কী টানই না ছিল ছোটবেলায় যাত্রা দেখার! আশেপাশে কোথাও যাত্রা হলে কে রোখে! ‘টিকিট সেল’ যাত্রা দেখা তো অনেক পরে, এমনিই চারিদিকে কত যাত্রা হত! নিজের পাড়া বা গ্রামের অন্যত্র থেকে পাশের গ্রাম ঘনশ্যামপুর, মাখালিয়া, মাইতির হাট, আতাসুরা, মগরাহাট…। কলকাতার বড় বড় দলের পালা যেমন কোথাও কোথাও দেখা যেত বিনা টিকিটে, অ্যামেচার দলে যাত্রা করতে করতে বড় দলে সুযোগ পাওয়া বা দলটাই বড় মাপের হয়ে যাওয়াও তো ছিলই। আমাদের পাশের পাড়া ডোঙাঘাটায় দ্বিজপদ নস্করের ব্যবস্থাপনায় তাঁর গৃহসংলগ্ন মাঠে সাধক রামপ্রসাদ পালায় রামপ্রসাদরূপী জলদকুমারের ‘… কালীনামে দাও রে বেড়া ফসলে তছরুপ হবে না…’ গাইতে গাইতে সেই বেড়া দেওয়া আর পিছন থেকে কন্যারূপে কালীর দড়ি যোগানো— ছোটবেলার সে স্মৃতি মুছবে কি কোনোদিন! সুজিত পাঠক তো বলতে গেলে আমাদের প্রতিবেশী গ্রামেরই— তসরলা— গ্রামের বাসিন্দা হয়ে গেলেন! তিনি আমাদের পাশের গ্রাম ঘনশ্যামপুরেও যাত্রা করেছেন।১ তাঁর পুত্র প্রশান্ত পাঠকও অভিনয় করেন। কন্যার বিয়ে দিয়েছেন আমাদের গ্রাম গোকর্ণীতেই, জামাতা রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তীদের পরিবারও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত।
আমি করেছিলাম কি, তিনভাগ-রাখা এক বড় নারকেলের মালার মধ্যে একটা ছোট মোমবাতি জ্বেলে তার সমনের দিকে স্বচ্ছ প্লাস্টিক ঢেকে পথ দেখে দেখে যাওয়া-আসার বন্দোবস্ত করে নিয়েছিলাম! যাতে হাওয়ায় নিভে না যায়। হাওয়া চলাচলের জন্যে একটি ফুটো রেখেছিলাম। সঙ্গে বাড়তি দু-এক টুকরো বাতি রেখে দিতাম আর একটা দেশলাই। তো সেসব যাত্রার অনেক স্মৃতি! দেখা যাত্রা তো ছিলই, মাইকে শুনে শুনে প্রায় মুখস্থ-হয়ে-যাওয়া যাত্রাও কম ছিল না। শেষোক্তর মধ্যে যেমন— নটী বিনোদিনী, মা মাটি মানুষ, অচল পয়সা, মীরার বঁধুয়া, ওগো বিষ্ণুপ্রিয়া…। প্রসঙ্গত, তখন মাইকে নাটকও হত। শরৎচন্দ্রের বিরাজ বৌ, শচীন শেনগুপ্তর সিরাজদ্দৌলা। চেড়ার তরোয়াল তৈরি করে আমরাও কম যুদ্ধ করেছি নাকি! বিভূতিভূষণের অপু তো আমরাই ছিলাম! একাধিক যাত্রায় বই বলেছি, অর্থাৎ প্রম্পট করেছি পরে। পরবর্তীকালে ছেলে ও মেয়েকে, বিশেষত মেয়েকে ঘুম পাড়াতে দিনের পর দিন গেয়েছি, “আয় ঘুম আয়/ আয় ঘুম আয় রে/আমার সোনামণির চোখে ঘুম আয় রে।। ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি ঘুম দিয়ে যা/চাঁদের কপালে চাঁদ টি দিয়ে যা।/হাসির নুপূর গড়িয়ে রে তোর পরিয়ে দেব পায়।।/ আয় ঘুম আয়…।” নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না, গান্ধারী জননী। যাক, সেসব কথা আর এখন নয়।
‘যাত্রা’র পিঠোপিঠি ‘ফাত্রা’ শব্দটার বেশ চল। ‘যাত্রা-টাত্রা’ যেমন, চলে ‘যাত্রা-ফাত্রা’ও। টাত্রা যুক্ত হয় খানিক অস্তর্থকে, ফাত্রা খানিক নঙর্থকে। “ছেলেটা একটু আধটু যাত্রা-টাত্রা করে আর কি।” “ও-সব যাত্রা-ফাত্রা আমার দ্বারা হবে না।” যে প্রবাদটিতে যাত্রার সঙ্গে ফাত্রা ওতপ্রোত, সচরাচর তার দুটি বয়ান প্রচলিত। ‘যাত্রা দেখে ফাত্রা লোকে’র সঙ্গে সঙ্গে ‘যাত্রা করে ফাত্রা লোকে’রও উল্লেখ পাচ্ছি। প্রবাদ যখন, তার বক্তব্যকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া মুশকিল। সমাজচিত্র, সমাজমানস, সমাজ-অভিজ্ঞতা ইত্যাদি থেকে উঠে-আসা সংক্ষিপ্ত উক্তি যদি অন্তত কিছুটা তথ্য ও সত্যের ধারক না হত তাহলে সেটা মানুষের মুখে মুখে দীর্ঘদিন বাঁচত না, প্রবাদ অভিধাও পেত না নিশ্চয়ই। কিন্তু এই দুটোর মধ্যে দেখতে হবে কোনটা প্রবাদ হিসাবে বেশি উপযুক্ত, অর্থাৎ কোনটাতে ঘটনা বা সত্য বেশি আধারিত। দেখতে হবে সমাজদর্পণে কোনটা বেশি প্রতিবিম্বিত— ঘটনা ও সত্যের দিক থেকে কোনটা বেশি বাস্তবসম্মত।
দু-একটি উচ্চারণ শুনে নিই। রানী চন্দের লেখায় পাই— “বড়ো মামীমার মুখে একটা ছড়া শুনি প্রায়ই; বলেন, ‘যাত্রা দেখে ফাত্রা লোকে, কবি শোনে খবিশ লোকে’। অর্থাৎ যাত্রা ফাজিল-ফক্কর লোকরাই দেখে রাত জেগে। আর ‘খবিশ’ বোধ হয় আরো নিকৃষ্ট কিছু হবে— কবিগান তারাই কেবল শোনে। যত কুৎসিত কথা, গালাগালি থাকে নাকি কবিগানে। ভদ্রলোকের স্থান নয় মোটে।” আরবি শব্দ খবিশ বা খবিসের অর্থ ভূত-পেত্নী অথবা ময়লা বা নোংরা। শ্রীমতী চন্দ যাঁর কথা বলতে গিয়ে উক্তিটির অবতারণা করলেন তিনি কিন্তু ‘দেখা’র লোক নন, ‘করা’র লোক। সুবাসী একটা চালাঘরে থাকতেন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে। তাঁর স্বামী কবিগানের দলের সঙ্গে গান গেয়ে গেয়ে বেড়ান, বাড়িতে আসেন কদাচিৎ। শ্রীমতী চন্দের মামিরা আক্ষেপ করেন, কী করে যে সংসার চলে সুবাসীর! কবিগানের লোক শুনে রানীর মনে দুঃখ হয়, ভয়ও পান। কখনও সে বাড়িতে এলে, তিনি ঘর থেকে বের হন না, বেড়ার ফাঁকে চোখ রেখে দেখেন। “মা দাওয়ায় বসে বসে লেস বোনেন, নয় ‘ছাঁচ’ কাটেন, সুবাসী বইনের স্বামী পাশের বেঞ্চিতে চুপচাপ বসে থাকেন। অত্যন্ত লাজুক নিরীহ প্রকৃতির মানুষ; মা’দের সঙ্গে কখনো সামনাসামনি মুখ তুলে কথা বলেন না।” লিখেছেন, “এই মানুষই কবিগানের আসরে একেবারে অন্য লোক।”২
যাত্রা-নাটকের গানের মান্য গবেষক দেবজিত্ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন, “যদিও প্রচলিত প্রবাদ ‘যাত্রা করে ফাত্রা লোকে’। কিন্তু আদতে তা নয়। যাত্রা-পথ সুগম হল ধর্মপ্রচারের অনুষঙ্গে। সে পথে শৈব, শাক্ত আর অন্যান্য ধর্মপন্থীদের তুলনায় বেশি সার্থকতা পেল চৈতন্য-অনুগামী বৈষ্ণববাদিরা।”৩
আরো দু-একটা দৃষ্টান্ত দেখে নিতে দোষ নেই। সুশীল কুমার দে-র সম্পাদিত বাংলা প্রবাদ — ছড়া ও চলতি কথা বইয়ে পাই, যাত্রা শোনে ফাতরা লোকে, কবি শোনে সবই লোকে।৪ অর্থাৎ তাহলে শুধু ‘দেখে’, ‘করে’ নয়, ‘শোনে’ও পাওয়া গেল। ‘দেখে’র পাঠান্তর ‘শোনে’ সমার্থক বলতে গেলে— দর্শক যেহেতু শ্রোতাও, কিন্তু ‘করে’ নয়, যেহেতু তা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ব্যাপার। যাই হোক, এখানে কবির ক্ষেত্রে ‘সবই লোকে’ বলায়, রানী চন্দের বয়ানের বিপরীতার্থকই তা। আমজনতার ব্যাপার হয়ে গেল সেটা, অর্থাৎ সবাই দেখতে পারে— তাতে খারাপ কিছু নেই বা খারাপ লোকেদের ব্যাপার নয়। শ্রী দে প্রাদেশিক বলে উল্লেখ করে, ফাতরার অর্থ করেছেন, অসার। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ ফাতরা শব্দের অর্থ দিয়েছেন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন, সেখানে উৎস আরবি শব্দ হিসাবে ‘ফত্র্’-এর মানে উল্লেখ করেছেন, ‘ছেদন’ এবং ঢাকা অঞ্চলে ‘ফাৎরা’ শব্দের অর্থ বলেছেন ‘কলাগছের খোলা’। আমরা স্থানীয় একটি শব্দের সঙ্গে আজন্ম পরিচিত— ফাদরাফাঁই (ফাতরাফাঁই থেকেই এমন উচ্চারণে নিশ্চয়ই), যার অর্থ জামাকাপড়, চাদর, কাগজ ইত্যাদি অনেকখানি ছিঁড়ে যাওয়া বা ফালাফালা হয়ে যাওয়া। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান-এ৫ ময়মনসিংহের প্রাদেশিক শব্দ বলে উল্লেখ করে ফাতরা-র অর্থ করা হয়েছে ‘কলাগাছের পাতার সহিত শুষ্ক খোলা’, এখানে শুকনো কলাপাতার সঙ্গে যে শুকনো খোলা তাকেই বোধহয় বোঝাতে চাওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অর্থ দেওয়া হয়েছে ‘অসার’। শব্দটির উৎস বলা হয়েছে পত্র, যা ঠিক কি না সন্দেহ আছে। আমাদের আলোচ্য ফাত্রা বা ফাতরা বোধহয় এই দ্বিতীয় অর্থ অসার-এর কাছেপিঠে।
নির্মল মুখোপাধ্যায়ের আত্মস্মৃতি আমার যাত্রা জীবন-এর ভূমিকায় প্রভাতকুমার দাস লিখছেন—“যাত্রাভিনেতারা আজ আর সমাজে ফাত্রালোক হিসেবে নিন্দিত নয়—অনেক শিল্পীই সম্পন্ন পরিবারের সন্তান, স্কুল-কলেজের শিক্ষাপর্ব শেষ করে কিংবা পড়তে-পড়তেই যাত্রাভিনয়কে পেশা করেছেন। সাফল্যও পেয়েছেন।” অর্থাৎ এখানেও কিন্তু যাত্রার দর্শক-শ্রোতাদের কথা বলা হল না, বলা হল যাঁরা যাত্রা করেন তাঁদের কথাই। যাই হোক, দৃষ্টান্ত হিসাবে শ্রী দাস হাজির করেছেন পালাকারকে, ব্রজেন্দ্রকুমার দে-র কথা বলেছেন, “গত শতকের তিরিশের দশকে পেশাদার যাত্রায় পালাকার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন যিনি, পরে পালা-সম্রাট হিসেবেই প্রাতঃস্মরণীয় হয়েছেন।... অর্থনীতির এম.এ, পরবর্তীকালে প্রধান শিক্ষক— একটানা যাত্রালক্ষ্মীর সেবায় আত্মনিযুক্ত। যাত্রা সংস্কারে তাঁর ভূমিকা চিরস্মরণীয়— আধুনিকতার যাবতীয় নিরীক্ষায়, যাত্রাপালার সাহিত্যমূল্য প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন আমৃত্যু অক্লান্ত।”৬
যাত্রা-গবেষক সাফিউল্লা মোল্লা লিখছেন— “উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের শুরুর দিকে যাত্রা যখন শহুরে পোশাক পরে ‘ফাত্রা’ লোকের বিনোদনে পরিণত হতে বসেছে তখনও কিন্তু গ্রামে রাম-সীতার বিলাপ দর্শকের চোখে জল নিয়ে আসতে সক্ষম হচ্ছে।” পূর্বপ্রসঙ্গে বলেছেন—“যাত্রার আদিরূপ ছিল কিন্তু পুরাণ নির্ভর, শিবযাত্রার হাত ধরে যার যাত্রা শুরু। তা থেকে রামযাত্রা-কৃষ্ণযাত্রা-কালীয়দমন যাত্রা (কৃষ্ণযাত্রার আদিরসাত্মক রূপ)—উনিশ শতকে নতুন—যাত্রা—তা থেকে গীতাভিনয়—উনিশ শতকের শেষে সখের যাত্রা—বিশ শতকের শুরুতে তা পরিণত হল থিয়েট্রিক্যালে। যুগের প্রয়োজনে যাত্রা বরাবর তার আঙ্গিক বা রূপের বদল ঘটিয়েছে। কিন্তু যার হাত দিয়ে যাত্রার জাগরণ সেই সত্তারই অনুসন্ধান করেছে বরাবর।”৭
