদ্যোগের ওপর। শুধুমাত্র স্মৃতিকাতরতার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং আমাদের জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে লোকশিল্পের পুনরুজ্জীবন জরুরি। ভবিষ্যতে আধুনিক শিল্প ও লোকশিল্পের মেলবন্ধনে তৈরি হতে পারে নতুন একটি শিল্পধারা, যা আমাদের অতীতের গৌরবকে ধরে রাখবে আধুনিকতার ছোঁয়ায়।
লোকশিল্পের পুনর্জাগরণ একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা উচিত। একুশ শতকের বিশ্বায়নের যুগে, শিল্প ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণ হয়ে উঠেছে এক নতুন চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে লোকশিল্পকে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করতে হবে। আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জীবন্ত প্রতীক হিসেবে লোকশিল্পের পুনঃপ্রবর্তন সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা ও দূরদর্শী পরিকল্পনা।
আগামী দিনে বৈদ্যুতিন মিডিয়া ও অপ্রকৃত বাস্তবতা মাধ্যমে লোকশিল্পকে বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করা যেতে পারে। অপ্রকৃত বাস্তবতার প্রদর্শনী, আদানপ্রদানমূলক ওয়েবসাইট, ও অপ্রকৃত বাস্তবতার মিউজিয়াম তৈরি করলে বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের লোকশিল্প সহজেই পৌঁছে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, পুরুলিয়ার ছৌনাচ কিংবা বাঁকুড়ার মাটির ঘোড়ার অপ্রকৃত বাস্তবতার প্রদর্শনী বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচালিত কর্মশালার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে লোকশিল্প আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
বিশেষত তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার জন্য লোকশিল্পের ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতাকে যুক্ত করে নতুন রূপরেখার প্রবর্তন জরুরি। বর্তমান সময়ে বেশভূষাশৈলী, গৃহসজ্জা, এবং আধুনিক শিল্পের সঙ্গে লোকশিল্পের সৃজনশীল সমন্বয় নতুন বাজার সৃষ্টি করতে পারে। যেমন—মাটির তৈরি গৃহসজ্জা সামগ্রী, আধুনিক গহনা, পোশাক কিংবা সাজসজ্জায় ঐতিহ্যের নকশা ও আধুনিকতার সংমিশ্রণ ঘটানো সম্ভব।
পাশাপাশি, সাংস্কৃতিক পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে লোকশিল্পের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন অঞ্চলের লোকশিল্পকে কেন্দ্র করে পর্যটন কেন্দ্র তৈরি হলে শিল্পীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। ফলে গ্রামের অর্থনীতিতে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন, যা লোকশিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সর্বোপরি, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় লোকশিল্প ও সংস্কৃতির গুরুত্ব পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক চেতনা ও শিল্পবোধ জাগিয়ে তুলতে পারলেই এই ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পগুলোর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হবে। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে লোকশিল্প হয়ে উঠতে পারে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের পরিচয়ের এক গর্বিত ও অপরিহার্য


উপসংহার:

লোকজ শিল্পের হারিয়ে যাওয়া আমাদের জাতীয় ক্ষতি। আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আমাদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করাও অপরিহার্য। এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখার মধ্য দিয়েই আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য টিকে থাকবে। আমাদের সচেতন উদ্যোগ, সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতাই পারে এই হারিয়ে যাওয়া লোকশিল্পকে আবারও জীবন্ত ও প্রাণবন্ত করে তুলতে।
বাংলার গ্রামীণ জীবনে লোকশিল্পের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম, কেননা এটি সাধারণ মানুষের জীবন-সংগ্রাম, আনন্দ-বেদনা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত ছিল। আধুনিকায়নের প্রবল স্রোতে যখন মানুষ নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখনই সৃষ্টি হয় সাংস্কৃতিক শূন্যতার। তাই এই শূন্যতা পূরণের জন্য আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় পুনরুদ্ধার এবং রক্ষা করা আজকের দিনে একটি অপরিহার্য কর্তব্য (সেনগুপ্ত, ২০১৪)।
বিশেষত পুরুলিয়ার ছৌনাচ, বাঁকুড়ার মৃৎশিল্প ও গাজনের মতো সমৃদ্ধ লোকশিল্পকে হারানো মানে জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কেই হারানো। আজকের দিনে যখন বৈশ্বিক পরিসরে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের গুরুত্ব বেড়েই চলেছে, তখন আমাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে ধরে রাখার গুরুত্ব সর্বাধিক। এই লোকশিল্পগুলি আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও গর্বের জন্ম দিতে পারে (ঘোষ, ২০১০)।
লোকশিল্পের হারিয়ে যাওয়া শুধু শিল্পীদের আর্থিক অনিশ্চয়তা বা সাংস্কৃতিক ক্ষতি নয়, বরং এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়কেও নির্দেশ করে। কেননা, যে সমাজ নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে, সে সমাজের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে। এই ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় লোকশিল্প ও লোকসংস্কৃতির অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত জরুরি। এতে করে তরুণ প্রজন্ম নিজেদের শিকড়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে এবং নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতন হবে (চক্রবর্তী, ২০১৮)।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে লোকশিল্পীদের আর্থিক সহযোগিতা, বিপণন ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের লোকশিল্পকে উপস্থাপনের মাধ্যমেই এই শিল্পগুলি পুনরায় প্রাণ ফিরে পেতে পারে। সেইসঙ্গে শিল্পীদের জন্য প্রশিক্ষণ, উন্নত সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির ব্যবস্থাপনাও এই শিল্পের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে (দাশগুপ্ত, ২০১৬)।
এই সচেতন উদ্যোগের মাধ্যমেই আমরা আমাদের হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে পারব। কারণ, শিকড়ের সন্ধানেই নিহিত আমাদের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পুনর্জাগরণ।

তথ্যসূত্র:

১. সেনগুপ্ত, আশিস (২০১৪), "বাংলার লোকসংস্কৃতির ইতিহাস", কলকাতা: সাহিত্যলোক প্রকাশনী, পৃ. ৮৪-৯২।
২. ঘোষ, বিনয় (২০১০), "লোকায়ত বাংলা", কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, পৃ. ১২০-১২৬।
৩. চক্রবর্তী, সুদীপ্ত (২০১৮), "বাংলার লোকজ শিল্প ও সংস্কৃতির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ", কলকাতা: পুস্তক বিপণী, পৃ. ৪৫-৫৬।
৪. দাশগুপ্ত, শুভ্র (২০১৬), "আধুনিকায়ন ও বাংলার লোকশিল্পের সংকট", কলকাতা: প্রতিভাস পাবলিকেশন, পৃ. ৩৩-৪২।

=================
ভাস্কর সিনহা 
বিশ্ব ভারতী এবং আই আই টি দিল্লীর প্রাক্তনী। দুবাই নিবাসী।

Comments

বিধিবদ্ধ স্বীকার্য :

লেখার বক্তব্যের দায়িত্ব লেখকের, পত্রিকার নয়। আমরা বহু মতের প্রকাশক মাত্র।

সাম্প্রতিক বাছাই

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ৯৮তম সংখ্যা ।। বৈশাখ ১৪৩৩ এপ্রিল ২০২৬

  শুভ নববর্ষ ১৪৩৩ নবপ্রভাতের পক্ষ থেকে সকলকে জানাই শুভ বাংলা নববর্ষের হার্দিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।  সকলের মঙ্গল হোক। পারস্পরিক সৌহার্দ্যে নন্দিত হোক জীবন। বাংলা নববর্ষকেন্দ্রিক লেখাগুচ্ছ এই সংখ্যায় রইল। অন্যান্য লেখা পরে প্রকাশিত হবে। —নিরাশাহরণ নস্কর, সম্পাদক, নবপ্রভাত।   সূচিপত্র পহেলা বৈশাখ : অদ্বিতীয় বাঙালির সর্বজনীন উৎসব ।। অলোক আচার্য বোশেখের ঘুড়ি ।। শাহ মতিন টিপু পয়লা বৈশাখ : বাঙালির প্রাণের উৎসব ।। উৎপল সরকার মাটি, বঁড়শি ও রক্তের আখ্যান ।। দিব্যেন্দু ঘোষ হালখাতা — বাঙালিয়ানা ।। শ্যামল হুদাতী বাংলা নববর্ষ : বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক ।। তপন মাইতি বাংলা পঞ্জিকার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ।। তুষার ভট্টাচার্য হালখাতা ।। চন্দ্রমা মুখার্জী নববর্ষের গৌরচন্দ্রিকা ।। অভীক চন্দ্র নববর্ষের সেকাল একাল ।। মিতা ভৌমিক নববর্ষের নবতম আশা ।। সমীর কুমার দত্ত দুই আকাশ, এক নববর্ষ ।। রাজদীপ মজুমদার আমার সন্ন্যাস ।। অংশুদেব পয়লা থেকে একলা হওয়া ।। সুকান্ত ঘোষ পহেলা বৈশাখে আনন্দ নগরের স্মৃতি ।। সারাবান তহুরা মৌমিতা বাংলা নববর্ষ ।। পার্থপ্রতিম দত্ত স্মৃতির পাতায় পয়লা ।। দেবশ্রী চক্রবর...

