২৯ জুলাই : বিদ্যাসাগর—একটি যুগের বিবেক, একটি আলোর নাম
উৎপল সরকার
বাংলার ইতিহাসে কিছু দিন কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ হয়ে থাকে না; তারা মানুষের বিবেকের ভেতর অম্লান প্রদীপ হয়ে জ্বলে। ২৯ জুলাই তেমনই একটি দিন।বাংলার শিশুশিক্ষার ইতিহাসে তাঁর অবদান আজও অম্লান। তিনি ‘বর্ণপরিচয়’ প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ রচনা করেন, যা বাংলার লক্ষ লক্ষ শিশুর প্রথম পাঠ্যপুস্তক হয়ে ওঠে। ‘বর্ণপরিচয়’ কেবল একটি পাঠ্যপুস্তক নয়; এটি বাংলার অসংখ্য শিশুর প্রথম স্বপ্ন, প্রথম অক্ষরচেনা, প্রথম ভাষাপ্রেম।এই দিনটি ফিরে এলে বাংলার আকাশে যেন এক অদৃশ্য নীরবতা নেমে আসে। মনে হয়, কোনো বিশাল বটবৃক্ষের ছায়া হঠাৎ সরে গেছে, অথচ তার শিকড় এখনো মাটির গভীরে আমাদের অস্তিত্বকে ধরে রেখেছে। ১৮৯১ সালের এই দিনে নিভে গিয়েছিল এক মানুষের দেহজীবন, কিন্তু জ্বলে উঠেছিল তাঁর আদর্শের অনির্বাণ প্রদীপ। সেই মানুষটির নাম ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর—যিনি ছিলেন বিদ্যার সাগর, মানবতার মহাসমুদ্র এবং সমাজ-সংস্কারের এক অবিনাশী আলোকস্তম্ভ।
বিদ্যাসাগরকে কেবল একজন পণ্ডিত বললে তাঁর প্রতি অবিচার করা হয়। তিনি ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি জ্ঞানের সঙ্গে হৃদয়ের, যুক্তির সঙ্গে করুণার এবং সাহসের সঙ্গে মানবিকতার এক বিরল সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন প্রমাণ করে, প্রকৃত শিক্ষা কেবল মুখস্থ বিদ্যার সঞ্চয় নয়; শিক্ষা মানুষের ভিতরে মানুষকে জাগিয়ে তোলার এক অন্তহীন সাধনা।
বীরসিংহ গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া সেই বালকের শৈশব ছিল অভাবের, কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল আকাশের মতো বিস্তৃত। অর্থের অভাব তাঁকে কখনো জ্ঞানের পথ থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। কুপি জ্বালানোর সামর্থ্য না থাকলেও রাস্তার আলোর নিচে পড়াশোনা করার যে কাহিনি বাংলার মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে, তা কেবল একটি ঘটনার বিবরণ নয়; তা অধ্যবসায়ের এক কালজয়ী প্রতীক। সেই শিশুটি পরে হয়ে উঠেছিলেন সংস্কৃত কলেজের গর্ব, বাংলা ভাষার অন্যতম নির্মাতা এবং নবজাগরণের প্রাণপুরুষ।
বাংলা গদ্যকে তিনি এমন একটি সহজ, সংযত ও মার্জিত রূপ দিয়েছিলেন, যা সাধারণ মানুষের ভাষাকে সাহিত্যের মর্যাদা এনে দেয়। ভাষা তাঁর কাছে ছিল ক্ষমতার অলংকার নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের সেতু। তিনি জানতেন, যে ভাষা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাতে পারে না, সে ভাষা কখনো সমাজকে বদলে দিতে পারে না। তাই তাঁর রচনায় ছিল সরলতা, অথচ সেই সরলতার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল গভীর বোধের দীপ্তি।
বাংলার শিশুশিক্ষার ইতিহাসে তাঁর অবদান আজও অম্লান। ‘বর্ণপরিচয়’ কেবল একটি পাঠ্যপুস্তক নয়; এটি বাংলার অসংখ্য শিশুর প্রথম স্বপ্ন, প্রথম অক্ষরচেনা, প্রথম ভাষাপ্রেম। একটি জাতির ভবিষ্যৎ যে শিক্ষার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, বিদ্যাসাগর তা বহু আগেই উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি শিশুদের জন্য এমন পাঠ্য নির্মাণ করেছিলেন, যা জ্ঞানকে আনন্দের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। তাঁর শিক্ষাদর্শ ছিল মুক্তির দর্শন—যেখানে শিক্ষা মানে কেবল কর্মসংস্থান নয়, বরং চিন্তার স্বাধীনতা।