স্বপনকুমার ঠাকুর তাঁর গঙ্গাহৃদি বঙ্গভূমি পুস্তকের৮ একটি অধ্যায়ের নামকরণ করেছেন ‘যাত্রা দেখে ফাতরা লোকে’। নাজিবুল ইসলাম মণ্ডল লিখেছেন, “সেদিনের সেই সব উৎসব সমাবেশে ‘যাত্রা দেখে ফাত্রা লোকে’ বলা যেত না। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মুখর হয়ে উঠত। সব শ্রেণির মানুষেরও উজ্জ্বল উপস্থিতি বিশেষভাবে উল্লেখ্য।”৯
অতীশ পালের একটি বয়ান দেখে নিই (মুখ-বই, ২২ মে ২০২৬)। তিনি লিখছেন :
‘“যাত্রা দেখে ফাত্রা লোকে”। এমন একটি শব্দবন্ধ নিশ্চয়ই ফাত্রা মানুষের নয়। এমন কটাক্ষ তাঁরাই করেছেন যাঁরা নিজেদের সমাজের জ্যাঠামশাই ভাবেন। এই শিষ্ট জ্যাঠামশাইরাই বলে দেন কোনটি শ্লীল বা কোনটি অশ্লীল। কোনটি শিল্প বা কোনটি শিল্প নয়। ‘ফাত্রা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ যতদূর জানি মূল্যহীন, খেলো, বাজে, ধাপ্পাবাজ, বাচাল, হালকা বা অপ্রয়োজনীয়। যাঁরা যাত্রা দেখেন তাঁরা যদি ফাত্রা হন তবে যাত্রা যাঁরা করেন বা যাঁরা পালা রচনা করেন তাঁরা কি? তাঁদের জন্য শিষ্ট মানুষের কি বিশেষণ, সেটি অবশ্য আমার জানা নেই। এবার খানিকটা জেনে নেওয়া যাক এই ফাত্রাদের জন্য যাঁরা যাত্রাপালা করেছেন বা লিখেছেন তাঁরা কারা?’ এর পর সেকালের বেশ কয়েকটি যাত্রাপালার উল্লেখ করে বলেছেন যে সেসবের মতো পালাগান ‘বহু মানুষকে যে ফাত্রা বানিয়েছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।’ লিখেছেন, “১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় নট ও পালাকার মুকুন্দ দাস নিজেও কতখানি ফাত্রা ছিলেন তা কারো অজানা নয়। এতটাই ফাত্রা ছিলেন তিনি যে যাত্রা পালা করতে গিয়ে হাসিমুখে কারাবাসও করেছিলেন। এ তো গেল সেকালের কথা এবার একালের ফাত্রা বানাবার কারিগরদের দিকে একটু নজর দিলে দেখবো কে নেই সেই সারিতে। কাকে বাদ দিয়ে কার কথা বলবো সেটা ভাবতে গিয়ে খেই হারিয়ে যাবে। সুতরাং সে রাস্তায় হাঁটার সাহস দেখালাম না। শুধু বলি স্টুডিওর ঘেরাটোপে না এসে আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়া একেবারে খোলা মঞ্চে হাজার হাজার মানুষের সামনে যে গান বীনা দাশগুপ্ত, লতা দেশাই, ছন্দা চ্যাটার্জি, মল্লিকা চ্যাটার্জিরা গেয়েছেন তাতে ফাত্রা না হয়ে উপায় আছে?” নিজের সম্বন্ধে বলেছেন যে ছোটবেলা থেকেই ফাত্রা তিনি। “যাত্রার নেশায় ফাত্রা হয়ে খুব কম মার আমি খাইনি বাল্যকালে। সমাজে কিছুটা এগিয়ে থাকা আমার পরিবারও মনে করতেন যাত্রা দেখে ফাত্রা লোকে। ও বাবা! পাঁচগাছিয়ার ওই ফাত্রার আসরে গিয়ে দেখি আমার মতো হেঁজিপেঁজি নয় বহু জ্ঞানীগুণী ফাত্রা সেখানে জড়ো হয়েছেন। এই ফাত্রা সমাবেশের উদ্যোক্তা ছিলেন সুচেতনা।” লেখাটি মূলত গৌতম মণ্ডল সম্পাদিত ষাণ্মাসিক সুচেতনা পত্রিকার বাংলা যাত্রা সংস্কৃতির সেকাল ও সমকাল সংখ্যার১০ প্রকাশ-অনুষ্ঠান নিয়ে। এই সখ্যায় ‘শৈশবের যাত্রাপালা ও গ্রামীণ সংস্কৃতি’ শীর্ষক চমৎকার এক লেখা আছে শ্রী পালের। ফাত্রা দর্শকদের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে তিনি দর্শক-শ্রোতা থেকে পালাকার, যাত্রাশিল্পী প্রভৃতি অনেককে টেনেছেন।
দৃষ্টান্ত কয়টি থেকে যাত্রা দেখে ফাত্রা লোকে-র থেকে যাত্রা করে ফাত্রা লোকে-র দিকে পাল্লা ভারী নয় কি! যাত্রা দেখা বা শোনার লোক যাত্রা দেখে হাসেন কাঁদেন, আর যাত্রা করার লোক হাসান কাঁদান। যাত্রা দেখার লোকের আবেগ অনেকটাই খাঁটি, যাত্রা করার লোকের আবেগ সৃষ্ট— সদর্থে হলেও অনেকটা মেকি, অভিনয়টাই সেখানে প্রধান। অর্থাৎ আবেগের ভাব করা, হাসার ভাব করা, কাঁদার ভাব করা— কতটা বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যায়। সত্য বলে প্রতিভাত করানো যায়। কিন্তু বাস্তবসম্মত করে তোলার চেষ্টায় অভিনেতা-অভিনেত্রী অভিনীত চরিত্রের সঙ্গে অনেকসময় একেবারে একাত্ম হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু একই কথা, বিশেষত পেশাদার যাত্রাদলে একই ভাবভঙ্গি বলতে গেলে দিনের পর দিন তাঁদের করে যেতে হয় অনেকসময় পুতুলের মতো প্রায়, আর দর্শক-শ্রোতা যখন তা দেখছেন শুনছেন সেই সময়টুকুর জন্যে, সেই সময়টুকুতে তাঁরা খাঁটি কিছু অনুভূতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, সেই অনুভূতিতে বাস করছেন, সেই অনুভূতির সঙ্গী হয়ে যাচ্ছেন এবং সেইমতো আন্দোলিত হয়ে উঠছেন। অন্তত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভিনয় প্রদর্শনের সময়ের মুহূর্তগুলো জুড়ে। অর্থাৎ অভিনয়ের মধ্যে থাকে একরকম ফাঁকি, সৃজনমূলক সদর্থক হলেও। কিন্তু দর্শক-শ্রোতা অনেকটা খাঁটি অন্তত সেই মুহূর্তে।
যাত্রা দেখার লোকেদের সচরাচার একটা পরিবার— তাঁদের নিজ নিজ; যাত্রা করার লোকেদের, বিশেষত পেশাদার যাত্রাশিল্পীদের সচরাচর দুই পরিবার— একটা নিজ নিজ, আর একটা তাঁদের যাত্রা-পরিবার। উভয় পরিবারেই আছে হাসি-কান্না, সমস্যা-সম্ভাবনা। এদিকে দুটো পরিবার ভিন্নধর্মীও। অভিনয়ের জগৎ বলতে গেলে ভিন্ন ভিন্ন পরিবার থেকে আসা মানুষের জগৎ। সচরাচর সাবালক। পোড়খাওয়াও অনেকেই। দুই পরিবারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, দায়দায়িত্ব পালন ইত্যাদি নেহাত কম সমস্যার নয়। অনেক সময় ক্ষতবিক্ষত হতে হয়। বিশেষত পেশাদার যাত্রাজগতের লোকেদের দিনের পর দিন আপন পরিবার ছেড়ে কাটানো, জেলার পর জেলা থেকে রাজ্যের পর রাজ্য। দক্ষিণের কলকাতা ও তার আশপাশের জেলা থেকে উত্তরবঙ্গ ছাড়িয়ে আসাম, ত্রিপুরা, বিহার বা পরে ঝাড়খণ্ড। বাড়ির সমস্যা থেকে যাত্রাজগতের মানুষদের মধ্যে পারস্পরিক মেশামিশি, সঙ্গ-সান্নিধ্য, সুখ-দুঃখ, দলাদলি তথা দল পালটানো, লোভ, দুর্নীতি, কথার খেলাপ, ঠকানো, প্রাপ্যে বঞ্চিত করা, অভিনেত্রীদের অসহায়তার সুযোগ নেওয়া, সম্পর্কের বাইরে সম্পর্ক গড়ে তোলা বা ভেঙে ফেলা আরও আরও অনেককিছু। থিয়েটারে লোকশিক্ষে হয়, রামকৃষ্ণ বলেছিলেন। ব্যাপকার্থে বলা যায় অভিনয়ে লোকশিক্ষা হয়। দেখার লোকেরা যাত্রা দেখে কতটা শিখতে পারলেন, তার থেকে যাত্রা দেখানোর লোকেরা অর্থাৎ অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কতটা পালন করতে পারলেন দুটোর অভিঘাত আলাদা বই-কি! দেখে, নিতে না পারার থেকে দেখানো অর্থাৎ শিক্ষা দেওয়া লোক বা শিক্ষক নিজেই শিক্ষণীয় বিষয় আপনি আচরি ধর্মতে পরিণত করতে না পারলে খামতিটা অধিক মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়, অপরাধবোধ জাগাও নয় অসম্ভব। মানুষ অভিনয় দেখেছে, অভিনয় ভুলেছে, আবার ভোলেনিও। পালার শিক্ষা থেকে শিক্ষা নিয়েছে, আবার নেওয়া সম্ভব হয়নিও যে-যার নিজস্ব বাস্তবতায়, নিজস্ব স্বভাবধর্মে। পারস্পরিক বিবাদ ভুলে পরস্পরে বিবাদ মিটিয়ে নিল এমনও দেখা গেছে। দেখা গেছে শাশুড়ি-বউ এসে পালাকার-অভিনেতার কাছে জানাচ্ছেন যে তাঁর পালা তাঁদের বিবাদ মিটিয়ে দিল। কাহিনির মধ্যে নিজেদের বা নিজেদের পরিবারের ছায়া দেখে কত মানুষ কেঁদেছেন! যেন তাঁদেরই কাহিনি, জানিয়েছেন তাঁরা তা পালাকার-অভিনেতাকে। তাছাড়া ভাল যাত্রার স্মৃতি রয়ে যায় ভবিষ্যতেও, অনেক সময় আজীবন। থিয়েটার বা চলচ্চিত্রেজগতে একাধিক দৃষ্টান্ত থাকলেও যাত্রাজগতের দিকপাল অভিনেতা-অভিনেত্রীরা খুব একটা স্মৃতিকথা বলতে গেলে কেউই লিখে যাননি বা লিখছেন না। কেউ কেউ অসম্পূর্ণ দু-একটা লেখা লিখে গেছেন বা শুরু করে, কিছুটা এগিয়ে আর শেষ করে যেতে পারেননি। কেউ-কেউ সাক্ষাৎকারে বলে গেছেন কিছু কিছু কথা। কেন? আসলে লিখতে গেলে অভিনয়জগতের অনেক ভিতরের কথা বেরিয়ে আসবে, নিজেদের কথা হয়ে যাবে, সৎভাবে সব কথা অকপটে বলা যাবে না। মাত্র কয়েক বছরই আগে— ২০২২ সালে আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ আত্মস্মৃতি পেলাম নির্মল মুখোপাধ্যায়ের (পূর্বোক্তআমার যাত্রা জীবন)। বইয়ের দ্বিতীয় ব্লার্বে লিখতে হল, “সাহিত্যের ইতিহাসে, প্রথম কোনো যাত্রাশিল্পী তাঁর আত্মকথা লিখে নতুন নজির তৈরি করলেন।” সেটা সম্ভব হয়েছিল অনেকটা সম্পাদক প্রভাতকুমার দাসের সৌজন্যে এবং মীনা কুমারীর তাগিদে। নির্মলবাবুকে স্যালুট, শুরুতে ‘আমার কথা’-তে তিনি লিখছেন, “আত্মকথায় যদি কাল্পনিক কিছু সংযোজন করা হয়, সেটা যেমন আত্মপ্রতারণা, তেমনি যদি সত্য গোপন করা হয় সেটাও আত্মতঞ্চকতা। এই গ্রন্থে যা যা উল্লিখিত হয়েছে, তা বিন্দুমাত্র অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা নয়।” যথাসাধ্য সে-কথা তিনি রেখেছেন, তাঁর বইটি পড়লেই বোঝা যায়। আর বোঝা যায়, কেন যাত্রাজগতের বড় বড় ব্যক্তিত্বদের আত্মস্মৃতি বা আত্মজীবনী লেখাটা বেশ কঠিন। সে কথায় আমরা পরে আসছি।
যাত্রা-নাটকের, বিশেষত যাত্রার প্রতি গ্রামীণ মানুষ অপ্রতিরোধ্য টান অনুভব করে এলেও, তাকে ‘পোঁদ নাচানো’ বলতেও বাধেনি তাদের। কবিগানেরই দোসর তরজাকে তার চাপান-উতোরের আবহে ঝগড়া-কলহের অনুষঙ্গেও দেখেছি আমরা। বলেছি, তোরা এসব তজ্জা/তরজা জুড়িচিস কেন রে! ‘পোঁদে-বাড়ি পুতুলনাচ’ বলেছি ডাং-পুতুলনাচকে! বলেছি, কী রে, পোঁদে-বাড়ি পুঁতুলনাচ/পুতুলনাচ দেকতি যাবিনি?
