সেলাই করা নরকের বিভীষিকা
শাশ্বতী চট্টোপাধ্যায়
কলকাতার রাতের একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। পুরনো ট্রামের লোহা, ভেজা রাস্তার ধুলো, নর্দমার পচা জল আর ক্লান্ত শহরের অবশ শরীর থেকে বেরোনো এক অদ্ভুত উষ্ণতা—সব মিলিয়ে কলকাতা নগরী রাতেরবেলা যেন অন্য এক আদিম জীব হয়ে ওঠে। কিন্তু লেক গার্ডেন্সের সেই ১১১/৩ এর জরাজীর্ণ, স্যাঁতসেঁতে পুরনো ভাড়া বাড়িটার ভেতরে রাতের গন্ধ কলকাতার এই চেনা গন্ধের থেকে অনেকটাই আলাদা ছিল। সেখানে যেন সময় নিজেই একটা বদ্ধ পাত্রে পচে গলে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল।
দেওয়ালের লোনাধরা ফাটলগুলো থেকে ভেজা চুন আর ক্ষয়ে যাওয়া ইটের সঙ্গে মিশে বেরোত এক তীব্র মিষ্টি অথচ অসহ্য আঁশটে গন্ধ—ঠিক যেমনটা কোনো মরা পশুর শরীর পচতে শুরু করলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। ঘরের আদিম সিলিং ফ্যানটা কাঁপতে কাঁপতে ঘুরত ধীরে ধীরে, যেন বহু যুগ ধরে চলা কোনো যন্ত্রণার ক্লান্তিতে তার লোহার ডানাতেও মরচে ধরে গেছে। মাঝরাতে বাড়িটার প্রাচীন কাঠের দরজাগুলো কোনো বাতাস ছাড়াই নিজে থেকেই কেঁপে উঠত, আর ছাদের কোনো এক অদৃশ্য কোণ থেকে অবিরাম জল পড়ার শব্দ হতো—টুপ… টুপ… টুপ… যেন কোনো কাটা ধমনী থেকে মেঝেতে রক্ত চুইয়ে পড়ছে।
রাত তখন দুটো বেজে পনেরো।
রায়ান টেবিল ল্যাম্পের নিচে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল। ল্যাম্পের হলুদ আলোটা এত ক্ষীণ আর নোংরা ছিল যে ঘরের জমাট অন্ধকারকে তাড়ানো তো দূর, তাকে আরও বেশি কুৎসিত আর জীবন্ত করে তুলছিল। তার ঠিক সামনে, টেবিলের ওপর রাখা ছিল একটা পুরনো নীল বাটিকের কানের দুল, যার নিচে কালচে রক্তের দাগ শুকিয়ে চটা উঠে গেছে। পাশে পড়ে ছিল কুঁকড়ে যাওয়া, কালচে হয়ে যাওয়া কিছু পচা গাঁদা ফুল, যা থেকেও একটা তীব্র শ্মশানের গন্ধ বেরোচ্ছিল। আর তার ঠিক পাশেই রাখা একটা ছোট ট্রান্সপারেন্ট প্লাস্টিকের বাক্সের ভেতরে সাজানো ছিল কয়েকটা মানুষের উপড়ানো দাঁত, যেগুলোর গোড়ায় তখনও লেগে থাকা মাংসের কুচি শুকিয়ে শক্ত হয়ে আছে।
রায়ানের হাত কাঁপছিল। তীব্র, অনিয়ন্ত্রিত সেই কাঁপুনি।
তার চোখের নিচে কালচে-বেগুনি রঙের গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে। ঠোঁটের চামড়া শুকিয়ে ফেটে গিয়ে সেখান থেকে চুইয়ে বেরোনো রক্ত ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে। গত এক মাসে সে এক সেকেন্ডের জন্যও চোখ বুজতে পারেনি। মাঝরাতে যখনই অবশ শরীরটা একটু হেলে পড়তে চায়, তখনই এক তীব্র ঠাণ্ডা আতঙ্কে সে চমকে উঠে বসে থাকে। তার সর্বক্ষণ মনে হয়, এই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মাঝে ঘরের ঠিক কোণায়, যেখানে আলো পৌঁছায় না, সেখানে উল্টো হয়ে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। কখনো মনে হয়, তার নিজের বিছানার ঠিক নিচে মেঝের ওপর শুয়ে কেউ খুব ভারী, ভেজা আর গোঙানি জড়ানো গলায় নিঃশ্বাস ফেলছে।
রায়ান ছোটবেলা থেকে তৃষাকে ভালোবাসত। অন্তত সে নিজে নিজের মনের ভেতরের সেই আদিম, হিংস্র অধিকারবোধটাকেই ভালোবাসা বলে বিশ্বাস করিয়েছিল।
স্কুল থেকে ফেরার সময় তৃষার ব্যাগ বয়ে দেওয়া, কলেজে ওর জন্য রোদে-বৃষ্টিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কুকুরের মতো অপেক্ষা করা, মাঝরাতে ও ভেঙে পড়লে ওর কান্না শোনা—সবকিছুর আড়ালে রায়ান নিজের মনের ভেতর একটা অদৃশ্য, বিষাক্ত অধিকারের জাল বুনে চলেছিল। তৃষা যখনই অন্য কারও সাথে হাসিমুখে কথা বলত বা সম্পর্কে জড়াত, রায়ানের বুকের পাঁজর ফুঁড়ে এক পৈশাচিক, অবদমিত হিংসা মাথা চাড়া দিয়ে উঠত। ওর মনে হতো, তৃষা শুধু ওর সম্পত্তি, অন্য কারোর সেখানে তাকানোর অধিকারও নেই। অথচ, লোকচক্ষুর সামনে সে কখনোই নিজের এই মনের বিকৃতি প্রকাশ পেতে দেয়নি। সে নিজেকে একজন পরম নির্ভরযোগ্য, নিঃস্বার্থ বন্ধু হিসেবে সাজিয়ে রেখেছিল।