তবে বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর মানবিক সাহসে। নারীশিক্ষার প্রসারে তাঁর ভূমিকা ছিল যুগান্তকারী। তিনি বুঝেছিলেন, একটি জাতির অগ্রগতি কখনো সম্ভব নয় যদি তার অর্ধেক জনগোষ্ঠী অন্ধকারে বন্দি থাকে। তাই তিনি ৩৫টিরও বেশি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজস্ব অর্থে অনেকগুলোর খরচ বহন করেন। তিনি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন, নিজের অর্থ ব্যয় করেছেন, দরজায় দরজায় গিয়ে অভিভাবকদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর কাছে নারীশিক্ষা কোনো দয়া নয়; এটি ছিল ন্যায়ের দাবি।
তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’, ‘শকুন্তলা’, ‘সীতার বনবাস’, ‘বিধবা বিবাহ’ পুস্তিকা এবং ‘সমাজ-সংস্কার’ বিষয়ক বহু প্রবন্ধ। বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিজীবনের উদারতা কিংবদন্তির মতো।যে সমাজে কুসংস্কার ছিল ধর্মের পোশাক পরে প্রতিষ্ঠিত, সেই সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন। বিধবা নারীর জীবন কি কেবল অন্ধকারে বন্দি থাকবে? নারী কি কেবল সামাজিক নিয়মের শিকার হবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তিনি শুরু করেছিলেন এক কঠিন সংগ্রাম। প্রবল বিরোধিতা, অপমান, কুৎসা এবং সামাজিক আক্রমণের মুখেও তিনি পিছিয়ে যাননি। কারণ তিনি জানতেন, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা মানে মানবতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
বিধবা বিবাহ প্রচলনের আন্দোলন ছিল কেবল একটি আইন পরিবর্তনের দাবি নয়; এটি ছিল মানুষের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম। সেই সময় অসংখ্য মানুষ তাঁকে ধর্মদ্রোহী বলেছিল, সমাজচ্যুত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ইতিহাসের এক আশ্চর্য নিয়ম আছে—যারা সময়ের চেয়ে এগিয়ে হাঁটে, তাদের বিচার সমসাময়িক মানুষ নয়, ভবিষ্যৎ করে। আজ সেই ভবিষ্যৎই বিদ্যাসাগরকে শ্রদ্ধার সর্বোচ্চ আসনে বসিয়েছে।
বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিজীবনের উদারতা কিংবদন্তির মতো। অসহায় মানুষের জন্য তাঁর দরজা সর্বদা খোলা ছিল। দরিদ্র ছাত্রের পড়াশোনা, ক্ষুধার্ত মানুষের আহার, অসুস্থের চিকিৎসা—যেখানে মানবিক প্রয়োজন, সেখানেই তিনি এগিয়ে গিয়েছেন। তাঁর কাছে দান ছিল প্রদর্শনের বিষয় নয়; ছিল নিঃশব্দ কর্তব্য। তাই মানুষ তাঁকে কেবল বিদ্যার সাগর নয়, দয়ার সাগর বলেও স্মরণ করেছে।
জীবনের শেষ অধ্যায়ে তিনি শহরের কোলাহল ছেড়ে সাঁওতাল অঞ্চলে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। জাতি, ধর্ম, ভাষা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের ভেদরেখা তাঁর মানবতাকে কখনো সীমাবদ্ধ করতে পারেনি। মানুষের মুখই ছিল তাঁর ধর্মগ্রন্থ, মানুষের কান্নাই ছিল তাঁর প্রার্থনা। তিনি বিশ্বাস করতেন, সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় মানুষের প্রতি ভালোবাসায়।