কবিতা ।। দি ওয়াল- রাহুল দ্রাবিড় ।। আনন্দ বক্সী

দি ওয়াল- রাহুল দ্রাবিড়  আনন্দ বক্সী  ঠান্ডা মাথা, সরল হাসি, ভদ্র আচরণ  যাঁর ব্যাটিং দক্ষতায় মজে সবার মন,  ধৈর্য আর একাগ্রতার যিনি নিদর্শন  ভারতবাসীগণের তিনি অতি আপনজন,  ইন্দোরে জন্ম হলেও কর্নাটকে বাস  ক্রিকেট খেলে ছড়িয়ে দেন ধরাধামে সুবাস, শরদ দ্রাবিড় পিতা তাঁর পেশায় কারবারি  মাতা পুষ্পা,গৃহবধূর ছেলে সে দরকারি, যাঁর ব্যাটিং দেখতে মাঠে জমতো সে কী ভিড় ক্রিকেটপ্রেমী জনের প্রিয়, সে রাহুল দ্রাবিড়। বারো বছর বয়সে তাঁর ক্রিকেটে হাতেখড়ি  স্কুলের হয়ে ভাসান প্রথম তাঁর ক্রিকেট তরি। বিশ্বনাথ ও তারাপোরে দেন ক্রিকেট-দীক্ষা  সঙ্গী হলো জীবনে তাঁর তাদের সে শিক্ষা। কর্নাটকের হয়ে তিনি ঘরোয়া খেলা খেলে  নির্বাচকের সামনে  প্রতিভা ধরেন মেলে। ওয়ানডের জাতীয়দলে পেলেন তিনি ডাক  কিন্তু যেন কোথায় একটা থেকেই গেল ফাঁক।  শুরুটা তাঁর হলোনা ভাল শ্রীলঙ্কার সাথে  বাড়ালেন সময় আরও নিজের কসরতে।  ইংল্যান্ডে ঘটল তাঁর টেস্ট-অভিষেক  এমন খেলা খেললেন যে পেলনা কেউ ঠেক। লর্ডস মাতিয়ে দিলেন তিনি দুর্দান্ত খেলে  আউট হয়ে ফ...

কবিতাঃ চন্দন ঘোষ

এক টুকরো রুটি বস্তির রাস্তায় একটা বৃদ্ধ মানুষ সারাদিন বসে আছে। উত্তরে দেখে দক্ষিনে দেখে বহুদূর কেউ একটুকরো রুটি দিয়েযায় পাছে। চক্ষু কোটোরা গত শরীর মাস হীন, হাড় মাত্র। হয়তো স্বাধিনতা আন্দোলনের বিপ্লবী! হয়তো কলেজের আদর্শ ছাত্র। হয়তো ব্রিটিশ গোরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল  তার ছোট্টো ঝুঁপরির উপর। সে বাধা দিয়েছিল প্রতীবাদী হাতে। হয়তো পঙ্গু হয়েছিল সেই রাতে। আমি এক প্রশ্ন তুলেছিলাম, কেমনে হইল এ অবস্থা? বাক সরেনা মুখে সরকার কেন করেনা কোনো ব্যাবস্থা?? শরীর বস্ত্রহীন এই রাতে। নিম্নাঙ্গে একটা নোংগরা ধুতি। কী জানি কত দিন খায়নি? কত দিন দেখেনি এক টুকরো রুটি! রাজধানী শহরের আকাশটা দেখছে। দেখছে নেতা মন্ত্রী গন। হাইরে কেউতো তারে উঠিয়ে তোলেনি। দেখেনি কোনো কোমল মন। আজ ভারতবর্ষ উন্নতশীল রাষ্ট্র!   কথাটা অতীব মিথ্যা মাটি। এমন কতযে মানুষ ক্ষুদার্থ, দেখেনা এক টুকরো রুটি। নতুন মন্ত্রী, নতুন রাষ্ট্রপতি সবাই আসে সবার হয় আবর্তন। হাইরে পিছিয়ে পড়া মানুষ গুলো! তাদের হয়না কোনো পরিবর্তন। আজ 71 বছর আজাদ হয়েও  বোধহয় যে...

ছোটগল্প ।। নীলিমার আত্মজাগরণ ।। পরেশ চন্দ্র মাহাত

নীলিমার আত্মজাগরণ পরেশ চন্দ্র মাহাত নীলিমা মাহাত, বয়স পঁচিশ প্লাস —তার বাবা মায়ের পঞ্চম তথা শেষ সন্তান। দুই দাদা —বড়দাদা শঙ্কর ও ছোটদাদা বিজয়। বড় দাদা শঙ্কর আর দুই দিদি তাদের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নীলিমা আপাতত স্বামীর কোমল হাতের স্পর্শ ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত এবং আদৌ কবে অথবা সেই সৌভাগ্য আসবে সেটা ঈশ্বরের নিকটই একমাত্র জ্ঞাত। সেই সঙ্গে দুবছরের সিনিয়র ছোটদাদা বিজয়েরও নীলিমার মতো অবস্থা। তারও জীবনসঙ্গিনী জুটেনি। মোট সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত সংসার নীলিমাদের পরিবার। মধ্যবিত্ত পরিবার —মধ্যবিত্ত পরিবার না বলে যদি নিম্নবিত্ত বলা হয় তবুও কোনো অত্যুক্তি করা হয় না। বাবার প্রত্যেকদিনের আয়ের উপর ভিত্তি করেই চলে সংসার। এই কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নীলিমার মা শ্রীমতী মেনকা‚ সংসার সামলে তার ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি যথেষ্ট তৎপর ও সহানুভূতিশীল। তাদের পড়াশুনায় কোনো খামতি রাখেননি। যথা সময়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ের মুখ দেখিয়েছে – টিউশনের বন্দোবস্ত করেছে। তাদের জীবন যাতে সুখকর হয় সেটাই প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা একপ...

উন্মুক্ত পাগলামি ।। আশরাফুল মণ্ডল

উন্মুক্ত পাগলামি আশরাফুল মণ্ডল আহা, অপরূপ নিজস্বতার দাহ! কুঁকড়ে যায় আবহমান, সজনে পাতার বোঁটায়! ভাপওঠা ভাতের কাছে মাছি সত্তায় কী নিপুণ! তবুও ঘোর লাগা বসন্তের ডাক, হাঁকে! খেদিয়ে দেয় পা দোলানো প্রস্তাব, ওই ধুনুরি চোখ! রাংতায় মোড়া ডাকের সাজ, দে দোল দোল! হুইসেল বাজিয়ে কে রুখে দ্যায় সেই নাকছাবির রুদালি কাঁপন! খালবিল ছেঁচে পাঁচসিকের  মানত কুড়িয়ে আনে, বাংলা বাজার। ঠ্যাং নাচানো সুরে চোখ মারছে, দ্যাখো ভ্যানতারা! মুখ খোলা মানেই পাঁজরের স্রোত ভাবা যেন উগরানো টালমাটাল! ঢিল মারা প্রশ্নের রোয়াকে বক্রচোখে যেন মেধাবী কবিতা! মুছে দিও তবে লাজুক গুপ্ত রোগ, দিনরাত্রি! ভালো থেকো তোমরা বাছাধন, রং মাস সে আর কতদিন... ================    ASRAFUL MANDAL Chandidas Avenue, B-zone, Durgapur, Paschim Bardhaman, Pin - 713205,  

কবিতা ।। মনোজকুমার রায়

জল সিঁড়ি চেক বইয়ের পাতা ফুরিয়ে যেতে থাকে -- ঝরে পড়ে বৃদ্ধ গাছটির পত্রমুকুল কাঁচা গন্ধ বেয়ে চলে সময়ের স্রোতে  সারা ভোর জেগে থাকি ঘুমের টলে তাড়া দেয় একগ্রাস অবিশ্বাসী বায়ু দিন ফুরনো লাল সূর্যের টানে নেমে আসে পাড় ছোঁয়া জল সিঁড়ি ================= মনোজকুমার রায় দঃ ঝাড় আলতা ডাউকিমারী, ধূপগুড়ি জলপাইগুড়ি -৭৩৫২১০ মো ৭৭৯৭৯৩৭৫৬৬

চিরকুটের কবিতা

নতুন পৃথিবী আজ সকালে রোদ্দুর নামুক ভেজা বর্ষার মতো গা ধুয়ে কিছুটা পবিত্র হবো যত জীর্ণ মলিন দ্বেষ বিলীন হোক সব সময়ের তটে গা ভাসিয়ে কিছুটা বিলাসী হবো যা ছিল অতীত যা ছিল কষ্ট সবকিছু ভুলে নবীনে ব্রতী হবো আসুক ধেয়ে সতেজ হাওয়া দূর হোক যত কুণ্ঠা ব্যথা পুরানো যত বিবাদ ভুলে ভালোবাসার আবার বেড়া দেবো কিছুটা আশাবাদী কিছুটা কর্মঠ কিছুটা জেদি কিছুটা শপথ আসুক ছুঁয়ে বাঁচার আলো হাতে হাত রেখেই বিশ্বাসের ঘরে আবার নতুন দীপ জ্বালাবো