তৃষাও রায়ানকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করত। ওর অবচেতন মনে রায়ান ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ একটা আশ্রয়, এমন একজন মানুষ যার সামনে কোনো মুখোশ ছাড়া সম্পূর্ণ নগ্ন মনে কাঁদা যায়, নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে ভেঙে পড়া যায়।
কিন্তু রায়ান সেই বিশ্বাসেরই প্রতিটা রক্তবিন্দুকে নিজের কামনার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেছিল। সে তৃষার প্রতিটা কান্নার মুহূর্তকে, প্রতিটা জড়িয়ে ধরার দুর্বলতাকে নিজের প্রতি প্রেমের নীরব স্বীকৃতি বলেই ধরে নিয়েছিল।
আর সেই মারাত্মক ভুলটারই চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটেছিল ঠিক এক মাস আগে।
তৃষার বিয়ে ঠিক হয়েছিল কানাডায় থাকা এক সুপ্রতিষ্ঠিত পাত্রের সঙ্গে। খবরটা শোনার পর থেকেই রায়ানের মাথার ভেতরের শিরাগুলো যেন ছিঁড়ে বিকৃত হতে শুরু করেছিল। সে নিজেকে ঘরের মধ্যে বন্দি করে ফেলে । খাওয়া-দাওয়াও সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। রাতের পর রাত জেগে সে কেবল অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকত, আর তার চোখের সামনে ভেসে উঠত তৃষার সেই শরীর অন্য একটা পুরুষ স্পর্শ করছে। এই চিন্তাটা ওর মগজের কোষগুলোকে জ্যান্ত কামড়ে খাচ্ছিল। সে মানসিকভাবে পুরো উন্মাদ হয়ে উঠেছিল।
শেষবারের মতো নিজের তৈরি সেই কাল্পনিক হিসাব মেলাতে সে তৃষাকে ডেকে পাঠিয়েছিল লেক গার্ডেন্সের এই ১১১/৩এর অভিশপ্ত নির্জন বাড়িতে।
সেদিন বাইরে কালবৈশাখীর ঝড় আর অবিশ্রান্ত নিদারুণ বৃষ্টি হচ্ছিল। আকাশ চিরে নামা বিদ্যুতের আলোয় ঘরটা বারবার কেঁপে উঠছিল।
তৃষা তার ভিজে চুল পিঠের ওপর ফেলে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ওর পরনের হালকা নীল রঙের কুর্তিটা বৃষ্টিতে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে ছিল। বিরক্ত এবং কিছুটা আতঙ্কিত গলায় ও বলেছিল, “এভাবে মাঝরাতে এই ভুতুড়ে বাড়িতে আমাকে কেন ডেকেছিস রায়ান? আমার খুব ভয় করছে।”
রায়ানের বুকের ভেতর তখন হাজারখানেক চিতার আগুন একসাথে জ্বলছিল। সে ধীর পায়ে তৃষার দিকে এগিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলেছিল, “তুই আমাকে ছেড়ে অন্য কারও বিছানায় চলে যাবি তৃষা? আমি এটা হতে দিতে পারবোনা।”
তৃষা ক্লান্ত আর বিরক্ত গলায় রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “রায়ান, তুই পাগল হয়ে গেছিস? তুই আমার খুব কাছের বন্ধু, ভাই-এর মতো। কিন্তু সেটা কোনোদিন প্রেম ছিল না! তুই নিজেকে আয়নায় দেখ, কীরকম পশুর মতো আচরণ করছিস! সব সম্পর্ককে নিজের নোংরা অধিকারবোধ দিয়ে মাপিস না।”
'বন্ধু', 'প্রেম না'—এই শব্দগুলো রায়ানের মগজের ভেতর তপ্ত সীসার মতো ঢুকে গিয়েছিল। ওর ভেতরের আদিম জন্তুটা এক ঝটকায় সম্পূর্ণ খাঁচা ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছিল।
তারপরের কয়েকটা মিনিট ঠিক কী ঘটেছিল, রায়ানের স্মৃতিতে তার কোনো স্পষ্ট ধারাবাহিকতা নেই। একটা তীব্র আক্রোশ, কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দ, আর তৃষার দুটো চোখের সেই সীমাহীন, জ্যান্ত মৃত্যুর আতঙ্ক—ব্যস। রায়ানের শুধু মনে আছে, সে একহাতে তৃষার মুখ চেপে ধরে অন্যহাতে টেবিলের ওপর থাকা ভারী কাঁচের পেপারওয়েটটা দিয়ে ওর মাথায় অবিরাম আঘাত করে যাচ্ছিল। যতক্ষণ না খুলি ভাঙার মড়মড় শব্দ হয়েছিল, ততক্ষণ সে থামেনি।
যখন রায়ানের ঘোর কেটেছিল, তখন ঘর পুরো নিস্তব্ধ। তৃষা মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে ছিল।
ওর মাথার ডানপাশটা সম্পূর্ণ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে মগজ আর কালচে রক্ত মেঝেতে লেপ্টে গিয়েছিল l
বিদ্যুৎ চমকানোর আলোয় রায়ান দেখেছিল, তৃষার একটা চোখ কোটর থেকে প্রায় বেরিয়ে এসেছে, আর অন্য আধখোলা চোখটা স্থির হয়ে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে আছে। রায়ান সেই ঘরের নিস্তব্ধতায় বহুক্ষণ ওর রক্তাক্ত লাশের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ছিল। তার বারবার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি তৃষা চেনা গলায় ধমক দিয়ে উঠে বসবে, বলবে—“কী জঘন্য রসিকতা করছিস রায়ান!”
