Skip to main content

থ্রিলার ।। সেলাই করা নরকের বিভীষিকা ।। শাশ্বতী চট্টোপাধ্যায়

 Nabapravat

সেলাই করা নরকের বিভীষিকা

শাশ্বতী চট্টোপাধ্যায় 



কলকাতার রাতের একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। পুরনো ট্রামের লোহা, ভেজা রাস্তার ধুলো, নর্দমার পচা জল আর ক্লান্ত শহরের অবশ শরীর থেকে বেরোনো এক অদ্ভুত উষ্ণতা—সব মিলিয়ে কলকাতা নগরী  রাতেরবেলা যেন অন্য এক আদিম জীব হয়ে ওঠে। কিন্তু লেক গার্ডেন্সের সেই ১১১/৩ এর জরাজীর্ণ, স্যাঁতসেঁতে পুরনো ভাড়া বাড়িটার ভেতরে রাতের গন্ধ কলকাতার এই চেনা গন্ধের থেকে অনেকটাই আলাদা ছিল। সেখানে যেন সময় নিজেই একটা বদ্ধ পাত্রে পচে গলে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল।
​দেওয়ালের লোনাধরা ফাটলগুলো থেকে ভেজা চুন আর ক্ষয়ে যাওয়া ইটের সঙ্গে মিশে বেরোত এক তীব্র মিষ্টি অথচ অসহ্য আঁশটে গন্ধ—ঠিক যেমনটা কোনো মরা পশুর শরীর পচতে শুরু করলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। ঘরের আদিম সিলিং ফ্যানটা কাঁপতে কাঁপতে ঘুরত ধীরে ধীরে, যেন বহু যুগ ধরে চলা কোনো যন্ত্রণার ক্লান্তিতে তার লোহার ডানাতেও মরচে ধরে গেছে। মাঝরাতে বাড়িটার প্রাচীন কাঠের দরজাগুলো কোনো বাতাস ছাড়াই নিজে থেকেই কেঁপে উঠত, আর ছাদের কোনো এক অদৃশ্য কোণ থেকে অবিরাম জল পড়ার শব্দ হতো—টুপ… টুপ… টুপ… যেন কোনো কাটা ধমনী থেকে মেঝেতে রক্ত চুইয়ে পড়ছে।
​রাত তখন দুটো বেজে পনেরো।
​রায়ান টেবিল ল্যাম্পের নিচে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল। ল্যাম্পের হলুদ আলোটা এত ক্ষীণ আর নোংরা ছিল যে ঘরের জমাট অন্ধকারকে তাড়ানো তো দূর, তাকে আরও বেশি কুৎসিত আর জীবন্ত করে তুলছিল। তার ঠিক সামনে, টেবিলের ওপর রাখা ছিল একটা পুরনো নীল বাটিকের কানের দুল, যার নিচে কালচে রক্তের দাগ শুকিয়ে চটা উঠে গেছে। পাশে পড়ে ছিল কুঁকড়ে যাওয়া, কালচে হয়ে যাওয়া কিছু পচা গাঁদা ফুল, যা থেকেও  একটা তীব্র শ্মশানের গন্ধ বেরোচ্ছিল। আর তার ঠিক পাশেই রাখা একটা ছোট ট্রান্সপারেন্ট প্লাস্টিকের বাক্সের ভেতরে সাজানো ছিল কয়েকটা মানুষের উপড়ানো দাঁত, যেগুলোর গোড়ায়  তখনও লেগে থাকা মাংসের কুচি শুকিয়ে শক্ত হয়ে আছে।
​রায়ানের হাত কাঁপছিল। তীব্র, অনিয়ন্ত্রিত সেই কাঁপুনি।
​তার চোখের নিচে কালচে-বেগুনি রঙের গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে। ঠোঁটের চামড়া শুকিয়ে ফেটে গিয়ে সেখান থেকে চুইয়ে বেরোনো রক্ত ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে। গত এক মাসে সে এক সেকেন্ডের জন্যও চোখ বুজতে পারেনি। মাঝরাতে যখনই অবশ শরীরটা একটু হেলে পড়তে চায়, তখনই এক তীব্র ঠাণ্ডা আতঙ্কে সে চমকে উঠে বসে থাকে। তার সর্বক্ষণ মনে হয়, এই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মাঝে ঘরের ঠিক কোণায়, যেখানে আলো পৌঁছায় না, সেখানে উল্টো হয়ে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। কখনো মনে হয়, তার নিজের বিছানার ঠিক নিচে মেঝের ওপর শুয়ে কেউ খুব ভারী, ভেজা আর গোঙানি জড়ানো গলায় নিঃশ্বাস ফেলছে।
​রায়ান ছোটবেলা থেকে তৃষাকে ভালোবাসত। অন্তত সে নিজে নিজের মনের ভেতরের সেই আদিম, হিংস্র অধিকারবোধটাকেই ভালোবাসা বলে বিশ্বাস করিয়েছিল।
​স্কুল থেকে ফেরার সময় তৃষার ব্যাগ বয়ে দেওয়া, কলেজে ওর জন্য রোদে-বৃষ্টিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কুকুরের মতো অপেক্ষা করা, মাঝরাতে ও ভেঙে পড়লে ওর কান্না শোনা—সবকিছুর আড়ালে রায়ান নিজের মনের ভেতর একটা অদৃশ্য, বিষাক্ত অধিকারের জাল বুনে  চলেছিল। তৃষা যখনই অন্য কারও সাথে হাসিমুখে কথা বলত বা সম্পর্কে জড়াত, রায়ানের বুকের পাঁজর ফুঁড়ে এক পৈশাচিক, অবদমিত হিংসা মাথা চাড়া দিয়ে উঠত। ওর মনে হতো, তৃষা শুধু ওর সম্পত্তি, অন্য কারোর  সেখানে তাকানোর অধিকারও নেই। অথচ, লোকচক্ষুর সামনে সে কখনোই  নিজের এই মনের বিকৃতি প্রকাশ পেতে দেয়নি। সে নিজেকে একজন পরম নির্ভরযোগ্য, নিঃস্বার্থ বন্ধু হিসেবে সাজিয়ে রেখেছিল।
​তৃষাও রায়ানকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করত। ওর অবচেতন মনে রায়ান ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ একটা আশ্রয়, এমন একজন মানুষ যার সামনে কোনো মুখোশ ছাড়া সম্পূর্ণ নগ্ন মনে কাঁদা যায়, নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে ভেঙে পড়া যায়।
​কিন্তু রায়ান সেই বিশ্বাসেরই  প্রতিটা রক্তবিন্দুকে নিজের কামনার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেছিল। সে তৃষার প্রতিটা কান্নার মুহূর্তকে, প্রতিটা জড়িয়ে ধরার দুর্বলতাকে নিজের প্রতি প্রেমের নীরব স্বীকৃতি বলেই  ধরে নিয়েছিল।
​আর সেই মারাত্মক ভুলটারই  চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটেছিল ঠিক এক মাস আগে।
​তৃষার বিয়ে ঠিক হয়েছিল কানাডায় থাকা এক  সুপ্রতিষ্ঠিত পাত্রের  সঙ্গে। খবরটা শোনার পর থেকেই রায়ানের মাথার ভেতরের শিরাগুলো যেন ছিঁড়ে বিকৃত হতে শুরু করেছিল। সে নিজেকে ঘরের মধ্যে বন্দি করে ফেলে । খাওয়া-দাওয়াও  সম্পূর্ণ বন্ধ করে  দেয়। রাতের পর রাত জেগে সে কেবল অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকত, আর তার চোখের সামনে ভেসে উঠত তৃষার সেই শরীর অন্য একটা পুরুষ স্পর্শ করছে। এই চিন্তাটা ওর মগজের কোষগুলোকে জ্যান্ত কামড়ে খাচ্ছিল। সে মানসিকভাবে পুরো উন্মাদ হয়ে উঠেছিল।
​শেষবারের মতো নিজের তৈরি সেই কাল্পনিক হিসাব মেলাতে সে তৃষাকে ডেকে পাঠিয়েছিল লেক গার্ডেন্সের এই ১১১/৩এর অভিশপ্ত নির্জন বাড়িতে।
​সেদিন বাইরে কালবৈশাখীর ঝড় আর অবিশ্রান্ত নিদারুণ বৃষ্টি হচ্ছিল। আকাশ চিরে নামা বিদ্যুতের আলোয় ঘরটা বারবার কেঁপে উঠছিল।
​তৃষা তার ভিজে চুল পিঠের ওপর ফেলে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ওর পরনের হালকা নীল রঙের কুর্তিটা বৃষ্টিতে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে ছিল। বিরক্ত এবং কিছুটা আতঙ্কিত গলায় ও বলেছিল, “এভাবে মাঝরাতে এই ভুতুড়ে বাড়িতে আমাকে কেন ডেকেছিস রায়ান? আমার খুব ভয় করছে।”
​রায়ানের বুকের ভেতর তখন হাজারখানেক  চিতার আগুন একসাথে জ্বলছিল। সে ধীর পায়ে তৃষার দিকে এগিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলেছিল, “তুই আমাকে ছেড়ে অন্য কারও বিছানায় চলে যাবি  তৃষা? আমি এটা হতে দিতে পারবোনা।”
​তৃষা ক্লান্ত আর বিরক্ত গলায় রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “রায়ান, তুই পাগল হয়ে গেছিস? তুই আমার খুব কাছের বন্ধু, ভাই-এর মতো। কিন্তু সেটা কোনোদিন প্রেম ছিল না! তুই নিজেকে আয়নায় দেখ, কীরকম পশুর মতো আচরণ করছিস! সব সম্পর্ককে নিজের নোংরা অধিকারবোধ দিয়ে মাপিস না।”
​'বন্ধু', 'প্রেম না'—এই শব্দগুলো রায়ানের মগজের ভেতর তপ্ত সীসার মতো ঢুকে গিয়েছিল। ওর ভেতরের আদিম জন্তুটা এক ঝটকায় সম্পূর্ণ খাঁচা ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছিল।
​তারপরের কয়েকটা মিনিট ঠিক কী ঘটেছিল, রায়ানের স্মৃতিতে তার কোনো স্পষ্ট ধারাবাহিকতা নেই। একটা তীব্র আক্রোশ, কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দ, আর তৃষার দুটো চোখের সেই সীমাহীন, জ্যান্ত মৃত্যুর আতঙ্ক—ব্যস। রায়ানের শুধু মনে আছে, সে একহাতে তৃষার মুখ চেপে ধরে অন্যহাতে টেবিলের ওপর থাকা ভারী কাঁচের পেপারওয়েটটা দিয়ে ওর মাথায় অবিরাম আঘাত করে যাচ্ছিল। যতক্ষণ না খুলি ভাঙার মড়মড় শব্দ হয়েছিল, ততক্ষণ সে থামেনি।
​যখন রায়ানের ঘোর কেটেছিল, তখন ঘর পুরো নিস্তব্ধ। তৃষা মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে ছিল।
​ওর মাথার ডানপাশটা সম্পূর্ণ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে মগজ আর কালচে রক্ত মেঝেতে লেপ্টে গিয়েছিল l 
​বিদ্যুৎ চমকানোর আলোয় রায়ান দেখেছিল, তৃষার একটা চোখ কোটর থেকে প্রায় বেরিয়ে এসেছে, আর অন্য আধখোলা চোখটা স্থির হয়ে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে আছে। রায়ান সেই ঘরের নিস্তব্ধতায় বহুক্ষণ ওর রক্তাক্ত লাশের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ছিল। তার বারবার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি তৃষা চেনা গলায় ধমক দিয়ে উঠে বসবে, বলবে—“কী জঘন্য রসিকতা করছিস রায়ান!”
​কিন্তু মাংসের দলা হয়ে যাওয়া তৃষা আর ওঠেনি। সেই অভিশপ্ত রাতেই রায়ানের চেনা পৃথিবীটা চিরতরে একটা নরকের গহ্বরে তলিয়ে গিয়েছিল।
​ 
​প্রথম দুদিন রায়ান একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। সে পুলিশের ভয়ে লাশটাকে খাটের তলার পুরনো কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরী সিন্দুকে ভরে তার নিচে নুন আর কেমিক্যাল দিয়ে বন্ধ করে  দিয়েছিল। সে সারাটা দিন ঘরের কোণে গুটিসুটি মেরে বসে থাকত।
​কখনো তৃষার ফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকত, যা সে বন্ধ করে লুকিয়ে রেখেছিল। কখনো সেই রক্তভেজা ফাঁকা মেঝেটার দিকে তাকিয়ে নিজের নখ দিয়েই নিজের চামড়া খামচাঁত । তার অবচেতন মন তখনও তীব্রভাবে বিশ্বাস করতে চাইছিল যে এই পুরো ঘটনাটাই আসলে একটা কুৎসিত, দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন। একটু পরেই সকাল হবে, আর সব ঠিক হয়ে যাবে।
​কিন্তু তৃতীয় দিন থেকে সেই বিভৎস গন্ধটা শুরু হলো।
​প্রথমে গন্ধটা ছিল খুব হালকা—একটা পচা মিষ্টি গন্ধ। কিন্তু যত সময় যেতে লাগল, গন্ধটা তত তীব্র, ঘন আর অসহ্য  হয়ে উঠতে লাগল। এটা কোনো সাধারণ লাশের গন্ধ ছিল না, এটা ছিল যেন মানুষের পচা মাংসের সাথে কোনো আদিম শয়তানের নিশ্বাসের মিশ্রণ। রায়ান পাগলের মতো বাজার থেকে ডজন ডজন ধূপকাঠি কিনে এনে জ্বালিয়ে দিল। দামি রুম ফ্রেশনার স্প্রে করল বোতলের পর বোতল। ঘরের প্রতিটা জানলা-কপাট শক্ত করে বন্ধ করে রাখল। কিন্তু গন্ধটা কমল না। উল্টো মনে হতে লাগল, গন্ধটা তরল হয়ে ঘরের দেওয়ালের লোনাধরা আস্তরণের ভেতর ঢুকে গেছে এবং সেখান থেকে চুইয়ে চুইয়ে আবার ঘরে ফিরে আসছে। সেই গন্ধে রায়ানের পাকস্থলী উল্টে বমি চলে আসত, কিন্তু সে ঘর ছেড়ে বেরোতে পারত না।
​ঠিক তারপর থেকেই রাতের শব্দগুলো নিজের রূপ বদলাতে শুরু করল।
​মাঝরাত পার হলেই ঘরের কোণে রাখা পুরনো কাঠের ড্রেসিং টেবিলের দিক থেকে একটা অদ্ভুত খসখস শব্দ আসত। ঠিক যেমন কোনো ধারালো নখ দিয়ে কেউ কাঠের ওপর অনবরত আঁচড় কাটছে। অথবা কেউ যেন শুকনো, জট পড়া চুল আঁচড়াচ্ছে।
​প্রথম রাতে রায়ান নিজের কান চেপে ধরে বিছানায় পড়ে ছিল, ভেবেছিল এটা ওর মনের ভুল, তীব্র অপরাধবোধের ইলিউশন।
​কিন্তু দ্বিতীয় রাতে শব্দটা আরও অনেক বেশি স্পষ্ট আর কাছে চলে এল। এবার খসখস শব্দের সাথে একটা অদ্ভুত ভেজা ফিসফিসানি যোগ হলো।
​তৃতীয় রাতে রায়ান আর নিজের চোখ বন্ধ রাখতে পারল না। টেবিল ল্যাম্পের আবছা আলোয় সে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে তাকাতেই  দেখতে পেলো আয়নার ভেতরের অন্ধকারের মধ্যে যেন একটা কুঁকড়ে যাওয়া, অস্পষ্ট কালো অবয়ব বসে রয়েছে । অবয়বটার চুলগুলো সামনের দিকে ঝুলে মুখটাকে সম্পূর্ণ ঢেকে রেখেছিল।
​রায়ানের বুকের ভেতরের রক্ত যেন মুহূর্তের মধ্যে জমে বরফ হয়ে গেল। সে খাটের ওপর কাঠের মতো শক্ত হয়ে শুয়ে রইল, তার পুরো শরীর এমনই  অবশ  হয়ে গিয়েছিল যে  আঙুল নাড়ানোর মতো ক্ষমতাও তার ছিল না। এক অদৃশ্য, হিমশীতল ভারি চাপ যেন তার বুকের ওপর চেপে বসেছিল।
​আয়নার ভেতরের সেই অবয়বটা এবার খুব ধীরে ধীরে, হাড় মড়মড় করার শব্দ করে নিজের মাথাটা ঘোরাল। চুলগুলোর ফাঁক দিয়ে কোনো চামড়া বা মাংসের মুখ দেখা যাচ্ছিল না। সেখানে ছিল কেবল দুটো জ্বলন্ত, শূন্য চোখের কোটর, যা থেকে অবিরাম রক্ত আর পুঁজ গড়িয়ে পড়ছে।
​ঠিক তখনই মেঝের ওপর একটা ভারী, ভেজা তরল কিছু  পড়ার শব্দ হলো।
টুপ্ …
টুপ্ …