গল্প ।। জাতিস্মর ।। আশীষ কুমার বিশ্বাস

    জাতিস্মর   আশীষ  কুমার   বিশ্বাস    গল্পের শুরুটা প্রায় ষাট বছর আগের কথা । যার নাম গৌতম, ডাক নাম ছিল বাবু ।  তার বছর তখন ছয়-সাত হবে । আমরা বা আমি তখন একটু বড় । এক সাথেই চলতো খেলা । গোল্লা ছুট, দাঁড়িয়া বান্দা, চোর-পুলিশ । যে মাঝে মাঝে খেলা থেকে বিরত থাকতো ; সে-ই জাতিস্মর । মাঠের পাশেই ছিল একটা খেঁজুর গাছ । তাতে হাত রেখে দূরের এক গ্রামের দিকে এক মনে তাঁকিয়ে থাকতো "বাবু" । গ্রামটির নাম "বিনয় পল্লী " । মাঝে বড়ো মাঠ । হাঁটা শুরু করলে তিরিশ - চল্লিশ মিনিট লাগবে । মাঝে জলে ভরপুর দেখে কখনো যাওয়া হয়নি । বাবু কে যখন বলতাম, ওপারে কি দেখছিস? ও বলতো, ওখানে আমার ছোট মা থাকে, দিদি থাকে, আমার ভুলু কুকুর থাকে । এ কথা আমাদের বিশ্বাস হতো না । আবার খেলায় ফিরে যেতাম, খেলতাম ।  কিন্তু ও বসে বসে , ওপারের গাছ পালা , বাড়ি ঘর দেখতো । কাছে গেলে বলতো , ওই যে সবুজ ,কচি কলাপাতা রঙের দালান বাড়ি, ওটাই আমাদের বাড়ি !  এই ভাবে মাস ছয়, বছর গড়াতে লাগলো । মনে প্রশ্ন জাগতে লাগলো, এ টা কি মন গড়া , বা বানিয়ে বানিয়ে বলছে? সত্যি প্রকাশ হোল এক দিন ।  সে বাড়িতে কিছু ...

নববর্ষের ছড়া ।। বাসুদেব সরকার

  পুরানো ছাড়া নতুনের সাজ  বাসুদেব সরকার এ জীবনের অতীতস্মৃতি  শিকেয় তুলে,  নতুন স্বপ্নে যায় হারিয়ে পুরান ভুলে।  নতুন স্বপ্ন, নতুন আশায়   নতুন দিনে,  নতুন দিনের হাট হতে যে  আনে কিনে। স্বপ্ন-আশা-ভালোবাসায়   বাঁচা-বাড়া,  নেই নতুনের অস্তিত্ব যে  পুরান ছাড়া।  স্থির দাঁড়ানো পুরানো ভিত্তি  ব্যতীত আজ,  ভঙ্গুর অতি, বিবর্ণ তাই- নতুনের সাজ।  ........................... ◾বাসুদেব সরকার, পেশা: শিক্ষক  চরভৈরবী, হাইমচর, চাঁদপুর, বাংলাদেশ। 

মাটি, বঁড়শি ও রক্তের আখ্যান ।। দিব্যেন্দু ঘোষ

  বাংলা নববর্ষকেন্দ্রিক গল্প মাটি , বঁড়শি ও রক্তের আখ্যান দিব্যেন্দু ঘোষ বাঁকুড়ার একেবারে শেষ প্রান্তের গ্রাম খয়েরবনি। চৈত্রের দুপুরে গ্রামটাকে দেখলে মনে হয় যেন কোনও রাক্ষস তার সর্বস্ব শুষে নিয়ে ছিবড়ে করে ফেলে রেখে গেছে। মাঠের পর মাঠ ফুটিফাটা , ধানের গোলাগুলো খাঁ খাঁ করছে। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু নদীটা কবেই শুকিয়ে কাঠ , সেখানে এখন শুধু বালি আর নুড়িপাথরের কঙ্কাল। এই প্রবল খরা আর খিদের জ্বালা, এ দুইয়ের সঙ্গেই খয়েরবনি গ্রামের মানুষের নাড়ির টান। এখানে জীবন মানে প্রতিদিনের ক্লান্তিহীন যুদ্ধ , যেখানে জেতার কোনও আশা নেই , শুধু টিকে থাকাটাই একমাত্র লক্ষ্য । গ্রামের একেবারে শেষ মাথায় বুড়ো শিবতলার প্রাচীন নাটমন্দির। সেটারও ভগ্নদশা , পলেস্তারা খসে গিয়ে ভিতরের নগ্ন ইটগুলো বেরিয়ে পড়েছে। নাটমন্দিরের এক কোণে বসেছিল রতন। ওর বয়স পঁচিশ কি ছাব্বিশ হবে , কিন্তু অভাব আর রোদের তাপে চামড়া পুড়ে গিয়ে ওকে আরও অন্তত দশ বছরের বড় দেখায়। পরনে শতচ্ছিন্ন ফতুয়া , চোখের নীচে গভীর কালি , বুকের পাঁজরগুলো গোনা যায় । আর মাত্র দু ' দিন পরেই গাজন। গ্রামের প্রা...

জনপ্রিয় লেখা

সাহিত্যের মাটিতে এক বীজ : "ত্রয়ী কাব্য" -- সুনন্দ মন্ডল

সাহিত্যের মাটিতে এক বীজ -- "ত্রয়ী কাব্য" ------------------------------------------------------------------------------ সুনন্দ মন্ডল নবীনচন্দ্র সেন সাহিত্যে তথা বাংলা কবিতার জগতে এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি চট্টগ্রাম জেলার নওয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৮৪৭ সালে তাঁর জন্ম এবং মত্যু ১৯০৯ সালে। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁকে 'বাংলার বায়রন' বলেছেন। ‎জীবৎকালীন যুগে আত্মপ্রত্যয়ের মধ্যে জাতীয় চরিত্র আত্মস্থ করে নতুন সংস্কারে প্রয়াসী হয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছেন।মধুসূদন-হেমচন্দ্র-নবীনচন্দ্র--এই তিন কবি বাংলা কাব্যধারায় প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন। বিশেষত মহাকাব্য লেখার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। এদিক থেকে মধুসূদন দত্ত একজন সফল মহাকাব্যিক। তাঁর 'মেঘনাদ বধ' কাব্যের মত গভীর ও ব্যঞ্জনাময় না হলেও নবীনচন্দ্র সেনের 'ত্রয়ী' কাব্য বিশেষ মর্যাদা দাবি করতেই পারে। তাছাড়া 'ত্রয়ী' কাব্যে ধর্মীয় ভাবধারার আবেগ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‎ ‎নবীনচন্দ্র সেন বহু কাব্য লিখেছেন। যেমন- 'অবকাশরঞ্জিনী','পলাশীর যুদ্ধ', 'ক্লিওপেট্রা', 'রঙ্গমতী', 'খ্রীষ্ট', ...

প্রবন্ধ ।। লুপ্ত ও লুপ্তপ্রায় গ্রামীণ জীবিকা ।। শ্রীজিৎ জানা

লুপ্ত ও লুপ্তপ্রায় গ্রামীণ জীবিকা শ্রীজিৎ জানা "সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়"। স্রোতের ধারা তার দু'প্রান্তে রেখে যায় ভাঙাগড়ার চিহ্ন। কালের দৃশ্যপটেও পরিবর্তনের ছবি অনিবার্যভাবেই চোখে পড়ে। সমাজ সময়ের ছাঁচে নিজেকে গড়ে নেয় প্রতিনিয়ত।  সেখানে মনে নেওয়ায় বাধা থাকলেও,মেনে নেওয়ার গাজোয়ারি চলে না। ফলত কাল বদলের গাণিতিক হিসেবে জীবন ও জীবিকার যে রদবদল,তাকেই বোধকরি সংগ্রাম বলা যায়। জীবন সংগ্রাম অথবা টিকে থাকার সংগ্রাম।  মানুষের জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আজকে যা অত্যাবশ্যকীয় কাল তার বিকল্প রূপ পেতে পারে অথবা তা অনাবশ্যক হওয়াও স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে উক্ত বিষয়টির পরিষেবা দানকারী মানুষদের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এক কালে গাঁয়ে কত ধরনের পেশার মানুষদের চোখে পোড়তো। কোন পেশা ছিল সম্বৎসরের,আবার কোন পেশা এককালীন।  সব পেশার লোকেরাই কত নিষ্ঠা ভরে গাঁয়ে  তাদের পরিষেবা দিত। বিনিময়ে সামান্য আয় হত তাদের। আর সেই আয়টুকুই ছিল  তাদের সংসার নির্বাহের একমাত্র উপায়। কালে কালান্তরে সেই সব পেশা,সেই সব সমাজবন্ধুরা হারিয়ে গ্যাছে। শুধুমাত্র তারা বেঁচে আছে অগ্রজের গল্পকথায়,আর বিভিন...