২৯ জুলাই তাই কেবল একটি মৃত্যুদিবস নয়; এটি আত্মসমীক্ষার দিন। আমরা নিজেদের প্রশ্ন করতে পারি—আজকের সমাজ কি সত্যিই বিদ্যাসাগরের স্বপ্নের পথে এগোতে পেরেছে? শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, কিন্তু শিক্ষা কি সত্যিই মানুষকে মানবিক করেছে? প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, কিন্তু হৃদয়ের দরজা কি ততটাই উন্মুক্ত হয়েছে? নারী আজ বহু ক্ষেত্রে সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছেন, তবুও বৈষম্য, সহিংসতা এবং কুসংস্কারের ছায়া কি সম্পূর্ণ দূর হয়েছে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গেলেই বোঝা যায়, বিদ্যাসাগর এখনো আমাদের সমসাময়িক।
তিনি কোনো মূর্তি নন, যাঁকে বছরে একদিন মালা পরিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায়। তিনি এক চলমান চেতনা। যখন কোনো শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে ছাত্রকে মানুষ করে তোলেন, সেখানে বিদ্যাসাগর বেঁচে থাকেন। যখন কোনো তরুণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুক্তির ভাষায় প্রতিবাদ করেন, সেখানে বিদ্যাসাগর কথা বলেন। যখন কোনো মেয়ে শিক্ষার অধিকার অর্জন করে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নির্মাণ করে, তখন বিদ্যাসাগরের স্বপ্ন আরও একবার পূর্ণতা পায়।
আজকের পৃথিবী ভোগ, প্রতিযোগিতা এবং বিভেদের নানা সংকটে আক্রান্ত। এমন সময় বিদ্যাসাগর আমাদের শেখান—জ্ঞান যদি মানবিকতাকে বিস্তৃত না করে, তবে তা কেবল তথ্যের ভার। ধর্ম যদি মানুষকে ছোট করে, তবে তা ধর্ম নয়। শিক্ষা যদি স্বাধীন চিন্তার জন্ম না দেয়, তবে তা প্রকৃত শিক্ষা নয়। তাঁর জীবন যেন এক নিরবচ্ছিন্ন আহ্বান—মানুষ হও, সত্যের পাশে দাঁড়াও, অন্যের দুঃখকে নিজের দুঃখ মনে করো।
২৯ জুলাইয়ের সন্ধ্যা যখন ধীরে ধীরে বাংলার আকাশে নেমে আসে, তখন মনে হয় কোথাও যেন এক প্রাচীন প্রদীপ এখনো জ্বলছে। সেই আলো কোনো প্রাসাদের নয়; তা এক দরিদ্র ছাত্রের বইয়ের পাতায়, এক শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষে, এক মায়ের আশীর্বাদে, এক প্রতিবাদীর কণ্ঠে এবং প্রতিটি ন্যায়বোধসম্পন্ন মানুষের বিবেকে। মৃত্যু তাঁর শরীরকে থামিয়েছিল, কিন্তু তাঁর আদর্শকে নয়। তাই সময় যত এগোয়, বিদ্যাসাগর ততই নতুন হয়ে ওঠেন।
একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে মহান হয়, যখন সে তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মৃতিকে কেবল স্মরণ করে না, তাদের আদর্শকে জীবনের অংশ করে তোলে। বিদ্যাসাগরের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা তাই ফুলে নয়, ভাষণে নয়, বরং প্রতিটি শিশুর শিক্ষায়, প্রতিটি নারীর মর্যাদায়, প্রতিটি মানুষের প্রতি সমান সম্মানে এবং যুক্তিবাদী মানবিক সমাজ গঠনের নিরন্তর প্রয়াসে। ২৯ জুলাই আমাদের সেই শপথের দিন—আলো নিভে যায় না, যদি আমরা সেই আলো বহন করার সাহস রাখি। বিদ্যাসাগর তাই অতীতের কোনো নাম নন; তিনি বাংলার বিবেক, মানবতার এক চিরন্তন দীপশিখা।
.......................................
উৎপল সরকার, নিউটাউন, আলিপুরদুয়ার, জেলা :- আলিপুরদুয়ার।
বর্তমানে কর্মসূত্রে শিলিগুড়ির বাসিন্দা।
ইমেইল আইডি:-utpalwbmo@gmail.com.
Comments
Post a Comment