অভিনয়ের নেশার সঙ্গে সঙ্গে অন্য নেশাও যুক্ত ছিল না এমন বলা যাবে না। উনিশ শতকীয় বাই-নাচানো বাবু-কালচারে মদ্যপান একটি অতি সাধারণ ঘটনা ছিল। তাঁরা কেউ কেউ অভিনয়ে যুক্ত ছিলেন অথবা অভিনয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। নাটক, যাত্রায়। জমিদাররা আয়োজন করতেন যাত্রাভিনয়, ঝুমুর, কবিগানের। অভিনয়ের সঙ্গেও মদ-তাড়ির সংযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক গণ্যমান্য অভিনেতা মদ্যপ ছিলেন। নাট্যজগতের নট ও নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ তো এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মঞ্জরী অপেরা উপন্যাস থেকে একটু অংশ শুনে নিই— “গোরাবাবু মদ খেয়ে গ্লাস শেষ করে নামিয়ে রেখে বললে— রাইট। খুব ঠিক বলেছেন। আর আছে কি আমাদের? মঞ্জরী এই কথাটা বোঝে না। কাল আমাকে বলছিল, আজকাল অন্য অন্য দলে নতুন পাস-করা ছোকরারা ঢুকছে, তারা নাকি খাচ্ছে না। আমি বললাম, খাচ্ছে না, খাবে। আর যদি না খায় তবে অ্যাক্টর হতে পারবে না। তখন বলে আসরের লোকে ও সইবে না। শোন কথা! নেশা না হলে অ্যাক্টিং হয়? নেশা না হলে আমি ভাবব কি করে, আমি গোরা ওরফে বিজয় চক্রবর্তী, আমি ধাঁ করে দেবতা হয়েছি কি রাজা হয়েছি কি মরে যাচ্ছি!” অর্থাৎ এমনিতে নেশা করা লোক এবং নেশা না করলে কি আর ঠিকঠাক অভিনয় আসে— এই দুটি ধরনই বর্তমান। অতিরিক্ত মদ্যপান করে ফেলার ফলে অভিনয়ে তার প্রভাব পড়েছে এমন দৃষ্টান্তও আছে বই-কি! যাই হোক, দেবব্রত নস্করের নিজের গ্রামকে নিয়ে লেখা পুস্তক বেগমপুরের ইতিহাস থেকে একটি দৃষ্টান্ত দিই— “পঞ্চানন কয়াল, নফরচন্দ্র নস্কর, রজনী নস্কর, সীতাকুণ্ডুর গোলাম সাঁফুই এই দল গঠনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন। পঞ্চানন অপেরা পরিচালনার আর্থিক যোগান দিয়েছেন পঞ্চানন কয়াল ও গোলাম সাফুই এবং নফরচন্দ্র নস্কর ও রজনী নস্কর দলের লোকেদের অন্ন ও তাড়ি যুগিয়েছেন।”১১ দর্শক-শ্রোতারাও একেবারে নেশা করতেন না এমন বলা যাবে না। এই নিয়ে আসরের আশেপাশে হই-হল্লা দুর্লক্ষ্য ছিল না। মঞ্চে উঠে নর্তকী বা অভিনেতা-অভিনেত্রীকে টাকা উপহার দিতে দেখা যেত একসময় যাদের, তাদের মধ্যে নেশার ঘোরে টলটলায়মান কেউ কেউ যে থাকত না তা বলা যাবে না।
অ্যামেচার যাত্রায় আমরা দেখেছি, পয়সাওয়ালা লোক যোগ্যতা না থাকলেও প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করতে। কারও কারও তো রাজা বা জমিদারের পার্ট চাই-ই চাই। তিনি বেশি চাঁদা দিচ্ছেন না! শরীর হালকা বলে গায়ে কাপড় জড়িয়ে নিজেকে স্বাস্থ্যবান করে তুলে ধরতেও দেখা গেছে। যাত্রার পাল্লায় পড়ে ফতুর হতে দেখেছি মানুষকে। এই ‘পোঁদ নাচানো’ নেশার কলে পড়ে নির্ধন যেযন ফতুর হয়েছে, ধনবানও ফকির হয়েছে। কত সংসারকে ডুবিয়েছে পুরুষ যাত্রার পাল্লায় পড়ে! এমনিতে যাত্রা-নাটকের লোকেদের চরিত্র নিয়ে সমাজে খুব উচ্চ ধারণা ছিল না। ক্রমসামর্থ্যহীনতায় সংসারকে ডুবিয়েছে, অন্য নারীসঙ্গে পড়ে সংসারকে ডুবিয়েছে এমন দৃষ্টান্ত কম নয়। স্বামী অভিনয়ে গেলে, রাতে তেমাথায় স্ত্রীকে অপেক্ষা করতে দেখেছি উদ্ভিগ্নভাবে, কখন ফিরবে! কোনও কোনও অভিনেত্রী ছেলেমেয়ে হয়ে গেলে তাদের ভালভাবে মানুষ করার জন্যে অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও, ছাড়তে না পেরে স্বামীর সঙ্গে অভিনয়ে থেকে যান, যাতে স্বামী বেহাত না হয়ে যান! উলটোটারও, অর্থাৎ অভিনেত্রী-স্ত্রীকে একা না ছেড়ে সঙ্গে থাকার দৃষ্টান্ত একেবারে নেই তাও বলা যাবে না। জনপ্রিয় সুদর্শন অভিনেতাকে কত নারীর আবেদন-আহ্বানকে যে সসম্মানে অগ্রাহ্য করতে হয়! বিপরীতটিও বিরল নয়, অর্থাৎ জনপ্রিয় সুন্দরী অভিনেত্রীদেরও এড়াতে হয় পুরুষদের আবেদন-আহ্বান। সবসময় তা পারা সম্ভব হয় না। সেই, প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে।/কে কোথা ধরা পড়ে কে জানে! মানুষী সত্তা কোনো বাধাকেই অনেকসময় বাধা মানে না। মরণঝাঁপ দিতে দেখাও অসম্ভব নয়। কখনও কোনও সম্পর্ক মহিমান্বিত হয়, তো কখনও মনোবেদনার।
যাত্রার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের, বিশেষত অভিনেতাদের উপর, নিবিড় সান্নিধ্যহীনতার কারণে ছেলেমেয়েদের অভিমানের খবর কে-ই বা রেখেছে! থিয়েটার হোক বা যাত্রা— অভিনয়ে লোকশিক্ষে হয় তা অস্বীকার করার নয়, কিন্তু যাত্রা যাঁরা করেন তাঁদের সবসময় লোকশিক্ষে হয় তো! যাত্রার অন্তর্জগৎ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ যাত্রা তেমন হয়েছে কি না জানা নেই সেইভাবে, পালাকার-অভিনেতা নিজেরই পরিবারকে নিয়ে যাত্রা লিখতে বাধ্য হয়েছেন এমন দৃষ্টান্ত আছে।
আমরা দেখেছি ফড়ের যাত্রা। ফড়-রূপ জুয়া যাত্রার ব্যয়ভার বহন করত। এক-এক জায়গায় কোনও কোনও সময় এক-দু সপ্তাহ থেকে মাস অবধি যাত্রা চলত মূলত ফড়ের টাকায়। মনে পড়ে, মগরাহাটে সুলেখা সিনেমা হলের দক্ষিণ গায়ে চটির মাঠে (এখন দোকান ইত্যাদি সেখানে) প্রায় মাসখানেক ধরে ফড়ের যাত্রা হত (মনে আছে, এখানে দেখেছিলুম জ্বলন্ত বারুদ)। দর্শক-শ্রোতারা উদ্বিগ্ন হতেন, আওয়াজ তুলতেন, কখন যাত্রা শুরু হবে? কখন যাত্রা শুরু হবে? কিন্তু যতক্ষণ না মোটামুটি পরিমাণ একটা টাকা উঠছে ততক্ষণ সচরাচর যাত্রা শুরু হত না। দু-একদিন পরপর তেমন টাকা না উঠলে আসর বাতিল হয়ে গেছে এমনও দেখা গেছে। ফড় খেলে কত দর্শক-শ্রোতা যে তবিল ফাঁকা করে বাড়ি ফিরত বা ফতুর হত তার ঠিকঠিকানা নেই। নগদ ফুরিয়ে গেলে হাতঘড়ি, সাইকেল, এমনকি বিয়ের আংটি-বোতাম ইত্যাদি বাঁধা-বন্ধক দিয়ে বা বিক্রি করে ফড় খেলাও দেখা যেত। ফড়-প্রিয় স্বামীদের অনেক স্ত্রী যাত্রায় আসতে নিষেধ করত, মান-অভিমান চলত, ঝগড়াঝাঁটি। এমনকি ফড়ের জায়গায় গিয়েও পরিবারের লোক প্রতিবাদ করেছে, সরিয়ে এনেছে, ফড়ের লোকেদের সঙ্গে ঝগড়া করেছে এমন অনেক কিছুরই সাক্ষী আমরা। এক্ষেত্রে কিন্তু যাত্রা দেখে বা শোনে ফাত্রা লোকে খানিক উপযুক্ত।
মহিলা দূরের কথা— তাঁরা যাত্রাভিনয়ে এসেছেন অনেক পরে— পুরুষদের যাত্রায় অভিনয় করাও অনেকে ভাল চোখে দেখত না সমাজে। প্রথমে পুরুষরা স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করতেন, পরে গত শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে যখন মহিলারাও অভিনয়ে এগিয়ে এলেন, তাঁদের অভিনয় দেখেছেন মানুষ, কিন্তু সমাজজীবনে সবাই খুব সহজভাবে নেননি তাঁদেরকে। তার উপরে অভিনয়ে নারী আসায় নারী-পুরুষ উভয়ের একত্র অভিনয়ের প্রেক্ষিতে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চরিত্রগত দিক নিয়ে অনেক সময় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রথমদিকের ভক্তিমূলক পালা থেকে পরে পরে সামাজিক পালাও শুরু হয়েছে। মহিলারা বেশির ভাগই আসতেন দরিদ্র পরিবার থেকে। তাঁদের আত্মসম্মান বজায় রেখে অভিনয় করা অনেক সময় সম্ভব হত না। অনেক সময় অল্পবয়সি অভিনেত্রীদের পরিবারের কেউ অভিনেত্রীদের সঙ্গে থাকতেন অথবা চাইতেন একইসঙ্গে দুই বোনকে নেওয়া হোক, যাতে কোনো অপ্রীতিকর কিছু না ঘটে। উভয় ক্ষেত্রেই সহ-অভিনেতারা বা যাত্রামালিকরা মনে মনে ক্ষুণ্ণ হয়েছেন এমনও দেখা গেছে। অসন্তোষ কখনও প্রকাশ্যে এসে পড়েছে তা, পরোক্ষভাবে হলেও। তাতেও সবকিছু আটকানো যায়নি। যাত্রায় বিভিন্ন মরশুমে জুটি পালটানোর অভিঘাত নায়ক-নায়িকা বা সহ-অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জীবনেও অনেক সময় প্রভাব ফেলে বই-কি!