​রায়ান চোখের মণি নিচের দিকে নামিয়ে দেখল, খাটের তলার তক্তার সিন্দুকের ফাঁক গলে     ওপরের দিকে চুইয়ে উঠছে কালচে,আঁশটে গন্ধ যুক্ত এক তরল। মানুষের পচা চর্বি আর রক্তের সেই মিশ্রণ রায়ানের বিছানার পায়া বেয়ে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করেছে। সে সেদিন রাতে প্রথম হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডায় উপলব্ধি করেছিল যে —মানুষের অপরাধবোধ যখন রক্তমাংসের শরীর পায়, তখন সে বাস্তবের যেকোনো পিশাচের চেয়েও কোটি গুণ বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
​দিনের বেলা সে নিজেকে জোর করে স্বাভাবিক রাখার অভিনয় করত। পাড়ার মোড়ে গিয়ে বাজার করত, ছাঁকাওঠা  চা খেত, মুখে একটা কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলত, অনবরত মোবাইলের স্ক্রিন স্ক্রল করত। কিন্তু যেই মুহূর্তে সূর্য ডুবত, অমনি লেক গার্ডেন্সের সেই ঘরটা যেন এক জীবন্ত কসাইখানায় পরিণত হতো।
​ঘুমের ঘোরে সে স্পষ্ট শুনতে পেত, মেঝের ওপর দিয়ে কেউ নিজের শরীরটাকে টেনে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।
টুপ… টুপ… টুপ…
যেন ভেজা, চামড়া উঠে যাওয়া দুটো পা মেঝের রক্তে ডুবিয়ে কেউ রায়ানের খাটের চারপাশে বৃত্তাকারে হাঁটছে।
​এক রাতে সে অনুভব করল, তার গায়ের ওপর ঢাকা দেওয়া চাদরটা কেউ পায়ের দিক থেকে খুব ধীরে ধীরে নিচের দিকে টেনে নামাচ্ছে। রায়ান চোখ খুলে দেখল, তার বিছানার ঠিক পাশে অন্ধকারের মধ্যে কেউ একজন ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখটা রায়ানের মুখ থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে। সারা ঘর জুড়ে কেবল তৃষার সেই শেষ রাতের ভিজে চুলের তীব্র আঁশটে গন্ধ।
​তারপর, সেই চেনা তৃষার গলাটাই কেমন একটা ভাঙা, কুয়োর গভীর থেকে আসা বিকৃত ফিসফিসানিতে রূপান্তরিত হয়ে ঘরের থমথমে বাতাস কাঁপিয়ে দিল:
“তুই তো চেয়েছিলি রায়ান… আমি যেন তোকে ছেড়ে কোনোদিন না যাই… আমি তো যাইনি…”
​রায়ানের বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল। সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার মুখ থেকে কেবল একটু ফেনা আর লালা বেরিয়ে এল।
​“এখন আমাকে দেখে তোর এত ভয় কেন রায়ান? আমাকে ছুঁয়ে দেখ…”
​ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা এক ধাক্কায় মাইনাস ডিগ্রিতে নেমে গেছে । রায়ানের মুখ দিয়ে বেরোনো নিঃশ্বাস ঘন ধোঁয়ার মতো বাতাসে জমতে লাগল। আর তখনই জানলার কাঁচ ভেদ করে চাঁদের একফালি আলো এসে পড়ল সেই অবয়বটার ওপর। রায়ান দেখল, তৃষার সেই চূর্ণ হয়ে যাওয়া মাথা থেকে মগজের অংশগুলো তখন জীবন্ত পোকার মতো নড়াচড়া করছে, আর ওর একটা চোখ নিজের কোটর থেকে ঝুলে রায়ানের গালে এসে ঠেকছে।
​রায়ানের মগজের ভেতর তখন একটার পর একটা স্মৃতি চাবুকের মতো আছাড় খেতে লাগল। তৃষার সেই পবিত্র হাসি, ওর রাগ, ওর কান্না—সবকিছু যেন এক একটা ধারালো ব্লেড হয়ে রায়ানের আত্মাকে কুচি কুচি করে কাটতে লাগল। আর এক বিভৎস, নরকীয় সত্য ধীরে ধীরে ওর মগজে ঢুকে ওকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দিল।
​সে তৃষাকে কোনোদিন ভালোবাসেনি। সে কেবল একটা অসুরের মতো তৃষার শরীর আর অস্তিত্বকে নিজের দাস বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল। এই কামনার বিকৃতি আর ভালোবাসার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত, সেটা সে আজ নিজের চূর্ণ হওয়া বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছিল।
​
​সেই রাতের পর থেকে রায়ান আর কোনো জীবন্ত মানুষ ছিল না। সে এক জীবন্ত লাশে পরিণত হয়েছিল। তার ঘরটা এখন আর কোনো থাকার জায়গা ছিল না, সেটা হয়ে উঠেছিল একটা বিকৃত, অন্ধকার পৈশাচিক জাদুঘর। তৃষার মাথা থেকে উপড়ানো সেই চুল, ওর রক্তমাখা ছেঁড়া ওড়না, ওর ভাঙা দাঁতগুলো—সব সে টেবিলের ওপর পরম যত্নে সাজিয়ে রাখত।
​সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাওয়া-দাওয়া ভুলে সেই মৃত ধ্বংসাবশেষগুলোর দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বসে থাকত। ওর মনে হতো, এই জড় বস্তুগুলো এখনই তৃষার গলায় চিৎকার করে উঠবে।
​কিন্তু বস্তুগুলো কথা বলত না। কথা বলত ঘরের ভেতরের সেই আদিম, জমাট বাঁধা হিংস্র অন্ধকার।
​আরেক রাতের কথা। ঘুম ভেঙে রায়ান দেখল, ঘরের ভারী কাঠের দরজাটা মাঝখান থেকে আধখোলা হয়ে আছে। অথচ সে নিজের হাতে তিন  তিনটে তালা বন্ধ করে শুয়েছিল। বাইরে করিডরে একটা অত্যন্ত নোংরা, হলদেটে আলো কাঁপছিল।
​কোনো এক অদৃশ্য আকর্ষণে রায়ান বিছানা থেকে নেমে অবশ পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তার মনে হচ্ছিল, করিডরের ঠিক শেষ মাথায়, যেখানে ছাদের ছায়া এসে মেঝেতে মিশেছে, সেখানে কেউ একজন দেয়ালের সাথে উল্টো হয়ে ঝুলে আছে।
​রায়ান দেওয়াল ধরে ধরে এগোতে লাগল। দেয়ালের লোনাধরা ভেজা ছোপগুলো থেকে তখন টপ টপ করে কালো রক্ত পুঁজের মতো চুইয়ে মেঝেতে পড়ছে। চারিদিকের নিস্তব্ধতা এতটাই  তীব্র ছিল যে রায়ানের নিজের কানের ভেতরের পর্দাগুলো যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যেতে চাচ্ছিল।
​হঠাৎ করেই, সেই নিস্তব্ধতা চিরে একটা বিকট শব্দ হলো। খুব চেনা একটা মেয়ের গলা, কিন্তু সেটা অতিমানবীয় গতিতে খিলখিল করে হাসতে শুরু করল।
খিলখিল… খিলখিল… খিলখিল…
​সেই হাসির শব্দটা করিডরের দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হতে হতে রায়ানের কানের ভেতর যেন হাজারটা সুঁচ ফুটিয়ে দিল। শব্দটা কোনো একটা দিক থেকে আসছিল না, মনে হচ্ছিল সেটা রায়ানের নিজের মাথার খুলির ভেতর থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
​রায়ান আতঙ্কে পাগলের মতো চিৎকার করে নিজের ঘরের দিকে দৌড়ে এল। দরজাটা বন্ধ করে পিঠ দিয়ে চেপে ধরে সে জানোয়ারের মতো হাঁপাতে লাগল। তার বুকের ভেতরের হাড়গুলো তখনও  কাঁপছিল। সে বুঝতে পেরেছিল—সে এই বাড়িতে আর একা নেই। তৃষার আত্মা ওর খাটের  নিচ থেকে উঠে এসে ওর ঘরের প্রতিটা অণুতে মিশে গেছে।
​পরদিন সকালে সে যখন বাথরুমে গিয়ে আয়নায় নিজের মুখ দেখল, সে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিজেই ভয়ে ছিটকে পেছনে দেওয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল।
​তার গায়ের চামড়া কোনো জীবিত মানুষের মতো ছিল না। সেটা হয়ে গিয়েছিল মড়া ব্যাঙের পেটের মতো ফ্যাকাশে আর হলদেটে। চোখের নিচের চামড়া পচে গিয়ে কালচে বেগুনি গর্ত তৈরি হয়েছিল। ঠোঁট দুটো পুরোপুরি কালো হয়ে ফেটে চৌচির। মনে হচ্ছিল, বহু মাস আগে মারা যাওয়া কোনো লাশকে জোর করে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।
​সে দুই হাতে পাগলের মতো মুখে জলের ঝাপটা দিতে লাগল। কিন্তু আয়নার ভেতরের প্রতিবিম্বটা তো  বদলালোই না, উল্টে আয়নার ভেতরের রায়ানের মুখটা আসল রায়ানের নড়াচড়ার সাথেও  মিলল না। আসল রায়ান যখন স্থির দাঁড়িয়ে, আয়নার ভেতরের রায়ান তখন নিজের কুৎসিত পচা দাঁতগুলো বের করে বিকটভাবে হাসছিল।
​সেই প্রতিবিম্বের চোখ দুটো ছিল সম্পূর্ণ রক্তবর্ণ, আর সেখান থেকে ছোট ছোট সাদা পোকা বেরোচ্ছিল।
​রায়ান বুঝতে পারল, তৃষার সেই মৃত, পিশাচ রূপটা শুধু ঘরের বাইরে নয়, সেটা ধীরে ধীরে রায়ানের নিজের শরীরের ভেতর ঢুকেও  ওর রক্ত, মাংস আর আত্মাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। সে নিজের শরীরের ভেতর থেকেই উধাও হয়ে যাচ্ছে।
​
​পরের কয়েকটা দিনে রায়ানের মানসিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেল। সে পুরোপুরি এক উন্মাদ পশুর পর্যায়ে চলে গেল। সে যদি এক মিনিটের জন্য ঘরের বাইরে পা রাখত, তার মনে হতো রাস্তার প্রতিটা জ্যান্ত এবং জড় বস্তু ওর দিকে ঘুরে তাকিয়ে আছে।
​চায়ের দোকানের সেই নোংরা লোকটা, বাসস্ট্যান্ডের ওই অচেনা মহিলা, ডাস্টবিনের পাশে বসে থাকা কুষ্ঠরোগী ভিখিরিটা —সবার চোখগুলো যেন মানুষের চোখ ছিল না। সেগুলো ছিল তৃষার সেই কোটর থেকে বেরিয়ে আসা স্থির চোখ। আর সবার মুখ থেকে একসাথে একটা সম্মিলিত পচা ফিসফিসানি ভেসে আসত—
“তৃষা কোথায়? তৃষার মাংস তুই কোথায় লুকিয়েছিস রায়ান?”
​পুলিশ এর মধ্যে দুবার এসে রায়ানের বাড়িতে জেরা করে গেছে। তৃষার বাবা-মাও  থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেছিলেন। রায়ানের সামনে যখন ওর মা-বাবা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, রায়ান তখনও  নিজের ভেতরের পৈশাচিক সত্তাটাকে লুকিয়ে অত্যন্ত শান্ত, ঠাণ্ডা গলায় বলেছিল, “তৃষা বোধহয় অন্য কোনো ছেলের সাথে পালিয়ে গেছে। ও তো এমনই ছিল।”
​সেই চরম নোংরা মিথ্যেটা বলার সময় রায়ানের প্যান্টের ভেতর নিজের হাত দুটো নিজের উরুর চামড়া নখ দিয়ে ছিঁড়ে রক্ত বের করে দিচ্ছিল।
​তার শাস্তি সেই রাতেই আরও হাজার গুণ বিভৎস হয়ে নেমে এল।
​মাঝরাতে ঘর জুড়ে আবার সেই হাড় মড়মড় করার বিকট শব্দ শুরু হলো।
খট… খট… খট…
যেন কেউ নিজের পায়ের ভাঙা হাড়গুলো মেঝের ওপর সজোরে ঠুকে ঠুকে এগিয়ে আসছে।
​রায়ান খাটের ওপর উঠে বসল। ঘরের কোণের সেই জমাট অন্ধকার চিরে ধীরে ধীরে একটা অবয়ব রায়ানের খাটের দিকেই  এগিয়ে আসতে লাগল।
​তৃষা।
​কিন্তু এবার ওর রূপটা কোনো দুঃস্বপ্নের চেয়েও কোটি গুণ বেশি নোংরা আর বিভৎস ছিল। ওর মাথার ডানদিকের খুলিটা সম্পূর্ণ হা হয়ে খোলা, সেখান থেকে পচা মগজের অংশগুলো মেঝের ওপর টপ টপ করে খসে পড়ছে। ওর সারা শরীরের চামড়া যেন কোনো ধারালো ছুরি দিয়ে ফালা ফালা  করে কাটা, আর সেই কাটা অংশগুলো থেকে জ্যান্ত পোকারা কিলবিল করে বেরিয়ে আসছে। ওর ডান হাতটা কনুইয়ের কাছ থেকে উল্টো দিকে ভেঙে ঝুলছিল।
​রায়ান চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু ওর ভোকাল কর্ডে যেন কেউ গরম সীসা গলিয়ে ঢেলে দিয়েছিল। ওর মুখ দিয়ে কেবল একটা ঘড়ঘড়ে পশুর মতো আওয়াজই  বেরোল।
​তৃষা ধীর পায়ে রায়ানের বিছানার ওপর উঠে এল। ওর ভাঙা, চামড়া ওঠা ভেজা পা দুটো রায়ানের বুকের ওপর চেপে বসল। সেই তীব্র ওজনে রায়ানের পাঁজরের হাড়গুলো মড়মড় করে উঠল। তৃষা নিজের সেই পচা, পোকা কিলবিল করা মুখটা রায়ানের চোখের সামনে এনে অত্যন্ত ঠাণ্ডা, হিমশীতল গলায় বলল:
“তুই আমাকে কোনোদিন মানুষই  মনে করিসনি রে রায়ান… তুই আমাকে নিজের একটা সস্তা খেলনা ভেবেছিলি…”
​রায়ানের চোখ দিয়ে তখন রক্তের অশ্রু ঝরছিল।
​“তুই চেয়েছিলি আমি তোকে ভালোবেসে তোর পায়ের নিচে কুকুরের মতো পড়ে থাকি। তোর সেই নোংরা অহংকারই  আজ আমি এই মেঝের রক্ত দিয়ে ধুয়ে দেব।”
​তৃষার মুখের ভেতর থেকে এক তীব্র বিষাক্ত কালো গ্যাস রায়ানের মুখের ভেতর ঢুকতে শুরু করল। রায়ান চোখ বন্ধ করার চেষ্টা করল, কিন্তু ওর চোখের পাতা দুটো যেন কোনো অদৃশ্য সুঁচ  দিয়ে ওপরের দিকে সেলাই করে আটকে দেওয়া হয়েছিল।
​“যে সম্পর্কের ভেতর কোনো সম্মান থাকে না রায়ান… সেটা এভাবেই পচে যায়… আর তার সাথে সাথে তুইও পচে যাবি।”
​হঠাৎ করেই ঘরের চারদিকের চারটে বড় জানলা কোনো হাত ছাড়াই একসাথে এক বিকট বজ্রপাতের শব্দে দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল। ঘরের ভেতরের সমস্ত বাতাস মুহূর্তের মধ্যে কর্পূরের মতো উবে গেল। চারদিকের দেওয়ালে জমে থাকা সেই পুরনো লোনাধরা চুনগুলো তীব্র গতিতে খসে পড়তে লাগল, আর সেই খসে যাওয়া ইটের ওপর কালো রক্ত দিয়ে নিজে থেকেই কিছু লেখা ফুটে উঠতে লাগল:
“তুই কি ভেবেছিস তুই বেঁচে যাবি?”
​লেখাটা চোখের পলকে নিজের রূপ বদলে আবার ফুটে উঠল:
“তোর নিজের ভেতরের এই নরক থেকে তুই পালাবি কোথায় রায়ান?”
​রায়ান বিছানার ওপর নিজের মাথাটা নিয়ে পাগলের মতো ছটফট করতে লাগল। সে বুঝতে পারছিল, এই লেক গার্ডেন্সের বাড়িটা আর কোনো সাধারণ ইট-পাথরের খাঁচা নেই।
​এটা হয়ে উঠেছে ওর নিজের করা পাপ, আক্রোশ আর বিকৃতির এক জীবন্ত, রক্তচোষা শরীর। প্রতিটা দেওয়াল যেন ওর দিকে তাকিয়ে অট্টহাসি হাসছে।
​সে সিদ্ধান্ত নিল, তাকে আজ রাতেই এই শহর, এই দেশ ছেড়ে পালাতে হবে।