কিন্তু মাংসের দলা হয়ে যাওয়া তৃষা আর ওঠেনি। সেই অভিশপ্ত রাতেই রায়ানের চেনা পৃথিবীটা চিরতরে একটা নরকের গহ্বরে তলিয়ে গিয়েছিল।
প্রথম দুদিন রায়ান একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। সে পুলিশের ভয়ে লাশটাকে খাটের তলার পুরনো কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরী সিন্দুকে ভরে তার নিচে নুন আর কেমিক্যাল দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল। সে সারাটা দিন ঘরের কোণে গুটিসুটি মেরে বসে থাকত।
কখনো তৃষার ফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকত, যা সে বন্ধ করে লুকিয়ে রেখেছিল। কখনো সেই রক্তভেজা ফাঁকা মেঝেটার দিকে তাকিয়ে নিজের নখ দিয়েই নিজের চামড়া খামচাঁত । তার অবচেতন মন তখনও তীব্রভাবে বিশ্বাস করতে চাইছিল যে এই পুরো ঘটনাটাই আসলে একটা কুৎসিত, দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন। একটু পরেই সকাল হবে, আর সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু তৃতীয় দিন থেকে সেই বিভৎস গন্ধটা শুরু হলো।
প্রথমে গন্ধটা ছিল খুব হালকা—একটা পচা মিষ্টি গন্ধ। কিন্তু যত সময় যেতে লাগল, গন্ধটা তত তীব্র, ঘন আর অসহ্য হয়ে উঠতে লাগল। এটা কোনো সাধারণ লাশের গন্ধ ছিল না, এটা ছিল যেন মানুষের পচা মাংসের সাথে কোনো আদিম শয়তানের নিশ্বাসের মিশ্রণ। রায়ান পাগলের মতো বাজার থেকে ডজন ডজন ধূপকাঠি কিনে এনে জ্বালিয়ে দিল। দামি রুম ফ্রেশনার স্প্রে করল বোতলের পর বোতল। ঘরের প্রতিটা জানলা-কপাট শক্ত করে বন্ধ করে রাখল। কিন্তু গন্ধটা কমল না। উল্টো মনে হতে লাগল, গন্ধটা তরল হয়ে ঘরের দেওয়ালের লোনাধরা আস্তরণের ভেতর ঢুকে গেছে এবং সেখান থেকে চুইয়ে চুইয়ে আবার ঘরে ফিরে আসছে। সেই গন্ধে রায়ানের পাকস্থলী উল্টে বমি চলে আসত, কিন্তু সে ঘর ছেড়ে বেরোতে পারত না।
ঠিক তারপর থেকেই রাতের শব্দগুলো নিজের রূপ বদলাতে শুরু করল।
মাঝরাত পার হলেই ঘরের কোণে রাখা পুরনো কাঠের ড্রেসিং টেবিলের দিক থেকে একটা অদ্ভুত খসখস শব্দ আসত। ঠিক যেমন কোনো ধারালো নখ দিয়ে কেউ কাঠের ওপর অনবরত আঁচড় কাটছে। অথবা কেউ যেন শুকনো, জট পড়া চুল আঁচড়াচ্ছে।
প্রথম রাতে রায়ান নিজের কান চেপে ধরে বিছানায় পড়ে ছিল, ভেবেছিল এটা ওর মনের ভুল, তীব্র অপরাধবোধের ইলিউশন।
কিন্তু দ্বিতীয় রাতে শব্দটা আরও অনেক বেশি স্পষ্ট আর কাছে চলে এল। এবার খসখস শব্দের সাথে একটা অদ্ভুত ভেজা ফিসফিসানি যোগ হলো।
তৃতীয় রাতে রায়ান আর নিজের চোখ বন্ধ রাখতে পারল না। টেবিল ল্যাম্পের আবছা আলোয় সে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো আয়নার ভেতরের অন্ধকারের মধ্যে যেন একটা কুঁকড়ে যাওয়া, অস্পষ্ট কালো অবয়ব বসে রয়েছে । অবয়বটার চুলগুলো সামনের দিকে ঝুলে মুখটাকে সম্পূর্ণ ঢেকে রেখেছিল।
রায়ানের বুকের ভেতরের রক্ত যেন মুহূর্তের মধ্যে জমে বরফ হয়ে গেল। সে খাটের ওপর কাঠের মতো শক্ত হয়ে শুয়ে রইল, তার পুরো শরীর এমনই অবশ হয়ে গিয়েছিল যে আঙুল নাড়ানোর মতো ক্ষমতাও তার ছিল না। এক অদৃশ্য, হিমশীতল ভারি চাপ যেন তার বুকের ওপর চেপে বসেছিল।
আয়নার ভেতরের সেই অবয়বটা এবার খুব ধীরে ধীরে, হাড় মড়মড় করার শব্দ করে নিজের মাথাটা ঘোরাল। চুলগুলোর ফাঁক দিয়ে কোনো চামড়া বা মাংসের মুখ দেখা যাচ্ছিল না। সেখানে ছিল কেবল দুটো জ্বলন্ত, শূন্য চোখের কোটর, যা থেকে অবিরাম রক্ত আর পুঁজ গড়িয়ে পড়ছে।
ঠিক তখনই মেঝের ওপর একটা ভারী, ভেজা তরল কিছু পড়ার শব্দ হলো।
টুপ্ …
টুপ্ …
রায়ান চোখের মণি নিচের দিকে নামিয়ে দেখল, খাটের তলার তক্তার সিন্দুকের ফাঁক গলে ওপরের দিকে চুইয়ে উঠছে কালচে,আঁশটে গন্ধ যুক্ত এক তরল। মানুষের পচা চর্বি আর রক্তের সেই মিশ্রণ রায়ানের বিছানার পায়া বেয়ে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করেছে। সে সেদিন রাতে প্রথম হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডায় উপলব্ধি করেছিল যে —মানুষের অপরাধবোধ যখন রক্তমাংসের শরীর পায়, তখন সে বাস্তবের যেকোনো পিশাচের চেয়েও কোটি গুণ বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
দিনের বেলা সে নিজেকে জোর করে স্বাভাবিক রাখার অভিনয় করত। পাড়ার মোড়ে গিয়ে বাজার করত, ছাঁকাওঠা চা খেত, মুখে একটা কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলত, অনবরত মোবাইলের স্ক্রিন স্ক্রল করত। কিন্তু যেই মুহূর্তে সূর্য ডুবত, অমনি লেক গার্ডেন্সের সেই ঘরটা যেন এক জীবন্ত কসাইখানায় পরিণত হতো।
ঘুমের ঘোরে সে স্পষ্ট শুনতে পেত, মেঝের ওপর দিয়ে কেউ নিজের শরীরটাকে টেনে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।
টুপ… টুপ… টুপ…
যেন ভেজা, চামড়া উঠে যাওয়া দুটো পা মেঝের রক্তে ডুবিয়ে কেউ রায়ানের খাটের চারপাশে বৃত্তাকারে হাঁটছে।