মঞ্জরী অপেরা উপন্যাসে পিছল পথের কথা আছে। এ উপন্যাস থেকে আর একটু উদ্ধৃত করি। “অভিনেত্রীর কর্মটি এদেশে এ পর্যন্ত মেয়েদের মধ্যে তারাই করে যারা আসলে দেহব্যবসায়িনী। থিয়েটারে তারা চাকরি করে, তাতে তাদের উপার্জন বাড়ে। আগেকার কালে যখন সারারাত্রি বা রাত্রি দুটো তিনটে পর্যন্ত অভিনয় হত তখন শনি রবি বুধ পরে বুধের বদলে বৃহস্পতি তিনদিন ছাড়া বাকী চারদিন তাদের পেশার উপার্জন অবকাশ থাকে। কিন্তু যাত্রার দলে, মফস্বলে এ পথ বন্ধ হয়ে যায়। মাইনেও যাত্রাদলে থিয়েটার থেকে কম। তার উপর কষ্ট পথের। কত জায়গায় গরুর গাড়িতে দশ বিশ মাইল চলতে হয়। পুরুষেরা হেঁটে মেরে দেয়। তারা সঙ্গে চিঁড়ে রাখে গুড় রাখে, পথে তাই ভিজিয়ে খেয়ে পথ চলে। মেয়েরা তা পারে না। তার উপর প্রয়োজন রক্ষকের। শাস্ত্রে নারী এবং পুরুষের উপমা দিয়েছে ঘি এবং আগুনের সঙ্গে। চারিদিকে বা দশদিক থেকে যখন বিশ তিরিশ আগুন লোলজিহ্বা বিস্তার করে তখন ঘিয়ের বিপদ। সেই কারণে মেয়েদের যাত্রার দলে নেয়ও না, মেয়েরাও যায় না।”
আমার যাত্রা জীবন থেকে একটু তুলে ধরি। “লক্ষ্মীদা জিজ্ঞেস করলেন, নায়িকাকে তোমার কেমন লাগে? বললাম, ভালো, খুব ভালো মেয়ে। উনি বললেন, গরিব ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়ে। দেখতে রূপসী, যাত্রাদলে দুরাত্মা ইতরের অভাব নেই। কতদিন তারা ওকে ভালো থাকতে দেবে? ডলিকে তুমি বিয়ে করো।...” ডলি চ্যাটার্জিকে বিয়ে করার জন্যে নির্মল মুখোপাধ্যায়কে এভাবেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন সহকারী ম্যানেজার লক্ষ্মী ভট্টাচার্য।
নির্মলবাবুর ভরসাতে দুই অভিনেত্রীকে দলে পাঠিয়েছেন তাঁদের বাবা-মা। কিছু কেনাকাটা করতে হলে তাঁরা তাঁকে নিয়ে যেতেন। দুই ম্যানেজারের তা পছন্দ নয়, বলেন, “নির্মলের সঙ্গে যাস কেন? তোরা কি নির্মলের চাকরি করিস? ও কি তোদের মাইনে দেবে?” তাঁদের ভয়ে তাঁরা তাই কম আসতেন নির্মলবাবুর কাছে। দুই ম্যানেজার তাঁদের ফ্রক, প্রসাধনী সামগ্রী কিনে দিতেন। কিছুদিন পর অন্য অভিনেত্রীদের সঙ্গে থাকা বন্ধ করে দিয়ে নিজেদের কাছে আলাদা ঘরে রাখতে শুরু করলেন! ‘দলটাই নোংরামীর আস্তাকুঁড়’ বলে লিখেছেন তিনি, “দল মালিক অমূল্য ঘোষ থাকতেন যিনি রানির চরিত্র করতেন তাকে নিয়ে। কালি সাহা সহ নায়িকাকে নিয়ে। নায়ক, কালিঘাটের শ্যামল গোস্বামী জুটিয়ে নিলেন, মীরা মুখার্জির বোন প্রধান নর্তকী ধীরাকে। আর পাঁচুগোপাল মুখোপাধ্যায়ের প্রেমিকা ছিলেন প্রধান নায়িকা অঞ্জনা বসু।” উক্ত দুই অভিনেত্রী— ছায়া ও সাধনার ব্যাপারটা মেনে নিতে না পেরে তীব্র প্রতিবাদ করায় ম্যানেজাররা আটকে দিলেন নির্মলবাবুর মাইনে। চাইলে, কেবল দশ-বারো টাকা দিতেন। সেই বকেয়া মাইনে আদায় করতে সে আর এক পালা! তাঁর শুভানুধ্যায়ীদের যাত্রার আসরে পালা বায়না করার অভিনয় করে রগে রিভলবার চেপে ধরে বলতে হয়, “যাত্রা শেষ হওয়ার আগে নির্মল মুখার্জি সহ যে দুটো মেয়েকে নিয়ে তোরা ফুর্তি মেরেছিস, তাদের সবার মাইনে মিটিয়ে দিবি, তিন জনের বেডিংপত্র জিপে তুলে দিবি। সাজঘরে গিয়ে একথা কাউকে বললে তিনটেকেই লাশ বানিয়ে দেবো।…”
চুক্তিভঙ্গ করা, করানো, একই যাত্রাপালা ভিন্ন নামে একাধিক দলে চলা বা চালানো, মরশুমশেষে প্রাপ্য টাকা পুরো না দেওয়া, ইচ্ছা করে পালা ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ইত্যাদি আকছার ঘটনা ছিল যাত্রা-দুনিয়ায়।
আর একাকিত্ব, সে কি কেবল নিছক শিল্পীসুলভ একাকিত্ব! নির্মল মুখোপাধ্যায়ের কথা শুনুন, “পুরো অর্ধ শতাব্দী অবিচ্ছিন্ন ভাবে বিনোদন মূলক পেশাদার জীবন থেকে ছিটকে পড়ে একা হয়ে যাওয়া যে কত দুঃসহ, ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কেউ তা বুঝবে না। তার ওপর সেই ছিটকে পড়া ব্যক্তি যদি আপনজনের সান্নিধ্য না পায় তা হলে জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে যায়। আমি তার জ্বলন্ত প্রমাণ।” এর সঙ্গে জুড়ে নিন এই অংশটা : “২০১৫ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত মাঝে মাঝে চন্দননগর গিয়ে থাকতাম। বাড়ির সবাইকে দেখার খুব ইচ্ছে হতো, কিন্তু চন্দননগর গেলেই একটা অপ্রাপ্তি, উপেক্ষা জীবনকে ঘিরে ধরে মনকে কষ্ট দিতো (এখনো দেয়)। কিছুদিন থেকে আবার চলে আসতাম বাঁশপাল্লায় মীনার কাছে। ২০১৮ সাল থেকে আর চন্দননগর যাইনি। প্রিয়জনদের উপেক্ষা— কারা-শাস্তির চেয়েও কষ্টদায়ক।”১২ যাত্রাশিল্পের একাধারে অনন্য এই পালাকার-নির্দেশক-অভিনেতা আপন অকপট আত্মস্মৃতিতে ব্যাপারটাকে একতরফা বলতে পারেননি। স্ত্রী ডলির দিকটিও তিনি অনুভব করেছেন যথাযথ— পরিবারকে বুঝতে চেষ্টা করেছেন যেমন, মর্যাদা দিয়েছেন, বিশ্লেষণ করার সঙ্গে সঙ্গে পেয়েছেন কষ্টও। যে বিবেচক ব্যক্তিত্বময়ী মীনা কুমারী তাঁর একাধারে গুরু ও জীবনসঙ্গী নির্মলবাবুকে এত ভালবাসা ও যত্নে রেখেছেন, সাময়িক দুর্বলতায় অন্য নারীসংসর্গের কারণে তাঁকে এমন আঘাত দিয়ে ফেলেছিলেন যে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন মীনা। এসবের কথা এড়িয়ে যাননি তিনি তাঁর আত্মস্মৃতিতে। দৃষ্টান্ত অনেক। আমরা আর মাত্র একটি দিয়ে, এ দিকটি ছাড়ব। খ্যাতনামা প্রয়াত নট সুজিত পাঠক তাঁর স্নেহের পাত্রপাত্রীদের যাত্রাশিল্পকে পেশা হিসাবে বেছে নেওয়ার প্রশ্নে বলছেন, “কুলিগিরি করে খা, তবু এ লাইনে আসিসনি!” অবসর কীভাবে কাটে জানতে চাওয়ায় জানান, “বানপ্রস্থে। সকালে ঘর থেকে বের হই, কোনভাবে বাথরুম— তারপর ওই মন্দিরে গিয়ে শুয়ে থাকি। দুপুরে খাই। তারপর ঘরের মধ্যে পড়ে থাকি। বিকালে চোখে দেখতে পাই না, তাই বের হতে পারি না। এই সেই সুজিত পাঠক, যাকে দেখতে মানুষকে টিকিট কাটতে হত, আজ তার সঙ্গে দু’দণ্ড কথা বলার কেউ নেই। আজ তোমরা এসেছ— কথা বলে আনন্দ পেলাম।… এখন দিনরাত ঠাকুরকে ডাকি— ঠাকুর এই চরম একাকিত্ব থাকে আমাকে মুক্তি দাও।”১৩
অতীশ পালের যে লেখাটির উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানেও এই বিড়ম্বিত-জীবন বঞ্চিত শিল্পীর অন্যরকম সম্মানের সন্ধান পাওয়ার কথা রয়েছে। “সীতার কথায়, আমার এই স্বল্প জীবনের পরিসরে অনেক লাথি-ঝাঁটা খেয়েছি, কিন্তু সত্যিই সম্মান পেয়েছি আমারই মতো কিছু গরীব মানুষের কাছে। এরা আমাকে প্রায় দেবীর মতো দেখেছে। আমার গলার মালা কিনে নিয়ে ঘরে ঠাকুরের পায়ে রেখেছে। প্রকৃত অর্থে আমার সিঁদুর জোটেনি, সেই আমারই সিঁদুর নিয়ে ওরা নিজেদের নড়বড়ে সংসার মজবুত করতে চেয়েছে। কথাগুলো হয়তো এ ভাষাতে নয়, কিন্তু ভাবটা এমনই।”১৪ বাস্তবের চরিত্র এখানে সীতা নামে, কিন্তু এমন সীতা কম নয় যাত্রাজগতে।
এখন কথা হল, নেশা তো অন্যান্য শিল্পী বা পেশার লোক তো বটেই, সাধারণ লোকও করে থাকেন, আর স্খলন পতন ইত্যাদি অন্য পেশা বা শিল্পেও যে দেখা যায় না তা তো নয়। এমনকি নিতান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যেও তা দুর্লক্ষ্য নয়। কিন্তু আমাদের বক্তব্য খুব স্পষ্ট, অতীতের বা অন্য ক্ষেত্রের দৃষ্টান্ত দিয়ে যাত্রাজগতের অভ্যন্তরীণ নানান খামতি, দুর্বলতা, দুর্নীতি, অন্যায় ইত্যাদিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যে প্রবাদ নিয়ে আমাদের আলোচনা— মূল বক্তব্য হল— প্রবাদ যখন, তাতে অন্তত কিছুটা সত্য আছে বলেই তা মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছে। বিদ্যমান থেকেছে দীর্ঘদিন। তাই এ প্রবাদকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই। অন্যান্য শিল্পের থেকে যাত্রাশিল্পে যেহেতু জুটিবদল থাকে, দীর্ঘদিন গৃহ তথা পরিবার-ছাড়া থাকতে হয় এবং দূর-দূরান্তে ভ্রমণ করতে হয়, একসঙ্গে নানান পরিবেশ-পরিস্থিতি, ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্যে দিয়ে সুখ-দুঃখে একটানা কাজ করে যেতে হয়, তাই এখানে এসবের সম্ভাবনা বেশি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাছাড়া একটা সময় যাত্রাশিল্পে প্রচুর অর্থাগম হওয়ার ফলে এক-একজন মালিক একাধিক দল করলেন, ছায়াছবির জগতের অনেকের যাত্রাশিল্পের দিকে নজর পড়ল, এসব বুঝিয়ে দেয় যাত্রায় সম্মান, অর্থ ইত্যাদি আছে, একইসঙ্গে তার মধ্যে অনেক খামতি দুর্বলতাও প্রশ্রয় পেয়েছে। অবশ্যই সময়ের নিয়মে পেশাদার যাত্রাশিল্পের সে রমরমা আজ আর নেই। বরং অ্যামেচার যাত্রা বা শখের যাত্রার মাধ্যমে কিছুটা হলেও সে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখছে। যে-কোনো পেশা বা শিল্পে সবাই খারাপ, বদস্বভাব বা দুর্নীতিপরায়ণ তা তো হতে পারে না। তাছাড়া যে-কোনো পেশা বা শিল্পের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য বাধ্যবাধকতা সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি থাকাটাই স্বাভাবিক। তার পরেও কিন্তু বলতে হয়, প্রবাদটা নিতান্ত প্রলাপ ছিল না।