​পরদিন বিকেলে সে কোনোমতে কাঁপতে কাঁপতে আলমারি থেকে একটা বড় ট্রাভেল ব্যাগ বের করল। জামাকাপড়গুলো এলোমেলোভাবে ব্যাগের ভেতর ঠুসে ভরতে লাগল। কিছু টাকা আর পাসপোর্টটা যখন সে হাতে নিল, ঠিক তখনই ওর বাঁ কানের একেবারে লতির পাশে একটা বরফ-ঠাণ্ডা নিশ্বাস এসে ঠেকল।
​একটা অতি পরিচিত, খিলখিল করা ফিসফিসানি ভেসে এল:
“এত সহজে আমার হাত থেকে রেহাই পাবি ভেবেছিস রায়ান?”
​রায়ানের হাত থেকে পাসপোর্ট আর ব্যাগটা মেঝের রক্তের ওপর ছিটকে পড়ে গেল। সে অত্যন্ত ধীর গতিতে, রোবটের মতো নিজের ঘাড়টা পেছনের দিকে ঘোরাল।
​ঘরে কেউ ছিল না। কিন্তু ড্রেসিং টেবিলের সেই বিশাল আয়নাটার ভেতরে তৃষা দাঁড়িয়ে ছিল, আর ওর দুই হাতের নখ দিয়ে ও আয়নার কাঁচের ওপর নিজের বুকটা চিড়ছিল।
​
​সেদিন অমাবস্যার রাতে রায়ানের ভেতরের মনুষ্যত্বের শেষ কণাটুকুও এক বীভৎস তাণ্ডবে ধ্বংস হয়ে গেল।
​ঘরের সব আলো চিরতরে নিভে গিয়েছিল। কোনো মোমবাতি বা দেশলাই জ্বলছিল না। শুধু ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটার ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত, গাঢ় লালচে আগুনের আভা বেরোচ্ছিল—ঠিক যেমনটা কোনো শ্মশানের চিতা জ্বললে তার আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
​রায়ান এক অদৃশ্য পৈশাচিক শক্তিতে টানতে টানতে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
​সে আয়নার কাঁচের দিকে তাকিয়ে যা দেখল, তাতে ওর মগজের প্রতিটা কোষ একসাথে যন্ত্রণায় ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো।
​সে দেখল, আয়নার ভেতরের জগতটা আর কোনো প্রতিবিম্ব নয়। সেটা একটা বিশাল, অন্ধকার লোহার কয়েদখানা। আর সেই কয়েদখানার মাঝখানে একটা মরচে ধরা লোহার চেয়ারে রায়ান নিজে বসে আছে। আয়নার ভেতরের রায়ানের হাত-পা মোটা কাঁটাতার দিয়ে চেয়ারের সাথে শক্ত করে বাঁধা, আর সেই কাঁটাতারের সুঁচগুলো ওর মাংস ফুঁড়ে হাড়ের ভেতর ঢুকে গেছে। ওর সারা মুখ জুড়ে এক অবর্ণনীয়, পশুর মতো আতঙ্ক।
​আর সেই চেয়ারের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে ছিল তৃষা।
​কিন্তু এবার তৃষার শরীরটা অক্ষত ছিল। ওর মাথায় কোনো ক্ষত ছিল না, শরীর থেকে কোনো পোকা বেরোচ্ছিল না। ও ঠিক তেমনটাই সুন্দর আর পবিত্র দেখাচ্ছিল, যেমনটা ও বেঁচে থাকার সময় ছিল। ওর পরনে ছিল একটা সাদা শাড়ি, কিন্তু ওর চোখ দুটো ছিল সম্পূর্ণ শূন্য, কুচকুচে কালো।
​তৃষা ধীর পায়ে আয়নার ভেতরের রায়ানের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, “তুই পৃথিবীর সবার সামনে মিথ্যে বলেছিস রায়ান। তুই পুলিশকে মিথ্যে বলেছিস, আমার মা-বাবাকেও  মিথ্যে বলেছিস। কিন্তু নিজের আত্মার সামনে তুই কীভাবে মিথ্যে বলবি?”
​আসল রায়ান বাইরে থেকে কাঁচের ওপর দুই হাত পিটিয়ে চিৎকার করে উঠল, “আমি তোকে ভালোবাসতাম তৃষা! আমি তোকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসতাম! তাই তোকে অন্য কারও হতে দিতে পারিনি!”
​“না!”
​তৃষা কেবল একটা শব্দ উচ্চারণ করল। কিন্তু সেই শব্দের তীব্রতা এতটাই  ভয়ানক ছিল যে ড্রেসিং টেবিলের কাঁচটা মাঝখান থেকে চড়চড় করে ফেটে গেল। সেই ফাটল দিয়ে কালো রক্ত চুইয়ে বাইরে রায়ানের গায়ের ওপর পড়তে লাগল।
​“ভালোবাসার নামে তুই নিজের ভেতরের একটা হিংস্র পশুকেই  পুষে রেখেছিলি রায়ান। ভালোবাসলে মানুষকে এভাবে পশুর মতো পিটিয়ে মারতে হয় না। তার ইচ্ছাকে, তার 'না' বলাকে এভাবে পায়ে পিষে দিতে হয় না। তুই আমাকে কোনোদিনই  ভালোবাসিসনি, তুই কেবল আমার শরীরটাকে নিজের একটা মৃত সম্পত্তি বানাতে চেয়েছিলি।”
​ঠিক তখনই, আয়নার ভেতরের সেই বাঁধা থাকা রায়ানটা এক তীব্র, অলৌকিক যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। তার পুরো শরীরটা চেয়ারের সাথেই ধনুকের মতো বেঁকে গেল। সে নিজের হাতের নখগুলো দিয়ে নিজের মুখের চামড়া, গাল আর চোখ পাগলের মতো আঁচড়াতে শুরু করল। নখের টানে ওর গালের মাংস ফালি ফালি হয়ে ছিঁড়ে মেঝের ওপর পড়তে লাগল। রক্ত আর মাংসের কুচি ছিটকে এসে আয়নার কাঁচের ভেতরের দেয়ালে লেপ্টে যাচ্ছিল।
​বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আসল রায়ান নিজের চোখ দুটো বন্ধ করার জন্য হাত তুলতে চাইল, কিন্তু ওর হাত দুটো ততক্ষণে অবশ হয়ে নিজের শরীরের পাশে ঝুলে গেছে। ও চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছিল না। ও নিজের জীবন্ত চোখের সামনে নিজেরই এক চরম, কুৎসিত আত্মহনন দেখতে বাধ্য হচ্ছিল।
​তৃষা এবার সোজা ঘুরে আয়নার কাঁচের ওপার থেকে আসল রায়ানের চোখের দিকে তাকাল। ওর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক শয়তানি হাসি।
​“তুই ভেবেছিলি তুই একাই কষ্ট পেয়েছিস রায়ান? এবার দেখ, তোর এই পাপের বিচার কারা করবে।”
​হঠাৎ করেই ড্রেসিং টেবিলের সেই ভাঙা আয়নার কাঁচের প্রতিটা ফাটলের ভেতর থেকে কোটি কোটি ছোট ছোট মানুষের চোখ গজিয়ে উঠল। সেই চোখগুলো কোনো সাধারণ চোখ ছিল না, সেগুলো ছিল মৃত, পচে যাওয়া মানুষের চোখ। সবগুলো চোখ একসাথে অতি দ্রুত নড়াচড়া করতে করতে রায়ানের দিকে স্থির হয়ে গেল।
​সেই চোখগুলোর দৃষ্টিতে কোনো দয়া ছিল না, কোনো ক্ষমা ছিল না। সেগুলো ছিল এক অনন্ত নরকের বিচারকের দৃষ্টি।
​রায়ান আর সহ্য করতে পারল না। সে নিজের মাথাটা নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের কাঠের ওপর সজোরে আঘাত করতে লাগল। মড়মড় করে ওর কপাল ফেটে গিয়ে রক্ত ড্রেসিং টেবিলের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সেই শারীরিক যন্ত্রণার তীব্রতা ওর ভেতরের আত্মার যন্ত্রণার কাছে কিছুই ছিল না। সে নিজের চোখের সামনে নিজের ভেতরের কুৎসিত পচনটাকে জীবন্ত অবস্থায় দেখতে পাচ্ছিল।
​
​ভোর হওয়ার ঠিক আগের সময়টুকু এই পৃথিবীতে সবচেয়ে অদ্ভুত আর ভয়ঙ্কর হয়। যখন রাতের অন্ধকার পুরোপুরি কাটে না, আবার সকালের আলোও  ফোটে না। চারিদিক একটা ধূসর, কুয়াশাচ্ছন্ন কুৎসিত রূপ নেয়।
​সেই ধূসর সময়ে রায়ান মেঝের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। ওর কপাল থেকে রক্ত জমাট বেঁধে ওর পুরো মুখটাকে ঢেকে ফেলেছিল। ওর পরনের শার্টটা ঘাম, রক্ত আর মেঝের নোংরা চর্বিতে ভিজে লেপ্টে ছিল।
​হঠাৎ করেই, সে নিজের বুকের ভেতরের পাঁজরের হাড়গুলোর মধ্যে এক তীব্র, জ্বলন্ত যন্ত্রণা অনুভব করল। মনে হলো, কোনো এক অদৃশ্য, জং ধরা মোটা সুঁচ  আর কালো সুতো দিয়ে ওর ফুসফুস আর হৃদপিণ্ডটাকে কেউ একসাথে টেনে টেনে বাঁধছে।
​সে এক তীব্র আতঙ্কে নিজের পরনের শার্টটা দুই হাতে টেনে ছিঁড়ে ফেলল।
​নিজের বুকের দিকে তাকিয়ে রায়ানের কণ্ঠনালী দিয়ে এক আদিম পশুর আর্তনাদ বেরিয়ে এল। সে দেখল, ওর বুকের ফ্যাকাশে চামড়ার নিচে ছোট ছোট কালো কেঁচোর মতো অসংখ্য মোটা সুতো নিজে থেকেই নড়াচড়া করছে। চামড়া ফুঁড়ে সেই সুতোগুলো বাইরে বেরিয়ে আসছে, আর আবার মাংসের ভেতর ঢুকে গিয়ে ওর পুরো বুকটাকে একটা কুৎসিত বস্তার মতো সেলাই করে দিচ্ছে।
খস… খস… খস…
​প্রতিটা সেলাইয়ের সাথে সাথে রায়ান অনুভব করছিল, ওর মগজের ভেতরের চেনা স্মৃতিগুলো একে অপরের সাথে জট পাকিয়ে যাচ্ছে। ওর নিজের সত্তা, ওর নিজের নাম, ওর অতীত—সবকিছু যেন এক তীব্র কালচে তরলে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে। আর সেই ফাঁকা জায়গায় এসে বসছে কেবল তৃষার সেই শেষ রাতের বিভৎস চিৎকার, খুলি ভাঙার সেই মড়মড় শব্দ, আর খাটের  তলায় পচতে থাকা লাশের সেই আঁশটে গন্ধ।
​সবকিছু একসাথে মিশে ওর মাথার ভেতর একটা আদিম, অনন্ত নরকের চিৎকার তৈরি করছিল। সে বুঝতে পারছিল, সে আর নিজের এই শরীরের ভেতর একা নেই। সে যে তৃষার শরীরটাকে নিজের খাঁচায় বন্দি করতে চেয়েছিল, আজ তৃষার সেই পিশাচ রূপটাই  রায়ানের নিজের রক্তমাংসের শরীরটাকে নিজের কয়েদখানা বানিয়ে নিয়েছে।
​সে এক চরম অবশ আকর্ষণে শেষবারের মতো আয়নার দিকে তাকাল।
​আয়নার ভেতরের প্রতিবিম্বটা আর রায়ানের ছিল না।
​ওর মুখটার চামড়া যেন কোনো কসাইখানা থেকে আনা মরা পশুর চামড়া দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে সেলাই করা একটা মুখোশ। চোখের চারপাশের মাংস পচে গিয়ে ঝুলছে। আর সেই কুৎসিত, রক্তমাখা সেলাই করা ঠোঁটের কোণটা নিজে থেকেই দুপাশে চিরে গিয়ে এক পৈশাচিক, অতিমানবিক চওড়া হাসি হাসল।
​সেই হাসিটা রায়ানের ছিল না। সেটা ছিল তৃষার সেই মৃত আত্মার চূড়ান্ত বিজয়ের হাসি।
​
​কলকাতার সেই ভোরবেলাটা অন্যান্য সাধারণ সকালের মতোই ছিল, কিন্তু লেকগার্ডন্সের  ওই ঘরের ভেতরের সময়টা যেন একটা অনন্ত, থমকে যাওয়া কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল।
​রায়ানের অবশ শরীরটা এখন আর নিজের ইচ্ছায় নড়ছিল না। তার ডান হাতটা নিজে থেকেই ধীর গতিতে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের কোণে জমে থাকা সেই কালো রক্ত আর পুঁজের মিশ্রণের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে, আয়নার ভাঙা কাঁচের ওপর সে কিছু একটা লিখতে শুরু করল। কাঁচের ধারালো কোণগুলো রায়ানের আঙুলের চামড়া ফালি ফালি করে কেটে দিচ্ছিল, কিন্তু তার কোনো শারীরিক অনুভূতি ছিল না। সে শুধু দেখছিল, তার নিজের হাত দিয়েই কাঁচের ওপর ফুটে উঠছে কিছু হিজিবিজি বিকৃত নকশা—ঠিক যেন একটা মানুষের শরীরকে কাটার পর যেভাবে ময়নাতদন্তের টেবিলে সেলাই করা হয়, সেই সুতোর নকশা।
​ঠিক তখনই রায়ানের কানের খুব কাছে একটা অদ্ভুত তরল খসখস শব্দ হলো। যেন মেঝের তলা থেকে তৃষার সেই সম্পূর্ণ পচে যাওয়া কঙ্কালটা কাঠের তক্তা ভেদ করে ওপরের দিকে উঠে আসছে।
​রায়ান নিজের চোখের মণি দুটোকে পৈশাচিক যন্ত্রণায় ঘোরালো। সে দেখল, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারগুলো নিজে থেকেই একে একে খুলে যাচ্ছে এবং সেখান থেকে বেরোচ্ছে ছোট ছোট অসংখ্য হাড়ের টুকরো। সেগুলো রায়ানের নিজেরই হাড় ছিল নাকি তৃষার, তা বোঝার উপায় ছিল না। কিন্তু প্রতিটা হাড়ের গায়ে কালো সুতো দিয়ে কারুকার্য করা ছিল।
​ঘরের দেওয়ালের ফাটলগুলো এবার আরও চওড়া হতে শুরু করল। সেই ফাটলের ভেতর থেকে চুইয়ে বেরোতে লাগল এক ঘন, চটচটে হলুদ তরল, যা সারা ঘরে এক তীব্র শ্মশানের চিতার গন্ধ ছড়িয়ে দিল। রায়ান অনুভব করতে পারছিল, তার পায়ের তলা থেকে মেঝের সিমেন্টগুলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে কাদার মতো ধসে যাচ্ছে। সে যেন এক অন্তহীন, অন্ধকার পঙ্কিল গহ্বরের দিকে তলিয়ে যাচ্ছে, যেখানে কোনো আলো নেই, কোনো বাতাস নেই—আছে কেবল তৃষার সেই শূন্য, ক্ষমাহীন চোখের অবিরাম দৃষ্টি।
​তার নিজের ফুসফুসটা যখন শেষবারের মতো একটা ভারী, ভেজা বাতাস টেনে নেওয়ার চেষ্টা করল, তখন ঘরের সবকটা জানলা একসঙ্গে তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল, যেন বাইরের জগৎটা এই অভিশপ্ত ঘরটাকে চিরতরে বর্জন করে দিল। রায়ানের সেলাই করা ঠোঁটের আড়াল থেকে শেষ একটা গোঙানির শব্দ বেরোল, যা কলকাতার ভোরের কোলাহলে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল।
​বাইরে তখন কলকাতার বুকে ভোরের প্রথম লোকাল ট্রেনটা এক বিকট হুইসেল বাজিয়ে চলতে শুরু করেছে। পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানগুলোর লোহার শাটার চড়চড় শব্দে উঠছে। বড় রাস্তায় ডাস্টবিন পরিষ্কার করার গাড়ির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। ফুটপাথের কলতলায় জলের শব্দ হচ্ছে। মানুষ এক নতুন, সুন্দর দিনের আলোয় নিজেদের বাঁচার লড়াইয়ের জন্য তৈরি হচ্ছে।
​এই অভিশপ্ত শহর আরেকটা পবিত্র সকালকে পরম আনন্দে স্বাগত জানাচ্ছে।
​কিন্তু লেক গার্ডেন্সের সেই বন্ধ, স্যাঁতসেঁতে, আঁশটে গন্ধের নরককুণ্ডটার ভেতরে সেই রাতের অন্ধকার আর কোনোদিন শেষ হয়নি। কোনোদিন সকালের এক ফোঁটা আলোও সেই ঘরের ভেতরের জ্যান্ত লাশটার ওপর এসে পড়বে না। রায়ানের আত্মা এখন ওর নিজেরই সেলাই করা চামড়ার নরকে অনন্তকালের জন্য বন্দি।