গ্রন্থ আলোচনা: শর্মিষ্ঠা দেবনাথ

প্রতিবাদ যখন অগ্নিবাণী বাংলাদেশে নারীমুক্তি ও নারী আন্দোলনের পুরোধা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৯৯তম জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদিত হল " আসিফা এবং.." কাব্য সংকলনটির মধ্যদিয়ে।সংকলনটির বিশেষত্ব হল,এটি উৎসর্গ করা হয়েছে নারীর সম্মান রক্ষার আন্দোলনের যোগ্যতম ব্যক্তি শহীদ শিক্ষক বরুন বিশ্বাসকে। সংকলক প্রকাশক সন্দীপ সাহু নিজে এবং বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিকদের দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন এমন কিছু কবিতা, যা শুধুমাত্র শব্দ ও ছন্দের অনুবন্ধ নয়, এক একটি অগ্নিবাণী।আসলে জীবনকে দেখার স্বাতন্ত্র‍্যে কবিরা সব সময়ই অগ্রগণ্য এবং অনন্য।যুগ ও জীবন দ্বন্দ্বের কণ্ঠস্বরকে আশ্রয় করে,একদিকে মনের প্রবল দাহ ও অন্যদিকে  নির্যাতিতা শিশুকন্যা ও নারীর প্রতি মনের গভীর আকুলতা থেকে প্রকাশ পেয়েছে "আসিফা এবং" এর  কবিতাগুলি।এক অন্ধকার সময়ের মুখোমুখি আমরা,সেই অন্ধকার আমাদের নিয়ে এসেছে সামাজিক অবক্ষয়ের শেষধাপে যেখানে নৈতিকতা,পাপবোধ,গ্লানিকে সরিয়ে রেখে, সমাজের বানানো নিয়মকে তোয়াক্কা না করে,অনায়াস দক্ষতায় ও ক্ষিপ্রতায় নিজেরই ধর্মচেতনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে কিছু মানুষ তার পশুত্বের পরিচয় দিয়েছে ধর্ষণ ও ন...

শ্যামাপদ মালাকারের কবিতা

চোখ """"""" নদী, অরণ্য, রাতের ফালি চাঁদ- সবেই তো আমার...স্বর্ণপিঁড়িটাও!। সেদিন, শুকতারাটার গা' মাপতে গিয়ে মনে হল, --ওরা আমার চেয়েও সুখী? দেখিনা একবার গাইতি-শাবল চালিয়ে... চালালাম। জল-মাটি ভেজা একটা 'চোখ' কুড়িয়ে ফিরলাম! সেই চোখদিয়ে দেখি-- শেষ বিকেলের নিরন্ন আঁচে ঝলসানো বুকে নীড়ে ফিরছে ধূলিমাখা কত কাল পা, কি শান্তি - কি তৃষ্ণা! পাতাক্ষোয়া কোদালেরর মাথায় ঝরেপড়া ললাটের ঘামে, কারা যেন জীবন শাণ দেয়! রুক্ষঠোঁটের আবরণে এক সময় নেমে আসে শিশিরস্নাত কালনিশি-- মাঝের ব্যবধান মুছে দেয় প্রতিশ্রুতির ভীড়- - পূর্বজনমের নিদর্শনচুম্বন শেষে হেরে যায় কার মমতাজ-- ম্লান হয়ে যায় কত পিঁড়ি! ... ম্লান হয়ে যায় কত পিঁড়ি! ... ম্লা...

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৫

   মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠানো ভালো,  তাতে অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) য...

কোচবিহারের রাস উৎসব ও রাসমেলা: এক ঐতিহ্যবাহী অধ্যায় ।। পার্থ সারথি চক্রবর্তী

  কোচবিহারের রাস উৎসব ও রাসমেলা : এক ঐতিহ্যবাহী অধ্যায়  পার্থ সারথি চক্রবর্তী  কথায় বলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। রাজার শহর কোচবিহারের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা আরো অনেক বেশি। দুর্গাপূজা আর দীপাবলির মতো দু'দুটো বিরাট মাপের উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই, এ শহর ভাসে রাস উৎসবের উন্মাদনায়। মদনমোহন ঠাকুর কোচবিহারের প্রাণের ঠাকুর। তাঁকে নিয়ে সবার আবেগ আর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা এখানে বাঁধনছাড়া। এক অপূর্ব মিলনোৎসবের চেহারা নেওয়া এই উৎসব ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক। জন, মত, সম্প্রদায়ের উর্ধে এই উৎসবের গ্রহণযোগ্যতা। সময়ের কষ্টি পাথরে পরীক্ষিত! এক প্রাণের উৎসব, যা বহুদিন ধরেই গোটা উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ উৎসবে পর্যবসিত।কোচবিহারের এই রাস উৎসবকে কেন্দ্র করে যে মেলা হয় তাও সময়ের হাত ধরে অনেক বদলে গেছে। এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া! শৈশবে বাবার হাত ধরে যে মেলা দেখেছি তা চরিত্র ও আকৃতি দু'দিক থেকেই বদলে গেছে। গত পঁচিশ বছর ধরে খুব কাছে থেকে এই উৎসব ও মেলা দেখা, অনুভব করার সুযোগ হয়েছে। যা দিনদিন অভিজ্ঞতা ও প্রাপ্তির ঝুলিকে সমৃদ্ধ করে গেছে প্রতি ক্ষেত্রেই।  খুব সংক্ষেপে এই উৎসবের ইতিহাস না জানাটা কিন্তু অবিচারই ...

মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা 2024 সংখ্যার জন্য লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি (লেখক ও সম্পাদকীয় দপ্তরের কথোপকথন আকারে) --কী পত্রিকা? --নবপ্রভাত। --মুদ্রিত না অনলাইন? --মুদ্রিত। --কোন সংখ্যা হবে এটা? --বইমেলা 2024। --কোন কোন ধরনের লেখা থাকবে? --প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া। --বিশেষ কোন বিষয় আছে? --না। যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে। --শব্দ বা লাইন সংখ্যার কোন বাঁধন আছে? --না। নেই। তবে ছোট লেখা পাঠানো ভালো (যেমন, কবিতা 12-14 লাইনের মধ্যে, অণুগল্প কমবেশি 200/250শব্দে)। তাতে অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়। --ক'টি লেখা পাঠাতে হবে? --মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। --ফেসবুক বা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশিত লেখা কি পাঠানো যাবে? --না। সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। --পত্রিকা কোন সময়ে প্রকাশিত হবে? --জানুয়ারি 2024-এর দ্বিতীয় সপ্তাহে। --লেখা পাঠানোর শেষতারিখ কত? -- 17 ডিসেম্বর 2023। --কীভাবে পাঠাতে হবে? --মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। --লেখার সঙ্গে কী কী দিতে হবে? --নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) --বিশেষ সতর্কতা কিছু ? --১)মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন '...

উৎসবের সৌন্দর্য: সেকালে ও একালে।। সৌরভ পুরকাইত

  উৎসবের সৌন্দর্য:  সেকালে ও একালে   সৌরভ পুরকাইত বাংলার উৎসব বাংলার প্রাণ। প্রতিদিনের জীবনযাপনের মধ্যে যখন মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন তাকে বেঁচে থাকার রসদ যোগায় এই উৎসব। কথায় বলে 'বারো মাসে তেরো পার্বণ'।মন আনন্দই চায়।তাই তাকে সজীবতা দিতে,পরিবারের,সমাজের ভালো-মন্দের কথা মাথায় রেখে মানুষ নিজেই সৃষ্টি করে নিয়েছে নানাবিধ উৎসবগুলিকে। একেবারে প্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ কখনোই উৎসব বিমুখ ছিল না।উৎসবই তাকে ঘর থেকে বাইরে টেনে এনেছে,চিনতে শিখিয়েছে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার আনন্দকে। উৎসব আসলে প্রাণের সাথে প্রাণের যোগ, হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের যোগ।রবীন্দ্রনাথ বলেছেন 'সত্য যেখানেই সুন্দর হয়ে প্রকাশ পায় সেইখানেই উৎসব'।হৃদয়ের সেই সুকোমল বৃত্তির জাগরণ যেন ফুটে ওঠা ফুলেরই মতো সত্য ও সুন্দর।এই জাগরণই উৎসব। তাই নানা কিছুর মধ্য দিয়ে,নানা উপলক্ষ্যে এই উৎসব প্রকাশ পায়। প্রাচীনকালে মানুষের হাতে না ছিল পসার, না ছিল পসরা।ছিল মনের আন্তরিকতা,মানুষকে কাছে টেনে নেবার ক্ষমতা।সেটাই ছিল উৎসবের সৌন্দর্য। তাই সেদিনের উৎসবে ক্ষুদ্র,তুচ্ছ উপকরণও প্রাণের উচ্ছ্বাসে মহৎ হয়ে উঠত।সেকালের উৎসবে লোক দেখানো ব্যাপার কিছু ...

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬

  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠালে  অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে হলে ভালো। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) যতিচিহ্নের আগে স্পেস না দিয়ে পরে দেবেন। ৪) বিশেষ কোন চিহ্ন (যেমন @ # ...