আমি করেছিলাম কি, তিনভাগ-রাখা এক বড় নারকেলের মালার মধ্যে একটা ছোট মোমবাতি জ্বেলে তার সমনের দিকে স্বচ্ছ প্লাস্টিক ঢেকে পথ দেখে দেখে যাওয়া-আসার বন্দোবস্ত করে নিয়েছিলাম! যাতে হাওয়ায় নিভে না যায়। হাওয়া চলাচলের জন্যে একটি ফুটো রেখেছিলাম। সঙ্গে বাড়তি দু-এক টুকরো বাতি রেখে দিতাম আর একটা দেশলাই। তো সেসব যাত্রার অনেক স্মৃতি! দেখা যাত্রা তো ছিলই, মাইকে শুনে শুনে প্রায় মুখস্থ-হয়ে-যাওয়া যাত্রাও কম ছিল না। শেষোক্তর মধ্যে যেমন— নটী বিনোদিনী, মা মাটি মানুষ, অচল পয়সা, মীরার বঁধুয়া, ওগো বিষ্ণুপ্রিয়া…। প্রসঙ্গত, তখন মাইকে নাটকও হত। শরৎচন্দ্রের বিরাজ বৌ, শচীন শেনগুপ্তর সিরাজদ্দৌলা। চেড়ার তরোয়াল তৈরি করে আমরাও কম যুদ্ধ করেছি নাকি! বিভূতিভূষণের অপু তো আমরাই ছিলাম! একাধিক যাত্রায় বই বলেছি, অর্থাৎ প্রম্পট করেছি পরে। পরবর্তীকালে ছেলে ও মেয়েকে, বিশেষত মেয়েকে ঘুম পাড়াতে দিনের পর দিন গেয়েছি, “আয় ঘুম আয়/ আয় ঘুম আয় রে/আমার সোনামণির চোখে ঘুম আয় রে।। ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি ঘুম দিয়ে যা/চাঁদের কপালে চাঁদ টি দিয়ে যা।/হাসির নুপূর গড়িয়ে রে তোর পরিয়ে দেব পায়।।/ আয় ঘুম আয়…।” নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না, গান্ধারী জননী। যাক, সেসব কথা আর এখন নয়।
‘যাত্রা’র পিঠোপিঠি ‘ফাত্রা’ শব্দটার বেশ চল। ‘যাত্রা-টাত্রা’ যেমন, চলে ‘যাত্রা-ফাত্রা’ও। টাত্রা যুক্ত হয় খানিক অস্তর্থকে, ফাত্রা খানিক নঙর্থকে। “ছেলেটা একটু আধটু যাত্রা-টাত্রা করে আর কি।” “ও-সব যাত্রা-ফাত্রা আমার দ্বারা হবে না।” যে প্রবাদটিতে যাত্রার সঙ্গে ফাত্রা ওতপ্রোত, সচরাচর তার দুটি বয়ান প্রচলিত। ‘যাত্রা দেখে ফাত্রা লোকে’র সঙ্গে সঙ্গে ‘যাত্রা করে ফাত্রা লোকে’রও উল্লেখ পাচ্ছি। প্রবাদ যখন, তার বক্তব্যকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া মুশকিল। সমাজচিত্র, সমাজমানস, সমাজ-অভিজ্ঞতা ইত্যাদি থেকে উঠে-আসা সংক্ষিপ্ত উক্তি যদি অন্তত কিছুটা তথ্য ও সত্যের ধারক না হত তাহলে সেটা মানুষের মুখে মুখে দীর্ঘদিন বাঁচত না, প্রবাদ অভিধাও পেত না নিশ্চয়ই। কিন্তু এই দুটোর মধ্যে দেখতে হবে কোনটা প্রবাদ হিসাবে বেশি উপযুক্ত, অর্থাৎ কোনটাতে ঘটনা বা সত্য বেশি আধারিত। দেখতে হবে সমাজদর্পণে কোনটা বেশি প্রতিবিম্বিত— ঘটনা ও সত্যের দিক থেকে কোনটা বেশি বাস্তবসম্মত।
দু-একটি উচ্চারণ শুনে নিই। রানী চন্দের লেখায় পাই— “বড়ো মামীমার মুখে একটা ছড়া শুনি প্রায়ই; বলেন, ‘যাত্রা দেখে ফাত্রা লোকে, কবি শোনে খবিশ লোকে’। অর্থাৎ যাত্রা ফাজিল-ফক্কর লোকরাই দেখে রাত জেগে। আর ‘খবিশ’ বোধ হয় আরো নিকৃষ্ট কিছু হবে— কবিগান তারাই কেবল শোনে। যত কুৎসিত কথা, গালাগালি থাকে নাকি কবিগানে। ভদ্রলোকের স্থান নয় মোটে।” আরবি শব্দ খবিশ বা খবিসের অর্থ ভূত-পেত্নী অথবা ময়লা বা নোংরা। শ্রীমতী চন্দ যাঁর কথা বলতে গিয়ে উক্তিটির অবতারণা করলেন তিনি কিন্তু ‘দেখা’র লোক নন, ‘করা’র লোক। সুবাসী একটা চালাঘরে থাকতেন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে। তাঁর স্বামী কবিগানের দলের সঙ্গে গান গেয়ে গেয়ে বেড়ান, বাড়িতে আসেন কদাচিৎ। শ্রীমতী চন্দের মামিরা আক্ষেপ করেন, কী করে যে সংসার চলে সুবাসীর! কবিগানের লোক শুনে রানীর মনে দুঃখ হয়, ভয়ও পান। কখনও সে বাড়িতে এলে, তিনি ঘর থেকে বের হন না, বেড়ার ফাঁকে চোখ রেখে দেখেন। “মা দাওয়ায় বসে বসে লেস বোনেন, নয় ‘ছাঁচ’ কাটেন, সুবাসী বইনের স্বামী পাশের বেঞ্চিতে চুপচাপ বসে থাকেন। অত্যন্ত লাজুক নিরীহ প্রকৃতির মানুষ; মা’দের সঙ্গে কখনো সামনাসামনি মুখ তুলে কথা বলেন না।” লিখেছেন, “এই মানুষই কবিগানের আসরে একেবারে অন্য লোক।”২
যাত্রা-নাটকের গানের মান্য গবেষক দেবজিত্ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন, “যদিও প্রচলিত প্রবাদ ‘যাত্রা করে ফাত্রা লোকে’। কিন্তু আদতে তা নয়। যাত্রা-পথ সুগম হল ধর্মপ্রচারের অনুষঙ্গে। সে পথে শৈব, শাক্ত আর অন্যান্য ধর্মপন্থীদের তুলনায় বেশি সার্থকতা পেল চৈতন্য-অনুগামী বৈষ্ণববাদিরা।”৩
আরো দু-একটা দৃষ্টান্ত দেখে নিতে দোষ নেই। সুশীল কুমার দে-র সম্পাদিত বাংলা প্রবাদ — ছড়া ও চলতি কথা বইয়ে পাই, যাত্রা শোনে ফাতরা লোকে, কবি শোনে সবই লোকে।৪ অর্থাৎ তাহলে শুধু ‘দেখে’, ‘করে’ নয়, ‘শোনে’ও পাওয়া গেল। ‘দেখে’র পাঠান্তর ‘শোনে’ সমার্থক বলতে গেলে— দর্শক যেহেতু শ্রোতাও, কিন্তু ‘করে’ নয়, যেহেতু তা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ব্যাপার। যাই হোক, এখানে কবির ক্ষেত্রে ‘সবই লোকে’ বলায়, রানী চন্দের বয়ানের বিপরীতার্থকই তা। আমজনতার ব্যাপার হয়ে গেল সেটা, অর্থাৎ সবাই দেখতে পারে— তাতে খারাপ কিছু নেই বা খারাপ লোকেদের ব্যাপার নয়। শ্রী দে প্রাদেশিক বলে উল্লেখ করে, ফাতরার অর্থ করেছেন, অসার। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ ফাতরা শব্দের অর্থ দিয়েছেন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন, সেখানে উৎস আরবি শব্দ হিসাবে ‘ফত্র্’-এর মানে উল্লেখ করেছেন, ‘ছেদন’ এবং ঢাকা অঞ্চলে ‘ফাৎরা’ শব্দের অর্থ বলেছেন ‘কলাগছের খোলা’। আমরা স্থানীয় একটি শব্দের সঙ্গে আজন্ম পরিচিত— ফাদরাফাঁই (ফাতরাফাঁই থেকেই এমন উচ্চারণে নিশ্চয়ই), যার অর্থ জামাকাপড়, চাদর, কাগজ ইত্যাদি অনেকখানি ছিঁড়ে যাওয়া বা ফালাফালা হয়ে যাওয়া। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান-এ৫ ময়মনসিংহের প্রাদেশিক শব্দ বলে উল্লেখ করে ফাতরা-র অর্থ করা হয়েছে ‘কলাগাছের পাতার সহিত শুষ্ক খোলা’, এখানে শুকনো কলাপাতার সঙ্গে যে শুকনো খোলা তাকেই বোধহয় বোঝাতে চাওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অর্থ দেওয়া হয়েছে ‘অসার’। শব্দটির উৎস বলা হয়েছে পত্র, যা ঠিক কি না সন্দেহ আছে। আমাদের আলোচ্য ফাত্রা বা ফাতরা বোধহয় এই দ্বিতীয় অর্থ অসার-এর কাছেপিঠে।
নির্মল মুখোপাধ্যায়ের আত্মস্মৃতি আমার যাত্রা জীবন-এর ভূমিকায় প্রভাতকুমার দাস লিখছেন—“যাত্রাভিনেতারা আজ আর সমাজে ফাত্রালোক হিসেবে নিন্দিত নয়—অনেক শিল্পীই সম্পন্ন পরিবারের সন্তান, স্কুল-কলেজের শিক্ষাপর্ব শেষ করে কিংবা পড়তে-পড়তেই যাত্রাভিনয়কে পেশা করেছেন। সাফল্যও পেয়েছেন।” অর্থাৎ এখানেও কিন্তু যাত্রার দর্শক-শ্রোতাদের কথা বলা হল না, বলা হল যাঁরা যাত্রা করেন তাঁদের কথাই। যাই হোক, দৃষ্টান্ত হিসাবে শ্রী দাস হাজির করেছেন পালাকারকে, ব্রজেন্দ্রকুমার দে-র কথা বলেছেন, “গত শতকের তিরিশের দশকে পেশাদার যাত্রায় পালাকার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন যিনি, পরে পালা-সম্রাট হিসেবেই প্রাতঃস্মরণীয় হয়েছেন।... অর্থনীতির এম.এ, পরবর্তীকালে প্রধান শিক্ষক— একটানা যাত্রালক্ষ্মীর সেবায় আত্মনিযুক্ত। যাত্রা সংস্কারে তাঁর ভূমিকা চিরস্মরণীয়— আধুনিকতার যাবতীয় নিরীক্ষায়, যাত্রাপালার সাহিত্যমূল্য প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন আমৃত্যু অক্লান্ত।”৬
যাত্রা-গবেষক সাফিউল্লা মোল্লা লিখছেন— “উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের শুরুর দিকে যাত্রা যখন শহুরে পোশাক পরে ‘ফাত্রা’ লোকের বিনোদনে পরিণত হতে বসেছে তখনও কিন্তু গ্রামে রাম-সীতার বিলাপ দর্শকের চোখে জল নিয়ে আসতে সক্ষম হচ্ছে।” পূর্বপ্রসঙ্গে বলেছেন—“যাত্রার আদিরূপ ছিল কিন্তু পুরাণ নির্ভর, শিবযাত্রার হাত ধরে যার যাত্রা শুরু। তা থেকে রামযাত্রা-কৃষ্ণযাত্রা-কালীয়দমন যাত্রা (কৃষ্ণযাত্রার আদিরসাত্মক রূপ)—উনিশ শতকে নতুন—যাত্রা—তা থেকে গীতাভিনয়—উনিশ শতকের শেষে সখের যাত্রা—বিশ শতকের শুরুতে তা পরিণত হল থিয়েট্রিক্যালে। যুগের প্রয়োজনে যাত্রা বরাবর তার আঙ্গিক বা রূপের বদল ঘটিয়েছে। কিন্তু যার হাত দিয়ে যাত্রার জাগরণ সেই সত্তারই অনুসন্ধান করেছে বরাবর।”৭
স্বপনকুমার ঠাকুর তাঁর গঙ্গাহৃদি বঙ্গভূমি পুস্তকের৮ একটি অধ্যায়ের নামকরণ করেছেন ‘যাত্রা দেখে ফাতরা লোকে’। নাজিবুল ইসলাম মণ্ডল লিখেছেন, “সেদিনের সেই সব উৎসব সমাবেশে ‘যাত্রা দেখে ফাত্রা লোকে’ বলা যেত না। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মুখর হয়ে উঠত। সব শ্রেণির মানুষেরও উজ্জ্বল উপস্থিতি বিশেষভাবে উল্লেখ্য।”৯