এক রাতে সে অনুভব করল, তার গায়ের ওপর ঢাকা দেওয়া চাদরটা কেউ পায়ের দিক থেকে খুব ধীরে ধীরে নিচের দিকে টেনে নামাচ্ছে। রায়ান চোখ খুলে দেখল, তার বিছানার ঠিক পাশে অন্ধকারের মধ্যে কেউ একজন ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখটা রায়ানের মুখ থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে। সারা ঘর জুড়ে কেবল তৃষার সেই শেষ রাতের ভিজে চুলের তীব্র আঁশটে গন্ধ।
তারপর, সেই চেনা তৃষার গলাটাই কেমন একটা ভাঙা, কুয়োর গভীর থেকে আসা বিকৃত ফিসফিসানিতে রূপান্তরিত হয়ে ঘরের থমথমে বাতাস কাঁপিয়ে দিল:
“তুই তো চেয়েছিলি রায়ান… আমি যেন তোকে ছেড়ে কোনোদিন না যাই… আমি তো যাইনি…”
রায়ানের বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা যেন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল। সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার মুখ থেকে কেবল একটু ফেনা আর লালা বেরিয়ে এল।
“এখন আমাকে দেখে তোর এত ভয় কেন রায়ান? আমাকে ছুঁয়ে দেখ…”
ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা এক ধাক্কায় মাইনাস ডিগ্রিতে নেমে গেছে । রায়ানের মুখ দিয়ে বেরোনো নিঃশ্বাস ঘন ধোঁয়ার মতো বাতাসে জমতে লাগল। আর তখনই জানলার কাঁচ ভেদ করে চাঁদের একফালি আলো এসে পড়ল সেই অবয়বটার ওপর। রায়ান দেখল, তৃষার সেই চূর্ণ হয়ে যাওয়া মাথা থেকে মগজের অংশগুলো তখন জীবন্ত পোকার মতো নড়াচড়া করছে, আর ওর একটা চোখ নিজের কোটর থেকে ঝুলে রায়ানের গালে এসে ঠেকছে।
রায়ানের মগজের ভেতর তখন একটার পর একটা স্মৃতি চাবুকের মতো আছাড় খেতে লাগল। তৃষার সেই পবিত্র হাসি, ওর রাগ, ওর কান্না—সবকিছু যেন এক একটা ধারালো ব্লেড হয়ে রায়ানের আত্মাকে কুচি কুচি করে কাটতে লাগল। আর এক বিভৎস, নরকীয় সত্য ধীরে ধীরে ওর মগজে ঢুকে ওকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দিল।
সে তৃষাকে কোনোদিন ভালোবাসেনি। সে কেবল একটা অসুরের মতো তৃষার শরীর আর অস্তিত্বকে নিজের দাস বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল। এই কামনার বিকৃতি আর ভালোবাসার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত, সেটা সে আজ নিজের চূর্ণ হওয়া বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছিল।
সেই রাতের পর থেকে রায়ান আর কোনো জীবন্ত মানুষ ছিল না। সে এক জীবন্ত লাশে পরিণত হয়েছিল। তার ঘরটা এখন আর কোনো থাকার জায়গা ছিল না, সেটা হয়ে উঠেছিল একটা বিকৃত, অন্ধকার পৈশাচিক জাদুঘর। তৃষার মাথা থেকে উপড়ানো সেই চুল, ওর রক্তমাখা ছেঁড়া ওড়না, ওর ভাঙা দাঁতগুলো—সব সে টেবিলের ওপর পরম যত্নে সাজিয়ে রাখত।
সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাওয়া-দাওয়া ভুলে সেই মৃত ধ্বংসাবশেষগুলোর দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বসে থাকত। ওর মনে হতো, এই জড় বস্তুগুলো এখনই তৃষার গলায় চিৎকার করে উঠবে।
কিন্তু বস্তুগুলো কথা বলত না। কথা বলত ঘরের ভেতরের সেই আদিম, জমাট বাঁধা হিংস্র অন্ধকার।
আরেক রাতের কথা। ঘুম ভেঙে রায়ান দেখল, ঘরের ভারী কাঠের দরজাটা মাঝখান থেকে আধখোলা হয়ে আছে। অথচ সে নিজের হাতে তিন তিনটে তালা বন্ধ করে শুয়েছিল। বাইরে করিডরে একটা অত্যন্ত নোংরা, হলদেটে আলো কাঁপছিল।
কোনো এক অদৃশ্য আকর্ষণে রায়ান বিছানা থেকে নেমে অবশ পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তার মনে হচ্ছিল, করিডরের ঠিক শেষ মাথায়, যেখানে ছাদের ছায়া এসে মেঝেতে মিশেছে, সেখানে কেউ একজন দেয়ালের সাথে উল্টো হয়ে ঝুলে আছে।
রায়ান দেওয়াল ধরে ধরে এগোতে লাগল। দেয়ালের লোনাধরা ভেজা ছোপগুলো থেকে তখন টপ টপ করে কালো রক্ত পুঁজের মতো চুইয়ে মেঝেতে পড়ছে। চারিদিকের নিস্তব্ধতা এতটাই তীব্র ছিল যে রায়ানের নিজের কানের ভেতরের পর্দাগুলো যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যেতে চাচ্ছিল।
হঠাৎ করেই, সেই নিস্তব্ধতা চিরে একটা বিকট শব্দ হলো। খুব চেনা একটা মেয়ের গলা, কিন্তু সেটা অতিমানবীয় গতিতে খিলখিল করে হাসতে শুরু করল।
খিলখিল… খিলখিল… খিলখিল…
সেই হাসির শব্দটা করিডরের দেওয়ালে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হতে হতে রায়ানের কানের ভেতর যেন হাজারটা সুঁচ ফুটিয়ে দিল। শব্দটা কোনো একটা দিক থেকে আসছিল না, মনে হচ্ছিল সেটা রায়ানের নিজের মাথার খুলির ভেতর থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
রায়ান আতঙ্কে পাগলের মতো চিৎকার করে নিজের ঘরের দিকে দৌড়ে এল। দরজাটা বন্ধ করে পিঠ দিয়ে চেপে ধরে সে জানোয়ারের মতো হাঁপাতে লাগল। তার বুকের ভেতরের হাড়গুলো তখনও কাঁপছিল। সে বুঝতে পেরেছিল—সে এই বাড়িতে আর একা নেই। তৃষার আত্মা ওর খাটের নিচ থেকে উঠে এসে ওর ঘরের প্রতিটা অণুতে মিশে গেছে।
পরদিন সকালে সে যখন বাথরুমে গিয়ে আয়নায় নিজের মুখ দেখল, সে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিজেই ভয়ে ছিটকে পেছনে দেওয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল।