কবিতা ।। বসন্তের কোকিল তুমি ।। বিচিত্র কুমার

বসন্তের কোকিল তুমি   বিচিত্র কুমার                      (০১) তোমার দু-আঁখির গহীন অরণ্যে একটা স্বপ্নের বহমান নদী রয়েছে, তারই রেশ ধরে আমি হেঁটে চলি অজানা বসন্তের পথে নীর উদ্দেশ্যে। সে চলার কোন শেষ সীমা নেই তাই আমার বিষণ্ণ একতারা সন্ন্যাস খুঁজে ফিরে , কবে তুমি বুঝবে অনুশ্রী মনের পর্দা খুলে একুশ বসন্ত তোমার রঙ ছিটিয়ে যাচ্ছে অচিনপুরে। এদিকে আমার দেহের প্রতিটি শিরা ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছে তোমার ভালোবাসার একটু উষ্ণতা পাবার জন্যে, শুধু অনুভবে তাণ্ডব উচ্ছাসিত হচ্ছে--- যেদিকে তাকাই --- ফুলে ফুলে ভ্রমর গুনগুনিয়ে উড়ে উড়ে পরে বসন্তের কোকিল গান গায় নব বসন্তে, তোমার দুই চোখে আমার একই ছায়া রয়ে যায় উতলা ভালোবাসার সীমান্তে।                 (০২)        এক রক্তাক্ত বসন্তের স্মৃতি কোন এক উতলা বসন্তের সকালে পুষ্পবনে ফুটেছিল একটি টকটকে লাল গোলাপ, তার সাথে হয়েছিলো দেখা প্রথম ফাগুনে হয়েছিল দুজনার এ জীবনের আলাপ।  তারপর প্র...

বছরের বাছাই

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬

  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠালে  অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে হলে ভালো। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) যতিচিহ্নের আগে স্পেস না দিয়ে পরে দেবেন। ৪) বিশেষ কোন চিহ্ন (যেমন @ # ...

সূচিপত্র ।। ৮৯তম সংখ্যা ।। শ্রাবণ ১৪৩২ জুলাই ২০২৫

সূচিপত্র   প্রবন্ধ ।। বাংলা যাত্রা ও নাট‍্যশিল্পে অবক্ষয় ।। মাখনলাল প্রধান প্রবন্ধ ।। শ্রমিকের অধিকার ।। চন্দন দাশগুপ্ত প্রবন্ধ ।। ভিনগ্রহীদের সন্ধানে ।। শ্যামল হুদাতী প্রবন্ধ ।। নারীমর্যাদা ও অধিকার ।। হিমাদ্রি শেখর দাস কবিতা ।। মশালের রং তুলি ।। তূণীর আচার্য কবিতা ।। জললিপি ।। রূপক চট্টোপাধ্যায় গুচ্ছকবিতা || শিশির আজম নিবন্ধ ।। পূনর্জন্ম ।। শংকর ব্রহ্ম মুক্তভাবনা ।। কোলাহল তো বারণ হলো ।। মানস কুমার সেনগুপ্ত গল্প ।। গানের হাড় ।। শুভজিৎ দত্তগুপ্ত গল্প ।। শিকড়ের খোঁজে ।। সমীর কুমার দত্ত সুপ্রভাত মেট্যার পাঁচটি কবিতা গ্রন্থ-আলোচনা ।। আবদুস সালামের কাব্যগ্রন্থ 'অলীক রঙের বিশ্বাস'।। তৈমুর খান অণুগল্প ।। হরিবোল বুড়ো ।। সুমিত মোদক রম্যরচনা ।। গোয়েন্দা গোলাপচন্দ আর প্রেমের ভুল ঠিকানা ।। রাজদীপ মজুমদার দুটি গল্প ।। মুহাম্মদ ফজলুল হক দুটি কবিতা ।। তীর্থঙ্কর সুমিত কবিতা ।। মেঘমুক্তি ।। বন্দনা পাত্র কবিতা ।। ব্যবচ্ছিন্ন শরীর ।। কৌশিক চক্রবর্ত্তী কবিতা ।। শমনচিহ্ন ।। দীপঙ্কর সরকার কবিতা ।। ভালোবাসার দাগ ।। জয়শ্রী ব্যানার্জী কবিতা ।। ফণীমনসা ।। বিবেকানন্দ নস্কর ছড়া ।। আজও যদি ।। বদ্রীন...

মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার চূড়ান্ত সূচিপত্র

  মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার চূড়ান্ত সূচিপত্র প্রকাশিত হল।     যত লেখা রাখা গেল, তার দ্বিগুণ রাখা গেল না। বাদ যাওয়া সব লেখার 'মান' খারাপ এমন নয়। কয়েকটি প্রবন্ধ এবং বেশ কিছু (১৫-১৭টা) ভালোলাগা গল্প শেষ পর্যন্ত রাখা যায়নি। আমাদের সামর্থ্যহীনতার কারণে।     তবুও শেষ পর্যন্ত দশ ফর্মার পত্রিকা হয়েছে। গত দুবছরের মতো A4 সাইজের পত্রিকা।    যাঁদের লেখা রাখা গেল না, তাঁরা লেখাগুলি অন্য জায়গায় পাঠাতে পারেন। অথবা, সম্মতি দিলে আমরা লেখাগুলি আমাদের অনলাইন নবপ্রভাতের জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশ করতে পারি।    পত্রিকাটি আগামী ৯-১৩ জানুয়ারি ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আয়োজিত কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন মেলায় (রবীন্দ্র সদন - নন্দন চত্বরে) পাওয়া যাবে।     সকলকে ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।

প্রবন্ধ ।। নারীমর্যাদা ও অধিকার ।। হিমাদ্রি শেখর দাস

নারীমর্যাদা ও অধিকার হিমাদ্রি শেখর দাস  নারীর মর্যাদা বলতে বোঝায় নারীর সম্মান, অধিকার, এবং তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। এটি সমাজে নারীর অবস্থান এবং তার প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে নির্দেশ করে। নারীর প্রতি সম্মানজনক আচরণ করা হয় এবং তাদের অধিকার গুলি সুরক্ষিত থাকে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই শ্রেণি সংগ্রাম শুরু হয়েছিল অনেক আগে।  একদিকে শ্রেণী বৈষম্য অপরদিকে নারী পুরুষের বৈষম্য এই দুটি ছিল শ্রেণীবিভক্ত সমাজের অন্যতম দুটি মূল ভিত। নারীর অধিকারহীনতা বা দাসত্ব শুরু হয় পরিবার ও সম্পত্তির উদ্ভাবনের ফলে। বহু যুগ ধরে নারী সমাজকে পারিবারিক ও সামাজিক দাসত্বের বোঝা বহন করতে হয়েছে বিনা প্রতিবাদে। সভ্যতার ক্রম বিকাশের সাথে সাথে নিপীড়ন ও নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে - দাস সমাজব্যবস্থা এবং সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা পুরুষ ও পরিবারের অধীনতা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছে। সামাজিক উৎপাদনের কাজে নারীদের বঞ্চিত রেখেই তাদের পরাধীন জীবন যাপনের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। নারীর অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের সূচনা হয় ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে। নতুন করে নারীদের সামাজিক উৎপাদনের কাজে ...

প্রবন্ধ ।। বাংলা যাত্রা ও নাট‍্যশিল্পে অবক্ষয় ।। মাখনলাল প্রধান

বাংলা যাত্রা ও নাট‍্যশিল্পে অবক্ষয় মাখনলাল প্রধান বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির জগতে যাত্রা শিল্প তথা নাট‍্যশিল্পে মড়ক নেমে এসেছে । যাত্রা শিল্পের মড়কে শুধু কোভিড নয় তার বহুপূর্ব থেকেই অর্থনৈতিক বিপর্যয় , শিক্ষাক্ষেত্রে বন্ধ‍্যাত্ব এবং গ্ৰাম বাংলার পটপরিবর্তন শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। যাত্রা-শিল্পের লীলাভূমি ছিল গ্ৰাম বাংলা। গ্ৰামে প্রচুর যাত্রাপালা হত নানা উৎসবকে কেন্দ্র করে । জমিদারি ব‍্যবস্থা লুপ্ত হওয়ার পর গ্ৰামীণ মানুষের উদ‍্যোগে শীতলা পূজা,  কালীপূজা, দুর্গাপূজা, কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা, চড়ক ইত‍্যাদিকে উপলক্ষ‍্য করে যাত্রাপালার আয়োজন না হলে কেমন যেন ম‍্যাড়ম‍্যাড়ে লাগতো। সেই সঙ্গে কলকাতার বড়বড় কোম্পানির যাত্রাপালা ঘটা করে, টিকিট সেল করে হত মাঠে। খুব বড় মাপের খেলার মাঠ যেখানে ছিল না সেখানে ধানের মাঠ নেওয়া হত ‌। ত্রিশ-চল্লিশ হাজার মানুষ দেখতে আসত। স্পেশাল বাস পাঠাত  আয়োজক কর্তৃপক্ষ। বিনা ভাড়ায় বাসে যাতায়াত করত যাত্রার দর্শকেরা। কিন্তু বিকল্প ধানচাষ শুরু হলে জমিগুলো সময় মতো ফাঁকা পাওয়া গেল না । প্রথম দিকে ব‍্যাপকহারে ধান শুরু না হওয়ায় খুব একটা অসুবিধা হত না। বহুক্ষেত্রে  ধান কা...