অতীশ পালের একটি বয়ান দেখে নিই (মুখ-বই, ২২ মে ২০২৬)। তিনি লিখছেন :
‘“যাত্রা দেখে ফাত্রা লোকে”। এমন একটি শব্দবন্ধ নিশ্চয়ই ফাত্রা মানুষের নয়। এমন কটাক্ষ তাঁরাই করেছেন যাঁরা নিজেদের সমাজের জ্যাঠামশাই ভাবেন। এই শিষ্ট জ্যাঠামশাইরাই বলে দেন কোনটি শ্লীল বা কোনটি অশ্লীল। কোনটি শিল্প বা কোনটি শিল্প নয়। ‘ফাত্রা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ যতদূর জানি মূল্যহীন, খেলো, বাজে, ধাপ্পাবাজ, বাচাল, হালকা বা অপ্রয়োজনীয়। যাঁরা যাত্রা দেখেন তাঁরা যদি ফাত্রা হন তবে যাত্রা যাঁরা করেন বা যাঁরা পালা রচনা করেন তাঁরা কি? তাঁদের জন্য শিষ্ট মানুষের কি বিশেষণ, সেটি অবশ্য আমার জানা নেই। এবার খানিকটা জেনে নেওয়া যাক এই ফাত্রাদের জন্য যাঁরা যাত্রাপালা করেছেন বা লিখেছেন তাঁরা কারা?’ এর পর সেকালের বেশ কয়েকটি যাত্রাপালার উল্লেখ করে বলেছেন যে সেসবের মতো পালাগান ‘বহু মানুষকে যে ফাত্রা বানিয়েছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।’ লিখেছেন, “১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় নট ও পালাকার মুকুন্দ দাস নিজেও কতখানি ফাত্রা ছিলেন তা কারো অজানা নয়। এতটাই ফাত্রা ছিলেন তিনি যে যাত্রা পালা করতে গিয়ে হাসিমুখে কারাবাসও করেছিলেন। এ তো গেল সেকালের কথা এবার একালের ফাত্রা বানাবার কারিগরদের দিকে একটু নজর দিলে দেখবো কে নেই সেই সারিতে। কাকে বাদ দিয়ে কার কথা বলবো সেটা ভাবতে গিয়ে খেই হারিয়ে যাবে। সুতরাং সে রাস্তায় হাঁটার সাহস দেখালাম না। শুধু বলি স্টুডিওর ঘেরাটোপে না এসে আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়া একেবারে খোলা মঞ্চে হাজার হাজার মানুষের সামনে যে গান বীনা দাশগুপ্ত, লতা দেশাই, ছন্দা চ্যাটার্জি, মল্লিকা চ্যাটার্জিরা গেয়েছেন তাতে ফাত্রা না হয়ে উপায় আছে?” নিজের সম্বন্ধে বলেছেন যে ছোটবেলা থেকেই ফাত্রা তিনি। “যাত্রার নেশায় ফাত্রা হয়ে খুব কম মার আমি খাইনি বাল্যকালে। সমাজে কিছুটা এগিয়ে থাকা আমার পরিবারও মনে করতেন যাত্রা দেখে ফাত্রা লোকে। ও বাবা! পাঁচগাছিয়ার ওই ফাত্রার আসরে গিয়ে দেখি আমার মতো হেঁজিপেঁজি নয় বহু জ্ঞানীগুণী ফাত্রা সেখানে জড়ো হয়েছেন। এই ফাত্রা সমাবেশের উদ্যোক্তা ছিলেন সুচেতনা।” লেখাটি মূলত গৌতম মণ্ডল সম্পাদিত ষাণ্মাসিক সুচেতনা পত্রিকার বাংলা যাত্রা সংস্কৃতির সেকাল ও সমকাল সংখ্যার১০ প্রকাশ-অনুষ্ঠান নিয়ে। এই সখ্যায় ‘শৈশবের যাত্রাপালা ও গ্রামীণ সংস্কৃতি’ শীর্ষক চমৎকার এক লেখা আছে শ্রী পালের। ফাত্রা দর্শকদের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে তিনি দর্শক-শ্রোতা থেকে পালাকার, যাত্রাশিল্পী প্রভৃতি অনেককে টেনেছেন।
দৃষ্টান্ত কয়টি থেকে যাত্রা দেখে ফাত্রা লোকে-র থেকে যাত্রা করে ফাত্রা লোকে-র দিকে পাল্লা ভারী নয় কি! যাত্রা দেখা বা শোনার লোক যাত্রা দেখে হাসেন কাঁদেন, আর যাত্রা করার লোক হাসান কাঁদান। যাত্রা দেখার লোকের আবেগ অনেকটাই খাঁটি, যাত্রা করার লোকের আবেগ সৃষ্ট— সদর্থে হলেও অনেকটা মেকি, অভিনয়টাই সেখানে প্রধান। অর্থাৎ আবেগের ভাব করা, হাসার ভাব করা, কাঁদার ভাব করা— কতটা বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যায়। সত্য বলে প্রতিভাত করানো যায়। কিন্তু বাস্তবসম্মত করে তোলার চেষ্টায় অভিনেতা-অভিনেত্রী অভিনীত চরিত্রের সঙ্গে অনেকসময় একেবারে একাত্ম হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু একই কথা, বিশেষত পেশাদার যাত্রাদলে একই ভাবভঙ্গি বলতে গেলে দিনের পর দিন তাঁদের করে যেতে হয় অনেকসময় পুতুলের মতো প্রায়, আর দর্শক-শ্রোতা যখন তা দেখছেন শুনছেন সেই সময়টুকুর জন্যে, সেই সময়টুকুতে তাঁরা খাঁটি কিছু অনুভূতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, সেই অনুভূতিতে বাস করছেন, সেই অনুভূতির সঙ্গী হয়ে যাচ্ছেন এবং সেইমতো আন্দোলিত হয়ে উঠছেন। অন্তত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভিনয় প্রদর্শনের সময়ের মুহূর্তগুলো জুড়ে। অর্থাৎ অভিনয়ের মধ্যে থাকে একরকম ফাঁকি, সৃজনমূলক সদর্থক হলেও। কিন্তু দর্শক-শ্রোতা অনেকটা খাঁটি অন্তত সেই মুহূর্তে।
যাত্রা দেখার লোকেদের সচরাচার একটা পরিবার— তাঁদের নিজ নিজ; যাত্রা করার লোকেদের, বিশেষত পেশাদার যাত্রাশিল্পীদের সচরাচর দুই পরিবার— একটা নিজ নিজ, আর একটা তাঁদের যাত্রা-পরিবার। উভয় পরিবারেই আছে হাসি-কান্না, সমস্যা-সম্ভাবনা। এদিকে দুটো পরিবার ভিন্নধর্মীও। অভিনয়ের জগৎ বলতে গেলে ভিন্ন ভিন্ন পরিবার থেকে আসা মানুষের জগৎ। সচরাচর সাবালক। পোড়খাওয়াও অনেকেই। দুই পরিবারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা, দায়দায়িত্ব পালন ইত্যাদি নেহাত কম সমস্যার নয়। অনেক সময় ক্ষতবিক্ষত হতে হয়। বিশেষত পেশাদার যাত্রাজগতের লোকেদের দিনের পর দিন আপন পরিবার ছেড়ে কাটানো, জেলার পর জেলা থেকে রাজ্যের পর রাজ্য। দক্ষিণের কলকাতা ও তার আশপাশের জেলা থেকে উত্তরবঙ্গ ছাড়িয়ে আসাম, ত্রিপুরা, বিহার বা পরে ঝাড়খণ্ড। বাড়ির সমস্যা থেকে যাত্রাজগতের মানুষদের মধ্যে পারস্পরিক মেশামিশি, সঙ্গ-সান্নিধ্য, সুখ-দুঃখ, দলাদলি তথা দল পালটানো, লোভ, দুর্নীতি, কথার খেলাপ, ঠকানো, প্রাপ্যে বঞ্চিত করা, অভিনেত্রীদের অসহায়তার সুযোগ নেওয়া, সম্পর্কের বাইরে সম্পর্ক গড়ে তোলা বা ভেঙে ফেলা আরও আরও অনেককিছু। থিয়েটারে লোকশিক্ষে হয়, রামকৃষ্ণ বলেছিলেন। ব্যাপকার্থে বলা যায় অভিনয়ে লোকশিক্ষা হয়। দেখার লোকেরা যাত্রা দেখে কতটা শিখতে পারলেন, তার থেকে যাত্রা দেখানোর লোকেরা অর্থাৎ অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কতটা পালন করতে পারলেন দুটোর অভিঘাত আলাদা বই-কি! দেখে, নিতে না পারার থেকে দেখানো অর্থাৎ শিক্ষা দেওয়া লোক বা শিক্ষক নিজেই শিক্ষণীয় বিষয় আপনি আচরি ধর্মতে পরিণত করতে না পারলে খামতিটা অধিক মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়, অপরাধবোধ জাগাও নয় অসম্ভব। মানুষ অভিনয় দেখেছে, অভিনয় ভুলেছে, আবার ভোলেনিও। পালার শিক্ষা থেকে শিক্ষা নিয়েছে, আবার নেওয়া সম্ভব হয়নিও যে-যার নিজস্ব বাস্তবতায়, নিজস্ব স্বভাবধর্মে। পারস্পরিক বিবাদ ভুলে পরস্পরে বিবাদ মিটিয়ে নিল এমনও দেখা গেছে। দেখা গেছে শাশুড়ি-বউ এসে পালাকার-অভিনেতার কাছে জানাচ্ছেন যে তাঁর পালা তাঁদের বিবাদ মিটিয়ে দিল। কাহিনির মধ্যে নিজেদের বা নিজেদের পরিবারের ছায়া দেখে কত মানুষ কেঁদেছেন! যেন তাঁদেরই কাহিনি, জানিয়েছেন তাঁরা তা পালাকার-অভিনেতাকে। তাছাড়া ভাল যাত্রার স্মৃতি রয়ে যায় ভবিষ্যতেও, অনেক সময় আজীবন। থিয়েটার বা চলচ্চিত্রেজগতে একাধিক দৃষ্টান্ত থাকলেও যাত্রাজগতের দিকপাল অভিনেতা-অভিনেত্রীরা খুব একটা স্মৃতিকথা বলতে গেলে কেউই লিখে যাননি বা লিখছেন না। কেউ কেউ অসম্পূর্ণ দু-একটা লেখা লিখে গেছেন বা শুরু করে, কিছুটা এগিয়ে আর শেষ করে যেতে পারেননি। কেউ-কেউ সাক্ষাৎকারে বলে গেছেন কিছু কিছু কথা। কেন? আসলে লিখতে গেলে অভিনয়জগতের অনেক ভিতরের কথা বেরিয়ে আসবে, নিজেদের কথা হয়ে যাবে, সৎভাবে সব কথা অকপটে বলা যাবে না। মাত্র কয়েক বছরই আগে— ২০২২ সালে আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ আত্মস্মৃতি পেলাম নির্মল মুখোপাধ্যায়ের (পূর্বোক্তআমার যাত্রা জীবন)। বইয়ের দ্বিতীয় ব্লার্বে লিখতে হল, “সাহিত্যের ইতিহাসে, প্রথম কোনো যাত্রাশিল্পী তাঁর আত্মকথা লিখে নতুন নজির তৈরি করলেন।” সেটা সম্ভব হয়েছিল অনেকটা সম্পাদক প্রভাতকুমার দাসের সৌজন্যে এবং মীনা কুমারীর তাগিদে। নির্মলবাবুকে স্যালুট, শুরুতে ‘আমার কথা’-তে তিনি লিখছেন, “আত্মকথায় যদি কাল্পনিক কিছু সংযোজন করা হয়, সেটা যেমন আত্মপ্রতারণা, তেমনি যদি সত্য গোপন করা হয় সেটাও আত্মতঞ্চকতা। এই গ্রন্থে যা যা উল্লিখিত হয়েছে, তা বিন্দুমাত্র অতিরঞ্জিত বা মিথ্যা নয়।” যথাসাধ্য সে-কথা তিনি রেখেছেন, তাঁর বইটি পড়লেই বোঝা যায়। আর বোঝা যায়, কেন যাত্রাজগতের বড় বড় ব্যক্তিত্বদের আত্মস্মৃতি বা আত্মজীবনী লেখাটা বেশ কঠিন। সে কথায় আমরা পরে আসছি।
যাত্রা-নাটকের, বিশেষত যাত্রার প্রতি গ্রামীণ মানুষ অপ্রতিরোধ্য টান অনুভব করে এলেও, তাকে ‘পোঁদ নাচানো’ বলতেও বাধেনি তাদের। কবিগানেরই দোসর তরজাকে তার চাপান-উতোরের আবহে ঝগড়া-কলহের অনুষঙ্গেও দেখেছি আমরা। বলেছি, তোরা এসব তজ্জা/তরজা জুড়িচিস কেন রে! ‘পোঁদে-বাড়ি পুতুলনাচ’ বলেছি ডাং-পুতুলনাচকে! বলেছি, কী রে, পোঁদে-বাড়ি পুঁতুলনাচ/পুতুলনাচ দেকতি যাবিনি?