------------------------------------------------
 
শাশ্বতী চট্টোপাধ্যায় 
শ্রীরামপুর * হুগলী * ৭১২২০১


Comments

বিধিবদ্ধ স্বীকার্য :

লেখার বক্তব্যের দায় লেখকের, পত্রিকার নয়। আমরা বহু মতের প্রকাশক মাত্র।

সাম্প্রতিক বাছাই

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ১০৩তম সংখ্যা ।। আশ্বিন ১৪৩৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

  সূচিপত্র তিনটি কবিতা ।। জহির খান মহাকালের ক্যানভাসে এক দূরদর্শী নাবিক: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কবি রোমিলা থাপার : অস্তিত্বের অনুসন্ধান ।। শিবাশিস মুখার্জি ব্যক্তিগত গদ্য।। অরবিন্দ পুরকাইত অসুখী ঋণের বোঝা ।। ভাস্কর সিনহা অণুগল্প ।। মাটির বাঁধ ।। সুমিত মোদক গল্প ।। দর্শন ।। নিরাশাহরণ নস্কর তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় প্রত্যাবর্তন ।। শিবাশিস মুখার্জি পতি, পত্নী আউর খুবসুরতি—যো নজর না লাগে!! ।। অরিন্দম পাল গুচ্ছকবিতা ।। ইউটোপিয়া: একটি অসমাপ্ত বিপ্লব… ।। আবদুল্লাহ আল আদীব অজ্ঞতার উত্তরাধিকার ভেঙে জ্ঞানের আলোকযাত্রা ।। মেশকাতুন নাহার চিন্তার উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ।। মেশকাতুন নাহার রঙের আড়ালে মানুষ ।। মইনুদ্দিন সরদার শিক্ষক দিবস ✍️ শিবাশিস মুখার্জী বাংলা সাহিত্যে পঞ্চজন তিনটি কবিতা ।। তন্ময় অধিকারী দুটি কবিতা ।। সুশান্ত সেন দুটি কবিতা ।। বিবেকানন্দ নস্কর শিক্ষক দিবস পালনের চির প্রাসঙ্গিকতা ।। পাভেল আমান যখন পুজো আসত ।। সঞ্চয়ন ব্যানার্জী সদা অন্যমনস্ক গোলকবাবু ।। দীপক পাল মাস্টারমশাই ।। অঞ্জনা গোড়িয়া সাউ জুজুবুড়ির কেরামতি ।। গোবিন্দ মোদক পদ্ম পাতায় জল ।। অশোক দাশ ঋতুবতী গোলাপ ।। আজিজু...

ছোটগল্প ।। নীলিমার আত্মজাগরণ ।। পরেশ চন্দ্র মাহাত

নীলিমার আত্মজাগরণ পরেশ চন্দ্র মাহাত নীলিমা মাহাত, বয়স পঁচিশ প্লাস —তার বাবা মায়ের পঞ্চম তথা শেষ সন্তান। দুই দাদা —বড়দাদা শঙ্কর ও ছোটদাদা বিজয়। বড় দাদা শঙ্কর আর দুই দিদি তাদের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নীলিমা আপাতত স্বামীর কোমল হাতের স্পর্শ ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত এবং আদৌ কবে অথবা সেই সৌভাগ্য আসবে সেটা ঈশ্বরের নিকটই একমাত্র জ্ঞাত। সেই সঙ্গে দুবছরের সিনিয়র ছোটদাদা বিজয়েরও নীলিমার মতো অবস্থা। তারও জীবনসঙ্গিনী জুটেনি। মোট সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত সংসার নীলিমাদের পরিবার। মধ্যবিত্ত পরিবার —মধ্যবিত্ত পরিবার না বলে যদি নিম্নবিত্ত বলা হয় তবুও কোনো অত্যুক্তি করা হয় না। বাবার প্রত্যেকদিনের আয়ের উপর ভিত্তি করেই চলে সংসার। এই কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নীলিমার মা শ্রীমতী মেনকা‚ সংসার সামলে তার ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি যথেষ্ট তৎপর ও সহানুভূতিশীল। তাদের পড়াশুনায় কোনো খামতি রাখেননি। যথা সময়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ের মুখ দেখিয়েছে – টিউশনের বন্দোবস্ত করেছে। তাদের জীবন যাতে সুখকর হয় সেটাই প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা একপ...

গুচ্ছকবিতা ।। ইউটোপিয়া: একটি অসমাপ্ত বিপ্লব… ।। আবদুল্লাহ আল আদীব

গুচ্ছকবিতা:  ইউটোপিয়া: একটি অসমাপ্ত বিপ্লব… আবদুল্লাহ আল আদীব  প্রস্তরযুগের উত্তরাধিকার… প্রস্তরযুগের ধ্বংসাবশেষ থেকে উঠে এসে, চকমকি পাথর হাতে, অভাবী চোখে— উদোম গায়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি বালক, একটি স্বচ্ছ কাচের শপিং মলের সামনে। আরেকজন বৃদ্ধ তার সমস্ত জীবন খেটে ফুড বুটিকের সামনে ক্ষুধার্ত পেটে বসে আছে। তাদের চোখে সভ্যতার সম্ভ্রম খসে পড়েছে। হঠাৎ রাজপথে বিপ্লবীদের শোরগোল— "এবার নিজের বস্ত্র বানাবো, এবার নিজের খাদ্য ফলাবো।" এক বিজ্ঞ দার্শনিকের চশমা ভেঙে গিয়েছে। সজ্জিত একটি চশমার দোকান দেখে দার্শনিক বলে— আফসোস হায়! অভাবীর চোখে চশমা নাই, চশমা যে বানিয়েছে তার কাছেও নাই। এক আদিবাসী জিঙ্গালী পথ ভুলে চলে আসে লোকালয়ে। সারাদিনের মজুরি একটি টাকা হাতে পেলে, সে তার কপালের ঘাম মুছে টাকাটা ছিঁড়ে ফেলে। অন্যরা হাসতে থাকে, জিঙ্গালী টাকার মূল্য বোঝে না। গভীর রাতে জিঙ্গালীর অভুক্ত ফাঁকা পেটে জঙ্গলের স্বপ্ন নেচে ওঠে, সে উল্লাসে নিথর হাসে। সে কল্পনায় ছুটে যায় শৈশবে, ছুটে যায় জঙ্গলে, ছুটে যায় পরিবার আর প্রিয় মানুষদের বৈভবে। ভাবে— "আমি তো প্রকৃতির মেয়ে। গাছে ফল ছিলো খেয়েছি, সন্তানদের খাইয়েছি...