কবিতাঃ চন্দন ঘোষ

এক টুকরো রুটি বস্তির রাস্তায় একটা বৃদ্ধ মানুষ সারাদিন বসে আছে। উত্তরে দেখে দক্ষিনে দেখে বহুদূর কেউ একটুকরো রুটি দিয়েযায় পাছে। চক্ষু কোটোরা গত শরীর মাস হীন, হাড় মাত্র। হয়তো স্বাধিনতা আন্দোলনের বিপ্লবী! হয়তো কলেজের আদর্শ ছাত্র। হয়তো ব্রিটিশ গোরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল  তার ছোট্টো ঝুঁপরির উপর। সে বাধা দিয়েছিল প্রতীবাদী হাতে। হয়তো পঙ্গু হয়েছিল সেই রাতে। আমি এক প্রশ্ন তুলেছিলাম, কেমনে হইল এ অবস্থা? বাক সরেনা মুখে সরকার কেন করেনা কোনো ব্যাবস্থা?? শরীর বস্ত্রহীন এই রাতে। নিম্নাঙ্গে একটা নোংগরা ধুতি। কী জানি কত দিন খায়নি? কত দিন দেখেনি এক টুকরো রুটি! রাজধানী শহরের আকাশটা দেখছে। দেখছে নেতা মন্ত্রী গন। হাইরে কেউতো তারে উঠিয়ে তোলেনি। দেখেনি কোনো কোমল মন। আজ ভারতবর্ষ উন্নতশীল রাষ্ট্র!   কথাটা অতীব মিথ্যা মাটি। এমন কতযে মানুষ ক্ষুদার্থ, দেখেনা এক টুকরো রুটি। নতুন মন্ত্রী, নতুন রাষ্ট্রপতি সবাই আসে সবার হয় আবর্তন। হাইরে পিছিয়ে পড়া মানুষ গুলো! তাদের হয়না কোনো পরিবর্তন। আজ 71 বছর আজাদ হয়েও  বোধহয় যে...

গল্প ।। জাতিস্মর ।। আশীষ কুমার বিশ্বাস

    জাতিস্মর   আশীষ  কুমার   বিশ্বাস    গল্পের শুরুটা প্রায় ষাট বছর আগের কথা । যার নাম গৌতম, ডাক নাম ছিল বাবু ।  তার বছর তখন ছয়-সাত হবে । আমরা বা আমি তখন একটু বড় । এক সাথেই চলতো খেলা । গোল্লা ছুট, দাঁড়িয়া বান্দা, চোর-পুলিশ । যে মাঝে মাঝে খেলা থেকে বিরত থাকতো ; সে-ই জাতিস্মর । মাঠের পাশেই ছিল একটা খেঁজুর গাছ । তাতে হাত রেখে দূরের এক গ্রামের দিকে এক মনে তাঁকিয়ে থাকতো "বাবু" । গ্রামটির নাম "বিনয় পল্লী " । মাঝে বড়ো মাঠ । হাঁটা শুরু করলে তিরিশ - চল্লিশ মিনিট লাগবে । মাঝে জলে ভরপুর দেখে কখনো যাওয়া হয়নি । বাবু কে যখন বলতাম, ওপারে কি দেখছিস? ও বলতো, ওখানে আমার ছোট মা থাকে, দিদি থাকে, আমার ভুলু কুকুর থাকে । এ কথা আমাদের বিশ্বাস হতো না । আবার খেলায় ফিরে যেতাম, খেলতাম ।  কিন্তু ও বসে বসে , ওপারের গাছ পালা , বাড়ি ঘর দেখতো । কাছে গেলে বলতো , ওই যে সবুজ ,কচি কলাপাতা রঙের দালান বাড়ি, ওটাই আমাদের বাড়ি !  এই ভাবে মাস ছয়, বছর গড়াতে লাগলো । মনে প্রশ্ন জাগতে লাগলো, এ টা কি মন গড়া , বা বানিয়ে বানিয়ে বলছে? সত্যি প্রকাশ হোল এক দিন ।  সে বাড়িতে কিছু ...

প্রবন্ধ ।। ভিনগ্রহীদের সন্ধানে ।। শ্যামল হুদাতী

ভিনগ্রহীদের সন্ধানে  শ্যামল হুদাতী  ইতিহাসের শুরু থেকে বারবার মানুষকে একটা প্রশ্ন কুঁড়ে কুঁড়ে খায় – এই মহাবিশ্বে আমরা কি একা? পৃথিবীর মতো আরও গ্রহ রয়েছে, যেখানে মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণীরা বাস করে – এই সম্ভাবনা বরাবর মানুষকে মুগ্ধ করেছে। আমাদের প্রত্যেকের জীবনের কখনও না কখনও এই ভাবনা এসেছে। দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণার পরও, এই বিষয়ে কোনও নিশ্চয়তা দিতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। জেমস ওয়েব মহাকাশ টেলিস্কোপ, বহু দূরের এমন কিছু গ্রহের সন্ধান দিয়েছে, যেগুলিতে প্রাণ থাকতেই পারে। তবে, নিশ্চিত কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে, আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ভিনগ্রহীদের খুঁজতে বহু দূরে যাওয়ার কোনও দরকার নেই। তারা এই পৃথিবীতেই মানুষের ছদ্মবেশে মানুষের মধ্যেই বসবাস করতে পারে। আমরা ভিনগ্রহীদের যেমন কল্পনা করি, এরা তার থেকে আলাদা। এরা অনেকটাই, দেবদূতদের মতো। মানব জগতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক প্রযুক্তিগত নয়, বরং জাদুকরি। মহাকাশে সৌরজগতের গ্রহ পৃথিবী ছাড়া অন্য কোথায় প্রাণ রয়েছে কি না তা নিয়ে চলছে বিস্তর গবেষণা। একই সঙ্গে পৃথিবী ছাড়া অন্য কোনো গ্রহে মানুষ বসবাস ক...

ছোটগল্প ।। নীলিমার আত্মজাগরণ ।। পরেশ চন্দ্র মাহাত

নীলিমার আত্মজাগরণ পরেশ চন্দ্র মাহাত নীলিমা মাহাত, বয়স পঁচিশ প্লাস —তার বাবা মায়ের পঞ্চম তথা শেষ সন্তান। দুই দাদা —বড়দাদা শঙ্কর ও ছোটদাদা বিজয়। বড় দাদা শঙ্কর আর দুই দিদি তাদের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নীলিমা আপাতত স্বামীর কোমল হাতের স্পর্শ ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত এবং আদৌ কবে অথবা সেই সৌভাগ্য আসবে সেটা ঈশ্বরের নিকটই একমাত্র জ্ঞাত। সেই সঙ্গে দুবছরের সিনিয়র ছোটদাদা বিজয়েরও নীলিমার মতো অবস্থা। তারও জীবনসঙ্গিনী জুটেনি। মোট সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত সংসার নীলিমাদের পরিবার। মধ্যবিত্ত পরিবার —মধ্যবিত্ত পরিবার না বলে যদি নিম্নবিত্ত বলা হয় তবুও কোনো অত্যুক্তি করা হয় না। বাবার প্রত্যেকদিনের আয়ের উপর ভিত্তি করেই চলে সংসার। এই কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নীলিমার মা শ্রীমতী মেনকা‚ সংসার সামলে তার ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি যথেষ্ট তৎপর ও সহানুভূতিশীল। তাদের পড়াশুনায় কোনো খামতি রাখেননি। যথা সময়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ের মুখ দেখিয়েছে – টিউশনের বন্দোবস্ত করেছে। তাদের জীবন যাতে সুখকর হয় সেটাই প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা একপ...

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ৯৮তম সংখ্যা ।। বৈশাখ ১৪৩৩ এপ্রিল ২০২৬

  শুভ নববর্ষ ১৪৩৩ নবপ্রভাতের পক্ষ থেকে সকলকে জানাই শুভ বাংলা নববর্ষের হার্দিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।  সকলের মঙ্গল হোক। পারস্পরিক সৌহার্দ্যে নন্দিত হোক জীবন। বাংলা নববর্ষকেন্দ্রিক লেখাগুচ্ছ এই সংখ্যায় রইল। অন্যান্য লেখা পরে প্রকাশিত হবে। —নিরাশাহরণ নস্কর, সম্পাদক, নবপ্রভাত।   সূচিপত্র পহেলা বৈশাখ : অদ্বিতীয় বাঙালির সর্বজনীন উৎসব ।। অলোক আচার্য বোশেখের ঘুড়ি ।। শাহ মতিন টিপু পয়লা বৈশাখ : বাঙালির প্রাণের উৎসব ।। উৎপল সরকার মাটি, বঁড়শি ও রক্তের আখ্যান ।। দিব্যেন্দু ঘোষ হালখাতা — বাঙালিয়ানা ।। শ্যামল হুদাতী বাংলা নববর্ষ : বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক ।। তপন মাইতি বাংলা পঞ্জিকার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ।। তুষার ভট্টাচার্য হালখাতা ।। চন্দ্রমা মুখার্জী নববর্ষের গৌরচন্দ্রিকা ।। অভীক চন্দ্র নববর্ষের সেকাল একাল ।। মিতা ভৌমিক নববর্ষের নবতম আশা ।। সমীর কুমার দত্ত দুই আকাশ, এক নববর্ষ ।। রাজদীপ মজুমদার আমার সন্ন্যাস ।। অংশুদেব পয়লা থেকে একলা হওয়া ।। সুকান্ত ঘোষ পহেলা বৈশাখে আনন্দ নগরের স্মৃতি ।। সারাবান তহুরা মৌমিতা বাংলা নববর্ষ ।। পার্থপ্রতিম দত্ত স্মৃতির পাতায় পয়লা ।। দেবশ্রী চক্রবর...