তার গায়ের চামড়া কোনো জীবিত মানুষের মতো ছিল না। সেটা হয়ে গিয়েছিল মড়া ব্যাঙের পেটের মতো ফ্যাকাশে আর হলদেটে। চোখের নিচের চামড়া পচে গিয়ে কালচে বেগুনি গর্ত তৈরি হয়েছিল। ঠোঁট দুটো পুরোপুরি কালো হয়ে ফেটে চৌচির। মনে হচ্ছিল, বহু মাস আগে মারা যাওয়া কোনো লাশকে জোর করে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে।
সে দুই হাতে পাগলের মতো মুখে জলের ঝাপটা দিতে লাগল। কিন্তু আয়নার ভেতরের প্রতিবিম্বটা তো বদলালোই না, উল্টে আয়নার ভেতরের রায়ানের মুখটা আসল রায়ানের নড়াচড়ার সাথেও মিলল না। আসল রায়ান যখন স্থির দাঁড়িয়ে, আয়নার ভেতরের রায়ান তখন নিজের কুৎসিত পচা দাঁতগুলো বের করে বিকটভাবে হাসছিল।
সেই প্রতিবিম্বের চোখ দুটো ছিল সম্পূর্ণ রক্তবর্ণ, আর সেখান থেকে ছোট ছোট সাদা পোকা বেরোচ্ছিল।
রায়ান বুঝতে পারল, তৃষার সেই মৃত, পিশাচ রূপটা শুধু ঘরের বাইরে নয়, সেটা ধীরে ধীরে রায়ানের নিজের শরীরের ভেতর ঢুকেও ওর রক্ত, মাংস আর আত্মাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। সে নিজের শরীরের ভেতর থেকেই উধাও হয়ে যাচ্ছে।
পরের কয়েকটা দিনে রায়ানের মানসিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেল। সে পুরোপুরি এক উন্মাদ পশুর পর্যায়ে চলে গেল। সে যদি এক মিনিটের জন্য ঘরের বাইরে পা রাখত, তার মনে হতো রাস্তার প্রতিটা জ্যান্ত এবং জড় বস্তু ওর দিকে ঘুরে তাকিয়ে আছে।
চায়ের দোকানের সেই নোংরা লোকটা, বাসস্ট্যান্ডের ওই অচেনা মহিলা, ডাস্টবিনের পাশে বসে থাকা কুষ্ঠরোগী ভিখিরিটা —সবার চোখগুলো যেন মানুষের চোখ ছিল না। সেগুলো ছিল তৃষার সেই কোটর থেকে বেরিয়ে আসা স্থির চোখ। আর সবার মুখ থেকে একসাথে একটা সম্মিলিত পচা ফিসফিসানি ভেসে আসত—
“তৃষা কোথায়? তৃষার মাংস তুই কোথায় লুকিয়েছিস রায়ান?”
পুলিশ এর মধ্যে দুবার এসে রায়ানের বাড়িতে জেরা করে গেছে। তৃষার বাবা-মাও থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেছিলেন। রায়ানের সামনে যখন ওর মা-বাবা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, রায়ান তখনও নিজের ভেতরের পৈশাচিক সত্তাটাকে লুকিয়ে অত্যন্ত শান্ত, ঠাণ্ডা গলায় বলেছিল, “তৃষা বোধহয় অন্য কোনো ছেলের সাথে পালিয়ে গেছে। ও তো এমনই ছিল।”
সেই চরম নোংরা মিথ্যেটা বলার সময় রায়ানের প্যান্টের ভেতর নিজের হাত দুটো নিজের উরুর চামড়া নখ দিয়ে ছিঁড়ে রক্ত বের করে দিচ্ছিল।
তার শাস্তি সেই রাতেই আরও হাজার গুণ বিভৎস হয়ে নেমে এল।
মাঝরাতে ঘর জুড়ে আবার সেই হাড় মড়মড় করার বিকট শব্দ শুরু হলো।
খট… খট… খট…
যেন কেউ নিজের পায়ের ভাঙা হাড়গুলো মেঝের ওপর সজোরে ঠুকে ঠুকে এগিয়ে আসছে।
রায়ান খাটের ওপর উঠে বসল। ঘরের কোণের সেই জমাট অন্ধকার চিরে ধীরে ধীরে একটা অবয়ব রায়ানের খাটের দিকেই এগিয়ে আসতে লাগল।
তৃষা।
কিন্তু এবার ওর রূপটা কোনো দুঃস্বপ্নের চেয়েও কোটি গুণ বেশি নোংরা আর বিভৎস ছিল। ওর মাথার ডানদিকের খুলিটা সম্পূর্ণ হা হয়ে খোলা, সেখান থেকে পচা মগজের অংশগুলো মেঝের ওপর টপ টপ করে খসে পড়ছে। ওর সারা শরীরের চামড়া যেন কোনো ধারালো ছুরি দিয়ে ফালা ফালা করে কাটা, আর সেই কাটা অংশগুলো থেকে জ্যান্ত পোকারা কিলবিল করে বেরিয়ে আসছে। ওর ডান হাতটা কনুইয়ের কাছ থেকে উল্টো দিকে ভেঙে ঝুলছিল।
রায়ান চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু ওর ভোকাল কর্ডে যেন কেউ গরম সীসা গলিয়ে ঢেলে দিয়েছিল। ওর মুখ দিয়ে কেবল একটা ঘড়ঘড়ে পশুর মতো আওয়াজই বেরোল।
তৃষা ধীর পায়ে রায়ানের বিছানার ওপর উঠে এল। ওর ভাঙা, চামড়া ওঠা ভেজা পা দুটো রায়ানের বুকের ওপর চেপে বসল। সেই তীব্র ওজনে রায়ানের পাঁজরের হাড়গুলো মড়মড় করে উঠল। তৃষা নিজের সেই পচা, পোকা কিলবিল করা মুখটা রায়ানের চোখের সামনে এনে অত্যন্ত ঠাণ্ডা, হিমশীতল গলায় বলল:
“তুই আমাকে কোনোদিন মানুষই মনে করিসনি রে রায়ান… তুই আমাকে নিজের একটা সস্তা খেলনা ভেবেছিলি…”
রায়ানের চোখ দিয়ে তখন রক্তের অশ্রু ঝরছিল।
“তুই চেয়েছিলি আমি তোকে ভালোবেসে তোর পায়ের নিচে কুকুরের মতো পড়ে থাকি। তোর সেই নোংরা অহংকারই আজ আমি এই মেঝের রক্ত দিয়ে ধুয়ে দেব।”
তৃষার মুখের ভেতর থেকে এক তীব্র বিষাক্ত কালো গ্যাস রায়ানের মুখের ভেতর ঢুকতে শুরু করল। রায়ান চোখ বন্ধ করার চেষ্টা করল, কিন্তু ওর চোখের পাতা দুটো যেন কোনো অদৃশ্য সুঁচ দিয়ে ওপরের দিকে সেলাই করে আটকে দেওয়া হয়েছিল।
“যে সম্পর্কের ভেতর কোনো সম্মান থাকে না রায়ান… সেটা এভাবেই পচে যায়… আর তার সাথে সাথে তুইও পচে যাবি।”
হঠাৎ করেই ঘরের চারদিকের চারটে বড় জানলা কোনো হাত ছাড়াই একসাথে এক বিকট বজ্রপাতের শব্দে দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল। ঘরের ভেতরের সমস্ত বাতাস মুহূর্তের মধ্যে কর্পূরের মতো উবে গেল। চারদিকের দেওয়ালে জমে থাকা সেই পুরনো লোনাধরা চুনগুলো তীব্র গতিতে খসে পড়তে লাগল, আর সেই খসে যাওয়া ইটের ওপর কালো রক্ত দিয়ে নিজে থেকেই কিছু লেখা ফুটে উঠতে লাগল:
“তুই কি ভেবেছিস তুই বেঁচে যাবি?”