ব্যক্তিগত গদ্য।। অরবিন্দ পুরকাইত

এক চিলতে সেই তোমার আকাশ আজ অরবিন্দ পুরকাইত   অপু, আজ শেষ বিকেলে বাসার মধ্যে কেমন যেন ভাল লাগছিল না! তাও একটু আগেই বেরিয়েছিলাম। আজ ফুন্তু-র বদলে অপু সম্বোধনে একটু কৌতুক অনুভব করলে বোধহয়! ভেবে দেখেছি, নাম-পদবির আদ্যক্ষর নিয়ে, কালজয়ী প্রিয় উপন্যাসের নায়ককে ভেবে— নিজের গ্রামপ্রীতির কথা মাথায় রেখে নেওয়া আমার এ নামটি তোমার ক্ষেত্রেই বেশি উপযুক্ত আজ। ঠাকুরদার সম্বোধনের—তোমারও নাম-পদবির আদ্যক্ষর মিলিয়ে নামের ওই ক্ষুদ্র সংস্করণটি তোমার তো বড় প্রিয় ছিল। লেখায়-আঁকায় ব্যবহার করতে। আর তুমিও তো আদ্যন্ত অপু! বয়স বাড়তে না দিয়ে, আরও যেন তার যাথার্থতা প্রতিপন্ন করে গেলে! সে যাক। তা তোমার বোনুর খিদে পেয়েছে বলে আমাকে পাঁউরুটি আনতে বলল। তোমার মা বলল, একটু আগে বেরোলো, বলতে পারিসনি! বোনুর যুক্তি, খিদে তো এখন পেল! তা তুমি তো জান ঘোষকাকুর দোকান এই সময় বন্ধ, আমি বলি, দেখি, অন্য কোথাও পাওয়া যেতে পারে।      তো বেরিয়ে, জয়রামের দোকানের কাছে, মেন রোডে ওঠার আগে ডানদিকে সরু সেলুনের পাশের মহিলার দোকান থেকে পেয়ে গেলাম হাফ পাউন্ড রুটি। দু-দফায় এবার দাম বেড়...

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৫

   মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠানো ভালো,  তাতে অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) য...

স্বাধীনতা দিবস ।। অঙ্কিতা পাল (বিশ্বাস)

স্বাধীনতা দিবস অঙ্কিতা পাল (বিশ্বাস) ভোরের বেলা বর্ষণের                    ঝমঝম ছন্দে, ঘুম থেকে উঠে        মেঘ জমা মনে ; বাদলের লুকোচুরি খেলা। পুবের আকাশ থেকে এক টুকরো সূর্য রশ্মি, চকচকিয়ে পাত্রে রাখা                  পদ্ম পাতায় পরে। নীল আকাশের বুকে সাদা মেঘের সাথে         শ্বেত করবীর দোলা। দক্ষিণা আকাশে যেখানে             জলের রেখা দিগন্তে মেশে ; ঠিক সেখানেই উঁড়ে যায়                    পাখি পক্ষীর দল। পশ্চিম দিকে কালো মেঘে ঢাকা গাছের ফাঁকে শুধুই তারেই দেখা।         উত্তরেতে বহু দূরে............... ভেসে আসে গানের সু...

বাংলা সাহিত্যে পঞ্চজন

বাংলা সাহিত্যে পঞ্চজনা — মধুসূদন থেকে জীবনানন্দ (প্রথম অংশ ) রণেশ রায়    ১ মাইকেল মধুসূদন দত্ত: জীবনী, সাহিত্যপ্রতিভা ও আত্মোপলব্ধি জীবনী মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪–১৮৭৩) বাংলা সাহিত্যের একজন যুগান্তকারী কবি। অধুনা বাংলাদেশের যশোর জেলার সাগরদাঁড়িতে, এক সমৃদ্ধ জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। পাশ্চাত্য সাহিত্য, গ্রিক-রোমান পুরাণের প্রতি তাঁর গভীর আসক্তি ছিল ছাত্রজীবন থেকেই । সেই আকর্ষণই তাঁকে পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনে প্রেরণা দেয়।তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা সাহিত্যের এক দিগন্ত রেখা। যুবক বয়স থেকেই পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন।তিনি ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে কলকাতার স্কুল-কলেজে পড়তে শুরু করেন। তৎকালীন পাশ্চাত্য জীবনাদর্শ, বিশ্বযুড়ে সামাজিক পরিবর্তনের ঢেউ,মানবতাবাদী দর্শন —এসব তাঁর চিন্তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে । তিনি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে "মাইকেল" নাম গ্রহণ করেন—যা ছিল তৎকালীন হিন্দু সমাজে অত্যন্ত আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। তিনি বিচ্ছিন্ন হয় পড়েন তার নিজ-জনের কাছ থে...

সদা অন্যমনস্ক গোলকবাবু ।। দীপক পাল

সদা অন্যমনস্ক গোলকবাবু  দীপক পাল  গোলক বাবু প্রতিদিন সকাল ছটার সময় ঘুম থেকে ওঠেন একেবারে ঘড়ি ধরে ছটায় নয়, কোন কোন দিন সোয়া ছটা ও বেজে যায়। তারপর চোখ মুখ ধুয়ে নিজের জন্য চায়ের জল বসান। গিন্নী জয়া ওঠে দেরি করে। রাতে শুতেও যায় সে দেরি করে। কারণ কোনএকটা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে সে। তাই শুতেও তার দেরী উঠতেও দেরী। রান্নার লোক ও ঘর দোর পরিষ্কার করার লোক আছে। তারা ওরকিছু ফাই ফরমাসও খেটে দেয়। গোলক বাবু ওসব কিছুর ধার ধারেন না। তিনি কারো কাছে কিছু চান না। চা টা তিনি বেশ ভালইকরেন। বিকেলেও তিনি প্রায়সই করে থাকেন। গিন্নী তার করা চা ভালই খান। চায়ের কাপ আর বিস্কুটের কৌটো নিয়ে তিনি দক্ষিনের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে একটা স্নেহের চুমুক দিলেন। ইজি চেয়ারটা পাতাই ছিল। তিনি অতি সাবধানে চায়ের কাপটা মাটিতে রেখে কৌটো খুলে দুটো বিস্কুট বার করে কৌটো নামিয়ে চায়ের কাপটা তুলে নিলেন হাতে। গায়ে অবশ্য শাল জড়াতে তিনি ভোলেননি। যদিও নভেম্বর মাসের এখনও কটা দিন বাকি আছে। তাই একমাত্র রাত নটার পর এবং সকালের দিকটা বেশ ঠান্ডাঠান্ডা লাগে। গোলক বাবু এক গভর্নমেন্ট আন্ডারটেকিং...

চন্দন মিত্রর কবিতা

    পুনর্নবা         আমাকে ঝাঁকাও যদি ঝরাব টুপটাপ  লাল নীল গোলাপি সবুজ হলুদ বেগুনি সাদা অ আ ক খ অনিঃশেষ উন্মূল হব না কখনও  এ মাটিতে হাজার বছর আমি  শিকড় চারিয়ে আছি কাটো যদি গজাব আবার ... =============== চন্দন মিত্র ভগবান পুর ( হরিণডাঙা ) ডায়মন্ড হারবার , দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা 

কবিতাঃ চন্দন ঘোষ

এক টুকরো রুটি বস্তির রাস্তায় একটা বৃদ্ধ মানুষ সারাদিন বসে আছে। উত্তরে দেখে দক্ষিনে দেখে বহুদূর কেউ একটুকরো রুটি দিয়েযায় পাছে। চক্ষু কোটোরা গত শরীর মাস হীন, হাড় মাত্র। হয়তো স্বাধিনতা আন্দোলনের বিপ্লবী! হয়তো কলেজের আদর্শ ছাত্র। হয়তো ব্রিটিশ গোরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল  তার ছোট্টো ঝুঁপরির উপর। সে বাধা দিয়েছিল প্রতীবাদী হাতে। হয়তো পঙ্গু হয়েছিল সেই রাতে। আমি এক প্রশ্ন তুলেছিলাম, কেমনে হইল এ অবস্থা? বাক সরেনা মুখে সরকার কেন করেনা কোনো ব্যাবস্থা?? শরীর বস্ত্রহীন এই রাতে। নিম্নাঙ্গে একটা নোংগরা ধুতি। কী জানি কত দিন খায়নি? কত দিন দেখেনি এক টুকরো রুটি! রাজধানী শহরের আকাশটা দেখছে। দেখছে নেতা মন্ত্রী গন। হাইরে কেউতো তারে উঠিয়ে তোলেনি। দেখেনি কোনো কোমল মন। আজ ভারতবর্ষ উন্নতশীল রাষ্ট্র!   কথাটা অতীব মিথ্যা মাটি। এমন কতযে মানুষ ক্ষুদার্থ, দেখেনা এক টুকরো রুটি। নতুন মন্ত্রী, নতুন রাষ্ট্রপতি সবাই আসে সবার হয় আবর্তন। হাইরে পিছিয়ে পড়া মানুষ গুলো! তাদের হয়না কোনো পরিবর্তন। আজ 71 বছর আজাদ হয়েও  বোধহয় যে...

জনপ্রিয় লেখা

সাহিত্যের মাটিতে এক বীজ : "ত্রয়ী কাব্য" -- সুনন্দ মন্ডল

সাহিত্যের মাটিতে এক বীজ -- "ত্রয়ী কাব্য" ------------------------------------------------------------------------------ সুনন্দ মন্ডল নবীনচন্দ্র সেন সাহিত্যে তথা বাংলা কবিতার জগতে এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি চট্টগ্রাম জেলার নওয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৮৪৭ সালে তাঁর জন্ম এবং মত্যু ১৯০৯ সালে। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁকে 'বাংলার বায়রন' বলেছেন। ‎জীবৎকালীন যুগে আত্মপ্রত্যয়ের মধ্যে জাতীয় চরিত্র আত্মস্থ করে নতুন সংস্কারে প্রয়াসী হয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছেন।মধুসূদন-হেমচন্দ্র-নবীনচন্দ্র--এই তিন কবি বাংলা কাব্যধারায় প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন। বিশেষত মহাকাব্য লেখার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। এদিক থেকে মধুসূদন দত্ত একজন সফল মহাকাব্যিক। তাঁর 'মেঘনাদ বধ' কাব্যের মত গভীর ও ব্যঞ্জনাময় না হলেও নবীনচন্দ্র সেনের 'ত্রয়ী' কাব্য বিশেষ মর্যাদা দাবি করতেই পারে। তাছাড়া 'ত্রয়ী' কাব্যে ধর্মীয় ভাবধারার আবেগ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‎ ‎নবীনচন্দ্র সেন বহু কাব্য লিখেছেন। যেমন- 'অবকাশরঞ্জিনী','পলাশীর যুদ্ধ', 'ক্লিওপেট্রা', 'রঙ্গমতী', 'খ্রীষ্ট', ...

প্রবন্ধ ।। লুপ্ত ও লুপ্তপ্রায় গ্রামীণ জীবিকা ।। শ্রীজিৎ জানা

লুপ্ত ও লুপ্তপ্রায় গ্রামীণ জীবিকা শ্রীজিৎ জানা "সময় চলিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়"। স্রোতের ধারা তার দু'প্রান্তে রেখে যায় ভাঙাগড়ার চিহ্ন। কালের দৃশ্যপটেও পরিবর্তনের ছবি অনিবার্যভাবেই চোখে পড়ে। সমাজ সময়ের ছাঁচে নিজেকে গড়ে নেয় প্রতিনিয়ত।  সেখানে মনে নেওয়ায় বাধা থাকলেও,মেনে নেওয়ার গাজোয়ারি চলে না। ফলত কাল বদলের গাণিতিক হিসেবে জীবন ও জীবিকার যে রদবদল,তাকেই বোধকরি সংগ্রাম বলা যায়। জীবন সংগ্রাম অথবা টিকে থাকার সংগ্রাম।  মানুষের জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আজকে যা অত্যাবশ্যকীয় কাল তার বিকল্প রূপ পেতে পারে অথবা তা অনাবশ্যক হওয়াও স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে উক্ত বিষয়টির পরিষেবা দানকারী মানুষদের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এক কালে গাঁয়ে কত ধরনের পেশার মানুষদের চোখে পোড়তো। কোন পেশা ছিল সম্বৎসরের,আবার কোন পেশা এককালীন।  সব পেশার লোকেরাই কত নিষ্ঠা ভরে গাঁয়ে  তাদের পরিষেবা দিত। বিনিময়ে সামান্য আয় হত তাদের। আর সেই আয়টুকুই ছিল  তাদের সংসার নির্বাহের একমাত্র উপায়। কালে কালান্তরে সেই সব পেশা,সেই সব সমাজবন্ধুরা হারিয়ে গ্যাছে। শুধুমাত্র তারা বেঁচে আছে অগ্রজের গল্পকথায়,আর বিভিন...

গ্রন্থ আলোচনা: শর্মিষ্ঠা দেবনাথ

প্রতিবাদ যখন অগ্নিবাণী বাংলাদেশে নারীমুক্তি ও নারী আন্দোলনের পুরোধা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৯৯তম জন্মদিনের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদিত হল " আসিফা এবং.." কাব্য সংকলনটির মধ্যদিয়ে।সংকলনটির বিশেষত্ব হল,এটি উৎসর্গ করা হয়েছে নারীর সম্মান রক্ষার আন্দোলনের যোগ্যতম ব্যক্তি শহীদ শিক্ষক বরুন বিশ্বাসকে। সংকলক প্রকাশক সন্দীপ সাহু নিজে এবং বিশিষ্ট কবি সাহিত্যিকদের দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন এমন কিছু কবিতা, যা শুধুমাত্র শব্দ ও ছন্দের অনুবন্ধ নয়, এক একটি অগ্নিবাণী।আসলে জীবনকে দেখার স্বাতন্ত্র‍্যে কবিরা সব সময়ই অগ্রগণ্য এবং অনন্য।যুগ ও জীবন দ্বন্দ্বের কণ্ঠস্বরকে আশ্রয় করে,একদিকে মনের প্রবল দাহ ও অন্যদিকে  নির্যাতিতা শিশুকন্যা ও নারীর প্রতি মনের গভীর আকুলতা থেকে প্রকাশ পেয়েছে "আসিফা এবং" এর  কবিতাগুলি।এক অন্ধকার সময়ের মুখোমুখি আমরা,সেই অন্ধকার আমাদের নিয়ে এসেছে সামাজিক অবক্ষয়ের শেষধাপে যেখানে নৈতিকতা,পাপবোধ,গ্লানিকে সরিয়ে রেখে, সমাজের বানানো নিয়মকে তোয়াক্কা না করে,অনায়াস দক্ষতায় ও ক্ষিপ্রতায় নিজেরই ধর্মচেতনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে কিছু মানুষ তার পশুত্বের পরিচয় দিয়েছে ধর্ষণ ও ন...