মাসের বাছাই

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ৯৮তম সংখ্যা ।। বৈশাখ ১৪৩৩ এপ্রিল ২০২৬

  শুভ নববর্ষ ১৪৩৩ নবপ্রভাতের পক্ষ থেকে সকলকে জানাই শুভ বাংলা নববর্ষের হার্দিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।  সকলের মঙ্গল হোক। পারস্পরিক সৌহার্দ্যে নন্দিত হোক জীবন। বাংলা নববর্ষকেন্দ্রিক লেখাগুচ্ছ এই সংখ্যায় রইল। অন্যান্য লেখা পরে প্রকাশিত হবে। —নিরাশাহরণ নস্কর, সম্পাদক, নবপ্রভাত।   সূচিপত্র পহেলা বৈশাখ : অদ্বিতীয় বাঙালির সর্বজনীন উৎসব ।। অলোক আচার্য বোশেখের ঘুড়ি ।। শাহ মতিন টিপু পয়লা বৈশাখ : বাঙালির প্রাণের উৎসব ।। উৎপল সরকার মাটি, বঁড়শি ও রক্তের আখ্যান ।। দিব্যেন্দু ঘোষ হালখাতা — বাঙালিয়ানা ।। শ্যামল হুদাতী বাংলা নববর্ষ : বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক ।। তপন মাইতি বাংলা পঞ্জিকার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ।। তুষার ভট্টাচার্য হালখাতা ।। চন্দ্রমা মুখার্জী নববর্ষের গৌরচন্দ্রিকা ।। অভীক চন্দ্র নববর্ষের সেকাল একাল ।। মিতা ভৌমিক নববর্ষের নবতম আশা ।। সমীর কুমার দত্ত দুই আকাশ, এক নববর্ষ ।। রাজদীপ মজুমদার আমার সন্ন্যাস ।। অংশুদেব পয়লা থেকে একলা হওয়া ।। সুকান্ত ঘোষ পহেলা বৈশাখে আনন্দ নগরের স্মৃতি ।। সারাবান তহুরা মৌমিতা বাংলা নববর্ষ ।। পার্থপ্রতিম দত্ত স্মৃতির পাতায় পয়লা ।। দেবশ্রী চক্রবর...

ছোটগল্প ।। নীলিমার আত্মজাগরণ ।। পরেশ চন্দ্র মাহাত

নীলিমার আত্মজাগরণ পরেশ চন্দ্র মাহাত নীলিমা মাহাত, বয়স পঁচিশ প্লাস —তার বাবা মায়ের পঞ্চম তথা শেষ সন্তান। দুই দাদা —বড়দাদা শঙ্কর ও ছোটদাদা বিজয়। বড় দাদা শঙ্কর আর দুই দিদি তাদের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নীলিমা আপাতত স্বামীর কোমল হাতের স্পর্শ ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত এবং আদৌ কবে অথবা সেই সৌভাগ্য আসবে সেটা ঈশ্বরের নিকটই একমাত্র জ্ঞাত। সেই সঙ্গে দুবছরের সিনিয়র ছোটদাদা বিজয়েরও নীলিমার মতো অবস্থা। তারও জীবনসঙ্গিনী জুটেনি। মোট সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত সংসার নীলিমাদের পরিবার। মধ্যবিত্ত পরিবার —মধ্যবিত্ত পরিবার না বলে যদি নিম্নবিত্ত বলা হয় তবুও কোনো অত্যুক্তি করা হয় না। বাবার প্রত্যেকদিনের আয়ের উপর ভিত্তি করেই চলে সংসার। এই কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নীলিমার মা শ্রীমতী মেনকা‚ সংসার সামলে তার ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি যথেষ্ট তৎপর ও সহানুভূতিশীল। তাদের পড়াশুনায় কোনো খামতি রাখেননি। যথা সময়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ের মুখ দেখিয়েছে – টিউশনের বন্দোবস্ত করেছে। তাদের জীবন যাতে সুখকর হয় সেটাই প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা একপ...

কবিতাঃ চন্দন ঘোষ

এক টুকরো রুটি বস্তির রাস্তায় একটা বৃদ্ধ মানুষ সারাদিন বসে আছে। উত্তরে দেখে দক্ষিনে দেখে বহুদূর কেউ একটুকরো রুটি দিয়েযায় পাছে। চক্ষু কোটোরা গত শরীর মাস হীন, হাড় মাত্র। হয়তো স্বাধিনতা আন্দোলনের বিপ্লবী! হয়তো কলেজের আদর্শ ছাত্র। হয়তো ব্রিটিশ গোরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল  তার ছোট্টো ঝুঁপরির উপর। সে বাধা দিয়েছিল প্রতীবাদী হাতে। হয়তো পঙ্গু হয়েছিল সেই রাতে। আমি এক প্রশ্ন তুলেছিলাম, কেমনে হইল এ অবস্থা? বাক সরেনা মুখে সরকার কেন করেনা কোনো ব্যাবস্থা?? শরীর বস্ত্রহীন এই রাতে। নিম্নাঙ্গে একটা নোংগরা ধুতি। কী জানি কত দিন খায়নি? কত দিন দেখেনি এক টুকরো রুটি! রাজধানী শহরের আকাশটা দেখছে। দেখছে নেতা মন্ত্রী গন। হাইরে কেউতো তারে উঠিয়ে তোলেনি। দেখেনি কোনো কোমল মন। আজ ভারতবর্ষ উন্নতশীল রাষ্ট্র!   কথাটা অতীব মিথ্যা মাটি। এমন কতযে মানুষ ক্ষুদার্থ, দেখেনা এক টুকরো রুটি। নতুন মন্ত্রী, নতুন রাষ্ট্রপতি সবাই আসে সবার হয় আবর্তন। হাইরে পিছিয়ে পড়া মানুষ গুলো! তাদের হয়না কোনো পরিবর্তন। আজ 71 বছর আজাদ হয়েও  বোধহয় যে...

উন্মুক্ত পাগলামি ।। আশরাফুল মণ্ডল

উন্মুক্ত পাগলামি আশরাফুল মণ্ডল আহা, অপরূপ নিজস্বতার দাহ! কুঁকড়ে যায় আবহমান, সজনে পাতার বোঁটায়! ভাপওঠা ভাতের কাছে মাছি সত্তায় কী নিপুণ! তবুও ঘোর লাগা বসন্তের ডাক, হাঁকে! খেদিয়ে দেয় পা দোলানো প্রস্তাব, ওই ধুনুরি চোখ! রাংতায় মোড়া ডাকের সাজ, দে দোল দোল! হুইসেল বাজিয়ে কে রুখে দ্যায় সেই নাকছাবির রুদালি কাঁপন! খালবিল ছেঁচে পাঁচসিকের  মানত কুড়িয়ে আনে, বাংলা বাজার। ঠ্যাং নাচানো সুরে চোখ মারছে, দ্যাখো ভ্যানতারা! মুখ খোলা মানেই পাঁজরের স্রোত ভাবা যেন উগরানো টালমাটাল! ঢিল মারা প্রশ্নের রোয়াকে বক্রচোখে যেন মেধাবী কবিতা! মুছে দিও তবে লাজুক গুপ্ত রোগ, দিনরাত্রি! ভালো থেকো তোমরা বাছাধন, রং মাস সে আর কতদিন... ================    ASRAFUL MANDAL Chandidas Avenue, B-zone, Durgapur, Paschim Bardhaman, Pin - 713205,  

গল্প ।। জাতিস্মর ।। আশীষ কুমার বিশ্বাস

    জাতিস্মর   আশীষ  কুমার   বিশ্বাস    গল্পের শুরুটা প্রায় ষাট বছর আগের কথা । যার নাম গৌতম, ডাক নাম ছিল বাবু ।  তার বছর তখন ছয়-সাত হবে । আমরা বা আমি তখন একটু বড় । এক সাথেই চলতো খেলা । গোল্লা ছুট, দাঁড়িয়া বান্দা, চোর-পুলিশ । যে মাঝে মাঝে খেলা থেকে বিরত থাকতো ; সে-ই জাতিস্মর । মাঠের পাশেই ছিল একটা খেঁজুর গাছ । তাতে হাত রেখে দূরের এক গ্রামের দিকে এক মনে তাঁকিয়ে থাকতো "বাবু" । গ্রামটির নাম "বিনয় পল্লী " । মাঝে বড়ো মাঠ । হাঁটা শুরু করলে তিরিশ - চল্লিশ মিনিট লাগবে । মাঝে জলে ভরপুর দেখে কখনো যাওয়া হয়নি । বাবু কে যখন বলতাম, ওপারে কি দেখছিস? ও বলতো, ওখানে আমার ছোট মা থাকে, দিদি থাকে, আমার ভুলু কুকুর থাকে । এ কথা আমাদের বিশ্বাস হতো না । আবার খেলায় ফিরে যেতাম, খেলতাম ।  কিন্তু ও বসে বসে , ওপারের গাছ পালা , বাড়ি ঘর দেখতো । কাছে গেলে বলতো , ওই যে সবুজ ,কচি কলাপাতা রঙের দালান বাড়ি, ওটাই আমাদের বাড়ি !  এই ভাবে মাস ছয়, বছর গড়াতে লাগলো । মনে প্রশ্ন জাগতে লাগলো, এ টা কি মন গড়া , বা বানিয়ে বানিয়ে বলছে? সত্যি প্রকাশ হোল এক দিন ।  সে বাড়িতে কিছু ...