লেখাটা চোখের পলকে নিজের রূপ বদলে আবার ফুটে উঠল:
“তোর নিজের ভেতরের এই নরক থেকে তুই পালাবি কোথায় রায়ান?”
রায়ান বিছানার ওপর নিজের মাথাটা নিয়ে পাগলের মতো ছটফট করতে লাগল। সে বুঝতে পারছিল, এই লেক গার্ডেন্সের বাড়িটা আর কোনো সাধারণ ইট-পাথরের খাঁচা নেই।
এটা হয়ে উঠেছে ওর নিজের করা পাপ, আক্রোশ আর বিকৃতির এক জীবন্ত, রক্তচোষা শরীর। প্রতিটা দেওয়াল যেন ওর দিকে তাকিয়ে অট্টহাসি হাসছে।
সে সিদ্ধান্ত নিল, তাকে আজ রাতেই এই শহর, এই দেশ ছেড়ে পালাতে হবে।
পরদিন বিকেলে সে কোনোমতে কাঁপতে কাঁপতে আলমারি থেকে একটা বড় ট্রাভেল ব্যাগ বের করল। জামাকাপড়গুলো এলোমেলোভাবে ব্যাগের ভেতর ঠুসে ভরতে লাগল। কিছু টাকা আর পাসপোর্টটা যখন সে হাতে নিল, ঠিক তখনই ওর বাঁ কানের একেবারে লতির পাশে একটা বরফ-ঠাণ্ডা নিশ্বাস এসে ঠেকল।
একটা অতি পরিচিত, খিলখিল করা ফিসফিসানি ভেসে এল:
“এত সহজে আমার হাত থেকে রেহাই পাবি ভেবেছিস রায়ান?”
রায়ানের হাত থেকে পাসপোর্ট আর ব্যাগটা মেঝের রক্তের ওপর ছিটকে পড়ে গেল। সে অত্যন্ত ধীর গতিতে, রোবটের মতো নিজের ঘাড়টা পেছনের দিকে ঘোরাল।
ঘরে কেউ ছিল না। কিন্তু ড্রেসিং টেবিলের সেই বিশাল আয়নাটার ভেতরে তৃষা দাঁড়িয়ে ছিল, আর ওর দুই হাতের নখ দিয়ে ও আয়নার কাঁচের ওপর নিজের বুকটা চিড়ছিল।
সেদিন অমাবস্যার রাতে রায়ানের ভেতরের মনুষ্যত্বের শেষ কণাটুকুও এক বীভৎস তাণ্ডবে ধ্বংস হয়ে গেল।
ঘরের সব আলো চিরতরে নিভে গিয়েছিল। কোনো মোমবাতি বা দেশলাই জ্বলছিল না। শুধু ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটার ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত, গাঢ় লালচে আগুনের আভা বেরোচ্ছিল—ঠিক যেমনটা কোনো শ্মশানের চিতা জ্বললে তার আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
রায়ান এক অদৃশ্য পৈশাচিক শক্তিতে টানতে টানতে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
সে আয়নার কাঁচের দিকে তাকিয়ে যা দেখল, তাতে ওর মগজের প্রতিটা কোষ একসাথে যন্ত্রণায় ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো।
সে দেখল, আয়নার ভেতরের জগতটা আর কোনো প্রতিবিম্ব নয়। সেটা একটা বিশাল, অন্ধকার লোহার কয়েদখানা। আর সেই কয়েদখানার মাঝখানে একটা মরচে ধরা লোহার চেয়ারে রায়ান নিজে বসে আছে। আয়নার ভেতরের রায়ানের হাত-পা মোটা কাঁটাতার দিয়ে চেয়ারের সাথে শক্ত করে বাঁধা, আর সেই কাঁটাতারের সুঁচগুলো ওর মাংস ফুঁড়ে হাড়ের ভেতর ঢুকে গেছে। ওর সারা মুখ জুড়ে এক অবর্ণনীয়, পশুর মতো আতঙ্ক।
আর সেই চেয়ারের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে ছিল তৃষা।
কিন্তু এবার তৃষার শরীরটা অক্ষত ছিল। ওর মাথায় কোনো ক্ষত ছিল না, শরীর থেকে কোনো পোকা বেরোচ্ছিল না। ও ঠিক তেমনটাই সুন্দর আর পবিত্র দেখাচ্ছিল, যেমনটা ও বেঁচে থাকার সময় ছিল। ওর পরনে ছিল একটা সাদা শাড়ি, কিন্তু ওর চোখ দুটো ছিল সম্পূর্ণ শূন্য, কুচকুচে কালো।
তৃষা ধীর পায়ে আয়নার ভেতরের রায়ানের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, “তুই পৃথিবীর সবার সামনে মিথ্যে বলেছিস রায়ান। তুই পুলিশকে মিথ্যে বলেছিস, আমার মা-বাবাকেও মিথ্যে বলেছিস। কিন্তু নিজের আত্মার সামনে তুই কীভাবে মিথ্যে বলবি?”
আসল রায়ান বাইরে থেকে কাঁচের ওপর দুই হাত পিটিয়ে চিৎকার করে উঠল, “আমি তোকে ভালোবাসতাম তৃষা! আমি তোকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসতাম! তাই তোকে অন্য কারও হতে দিতে পারিনি!”
“না!”