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৫

   মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠানো ভালো,  তাতে অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) য...

শ্যামাপদ মালাকারের কবিতা

চোখ """"""" নদী, অরণ্য, রাতের ফালি চাঁদ- সবেই তো আমার...স্বর্ণপিঁড়িটাও!। সেদিন, শুকতারাটার গা' মাপতে গিয়ে মনে হল, --ওরা আমার চেয়েও সুখী? দেখিনা একবার গাইতি-শাবল চালিয়ে... চালালাম। জল-মাটি ভেজা একটা 'চোখ' কুড়িয়ে ফিরলাম! সেই চোখদিয়ে দেখি-- শেষ বিকেলের নিরন্ন আঁচে ঝলসানো বুকে নীড়ে ফিরছে ধূলিমাখা কত কাল পা, কি শান্তি - কি তৃষ্ণা! পাতাক্ষোয়া কোদালেরর মাথায় ঝরেপড়া ললাটের ঘামে, কারা যেন জীবন শাণ দেয়! রুক্ষঠোঁটের আবরণে এক সময় নেমে আসে শিশিরস্নাত কালনিশি-- মাঝের ব্যবধান মুছে দেয় প্রতিশ্রুতির ভীড়- - পূর্বজনমের নিদর্শনচুম্বন শেষে হেরে যায় কার মমতাজ-- ম্লান হয়ে যায় কত পিঁড়ি! ... ম্লান হয়ে যায় কত পিঁড়ি! ... ম্লা...

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬

  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠালে  অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে হলে ভালো। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) যতিচিহ্নের আগে স্পেস না দিয়ে পরে দেবেন। ৪) বিশেষ কোন চিহ্ন (যেমন @ # ...

কোচবিহারের রাস উৎসব ও রাসমেলা: এক ঐতিহ্যবাহী অধ্যায় ।। পার্থ সারথি চক্রবর্তী

  কোচবিহারের রাস উৎসব ও রাসমেলা : এক ঐতিহ্যবাহী অধ্যায়  পার্থ সারথি চক্রবর্তী  কথায় বলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। রাজার শহর কোচবিহারের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা আরো অনেক বেশি। দুর্গাপূজা আর দীপাবলির মতো দু'দুটো বিরাট মাপের উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই, এ শহর ভাসে রাস উৎসবের উন্মাদনায়। মদনমোহন ঠাকুর কোচবিহারের প্রাণের ঠাকুর। তাঁকে নিয়ে সবার আবেগ আর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা এখানে বাঁধনছাড়া। এক অপূর্ব মিলনোৎসবের চেহারা নেওয়া এই উৎসব ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক। জন, মত, সম্প্রদায়ের উর্ধে এই উৎসবের গ্রহণযোগ্যতা। সময়ের কষ্টি পাথরে পরীক্ষিত! এক প্রাণের উৎসব, যা বহুদিন ধরেই গোটা উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ উৎসবে পর্যবসিত।কোচবিহারের এই রাস উৎসবকে কেন্দ্র করে যে মেলা হয় তাও সময়ের হাত ধরে অনেক বদলে গেছে। এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া! শৈশবে বাবার হাত ধরে যে মেলা দেখেছি তা চরিত্র ও আকৃতি দু'দিক থেকেই বদলে গেছে। গত পঁচিশ বছর ধরে খুব কাছে থেকে এই উৎসব ও মেলা দেখা, অনুভব করার সুযোগ হয়েছে। যা দিনদিন অভিজ্ঞতা ও প্রাপ্তির ঝুলিকে সমৃদ্ধ করে গেছে প্রতি ক্ষেত্রেই।  খুব সংক্ষেপে এই উৎসবের ইতিহাস না জানাটা কিন্তু অবিচারই ...

মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা 2024 সংখ্যার জন্য লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি (লেখক ও সম্পাদকীয় দপ্তরের কথোপকথন আকারে) --কী পত্রিকা? --নবপ্রভাত। --মুদ্রিত না অনলাইন? --মুদ্রিত। --কোন সংখ্যা হবে এটা? --বইমেলা 2024। --কোন কোন ধরনের লেখা থাকবে? --প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া। --বিশেষ কোন বিষয় আছে? --না। যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে। --শব্দ বা লাইন সংখ্যার কোন বাঁধন আছে? --না। নেই। তবে ছোট লেখা পাঠানো ভালো (যেমন, কবিতা 12-14 লাইনের মধ্যে, অণুগল্প কমবেশি 200/250শব্দে)। তাতে অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়। --ক'টি লেখা পাঠাতে হবে? --মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। --ফেসবুক বা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশিত লেখা কি পাঠানো যাবে? --না। সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। --পত্রিকা কোন সময়ে প্রকাশিত হবে? --জানুয়ারি 2024-এর দ্বিতীয় সপ্তাহে। --লেখা পাঠানোর শেষতারিখ কত? -- 17 ডিসেম্বর 2023। --কীভাবে পাঠাতে হবে? --মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। --লেখার সঙ্গে কী কী দিতে হবে? --নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) --বিশেষ সতর্কতা কিছু ? --১)মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন '...

ছোটগল্প ।। নীলিমার আত্মজাগরণ ।। পরেশ চন্দ্র মাহাত

নীলিমার আত্মজাগরণ পরেশ চন্দ্র মাহাত নীলিমা মাহাত, বয়স পঁচিশ প্লাস —তার বাবা মায়ের পঞ্চম তথা শেষ সন্তান। দুই দাদা —বড়দাদা শঙ্কর ও ছোটদাদা বিজয়। বড় দাদা শঙ্কর আর দুই দিদি তাদের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নীলিমা আপাতত স্বামীর কোমল হাতের স্পর্শ ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত এবং আদৌ কবে অথবা সেই সৌভাগ্য আসবে সেটা ঈশ্বরের নিকটই একমাত্র জ্ঞাত। সেই সঙ্গে দুবছরের সিনিয়র ছোটদাদা বিজয়েরও নীলিমার মতো অবস্থা। তারও জীবনসঙ্গিনী জুটেনি। মোট সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত সংসার নীলিমাদের পরিবার। মধ্যবিত্ত পরিবার —মধ্যবিত্ত পরিবার না বলে যদি নিম্নবিত্ত বলা হয় তবুও কোনো অত্যুক্তি করা হয় না। বাবার প্রত্যেকদিনের আয়ের উপর ভিত্তি করেই চলে সংসার। এই কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নীলিমার মা শ্রীমতী মেনকা‚ সংসার সামলে তার ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি যথেষ্ট তৎপর ও সহানুভূতিশীল। তাদের পড়াশুনায় কোনো খামতি রাখেননি। যথা সময়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ের মুখ দেখিয়েছে – টিউশনের বন্দোবস্ত করেছে। তাদের জীবন যাতে সুখকর হয় সেটাই প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা একপ...

উৎসবের সৌন্দর্য: সেকালে ও একালে।। সৌরভ পুরকাইত

  উৎসবের সৌন্দর্য:  সেকালে ও একালে   সৌরভ পুরকাইত বাংলার উৎসব বাংলার প্রাণ। প্রতিদিনের জীবনযাপনের মধ্যে যখন মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন তাকে বেঁচে থাকার রসদ যোগায় এই উৎসব। কথায় বলে 'বারো মাসে তেরো পার্বণ'।মন আনন্দই চায়।তাই তাকে সজীবতা দিতে,পরিবারের,সমাজের ভালো-মন্দের কথা মাথায় রেখে মানুষ নিজেই সৃষ্টি করে নিয়েছে নানাবিধ উৎসবগুলিকে। একেবারে প্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ কখনোই উৎসব বিমুখ ছিল না।উৎসবই তাকে ঘর থেকে বাইরে টেনে এনেছে,চিনতে শিখিয়েছে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার আনন্দকে। উৎসব আসলে প্রাণের সাথে প্রাণের যোগ, হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের যোগ।রবীন্দ্রনাথ বলেছেন 'সত্য যেখানেই সুন্দর হয়ে প্রকাশ পায় সেইখানেই উৎসব'।হৃদয়ের সেই সুকোমল বৃত্তির জাগরণ যেন ফুটে ওঠা ফুলেরই মতো সত্য ও সুন্দর।এই জাগরণই উৎসব। তাই নানা কিছুর মধ্য দিয়ে,নানা উপলক্ষ্যে এই উৎসব প্রকাশ পায়। প্রাচীনকালে মানুষের হাতে না ছিল পসার, না ছিল পসরা।ছিল মনের আন্তরিকতা,মানুষকে কাছে টেনে নেবার ক্ষমতা।সেটাই ছিল উৎসবের সৌন্দর্য। তাই সেদিনের উৎসবে ক্ষুদ্র,তুচ্ছ উপকরণও প্রাণের উচ্ছ্বাসে মহৎ হয়ে উঠত।সেকালের উৎসবে লোক দেখানো ব্যাপার কিছু ...

বছরের বাছাই

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬

  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠালে  অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে হলে ভালো। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) যতিচিহ্নের আগে স্পেস না দিয়ে পরে দেবেন। ৪) বিশেষ কোন চিহ্ন (যেমন @ # ...

ছোটগল্প ।। নীলিমার আত্মজাগরণ ।। পরেশ চন্দ্র মাহাত

নীলিমার আত্মজাগরণ পরেশ চন্দ্র মাহাত নীলিমা মাহাত, বয়স পঁচিশ প্লাস —তার বাবা মায়ের পঞ্চম তথা শেষ সন্তান। দুই দাদা —বড়দাদা শঙ্কর ও ছোটদাদা বিজয়। বড় দাদা শঙ্কর আর দুই দিদি তাদের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নীলিমা আপাতত স্বামীর কোমল হাতের স্পর্শ ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত এবং আদৌ কবে অথবা সেই সৌভাগ্য আসবে সেটা ঈশ্বরের নিকটই একমাত্র জ্ঞাত। সেই সঙ্গে দুবছরের সিনিয়র ছোটদাদা বিজয়েরও নীলিমার মতো অবস্থা। তারও জীবনসঙ্গিনী জুটেনি। মোট সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত সংসার নীলিমাদের পরিবার। মধ্যবিত্ত পরিবার —মধ্যবিত্ত পরিবার না বলে যদি নিম্নবিত্ত বলা হয় তবুও কোনো অত্যুক্তি করা হয় না। বাবার প্রত্যেকদিনের আয়ের উপর ভিত্তি করেই চলে সংসার। এই কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নীলিমার মা শ্রীমতী মেনকা‚ সংসার সামলে তার ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি যথেষ্ট তৎপর ও সহানুভূতিশীল। তাদের পড়াশুনায় কোনো খামতি রাখেননি। যথা সময়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ের মুখ দেখিয়েছে – টিউশনের বন্দোবস্ত করেছে। তাদের জীবন যাতে সুখকর হয় সেটাই প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা একপ...

কবিতাঃ চন্দন ঘোষ

এক টুকরো রুটি বস্তির রাস্তায় একটা বৃদ্ধ মানুষ সারাদিন বসে আছে। উত্তরে দেখে দক্ষিনে দেখে বহুদূর কেউ একটুকরো রুটি দিয়েযায় পাছে। চক্ষু কোটোরা গত শরীর মাস হীন, হাড় মাত্র। হয়তো স্বাধিনতা আন্দোলনের বিপ্লবী! হয়তো কলেজের আদর্শ ছাত্র। হয়তো ব্রিটিশ গোরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল  তার ছোট্টো ঝুঁপরির উপর। সে বাধা দিয়েছিল প্রতীবাদী হাতে। হয়তো পঙ্গু হয়েছিল সেই রাতে। আমি এক প্রশ্ন তুলেছিলাম, কেমনে হইল এ অবস্থা? বাক সরেনা মুখে সরকার কেন করেনা কোনো ব্যাবস্থা?? শরীর বস্ত্রহীন এই রাতে। নিম্নাঙ্গে একটা নোংগরা ধুতি। কী জানি কত দিন খায়নি? কত দিন দেখেনি এক টুকরো রুটি! রাজধানী শহরের আকাশটা দেখছে। দেখছে নেতা মন্ত্রী গন। হাইরে কেউতো তারে উঠিয়ে তোলেনি। দেখেনি কোনো কোমল মন। আজ ভারতবর্ষ উন্নতশীল রাষ্ট্র!   কথাটা অতীব মিথ্যা মাটি। এমন কতযে মানুষ ক্ষুদার্থ, দেখেনা এক টুকরো রুটি। নতুন মন্ত্রী, নতুন রাষ্ট্রপতি সবাই আসে সবার হয় আবর্তন। হাইরে পিছিয়ে পড়া মানুষ গুলো! তাদের হয়না কোনো পরিবর্তন। আজ 71 বছর আজাদ হয়েও  বোধহয় যে...

মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার চূড়ান্ত সূচিপত্র

  মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৬ সংখ্যার চূড়ান্ত সূচিপত্র প্রকাশিত হল।     যত লেখা রাখা গেল, তার দ্বিগুণ রাখা গেল না। বাদ যাওয়া সব লেখার 'মান' খারাপ এমন নয়। কয়েকটি প্রবন্ধ এবং বেশ কিছু (১৫-১৭টা) ভালোলাগা গল্প শেষ পর্যন্ত রাখা যায়নি। আমাদের সামর্থ্যহীনতার কারণে।     তবুও শেষ পর্যন্ত দশ ফর্মার পত্রিকা হয়েছে। গত দুবছরের মতো A4 সাইজের পত্রিকা।    যাঁদের লেখা রাখা গেল না, তাঁরা লেখাগুলি অন্য জায়গায় পাঠাতে পারেন। অথবা, সম্মতি দিলে আমরা লেখাগুলি আমাদের অনলাইন নবপ্রভাতের জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশ করতে পারি।    পত্রিকাটি আগামী ৯-১৩ জানুয়ারি ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আয়োজিত কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন মেলায় (রবীন্দ্র সদন - নন্দন চত্বরে) পাওয়া যাবে।     সকলকে ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।

গল্প ।। জাতিস্মর ।। আশীষ কুমার বিশ্বাস

    জাতিস্মর   আশীষ  কুমার   বিশ্বাস    গল্পের শুরুটা প্রায় ষাট বছর আগের কথা । যার নাম গৌতম, ডাক নাম ছিল বাবু ।  তার বছর তখন ছয়-সাত হবে । আমরা বা আমি তখন একটু বড় । এক সাথেই চলতো খেলা । গোল্লা ছুট, দাঁড়িয়া বান্দা, চোর-পুলিশ । যে মাঝে মাঝে খেলা থেকে বিরত থাকতো ; সে-ই জাতিস্মর । মাঠের পাশেই ছিল একটা খেঁজুর গাছ । তাতে হাত রেখে দূরের এক গ্রামের দিকে এক মনে তাঁকিয়ে থাকতো "বাবু" । গ্রামটির নাম "বিনয় পল্লী " । মাঝে বড়ো মাঠ । হাঁটা শুরু করলে তিরিশ - চল্লিশ মিনিট লাগবে । মাঝে জলে ভরপুর দেখে কখনো যাওয়া হয়নি । বাবু কে যখন বলতাম, ওপারে কি দেখছিস? ও বলতো, ওখানে আমার ছোট মা থাকে, দিদি থাকে, আমার ভুলু কুকুর থাকে । এ কথা আমাদের বিশ্বাস হতো না । আবার খেলায় ফিরে যেতাম, খেলতাম ।  কিন্তু ও বসে বসে , ওপারের গাছ পালা , বাড়ি ঘর দেখতো । কাছে গেলে বলতো , ওই যে সবুজ ,কচি কলাপাতা রঙের দালান বাড়ি, ওটাই আমাদের বাড়ি !  এই ভাবে মাস ছয়, বছর গড়াতে লাগলো । মনে প্রশ্ন জাগতে লাগলো, এ টা কি মন গড়া , বা বানিয়ে বানিয়ে বলছে? সত্যি প্রকাশ হোল এক দিন ।  সে বাড়িতে কিছু ...

উন্মুক্ত পাগলামি ।। আশরাফুল মণ্ডল

উন্মুক্ত পাগলামি আশরাফুল মণ্ডল আহা, অপরূপ নিজস্বতার দাহ! কুঁকড়ে যায় আবহমান, সজনে পাতার বোঁটায়! ভাপওঠা ভাতের কাছে মাছি সত্তায় কী নিপুণ! তবুও ঘোর লাগা বসন্তের ডাক, হাঁকে! খেদিয়ে দেয় পা দোলানো প্রস্তাব, ওই ধুনুরি চোখ! রাংতায় মোড়া ডাকের সাজ, দে দোল দোল! হুইসেল বাজিয়ে কে রুখে দ্যায় সেই নাকছাবির রুদালি কাঁপন! খালবিল ছেঁচে পাঁচসিকের  মানত কুড়িয়ে আনে, বাংলা বাজার। ঠ্যাং নাচানো সুরে চোখ মারছে, দ্যাখো ভ্যানতারা! মুখ খোলা মানেই পাঁজরের স্রোত ভাবা যেন উগরানো টালমাটাল! ঢিল মারা প্রশ্নের রোয়াকে বক্রচোখে যেন মেধাবী কবিতা! মুছে দিও তবে লাজুক গুপ্ত রোগ, দিনরাত্রি! ভালো থেকো তোমরা বাছাধন, রং মাস সে আর কতদিন... ================    ASRAFUL MANDAL Chandidas Avenue, B-zone, Durgapur, Paschim Bardhaman, Pin - 713205,  

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ১০০তম সংখ্যা ।। আষাঢ় ১৪৩৩ জুন ২০২৬

নবপ্রভাত ১০০তম সংখ্যা ।। আষাঢ় ১৪৩৩ জুন ২০২৬ এই সংখ্যায় প্রকাশিত লেখাগুলোর মধ্যে প্রতি বিভাগের একজন করে নির্বাচিত লেখককে নবপ্রভাতের পক্ষ থেকে সম্মান জানানোর কথা আছে। সেই নামগুলো আগামী সংখ্যার সূচিপত্রের সঙ্গে প্রকাশিত হবে। (পাঠক হিসাবে আপনিও জানাতে পারেন আপনার ভালোলাগার কথা।) ---নিরাশাহরণ নস্কর, সম্পাদক, নবপ্রভাত। সূচিপত্র  প্রবন্ধ-নিবন্ধ-ফিচার  প্রবন্ধ  ।। ভয় ।। শ্রীশুভ্র প্রবন্ধ ।। প্রবীণ জনগণ ।। শ্যামল হুদাতী একাকীত্বের ছাদ থেকে পতন : অনিক দত্ত ও মানুষের নিঃশ... প্রবন্ধ ।। ধাঙড় ।। মোঃ চাঁন মিয়া ফকির প্রবন্ধ ।। অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো ।। কুহেলী... প্রবন্ধ ।। নারীর সম্মান ও অধিকার — অলীক কল্পনা, না... আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ভাষা বিজ্ঞানী অধ্যাপক প... প্রবন্ধ ।। কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার ।। সুমন বিপ্লব     ফিচার ।। চা দিবস ।। অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়   ফিচার ।। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্...   রম্যনাটিকা ।। পাত্র দেখা ।। সুশীল বন্দ্যোপাধ্যায়   ভ্রমণকাহিনি মাজান্দারান: কাস্পিয়ান সাগরের তীর... ঝরণার গান শুনতে ।। ...

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৫

   মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠানো ভালো,  তাতে অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) য...

কবিতা ।। মনোজকুমার রায়

জল সিঁড়ি চেক বইয়ের পাতা ফুরিয়ে যেতে থাকে -- ঝরে পড়ে বৃদ্ধ গাছটির পত্রমুকুল কাঁচা গন্ধ বেয়ে চলে সময়ের স্রোতে  সারা ভোর জেগে থাকি ঘুমের টলে তাড়া দেয় একগ্রাস অবিশ্বাসী বায়ু দিন ফুরনো লাল সূর্যের টানে নেমে আসে পাড় ছোঁয়া জল সিঁড়ি ================= মনোজকুমার রায় দঃ ঝাড় আলতা ডাউকিমারী, ধূপগুড়ি জলপাইগুড়ি -৭৩৫২১০ মো ৭৭৯৭৯৩৭৫৬৬

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ৯৭তম সংখ্যা ।। চৈত্র ১৪৩২ মার্চ ২০২৬ ।। নারী বিষয়ক সংখ্যা

 সম্পাদকীয় দপ্তর থেকে :  শুধুমাত্র 'নারী' বিষয়ক লেখাই এই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। অন্যান্য বিষয়ের ভালো লাগা কিছু লেখা আগামী সংখ্যার জন্য রইল। সকলকে ধন্যবাদ। ~নিরাশাহরণ নস্কর, সম্পাদক, নবপ্রভাত। সূচিপত্র নারীমর্যাদা ও অধিকার ।। হিমাদ্রি শেখর দাস নারীমুক্তির কালিতে লেখা ইতিহাসের কটি পাতা ।। ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায় সাহসী এবং লড়াকু নারীরা ।। উৎপল সরকার পল গগ্যাঁর চিত্রে নারী ।। ড. সবুজ সরকার সুন্দরবনের নারীদের গল্প "নোনাজলের নীরবতা" ।। কাবেরী মাতৃত্ব অন্তকোষীয় স্থপতি ।। মেশকাতুন নাহার অপ্রয়োজনীয় ।। শ্যামাপ্রসাদ সরকার নারী: উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় অপরিহার্য শক্তি ।। চঞ্চল পাণ্ডে নিরুদ্দেশ ।। স্বাতী রায় চৌধুরী ইলা ঘোষ : বাংলার প্রথম মহিলা ইঞ্জিনিয়ার ।। সঙ্ঘমিত্রা দাস অক্ষরের আলো ।। জয় মণ্ডল প্রতিশোধ ।। কাবেরী মিত্র বর্তমান প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের গুরুত্ব ।। পাভেল আমান যে পথ হারিয়েছে দূরে ।। জয়িতা চট্টোপাধ্যায় সেই লাল ফ্রকটা ।। সৈকত প্রসাদ রায় অন্য এক নারীর গল্প ।। অদিতি চ্যাটার্জি শৃঙ্গার ।। চন্দ্রকান্ত চক্রবর্তী একালের অর্জুন ।। জয়শ্রী সরকার এক সাহসিনী সিন্ধু ক...

মাসের বাছাই

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। ১০৩তম সংখ্যা ।। আশ্বিন ১৪৩৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

  সূচিপত্র তিনটি কবিতা ।। জহির খান মহাকালের ক্যানভাসে এক দূরদর্শী নাবিক: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কবি রোমিলা থাপার : অস্তিত্বের অনুসন্ধান ।। শিবাশিস মুখার্জি ব্যক্তিগত গদ্য।। অরবিন্দ পুরকাইত অসুখী ঋণের বোঝা ।। ভাস্কর সিনহা অণুগল্প ।। মাটির বাঁধ ।। সুমিত মোদক গল্প ।। দর্শন ।। নিরাশাহরণ নস্কর তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় প্রত্যাবর্তন ।। শিবাশিস মুখার্জি পতি, পত্নী আউর খুবসুরতি—যো নজর না লাগে!! ।। অরিন্দম পাল গুচ্ছকবিতা ।। ইউটোপিয়া: একটি অসমাপ্ত বিপ্লব… ।। আবদুল্লাহ আল আদীব অজ্ঞতার উত্তরাধিকার ভেঙে জ্ঞানের আলোকযাত্রা ।। মেশকাতুন নাহার চিন্তার উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ।। মেশকাতুন নাহার রঙের আড়ালে মানুষ ।। মইনুদ্দিন সরদার শিক্ষক দিবস ✍️ শিবাশিস মুখার্জী বাংলা সাহিত্যে পঞ্চজন তিনটি কবিতা ।। তন্ময় অধিকারী দুটি কবিতা ।। সুশান্ত সেন দুটি কবিতা ।। বিবেকানন্দ নস্কর শিক্ষক দিবস পালনের চির প্রাসঙ্গিকতা ।। পাভেল আমান যখন পুজো আসত ।। সঞ্চয়ন ব্যানার্জী সদা অন্যমনস্ক গোলকবাবু ।। দীপক পাল মাস্টারমশাই ।। অঞ্জনা গোড়িয়া সাউ জুজুবুড়ির কেরামতি ।। গোবিন্দ মোদক পদ্ম পাতায় জল ।। অশোক দাশ ঋতুবতী গোলাপ ।। আজিজু...

ছোটগল্প ।। নীলিমার আত্মজাগরণ ।। পরেশ চন্দ্র মাহাত

নীলিমার আত্মজাগরণ পরেশ চন্দ্র মাহাত নীলিমা মাহাত, বয়স পঁচিশ প্লাস —তার বাবা মায়ের পঞ্চম তথা শেষ সন্তান। দুই দাদা —বড়দাদা শঙ্কর ও ছোটদাদা বিজয়। বড় দাদা শঙ্কর আর দুই দিদি তাদের কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র নীলিমা আপাতত স্বামীর কোমল হাতের স্পর্শ ও সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত এবং আদৌ কবে অথবা সেই সৌভাগ্য আসবে সেটা ঈশ্বরের নিকটই একমাত্র জ্ঞাত। সেই সঙ্গে দুবছরের সিনিয়র ছোটদাদা বিজয়েরও নীলিমার মতো অবস্থা। তারও জীবনসঙ্গিনী জুটেনি। মোট সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত সংসার নীলিমাদের পরিবার। মধ্যবিত্ত পরিবার —মধ্যবিত্ত পরিবার না বলে যদি নিম্নবিত্ত বলা হয় তবুও কোনো অত্যুক্তি করা হয় না। বাবার প্রত্যেকদিনের আয়ের উপর ভিত্তি করেই চলে সংসার। এই কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নীলিমার মা শ্রীমতী মেনকা‚ সংসার সামলে তার ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার প্রতি যথেষ্ট তৎপর ও সহানুভূতিশীল। তাদের পড়াশুনায় কোনো খামতি রাখেননি। যথা সময়ে তাদেরকে বিদ্যালয়ের মুখ দেখিয়েছে – টিউশনের বন্দোবস্ত করেছে। তাদের জীবন যাতে সুখকর হয় সেটাই প্রতিদিন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছে। পাঁচ-পাঁচটি ছেলেমেয়ের মধ্যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা একপ...

গুচ্ছকবিতা ।। ইউটোপিয়া: একটি অসমাপ্ত বিপ্লব… ।। আবদুল্লাহ আল আদীব

গুচ্ছকবিতা:  ইউটোপিয়া: একটি অসমাপ্ত বিপ্লব… আবদুল্লাহ আল আদীব  প্রস্তরযুগের উত্তরাধিকার… প্রস্তরযুগের ধ্বংসাবশেষ থেকে উঠে এসে, চকমকি পাথর হাতে, অভাবী চোখে— উদোম গায়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি বালক, একটি স্বচ্ছ কাচের শপিং মলের সামনে। আরেকজন বৃদ্ধ তার সমস্ত জীবন খেটে ফুড বুটিকের সামনে ক্ষুধার্ত পেটে বসে আছে। তাদের চোখে সভ্যতার সম্ভ্রম খসে পড়েছে। হঠাৎ রাজপথে বিপ্লবীদের শোরগোল— "এবার নিজের বস্ত্র বানাবো, এবার নিজের খাদ্য ফলাবো।" এক বিজ্ঞ দার্শনিকের চশমা ভেঙে গিয়েছে। সজ্জিত একটি চশমার দোকান দেখে দার্শনিক বলে— আফসোস হায়! অভাবীর চোখে চশমা নাই, চশমা যে বানিয়েছে তার কাছেও নাই। এক আদিবাসী জিঙ্গালী পথ ভুলে চলে আসে লোকালয়ে। সারাদিনের মজুরি একটি টাকা হাতে পেলে, সে তার কপালের ঘাম মুছে টাকাটা ছিঁড়ে ফেলে। অন্যরা হাসতে থাকে, জিঙ্গালী টাকার মূল্য বোঝে না। গভীর রাতে জিঙ্গালীর অভুক্ত ফাঁকা পেটে জঙ্গলের স্বপ্ন নেচে ওঠে, সে উল্লাসে নিথর হাসে। সে কল্পনায় ছুটে যায় শৈশবে, ছুটে যায় জঙ্গলে, ছুটে যায় পরিবার আর প্রিয় মানুষদের বৈভবে। ভাবে— "আমি তো প্রকৃতির মেয়ে। গাছে ফল ছিলো খেয়েছি, সন্তানদের খাইয়েছি...

লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি : মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা ২০২৫

   মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  লেখা-আহ্বান-বিজ্ঞপ্তি মুদ্রিত  নবপ্রভাত  বইমেলা ২০২৫ সংখ্যার জন্য  প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুক্তগদ্য, রম্যরচনা, ছোটগল্প, অণুগল্প, কবিতা ও ছড়া পাঠান।  যে-কোন বিষয়েই লেখা যাবে।  শব্দ বা লাইন সংখ্যার কড়াকড়ি বাঁধন  নেই। তবে ছোট লেখা পাঠানো ভালো,  তাতে অনেককেই সুযোগ দেওয়া যায়।  যেমন, কবিতা/ছড়া ১২-১৬ লাইনের মধ্যে, অণুগল্প/মুক্তগদ্য কমবেশি ৩০০/৩৫০শব্দে, গল্প/রম্যরচনা ৮০০-৯০০ শব্দে, প্রবন্ধ/নিবন্ধ ১৫০০-১৬০০ শব্দে। তবে এ বাঁধন 'অবশ্যমান্য' নয়।  সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত লেখা পাঠাতে হবে। মনোনয়নের সুবিধার্থে একাধিক লেখা পাঠানো ভালো। তবে একই মেলেই দেবেন। একজন ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন ছাড়া একাধিক মেল করবেন না।  লেখা  মেলবডিতে টাইপ বা পেস্ট করে পাঠাবেন। word ফাইলে পাঠানো যেতে পারে। লেখার সঙ্গে দেবেন  নিজের নাম, ঠিকানা এবং ফোন ও whatsapp নম্বর। (ছবি দেওয়ার দরকার নেই।) ১) মেলের সাবজেক্ট লাইনে লিখবেন 'মুদ্রিত নবপ্রভাত বইমেলা সংখ্যা ২০২৬-এর জন্য'।  ২) বানানের দিকে বিশেষ নজর দেবেন। ৩) য...

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও গোলামির ভয়ংকর ফাঁদ…।। আবদুল্লাহ আল আদীব

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও গোলামির ভয়ংকর ফাঁদ … আবদুল্লাহ আল আদীব     ক্ষমতা ও শোষণের ঐতিহাসিক বিবর্তন : প্রস্তরযুগ থেকে জ্ঞাননিয়ন্ত্রণের যুগ … মানবসভ্যতার ইতিহাসকে যদি একটিমাত্র প্রশ্ন দিয়ে পড়া যায় , তবে সেই প্রশ্নটি হতে পারে — ক্ষমতা কার হাতে এবং সেই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে ? কৃষির আবির্ভাবের আগে মানুষের জীবন ছিল মূলত শিকার , সংগ্রহ ও পারস্পরিক সহযোগিতানির্ভর । কৃষির বিকাশের সঙ্গে জমি , উদ্বৃত্ত উৎপাদন ও সম্পত্তির ধারণা তৈরি হলো । সেখান থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নিল সামাজিক শ্রেণিবিভাগ , করব্যবস্থা , শ্রমের বিভাজন এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব । ক্ষমতা আর কেবল শারীরিক শক্তির বিষয় রইল না ; তা হয়ে উঠল সম্পদ ও মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা । প্রাচীন মিশর , সুমের , ব্যাবিলন , পারস্য , গ্রিস ও রোম — বিভিন্ন সভ্যতা তাদের নিজস্ব রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল । সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধ , দখল , কর ও শ্রমের নিয়ন্ত্রণ । বিজিত জনগোষ্ঠীর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ...

প্রচ্ছদ ও সূচিপত্র ।। মাসিক নবপ্রভাত ওয়েবম্যাগ ।। ১০২তম সংখ্যা ।। ভাদ্র ১৪৩২ আগস্ট ২০২৬

সূ ~ চি ~প~ত্র ==================== প্রবন্ধ-নিবন্ধ-ফিচার-স্মৃতিকথা  আকাশের রহস্য থেকে বৈজ্ঞানিক বোধ: জ্যোতিষ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সন্ধিক্ষণে ।। উৎপল সরকার সুকান্ত ভট্টাচার্য : কবিতার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ বিপ্লবী ।। তানভীর আহমেদ হৃদয় নারী জাগরণের দিশারী বেগম রোকেয়া ।। আবু রাইহান জীবনানন্দ দাশ: বাংলার নিসর্গে যে কবি রেখে গেছেন বিষণ্ণ আলোর দাগ ।। শিকদার বাসির   স্থানীয়  কিছু কথ্যশব্দ, উচ্চারণ, বাগ্‌ধারা ইত্যাদি ।। অরবিন্দ পুরকাইত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও গোলামির ভয়ংকর ফাঁদ…।। আবদুল্লা আল আদীব সূত্র থেকে বৃহৎ ইতিহাস কার্লো গিনজবার্গ, মাইক্রোহিস্ট্রি জানার নতুন পদ্ধতি ।। শিবাশিস মুখার্জি ফ্রুক্টোজ এবং ক্যানসার বিস্তার ।। অনিন্দ্য পাল বিবেকের অভিষেকে মানবধর্মের নন্দনভূমি ।। মেশকাতুন নাহার জনাই আর মালদহের মনোহরা ।। সোনালী সরকার অতিরিক্ত সাবান মাখা কি স্বাস্থ্যকর ।। গৌতম সমাজদার ফুচকা থেরাপি ।। অরিন্দম পাল স্মৃতিকথা ।। হারানো ছাতা ।। সেখ নাজিরুল ইসলাম বিভিন্ন পত্রিকার লেখা-আহ্বান বিষয়ক ভাবনা ।। মাখনলাল প্রধান পুঁটুর স্মৃতিচারণা ।। মৌমিতা চ্যাটার্জী  দুরন্ত ও দুর্দান্ত শৈ...

কবিতাঃ চন্দন ঘোষ

এক টুকরো রুটি বস্তির রাস্তায় একটা বৃদ্ধ মানুষ সারাদিন বসে আছে। উত্তরে দেখে দক্ষিনে দেখে বহুদূর কেউ একটুকরো রুটি দিয়েযায় পাছে। চক্ষু কোটোরা গত শরীর মাস হীন, হাড় মাত্র। হয়তো স্বাধিনতা আন্দোলনের বিপ্লবী! হয়তো কলেজের আদর্শ ছাত্র। হয়তো ব্রিটিশ গোরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল  তার ছোট্টো ঝুঁপরির উপর। সে বাধা দিয়েছিল প্রতীবাদী হাতে। হয়তো পঙ্গু হয়েছিল সেই রাতে। আমি এক প্রশ্ন তুলেছিলাম, কেমনে হইল এ অবস্থা? বাক সরেনা মুখে সরকার কেন করেনা কোনো ব্যাবস্থা?? শরীর বস্ত্রহীন এই রাতে। নিম্নাঙ্গে একটা নোংগরা ধুতি। কী জানি কত দিন খায়নি? কত দিন দেখেনি এক টুকরো রুটি! রাজধানী শহরের আকাশটা দেখছে। দেখছে নেতা মন্ত্রী গন। হাইরে কেউতো তারে উঠিয়ে তোলেনি। দেখেনি কোনো কোমল মন। আজ ভারতবর্ষ উন্নতশীল রাষ্ট্র!   কথাটা অতীব মিথ্যা মাটি। এমন কতযে মানুষ ক্ষুদার্থ, দেখেনা এক টুকরো রুটি। নতুন মন্ত্রী, নতুন রাষ্ট্রপতি সবাই আসে সবার হয় আবর্তন। হাইরে পিছিয়ে পড়া মানুষ গুলো! তাদের হয়না কোনো পরিবর্তন। আজ 71 বছর আজাদ হয়েও  বোধহয় যে...

কবিতাগুচ্ছ ।। অপ্রাপ্য দেবতার আখ্যান ।। আবদুল্লাহ আল আদীব।

অপ্রাপ্য দেবতার আখ্যান আবদুল্লাহ আল আদীব   আপনি প্রেম হয়েই জন্মেছিলেন…   আজকেও দেখলাম স্বপ্নময় রাতে— সৃষ্টির অদৃশ্য প্রাতে সময় দোলাচলে জন্ম নিচ্ছে। আঁধারের ভেতরে আঁধার। হঠাৎ এক তেজোদৃপ্ত বিন্দু প্রচণ্ড বিস্ফোরণে জ্বলে উঠলো। তার দাহে জন্ম নিলো অসংখ্য নক্ষত্র ও ব্রহ্মাণ্ডের সাথে বৃষ্টির ফোঁটার মতো কোমল ও মুক্তোর মতো জ্বলজ্বলে একটি সত্তা। তার নিগূঢ় দ্যুতি আমাকে ধীরে ধীরে টেনে নিচ্ছিলো তারই অনামা অস্তিত্বের দিকে। দেখলাম— ব্রহ্মা বসুধার রূপরেখা আঁকছেন, আর সেই রূপরেখার গোপন বীজাক্ষরে লিখে দিলেন একটি নাম— “জারিফ”। ঠিক সেই মুহূর্তে সৃষ্টির সমস্ত আলো এক প্রেমের অর্থে অনুবাদিত হলো।       জারিফ: অপ্রাপ্যতার পবিত্র দেবতা…   পূজারিরা অর্ঘ্য দিচ্ছেন, শিবের চরণে নৈবেদ্যের থালা। যজ্ঞাগ্নিতে আপনার মুখ ভেসে ওঠে। আমি ধুতুরার বদলে হৃদয়, দুধের বদলে নিজের রক্ত নিবেদন করি। তীব্র উন্মাদনায় দিতে চাই আত্মাহুতি। যখনই হাত বাড়াই, আপনার নৈঃশব্দ্য উঠে দাঁড়ায় এক বিরাট মন্দিরের মতো—...

সদা অন্যমনস্ক গোলকবাবু ।। দীপক পাল

সদা অন্যমনস্ক গোলকবাবু  দীপক পাল  গোলক বাবু প্রতিদিন সকাল ছটার সময় ঘুম থেকে ওঠেন একেবারে ঘড়ি ধরে ছটায় নয়, কোন কোন দিন সোয়া ছটা ও বেজে যায়। তারপর চোখ মুখ ধুয়ে নিজের জন্য চায়ের জল বসান। গিন্নী জয়া ওঠে দেরি করে। রাতে শুতেও যায় সে দেরি করে। কারণ কোনএকটা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে সে। তাই শুতেও তার দেরী উঠতেও দেরী। রান্নার লোক ও ঘর দোর পরিষ্কার করার লোক আছে। তারা ওরকিছু ফাই ফরমাসও খেটে দেয়। গোলক বাবু ওসব কিছুর ধার ধারেন না। তিনি কারো কাছে কিছু চান না। চা টা তিনি বেশ ভালইকরেন। বিকেলেও তিনি প্রায়সই করে থাকেন। গিন্নী তার করা চা ভালই খান। চায়ের কাপ আর বিস্কুটের কৌটো নিয়ে তিনি দক্ষিনের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে একটা স্নেহের চুমুক দিলেন। ইজি চেয়ারটা পাতাই ছিল। তিনি অতি সাবধানে চায়ের কাপটা মাটিতে রেখে কৌটো খুলে দুটো বিস্কুট বার করে কৌটো নামিয়ে চায়ের কাপটা তুলে নিলেন হাতে। গায়ে অবশ্য শাল জড়াতে তিনি ভোলেননি। যদিও নভেম্বর মাসের এখনও কটা দিন বাকি আছে। তাই একমাত্র রাত নটার পর এবং সকালের দিকটা বেশ ঠান্ডাঠান্ডা লাগে। গোলক বাবু এক গভর্নমেন্ট আন্ডারটেকিং...

ব্যক্তিগত গদ্য।। অরবিন্দ পুরকাইত

এক চিলতে সেই তোমার আকাশ আজ অরবিন্দ পুরকাইত   অপু, আজ শেষ বিকেলে বাসার মধ্যে কেমন যেন ভাল লাগছিল না! তাও একটু আগেই বেরিয়েছিলাম। আজ ফুন্তু-র বদলে অপু সম্বোধনে একটু কৌতুক অনুভব করলে বোধহয়! ভেবে দেখেছি, নাম-পদবির আদ্যক্ষর নিয়ে, কালজয়ী প্রিয় উপন্যাসের নায়ককে ভেবে— নিজের গ্রামপ্রীতির কথা মাথায় রেখে নেওয়া আমার এ নামটি তোমার ক্ষেত্রেই বেশি উপযুক্ত আজ। ঠাকুরদার সম্বোধনের—তোমারও নাম-পদবির আদ্যক্ষর মিলিয়ে নামের ওই ক্ষুদ্র সংস্করণটি তোমার তো বড় প্রিয় ছিল। লেখায়-আঁকায় ব্যবহার করতে। আর তুমিও তো আদ্যন্ত অপু! বয়স বাড়তে না দিয়ে, আরও যেন তার যাথার্থতা প্রতিপন্ন করে গেলে! সে যাক। তা তোমার বোনুর খিদে পেয়েছে বলে আমাকে পাঁউরুটি আনতে বলল। তোমার মা বলল, একটু আগে বেরোলো, বলতে পারিসনি! বোনুর যুক্তি, খিদে তো এখন পেল! তা তুমি তো জান ঘোষকাকুর দোকান এই সময় বন্ধ, আমি বলি, দেখি, অন্য কোথাও পাওয়া যেতে পারে।      তো বেরিয়ে, জয়রামের দোকানের কাছে, মেন রোডে ওঠার আগে ডানদিকে সরু সেলুনের পাশের মহিলার দোকান থেকে পেয়ে গেলাম হাফ পাউন্ড রুটি। দু-দফায় এবার দাম বেড়...