কবিতা ।। মনোজকুমার রায়

জল সিঁড়ি চেক বইয়ের পাতা ফুরিয়ে যেতে থাকে -- ঝরে পড়ে বৃদ্ধ গাছটির পত্রমুকুল কাঁচা গন্ধ বেয়ে চলে সময়ের স্রোতে  সারা ভোর জেগে থাকি ঘুমের টলে তাড়া দেয় একগ্রাস অবিশ্বাসী বায়ু দিন ফুরনো লাল সূর্যের টানে নেমে আসে পাড় ছোঁয়া জল সিঁড়ি ================= মনোজকুমার রায় দঃ ঝাড় আলতা ডাউকিমারী, ধূপগুড়ি জলপাইগুড়ি -৭৩৫২১০ মো ৭৭৯৭৯৩৭৫৬৬

হালখাতায় বেহাল দশা ।। দীপক পাল

  হালখাতায় বেহাল দশা দীপক পাল পার্কের বেঞ্চে তিন মক্কেল সবে এসে বসেছে। তিন মক্কেল মানে বাবলা সৌম্য ও বিশ্বরূপ। তিনজনেই এবছর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে। সৌম্য আর বিশ্বরূপ স্টার পেয়েছে। কিন্তু বাবলা তিনবারের চেষ্টায় মোটামুটি ভাল নম্বর পেয়ে পাশ করেছে। তাই ওদের আনন্দ আর ধরে না। সৌম্য ও বিশ্বরূপ ভাল কলেজে ভর্তি হয়েছে আর বাবলা গড়িয়াহাটায় ইনিডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ড্রাফ্টসম্যান ট্রেণিংর জন্য ভর্তি হয়েছে। বাবলা বললো, - ' এই শোন, কাল তো পয়লা বৈশাখ, নববর্ষ, এই দিনটাকে আমরা অন্য রকম করে পালন করতে পারি না?' বিশ্বরূপ বলে, - ' তুমিই বলো কি ভাবে আমরা নববর্ষটা পালন করতে পারি?' - ' এই ধর কাল বিকেলে যদি আমরা সবাই ধুতি পাঞ্জাবী পরে বেরোই তবে কেমন হয়?' - ' ও বুঝেছি, কাল আমরা নববর্ষ উপলক্ষে নিপাট বাঙালী সেজে বেরোব।' সৌম্য বলে। - ' অ্যায় একদম ঠিক বলেছিস তুই।' এবার ওরা বললো, - ' কিন্তু ধুতি পাঞ্জাবীতো আমাদের নেই, তবে?' - ' আরে বাবা সেতো আমারও নেই। শোন আ...

নববর্ষের একাল সেকাল ।। অয়নী মুখার্জী

নববর্ষের একাল সেকাল  অয়নী মুখার্জী  নতুন নতুন আশা নিয়ে     নতুন বছর আসে, চড়ক আর গাজন শেষে      বৈশাখ মাসে| আগে চলত বিকেল থেকেই    হাল খাতার বহর, নোনতা-মিষ্টির প্যাকেট হাতে      মেতে উঠত শহর| পাড়ার দোকানে মানুষের ঢল     উপচে পড়া ভিড়, নতুন জামা গায়ে চড়িয়ে     চোখ ক্যালেন্ডারে স্থির| এখন সেই উন্মাদনা    হারিয়ে গেছে প্রায়, অনলাইন কেনা-কাটায়      অনেক সাশ্রয় হয়! পাড়ার দোকান ঝিমিয়ে গেছে     লোক হয়না আর, পয়লাতেও বিদেশি পোশাক     চাই ভিনদেশি খাবার|  যুগের সাথে তাল মিলিয়ে    ...

নববর্ষের সেকাল একাল ।। মিতা ভৌমিক

নববর্ষের সেকাল একাল মিতা ভৌমিক মুছে যাক গ্লানি,ঘুচে যাক সব জীর্ণ স্মৃতির ভার, তবুও মন থেকে মোছে না কিছু জমে থাকা হাহাকার। কিছু হাহাকারে থাকে পুরোনোকে ফিরে পাবার আকুলতা। যেমন প্রতি বছর বৈশাখের প্রথম দিনে হাহাকার জাগে পঞ্জিকার ডানার ওপর নববর্ষের রোদ ঝলসানো ভোরের। পুরোনো দিনগুলো উঁকি দিয়ে যায় স্মৃতির জানলা ধরে। প্রতিবছর ক্যালেন্ডার বদলায়,সময় এগিয়ে যায়, আমরা ধীরে ধীরে যান্ত্রিক মানবে রূপান্তরিত হয়ে উঠি। তবু কোথাও যেনো হৃদয়ের মণিকোঠায় অক্ষয় হয়ে থাকে শৈশবের নববর্ষরা ,রঙিন স্মৃতির ক্যানভাস জুড়ে। সেকালের নববর্ষ মানেই ছিলো ভোরের আলো ফুটতেই নতুন জামা পড়ে ঠাকুরঘরের পূজোতে চন্দন-ধূপের সুঘ্রাণ। "গাছে গাছে ফুল ফুটেছে, নববর্ষের ডাক এসেছে তুমি আমার বন্ধু হও, নববর্ষের কার্ড লও" বাবার এনে দেওয়া নববর্ষের কার্ডগুলোতে এই কবিতার ছড়া লিখে দাদুর হাত ধরে বিলি করতে বেরোতাম বন্ধুদের বাড়ি বাড়ি।পরিবর্তে নিজের সংগ্রহেও জমা হতো বহু নববর্ষের কার্ডের সম্ভার। ক্যালেন্ডারের পাতায় গণেশঠাকুরের মূর্তি আর লাল খেরোর খাতার গন্ধে ম ম করতো পাড়ার দোকানগুলো। মিষ্টির বাক্স আর বগলদাবা করে কিছু...

হালখাতা ।। সেখ জিয়াউর রহমান

  হালখাতা সেখ জিয়াউর রহমান সবারই বুকের বাঁ পকেটে একটা হালখাতা রাখা থাকে সেখানে লেখা -  মিনুর মা'কে চার চামচ নুন, ছোট জা বোনের বিয়েতে মিনাকরা বড়ো নেকলেসটা নিয়ে একমাস পর ফেরত দিয়েছিলো, কেউ লিখে রাখে - "ঠাকুরপো ওই দিকেই তো যাবে তোমার দাদার খাবারটা একটু নামিয়ে দেবে!" আরও কত কী- রামুর ভূষিমাল দোকানে একশো টাকা বাকি সেও হালখাতার কার্ড পাঠিয়েছে,মলিন কাগজে গণেশের ছবি ছাপা, দেবে তো সেই দশ বারোটা বোঁদে একটা নিমকি আর একটা গজা সবই হিসাবে বাঁধা! আচ্ছা মেঘ তো কোনোদিন কার্ড পাঠায়নি! চুড়ুই পাখি,  নাম না জানা ওই ফুলটা সন্ধেবেলা মন ফুরফুরে করে দেয় যে  বা ওই সাঁওতালি বাঁশিওয়ালা! হিসেবের খাতায় কত পাওনা জমা হলো   কে জানে! তোমার-আমার হিসেব খোলা খাতা — পাতা উল্টালেই দেখি কত না-দেওয়া, কত না-পাওয়া এই খাতা কখনো যেন বন্ধ  না-হয়, নইলে কোনো একদিন তুমি খাতা ছুঁড়ে ফেলে বলবে— "আমার জন্যে কী করেছো?" তখন— সমস্ত না-লেখা ভালোবাসা, সব গোপন স্পর্শ, সব নিঃশব্দ পাশে থাকা— হাওয়ায় ভেসে যাবে, আর আমরা দাঁড়িয়ে থাকবো একটি শূন্য হিসেবের সামনে... ................................... সেখ জিয়াউর রহমান...