তৃষা কেবল একটা শব্দ উচ্চারণ করল। কিন্তু সেই শব্দের তীব্রতা এতটাই ভয়ানক ছিল যে ড্রেসিং টেবিলের কাঁচটা মাঝখান থেকে চড়চড় করে ফেটে গেল। সেই ফাটল দিয়ে কালো রক্ত চুইয়ে বাইরে রায়ানের গায়ের ওপর পড়তে লাগল।
“ভালোবাসার নামে তুই নিজের ভেতরের একটা হিংস্র পশুকেই পুষে রেখেছিলি রায়ান। ভালোবাসলে মানুষকে এভাবে পশুর মতো পিটিয়ে মারতে হয় না। তার ইচ্ছাকে, তার 'না' বলাকে এভাবে পায়ে পিষে দিতে হয় না। তুই আমাকে কোনোদিনই ভালোবাসিসনি, তুই কেবল আমার শরীরটাকে নিজের একটা মৃত সম্পত্তি বানাতে চেয়েছিলি।”
ঠিক তখনই, আয়নার ভেতরের সেই বাঁধা থাকা রায়ানটা এক তীব্র, অলৌকিক যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। তার পুরো শরীরটা চেয়ারের সাথেই ধনুকের মতো বেঁকে গেল। সে নিজের হাতের নখগুলো দিয়ে নিজের মুখের চামড়া, গাল আর চোখ পাগলের মতো আঁচড়াতে শুরু করল। নখের টানে ওর গালের মাংস ফালি ফালি হয়ে ছিঁড়ে মেঝের ওপর পড়তে লাগল। রক্ত আর মাংসের কুচি ছিটকে এসে আয়নার কাঁচের ভেতরের দেয়ালে লেপ্টে যাচ্ছিল।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আসল রায়ান নিজের চোখ দুটো বন্ধ করার জন্য হাত তুলতে চাইল, কিন্তু ওর হাত দুটো ততক্ষণে অবশ হয়ে নিজের শরীরের পাশে ঝুলে গেছে। ও চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছিল না। ও নিজের জীবন্ত চোখের সামনে নিজেরই এক চরম, কুৎসিত আত্মহনন দেখতে বাধ্য হচ্ছিল।
তৃষা এবার সোজা ঘুরে আয়নার কাঁচের ওপার থেকে আসল রায়ানের চোখের দিকে তাকাল। ওর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক শয়তানি হাসি।
“তুই ভেবেছিলি তুই একাই কষ্ট পেয়েছিস রায়ান? এবার দেখ, তোর এই পাপের বিচার কারা করবে।”
হঠাৎ করেই ড্রেসিং টেবিলের সেই ভাঙা আয়নার কাঁচের প্রতিটা ফাটলের ভেতর থেকে কোটি কোটি ছোট ছোট মানুষের চোখ গজিয়ে উঠল। সেই চোখগুলো কোনো সাধারণ চোখ ছিল না, সেগুলো ছিল মৃত, পচে যাওয়া মানুষের চোখ। সবগুলো চোখ একসাথে অতি দ্রুত নড়াচড়া করতে করতে রায়ানের দিকে স্থির হয়ে গেল।
সেই চোখগুলোর দৃষ্টিতে কোনো দয়া ছিল না, কোনো ক্ষমা ছিল না। সেগুলো ছিল এক অনন্ত নরকের বিচারকের দৃষ্টি।
রায়ান আর সহ্য করতে পারল না। সে নিজের মাথাটা নিয়ে ড্রেসিং টেবিলের কাঠের ওপর সজোরে আঘাত করতে লাগল। মড়মড় করে ওর কপাল ফেটে গিয়ে রক্ত ড্রেসিং টেবিলের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সেই শারীরিক যন্ত্রণার তীব্রতা ওর ভেতরের আত্মার যন্ত্রণার কাছে কিছুই ছিল না। সে নিজের চোখের সামনে নিজের ভেতরের কুৎসিত পচনটাকে জীবন্ত অবস্থায় দেখতে পাচ্ছিল।
ভোর হওয়ার ঠিক আগের সময়টুকু এই পৃথিবীতে সবচেয়ে অদ্ভুত আর ভয়ঙ্কর হয়। যখন রাতের অন্ধকার পুরোপুরি কাটে না, আবার সকালের আলোও ফোটে না। চারিদিক একটা ধূসর, কুয়াশাচ্ছন্ন কুৎসিত রূপ নেয়।
সেই ধূসর সময়ে রায়ান মেঝের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। ওর কপাল থেকে রক্ত জমাট বেঁধে ওর পুরো মুখটাকে ঢেকে ফেলেছিল। ওর পরনের শার্টটা ঘাম, রক্ত আর মেঝের নোংরা চর্বিতে ভিজে লেপ্টে ছিল।
হঠাৎ করেই, সে নিজের বুকের ভেতরের পাঁজরের হাড়গুলোর মধ্যে এক তীব্র, জ্বলন্ত যন্ত্রণা অনুভব করল। মনে হলো, কোনো এক অদৃশ্য, জং ধরা মোটা সুঁচ আর কালো সুতো দিয়ে ওর ফুসফুস আর হৃদপিণ্ডটাকে কেউ একসাথে টেনে টেনে বাঁধছে।
সে এক তীব্র আতঙ্কে নিজের পরনের শার্টটা দুই হাতে টেনে ছিঁড়ে ফেলল।
নিজের বুকের দিকে তাকিয়ে রায়ানের কণ্ঠনালী দিয়ে এক আদিম পশুর আর্তনাদ বেরিয়ে এল। সে দেখল, ওর বুকের ফ্যাকাশে চামড়ার নিচে ছোট ছোট কালো কেঁচোর মতো অসংখ্য মোটা সুতো নিজে থেকেই নড়াচড়া করছে। চামড়া ফুঁড়ে সেই সুতোগুলো বাইরে বেরিয়ে আসছে, আর আবার মাংসের ভেতর ঢুকে গিয়ে ওর পুরো বুকটাকে একটা কুৎসিত বস্তার মতো সেলাই করে দিচ্ছে।
খস… খস… খস…
প্রতিটা সেলাইয়ের সাথে সাথে রায়ান অনুভব করছিল, ওর মগজের ভেতরের চেনা স্মৃতিগুলো একে অপরের সাথে জট পাকিয়ে যাচ্ছে। ওর নিজের সত্তা, ওর নিজের নাম, ওর অতীত—সবকিছু যেন এক তীব্র কালচে তরলে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে। আর সেই ফাঁকা জায়গায় এসে বসছে কেবল তৃষার সেই শেষ রাতের বিভৎস চিৎকার, খুলি ভাঙার সেই মড়মড় শব্দ, আর খাটের তলায় পচতে থাকা লাশের সেই আঁশটে গন্ধ।