অভিনয়ের নেশার সঙ্গে সঙ্গে অন্য নেশাও যুক্ত ছিল না এমন বলা যাবে না। উনিশ শতকীয় বাই-নাচানো বাবু-কালচারে মদ্যপান একটি অতি সাধারণ ঘটনা ছিল। তাঁরা কেউ কেউ অভিনয়ে যুক্ত ছিলেন অথবা অভিনয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। নাটক, যাত্রায়। জমিদাররা আয়োজন করতেন যাত্রাভিনয়, ঝুমুর, কবিগানের। অভিনয়ের সঙ্গেও মদ-তাড়ির সংযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক গণ্যমান্য অভিনেতা মদ্যপ ছিলেন। নাট্যজগতের নট ও নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ তো এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মঞ্জরী অপেরা উপন্যাস থেকে একটু অংশ শুনে নিই— “গোরাবাবু মদ খেয়ে গ্লাস শেষ করে নামিয়ে রেখে বললে— রাইট। খুব ঠিক বলেছেন। আর আছে কি আমাদের? মঞ্জরী এই কথাটা বোঝে না। কাল আমাকে বলছিল, আজকাল অন্য অন্য দলে নতুন পাস-করা ছোকরারা ঢুকছে, তারা নাকি খাচ্ছে না। আমি বললাম, খাচ্ছে না, খাবে। আর যদি না খায় তবে অ্যাক্টর হতে পারবে না। তখন বলে আসরের লোকে ও সইবে না। শোন কথা! নেশা না হলে অ্যাক্টিং হয়? নেশা না হলে আমি ভাবব কি করে, আমি গোরা ওরফে বিজয় চক্রবর্তী, আমি ধাঁ করে দেবতা হয়েছি কি রাজা হয়েছি কি মরে যাচ্ছি!” অর্থাৎ এমনিতে নেশা করা লোক এবং নেশা না করলে কি আর ঠিকঠাক অভিনয় আসে— এই দুটি ধরনই বর্তমান। অতিরিক্ত মদ্যপান করে ফেলার ফলে অভিনয়ে তার প্রভাব পড়েছে এমন দৃষ্টান্তও আছে বই-কি! যাই হোক, দেবব্রত নস্করের নিজের গ্রামকে নিয়ে লেখা পুস্তক বেগমপুরের ইতিহাস থেকে একটি দৃষ্টান্ত দিই— “পঞ্চানন কয়াল, নফরচন্দ্র নস্কর, রজনী নস্কর, সীতাকুণ্ডুর গোলাম সাঁফুই এই দল গঠনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন। পঞ্চানন অপেরা পরিচালনার আর্থিক যোগান দিয়েছেন পঞ্চানন কয়াল ও গোলাম সাফুই এবং নফরচন্দ্র নস্কর ও রজনী নস্কর দলের লোকেদের অন্ন ও তাড়ি যুগিয়েছেন।”১১ দর্শক-শ্রোতারাও একেবারে নেশা করতেন না এমন বলা যাবে না। এই নিয়ে আসরের আশেপাশে হই-হল্লা দুর্লক্ষ্য ছিল না। মঞ্চে উঠে নর্তকী বা অভিনেতা-অভিনেত্রীকে টাকা উপহার দিতে দেখা যেত একসময় যাদের, তাদের মধ্যে নেশার ঘোরে টলটলায়মান কেউ কেউ যে থাকত না তা বলা যাবে না।
অ্যামেচার যাত্রায় আমরা দেখেছি, পয়সাওয়ালা লোক যোগ্যতা না থাকলেও প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করতে। কারও কারও তো রাজা বা জমিদারের পার্ট চাই-ই চাই। তিনি বেশি চাঁদা দিচ্ছেন না! শরীর হালকা বলে গায়ে কাপড় জড়িয়ে নিজেকে স্বাস্থ্যবান করে তুলে ধরতেও দেখা গেছে। যাত্রার পাল্লায় পড়ে ফতুর হতে দেখেছি মানুষকে। এই ‘পোঁদ নাচানো’ নেশার কলে পড়ে নির্ধন যেযন ফতুর হয়েছে, ধনবানও ফকির হয়েছে। কত সংসারকে ডুবিয়েছে পুরুষ যাত্রার পাল্লায় পড়ে! এমনিতে যাত্রা-নাটকের লোকেদের চরিত্র নিয়ে সমাজে খুব উচ্চ ধারণা ছিল না। ক্রমসামর্থ্যহীনতায় সংসারকে ডুবিয়েছে, অন্য নারীসঙ্গে পড়ে সংসারকে ডুবিয়েছে এমন দৃষ্টান্ত কম নয়। স্বামী অভিনয়ে গেলে, রাতে তেমাথায় স্ত্রীকে অপেক্ষা করতে দেখেছি উদ্ভিগ্নভাবে, কখন ফিরবে! কোনও কোনও অভিনেত্রী ছেলেমেয়ে হয়ে গেলে তাদের ভালভাবে মানুষ করার জন্যে অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও, ছাড়তে না পেরে স্বামীর সঙ্গে অভিনয়ে থেকে যান, যাতে স্বামী বেহাত না হয়ে যান! উলটোটারও, অর্থাৎ অভিনেত্রী-স্ত্রীকে একা না ছেড়ে সঙ্গে থাকার দৃষ্টান্ত একেবারে নেই তাও বলা যাবে না। জনপ্রিয় সুদর্শন অভিনেতাকে কত নারীর আবেদন-আহ্বানকে যে সসম্মানে অগ্রাহ্য করতে হয়! বিপরীতটিও বিরল নয়, অর্থাৎ জনপ্রিয় সুন্দরী অভিনেত্রীদেরও এড়াতে হয় পুরুষদের আবেদন-আহ্বান। সবসময় তা পারা সম্ভব হয় না। সেই, প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে।/কে কোথা ধরা পড়ে কে জানে! মানুষী সত্তা কোনো বাধাকেই অনেকসময় বাধা মানে না। মরণঝাঁপ দিতে দেখাও অসম্ভব নয়। কখনও কোনও সম্পর্ক মহিমান্বিত হয়, তো কখনও মনোবেদনার।
যাত্রার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের, বিশেষত অভিনেতাদের উপর, নিবিড় সান্নিধ্যহীনতার কারণে ছেলেমেয়েদের অভিমানের খবর কে-ই বা রেখেছে! থিয়েটার হোক বা যাত্রা— অভিনয়ে লোকশিক্ষে হয় তা অস্বীকার করার নয়, কিন্তু যাত্রা যাঁরা করেন তাঁদের সবসময় লোকশিক্ষে হয় তো! যাত্রার অন্তর্জগৎ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ যাত্রা তেমন হয়েছে কি না জানা নেই সেইভাবে, পালাকার-অভিনেতা নিজেরই পরিবারকে নিয়ে যাত্রা লিখতে বাধ্য হয়েছেন এমন দৃষ্টান্ত আছে।
আমরা দেখেছি ফড়ের যাত্রা। ফড়-রূপ জুয়া যাত্রার ব্যয়ভার বহন করত। এক-এক জায়গায় কোনও কোনও সময় এক-দু সপ্তাহ থেকে মাস অবধি যাত্রা চলত মূলত ফড়ের টাকায়। মনে পড়ে, মগরাহাটে সুলেখা সিনেমা হলের দক্ষিণ গায়ে চটির মাঠে (এখন দোকান ইত্যাদি সেখানে) প্রায় মাসখানেক ধরে ফড়ের যাত্রা হত (মনে আছে, এখানে দেখেছিলুম জ্বলন্ত বারুদ)। দর্শক-শ্রোতারা উদ্বিগ্ন হতেন, আওয়াজ তুলতেন, কখন যাত্রা শুরু হবে? কখন যাত্রা শুরু হবে? কিন্তু যতক্ষণ না মোটামুটি পরিমাণ একটা টাকা উঠছে ততক্ষণ সচরাচর যাত্রা শুরু হত না। দু-একদিন পরপর তেমন টাকা না উঠলে আসর বাতিল হয়ে গেছে এমনও দেখা গেছে। ফড় খেলে কত দর্শক-শ্রোতা যে তবিল ফাঁকা করে বাড়ি ফিরত বা ফতুর হত তার ঠিকঠিকানা নেই। নগদ ফুরিয়ে গেলে হাতঘড়ি, সাইকেল, এমনকি বিয়ের আংটি-বোতাম ইত্যাদি বাঁধা-বন্ধক দিয়ে বা বিক্রি করে ফড় খেলাও দেখা যেত। ফড়-প্রিয় স্বামীদের অনেক স্ত্রী যাত্রায় আসতে নিষেধ করত, মান-অভিমান চলত, ঝগড়াঝাঁটি। এমনকি ফড়ের জায়গায় গিয়েও পরিবারের লোক প্রতিবাদ করেছে, সরিয়ে এনেছে, ফড়ের লোকেদের সঙ্গে ঝগড়া করেছে এমন অনেক কিছুরই সাক্ষী আমরা। এক্ষেত্রে কিন্তু যাত্রা দেখে বা শোনে ফাত্রা লোকে খানিক উপযুক্ত।
মহিলা দূরের কথা— তাঁরা যাত্রাভিনয়ে এসেছেন অনেক পরে— পুরুষদের যাত্রায় অভিনয় করাও অনেকে ভাল চোখে দেখত না সমাজে। প্রথমে পুরুষরা স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করতেন, পরে গত শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে যখন মহিলারাও অভিনয়ে এগিয়ে এলেন, তাঁদের অভিনয় দেখেছেন মানুষ, কিন্তু সমাজজীবনে সবাই খুব সহজভাবে নেননি তাঁদেরকে। তার উপরে অভিনয়ে নারী আসায় নারী-পুরুষ উভয়ের একত্র অভিনয়ের প্রেক্ষিতে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চরিত্রগত দিক নিয়ে অনেক সময় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রথমদিকের ভক্তিমূলক পালা থেকে পরে পরে সামাজিক পালাও শুরু হয়েছে। মহিলারা বেশির ভাগই আসতেন দরিদ্র পরিবার থেকে। তাঁদের আত্মসম্মান বজায় রেখে অভিনয় করা অনেক সময় সম্ভব হত না। অনেক সময় অল্পবয়সি অভিনেত্রীদের পরিবারের কেউ অভিনেত্রীদের সঙ্গে থাকতেন অথবা চাইতেন একইসঙ্গে দুই বোনকে নেওয়া হোক, যাতে কোনো অপ্রীতিকর কিছু না ঘটে। উভয় ক্ষেত্রেই সহ-অভিনেতারা বা যাত্রামালিকরা মনে মনে ক্ষুণ্ণ হয়েছেন এমনও দেখা গেছে। অসন্তোষ কখনও প্রকাশ্যে এসে পড়েছে তা, পরোক্ষভাবে হলেও। তাতেও সবকিছু আটকানো যায়নি। যাত্রায় বিভিন্ন মরশুমে জুটি পালটানোর অভিঘাত নায়ক-নায়িকা বা সহ-অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জীবনেও অনেক সময় প্রভাব ফেলে বই-কি!