সবকিছু একসাথে মিশে ওর মাথার ভেতর একটা আদিম, অনন্ত নরকের চিৎকার তৈরি করছিল। সে বুঝতে পারছিল, সে আর নিজের এই শরীরের ভেতর একা নেই। সে যে তৃষার শরীরটাকে নিজের খাঁচায় বন্দি করতে চেয়েছিল, আজ তৃষার সেই পিশাচ রূপটাই রায়ানের নিজের রক্তমাংসের শরীরটাকে নিজের কয়েদখানা বানিয়ে নিয়েছে।
সে এক চরম অবশ আকর্ষণে শেষবারের মতো আয়নার দিকে তাকাল।
আয়নার ভেতরের প্রতিবিম্বটা আর রায়ানের ছিল না।
ওর মুখটার চামড়া যেন কোনো কসাইখানা থেকে আনা মরা পশুর চামড়া দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে সেলাই করা একটা মুখোশ। চোখের চারপাশের মাংস পচে গিয়ে ঝুলছে। আর সেই কুৎসিত, রক্তমাখা সেলাই করা ঠোঁটের কোণটা নিজে থেকেই দুপাশে চিরে গিয়ে এক পৈশাচিক, অতিমানবিক চওড়া হাসি হাসল।
সেই হাসিটা রায়ানের ছিল না। সেটা ছিল তৃষার সেই মৃত আত্মার চূড়ান্ত বিজয়ের হাসি।
কলকাতার সেই ভোরবেলাটা অন্যান্য সাধারণ সকালের মতোই ছিল, কিন্তু লেকগার্ডন্সের ওই ঘরের ভেতরের সময়টা যেন একটা অনন্ত, থমকে যাওয়া কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল।
রায়ানের অবশ শরীরটা এখন আর নিজের ইচ্ছায় নড়ছিল না। তার ডান হাতটা নিজে থেকেই ধীর গতিতে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের কোণে জমে থাকা সেই কালো রক্ত আর পুঁজের মিশ্রণের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে, আয়নার ভাঙা কাঁচের ওপর সে কিছু একটা লিখতে শুরু করল। কাঁচের ধারালো কোণগুলো রায়ানের আঙুলের চামড়া ফালি ফালি করে কেটে দিচ্ছিল, কিন্তু তার কোনো শারীরিক অনুভূতি ছিল না। সে শুধু দেখছিল, তার নিজের হাত দিয়েই কাঁচের ওপর ফুটে উঠছে কিছু হিজিবিজি বিকৃত নকশা—ঠিক যেন একটা মানুষের শরীরকে কাটার পর যেভাবে ময়নাতদন্তের টেবিলে সেলাই করা হয়, সেই সুতোর নকশা।
ঠিক তখনই রায়ানের কানের খুব কাছে একটা অদ্ভুত তরল খসখস শব্দ হলো। যেন মেঝের তলা থেকে তৃষার সেই সম্পূর্ণ পচে যাওয়া কঙ্কালটা কাঠের তক্তা ভেদ করে ওপরের দিকে উঠে আসছে।
রায়ান নিজের চোখের মণি দুটোকে পৈশাচিক যন্ত্রণায় ঘোরালো। সে দেখল, ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারগুলো নিজে থেকেই একে একে খুলে যাচ্ছে এবং সেখান থেকে বেরোচ্ছে ছোট ছোট অসংখ্য হাড়ের টুকরো। সেগুলো রায়ানের নিজেরই হাড় ছিল নাকি তৃষার, তা বোঝার উপায় ছিল না। কিন্তু প্রতিটা হাড়ের গায়ে কালো সুতো দিয়ে কারুকার্য করা ছিল।
ঘরের দেওয়ালের ফাটলগুলো এবার আরও চওড়া হতে শুরু করল। সেই ফাটলের ভেতর থেকে চুইয়ে বেরোতে লাগল এক ঘন, চটচটে হলুদ তরল, যা সারা ঘরে এক তীব্র শ্মশানের চিতার গন্ধ ছড়িয়ে দিল। রায়ান অনুভব করতে পারছিল, তার পায়ের তলা থেকে মেঝের সিমেন্টগুলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে কাদার মতো ধসে যাচ্ছে। সে যেন এক অন্তহীন, অন্ধকার পঙ্কিল গহ্বরের দিকে তলিয়ে যাচ্ছে, যেখানে কোনো আলো নেই, কোনো বাতাস নেই—আছে কেবল তৃষার সেই শূন্য, ক্ষমাহীন চোখের অবিরাম দৃষ্টি।
তার নিজের ফুসফুসটা যখন শেষবারের মতো একটা ভারী, ভেজা বাতাস টেনে নেওয়ার চেষ্টা করল, তখন ঘরের সবকটা জানলা একসঙ্গে তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল, যেন বাইরের জগৎটা এই অভিশপ্ত ঘরটাকে চিরতরে বর্জন করে দিল। রায়ানের সেলাই করা ঠোঁটের আড়াল থেকে শেষ একটা গোঙানির শব্দ বেরোল, যা কলকাতার ভোরের কোলাহলে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল।
বাইরে তখন কলকাতার বুকে ভোরের প্রথম লোকাল ট্রেনটা এক বিকট হুইসেল বাজিয়ে চলতে শুরু করেছে। পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানগুলোর লোহার শাটার চড়চড় শব্দে উঠছে। বড় রাস্তায় ডাস্টবিন পরিষ্কার করার গাড়ির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। ফুটপাথের কলতলায় জলের শব্দ হচ্ছে। মানুষ এক নতুন, সুন্দর দিনের আলোয় নিজেদের বাঁচার লড়াইয়ের জন্য তৈরি হচ্ছে।
এই অভিশপ্ত শহর আরেকটা পবিত্র সকালকে পরম আনন্দে স্বাগত জানাচ্ছে।
কিন্তু লেক গার্ডেন্সের সেই বন্ধ, স্যাঁতসেঁতে, আঁশটে গন্ধের নরককুণ্ডটার ভেতরে সেই রাতের অন্ধকার আর কোনোদিন শেষ হয়নি। কোনোদিন সকালের এক ফোঁটা আলোও সেই ঘরের ভেতরের জ্যান্ত লাশটার ওপর এসে পড়বে না। রায়ানের আত্মা এখন ওর নিজেরই সেলাই করা চামড়ার নরকে অনন্তকালের জন্য বন্দি।
------------------------------------------------
শাশ্বতী চট্টোপাধ্যায়
শ্রীরামপুর * হুগলী * ৭১২২০১
Comments
Post a Comment