মঞ্জরী অপেরা উপন্যাসে পিছল পথের কথা আছে। এ উপন্যাস থেকে আর একটু উদ্ধৃত করি। “অভিনেত্রীর কর্মটি এদেশে এ পর্যন্ত মেয়েদের মধ্যে তারাই করে যারা আসলে দেহব্যবসায়িনী। থিয়েটারে তারা চাকরি করে, তাতে তাদের উপার্জন বাড়ে। আগেকার কালে যখন সারারাত্রি বা রাত্রি দুটো তিনটে পর্যন্ত অভিনয় হত তখন শনি রবি বুধ পরে বুধের বদলে বৃহস্পতি তিনদিন ছাড়া বাকী চারদিন তাদের পেশার উপার্জন অবকাশ থাকে। কিন্তু যাত্রার দলে, মফস্বলে এ পথ বন্ধ হয়ে যায়। মাইনেও যাত্রাদলে থিয়েটার থেকে কম। তার উপর কষ্ট পথের। কত জায়গায় গরুর গাড়িতে দশ বিশ মাইল চলতে হয়। পুরুষেরা হেঁটে মেরে দেয়। তারা সঙ্গে চিঁড়ে রাখে গুড় রাখে, পথে তাই ভিজিয়ে খেয়ে পথ চলে। মেয়েরা তা পারে না। তার উপর প্রয়োজন রক্ষকের। শাস্ত্রে নারী এবং পুরুষের উপমা দিয়েছে ঘি এবং আগুনের সঙ্গে। চারিদিকে বা দশদিক থেকে যখন বিশ তিরিশ আগুন লোলজিহ্বা বিস্তার করে তখন ঘিয়ের বিপদ। সেই কারণে মেয়েদের যাত্রার দলে নেয়ও না, মেয়েরাও যায় না।”
আমার যাত্রা জীবন থেকে একটু তুলে ধরি। “লক্ষ্মীদা জিজ্ঞেস করলেন, নায়িকাকে তোমার কেমন লাগে? বললাম, ভালো, খুব ভালো মেয়ে। উনি বললেন, গরিব ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়ে। দেখতে রূপসী, যাত্রাদলে দুরাত্মা ইতরের অভাব নেই। কতদিন তারা ওকে ভালো থাকতে দেবে? ডলিকে তুমি বিয়ে করো।...” ডলি চ্যাটার্জিকে বিয়ে করার জন্যে নির্মল মুখোপাধ্যায়কে এভাবেই প্রস্তাব দিয়েছিলেন সহকারী ম্যানেজার লক্ষ্মী ভট্টাচার্য।
নির্মলবাবুর ভরসাতে দুই অভিনেত্রীকে দলে পাঠিয়েছেন তাঁদের বাবা-মা। কিছু কেনাকাটা করতে হলে তাঁরা তাঁকে নিয়ে যেতেন। দুই ম্যানেজারের তা পছন্দ নয়, বলেন, “নির্মলের সঙ্গে যাস কেন? তোরা কি নির্মলের চাকরি করিস? ও কি তোদের মাইনে দেবে?” তাঁদের ভয়ে তাঁরা তাই কম আসতেন নির্মলবাবুর কাছে। দুই ম্যানেজার তাঁদের ফ্রক, প্রসাধনী সামগ্রী কিনে দিতেন। কিছুদিন পর অন্য অভিনেত্রীদের সঙ্গে থাকা বন্ধ করে দিয়ে নিজেদের কাছে আলাদা ঘরে রাখতে শুরু করলেন! ‘দলটাই নোংরামীর আস্তাকুঁড়’ বলে লিখেছেন তিনি, “দল মালিক অমূল্য ঘোষ থাকতেন যিনি রানির চরিত্র করতেন তাকে নিয়ে। কালি সাহা সহ নায়িকাকে নিয়ে। নায়ক, কালিঘাটের শ্যামল গোস্বামী জুটিয়ে নিলেন, মীরা মুখার্জির বোন প্রধান নর্তকী ধীরাকে। আর পাঁচুগোপাল মুখোপাধ্যায়ের প্রেমিকা ছিলেন প্রধান নায়িকা অঞ্জনা বসু।” উক্ত দুই অভিনেত্রী— ছায়া ও সাধনার ব্যাপারটা মেনে নিতে না পেরে তীব্র প্রতিবাদ করায় ম্যানেজাররা আটকে দিলেন নির্মলবাবুর মাইনে। চাইলে, কেবল দশ-বারো টাকা দিতেন। সেই বকেয়া মাইনে আদায় করতে সে আর এক পালা! তাঁর শুভানুধ্যায়ীদের যাত্রার আসরে পালা বায়না করার অভিনয় করে রগে রিভলবার চেপে ধরে বলতে হয়, “যাত্রা শেষ হওয়ার আগে নির্মল মুখার্জি সহ যে দুটো মেয়েকে নিয়ে তোরা ফুর্তি মেরেছিস, তাদের সবার মাইনে মিটিয়ে দিবি, তিন জনের বেডিংপত্র জিপে তুলে দিবি। সাজঘরে গিয়ে একথা কাউকে বললে তিনটেকেই লাশ বানিয়ে দেবো।…”
চুক্তিভঙ্গ করা, করানো, একই যাত্রাপালা ভিন্ন নামে একাধিক দলে চলা বা চালানো, মরশুমশেষে প্রাপ্য টাকা পুরো না দেওয়া, ইচ্ছা করে পালা ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ইত্যাদি আকছার ঘটনা ছিল যাত্রা-দুনিয়ায়।
আর একাকিত্ব, সে কি কেবল নিছক শিল্পীসুলভ একাকিত্ব! নির্মল মুখোপাধ্যায়ের কথা শুনুন, “পুরো অর্ধ শতাব্দী অবিচ্ছিন্ন ভাবে বিনোদন মূলক পেশাদার জীবন থেকে ছিটকে পড়ে একা হয়ে যাওয়া যে কত দুঃসহ, ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কেউ তা বুঝবে না। তার ওপর সেই ছিটকে পড়া ব্যক্তি যদি আপনজনের সান্নিধ্য না পায় তা হলে জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে যায়। আমি তার জ্বলন্ত প্রমাণ।” এর সঙ্গে জুড়ে নিন এই অংশটা : “২০১৫ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত মাঝে মাঝে চন্দননগর গিয়ে থাকতাম। বাড়ির সবাইকে দেখার খুব ইচ্ছে হতো, কিন্তু চন্দননগর গেলেই একটা অপ্রাপ্তি, উপেক্ষা জীবনকে ঘিরে ধরে মনকে কষ্ট দিতো (এখনো দেয়)। কিছুদিন থেকে আবার চলে আসতাম বাঁশপাল্লায় মীনার কাছে। ২০১৮ সাল থেকে আর চন্দননগর যাইনি। প্রিয়জনদের উপেক্ষা— কারা-শাস্তির চেয়েও কষ্টদায়ক।”১২ যাত্রাশিল্পের একাধারে অনন্য এই পালাকার-নির্দেশক-অভিনেতা আপন অকপট আত্মস্মৃতিতে ব্যাপারটাকে একতরফা বলতে পারেননি। স্ত্রী ডলির দিকটিও তিনি অনুভব করেছেন যথাযথ— পরিবারকে বুঝতে চেষ্টা করেছেন যেমন, মর্যাদা দিয়েছেন, বিশ্লেষণ করার সঙ্গে সঙ্গে পেয়েছেন কষ্টও। যে বিবেচক ব্যক্তিত্বময়ী মীনা কুমারী তাঁর একাধারে গুরু ও জীবনসঙ্গী নির্মলবাবুকে এত ভালবাসা ও যত্নে রেখেছেন, সাময়িক দুর্বলতায় অন্য নারীসংসর্গের কারণে তাঁকে এমন আঘাত দিয়ে ফেলেছিলেন যে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন মীনা। এসবের কথা এড়িয়ে যাননি তিনি তাঁর আত্মস্মৃতিতে। দৃষ্টান্ত অনেক। আমরা আর মাত্র একটি দিয়ে, এ দিকটি ছাড়ব। খ্যাতনামা প্রয়াত নট সুজিত পাঠক তাঁর স্নেহের পাত্রপাত্রীদের যাত্রাশিল্পকে পেশা হিসাবে বেছে নেওয়ার প্রশ্নে বলছেন, “কুলিগিরি করে খা, তবু এ লাইনে আসিসনি!” অবসর কীভাবে কাটে জানতে চাওয়ায় জানান, “বানপ্রস্থে। সকালে ঘর থেকে বের হই, কোনভাবে বাথরুম— তারপর ওই মন্দিরে গিয়ে শুয়ে থাকি। দুপুরে খাই। তারপর ঘরের মধ্যে পড়ে থাকি। বিকালে চোখে দেখতে পাই না, তাই বের হতে পারি না। এই সেই সুজিত পাঠক, যাকে দেখতে মানুষকে টিকিট কাটতে হত, আজ তার সঙ্গে দু’দণ্ড কথা বলার কেউ নেই। আজ তোমরা এসেছ— কথা বলে আনন্দ পেলাম।… এখন দিনরাত ঠাকুরকে ডাকি— ঠাকুর এই চরম একাকিত্ব থাকে আমাকে মুক্তি দাও।”১৩
অতীশ পালের যে লেখাটির উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানেও এই বিড়ম্বিত-জীবন বঞ্চিত শিল্পীর অন্যরকম সম্মানের সন্ধান পাওয়ার কথা রয়েছে। “সীতার কথায়, আমার এই স্বল্প জীবনের পরিসরে অনেক লাথি-ঝাঁটা খেয়েছি, কিন্তু সত্যিই সম্মান পেয়েছি আমারই মতো কিছু গরীব মানুষের কাছে। এরা আমাকে প্রায় দেবীর মতো দেখেছে। আমার গলার মালা কিনে নিয়ে ঘরে ঠাকুরের পায়ে রেখেছে। প্রকৃত অর্থে আমার সিঁদুর জোটেনি, সেই আমারই সিঁদুর নিয়ে ওরা নিজেদের নড়বড়ে সংসার মজবুত করতে চেয়েছে। কথাগুলো হয়তো এ ভাষাতে নয়, কিন্তু ভাবটা এমনই।”১৪ বাস্তবের চরিত্র এখানে সীতা নামে, কিন্তু এমন সীতা কম নয় যাত্রাজগতে।
এখন কথা হল, নেশা তো অন্যান্য শিল্পী বা পেশার লোক তো বটেই, সাধারণ লোকও করে থাকেন, আর স্খলন পতন ইত্যাদি অন্য পেশা বা শিল্পেও যে দেখা যায় না তা তো নয়। এমনকি নিতান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যেও তা দুর্লক্ষ্য নয়। কিন্তু আমাদের বক্তব্য খুব স্পষ্ট, অতীতের বা অন্য ক্ষেত্রের দৃষ্টান্ত দিয়ে যাত্রাজগতের অভ্যন্তরীণ নানান খামতি, দুর্বলতা, দুর্নীতি, অন্যায় ইত্যাদিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যে প্রবাদ নিয়ে আমাদের আলোচনা— মূল বক্তব্য হল— প্রবাদ যখন, তাতে অন্তত কিছুটা সত্য আছে বলেই তা মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছে। বিদ্যমান থেকেছে দীর্ঘদিন। তাই এ প্রবাদকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই। অন্যান্য শিল্পের থেকে যাত্রাশিল্পে যেহেতু জুটিবদল থাকে, দীর্ঘদিন গৃহ তথা পরিবার-ছাড়া থাকতে হয় এবং দূর-দূরান্তে ভ্রমণ করতে হয়, একসঙ্গে নানান পরিবেশ-পরিস্থিতি, ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্যে দিয়ে সুখ-দুঃখে একটানা কাজ করে যেতে হয়, তাই এখানে এসবের সম্ভাবনা বেশি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাছাড়া একটা সময় যাত্রাশিল্পে প্রচুর অর্থাগম হওয়ার ফলে এক-একজন মালিক একাধিক দল করলেন, ছায়াছবির জগতের অনেকের যাত্রাশিল্পের দিকে নজর পড়ল, এসব বুঝিয়ে দেয় যাত্রায় সম্মান, অর্থ ইত্যাদি আছে, একইসঙ্গে তার মধ্যে অনেক খামতি দুর্বলতাও প্রশ্রয় পেয়েছে। অবশ্যই সময়ের নিয়মে পেশাদার যাত্রাশিল্পের সে রমরমা আজ আর নেই। বরং অ্যামেচার যাত্রা বা শখের যাত্রার মাধ্যমে কিছুটা হলেও সে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখছে। যে-কোনো পেশা বা শিল্পে সবাই খারাপ, বদস্বভাব বা দুর্নীতিপরায়ণ তা তো হতে পারে না। তাছাড়া যে-কোনো পেশা বা শিল্পের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য বাধ্যবাধকতা সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি থাকাটাই স্বাভাবিক। তার পরেও কিন্তু বলতে হয়, প্রবাদটা নিতান্ত প্রলাপ ছিল না।
.......................
নিবন্ধে উল্লেখ ছাড়াও কয়েকটি উল্লেখসূত্র ও ঋণস্বীকার :
১) বিমলেন্দু হালদার তাঁর দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার যাত্রাগান : ইতিহাস আলোচনা (প্রথম খণ্ড) বইয়ে (প্রিয়নাথ প্রকাশনী, ১৪ এপ্রিল ২০১১) হরিশংকরপুর লিখেছেন, এটি মগরাহাট সংলগ্ন একটি গ্রাম— আদতে যা হবে ঘনশ্যামপুর। এখানকার মানুষের স্মৃতিতে তা ধরা আছে। বিমলেন্দুবাবুকে এ-বিষয়ে প্রশ্ন করলে, তিনিও তা মেনে নিয়েছেন।
২) রানী চন্দ, আমার মা’র বাপের বাড়ি, ১ বৈশাখ ১৩৮৪, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ
৩) দেবজিত্ বন্দ্যোপাধ্যায়, নির্বাচিত বাংলা যাত্রা (১ম খণ্ড), পশ্চিমবঙ্গ যাত্রা অকাদেমি, ২০০৮
৪) সুশীল কুমার দে-র সম্পাদিত বাংলা প্রবাদ — ছড়া ও চলতি কথা (৫২০৩ সংখ্যক প্রবাদ), ১ম সং, রঞ্জন পাবলিশিং হাউস, আশ্বিন ১৩৫২
৫) জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, ইণ্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৫ পৌষ ১৩৪৪
৬) নির্মল মুখোপাধ্যায়, আমার যাত্রা জীবন, সম্পাদনা প্রভাতকুমার দাস, প্রিয়া বুক হাউস, রথযাত্রা ১ জুলাই ২০২২
৭) সাফিউল্লা মোল্লা, ‘ফণিভূষণ বিদ্যাবিনোদ-এর যাত্রাপালা : রামানুজ’, যাত্রা আকাদেমি পত্রিকা, সপ্তম সংখ্যা,১৪২৫
৮) স্বপনকুমার ঠাকুর, গঙ্গাহৃদি বঙ্গভূমি পুস্তকের, খসড়া প্রকাশনী, সেপ্টেম্বর ২০২৪
৯) নাজিবুল ইসলাম মণ্ডল, জেলা লোকসংস্কৃতি পরিচয় গ্রন্থ দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, জানুয়ারি ২০২৩
১০) সুচেতনা, ৩০ বর্ষ, ১ম সংখ্যা, ৫৯তম সংকলন, ১৪৩৩, সম্পাদক গৌতম মণ্ডল
১১) ড. দেবব্রত নস্কর, বেগমপুরের ইতিহাস, প্রবাহ প্রকাশন, আগস্ট ২০২২
১২) পূর্বোক্ত আমার যাত্রা জীবন
১৩) সুচেতনা, ২য় বর্ষ, ২য় সংখ্যা, ৪র্থ সংকলন, শারদীয় ১৪০৫, সুভাষ সান্তারার সঙ্গে সাক্ষাৎকার। উক্ত পত্রিকার বাংলা যাত্রা সংস্কৃতির সেকাল ও সমকাল বিশেষ সংখ্যায় (৩০ বর্ষ, ১ম সংখ্যা, ৫৯ সংকলন, ১৪৩৩) পুনঃ প্রকাশিত। সম্পাদক গৌতম মণ্ডল
১৪। প্রাগুক্ত সুচেতনা পত্রিকার বাংলা যাত্রা সংস্কৃতির সেকাল ও সমকাল বিশেষ সংখ্যা।
...............................................
অরবিন্দ পুরকাইত
গ্রাম ও ডাক — গোকর্ণী,
থানা — মগরাহাট,
জেলা — দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা।
গ্রাম ও ডাক — গোকর্ণী,
থানা — মগরাহাট,
জেলা — দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা।

Comments
Post a Comment