ভ্রমণকাহিনি
স্বর্ণমন্দির থেকে অমরনাথ
সুনীল কর্মকার
মন চাইলেও শরীর সঙ্গে না দিলে ইচ্ছে টাকে পরিত্যাগ করতে হয়। ঘর ছেড়ে বাইরে যেতে চাইলেই শরীর মহাশয় বেঁকে বসেন। শরীর আর মনের এই দ্বন্দ্বে আমার অবস্থা নাজেহাল। ট্রাভেল এজেন্সির কর্ণধার অতি পরিচিত পুলকের নিকট থেকে কাশ্মীর ভ্রমণের প্রস্তাব আসতেই চটজলদি রাজি হয়ে গেলাম। কাশ্মীরের সঙ্গে অমরনাথ পর্যন্ত যাওয়ার পরিকল্পনা । সেই সঙ্গে স্বর্ণ মন্দির ,জালিয়ানাওয়ালা বাগ, ওয়াঘা বর্ডার , বৈষ্ণদেবী , শ্রীনগর ও সংলগ্ন দর্শনীয় স্থান।
গভীর ভাবে তলিয়ে না ভেবে প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম। মত দেওয়া ঠিক হলো কিনা এ নিয়ে বেশ দো টানায় পড়েছি। আমার কাছের এক আত্মীয় কিন্তু আমাদের সহযাত্রী হতে রাজি। কিছুটা মনের জোর বাড়ল । পুলককে শারীরিক সমস্যার কথা বলতেই বলে --আপনার কোন অসুবিধা হতে দেবনা।যদি মনে করেন অমরনাথ যাওয়া কষ্টকর আপনি শ্রীনগরে ঐ চারদিন হোটেলে আরামে কাটাবেন। আমরা আবার শ্রীনগরে ই ফিরব ।অমরনাথ যেতে বালতালে হচ্ছে ক্যাম্প। ওখানে থেকে চৌদ্দ কিঃমিঃ দুর্গম পাহাড়ী পথে যাত্রা।ঘোড়া ,ডুলি এসব পাওয়া যায়। সবার পক্ষে অমরনাথ দর্শন হয়না।সুস্থ হলেও না। ১৩৭০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত গুহাস্থিত তুষার শুভ্র দেবাদিদেব মহাদেব দর্শন নাকি বহু পুণ্যের ফল। আমি তো পাপী মানুষ । কোন ও দিন ই ঐভাবে পুণ্যত্ব অর্জনের লোভ কখনও ছিল না । এখনো নেই। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ,সেবাকেই মানবধর্ম ভেবেছি। এসব আচার অনুষ্ঠানের প্রতি কোনো আকর্ষন ছিলনা আজ ও নেই। তবে যদি মহাদেব সদা সদয় হোন তাহলে অমর নাথ দর্শনে আপত্তি নেই । আমি এমনিতেই শ্বাসকষ্টে সারা বছর ভুগি। দু'বেলা ইনহেলার নিতে হয়। ঠাণ্ডা লাগলে সমস্যা বৃদ্ধি পায়। কাশ্মীর ঠাণ্ডার জায়গা। অবশ্য আমাদের যাত্রার সময়ে অতো ঠাণ্ডা থাকবে না। তাৎক্ষণিক ভাবে আমি কাশ্মীর ভ্রমণের সুযোগ গ্ৰহণ করলাম। 'পরে কী হ ইবে তাহা ভাবিবার অবসর কোথায় ' ? জীবনে সুযোগ বেশি আসেনা ---ভূস্বর্গের হাতছানি আমাকে চঞ্চল করে তুলেছে। সেই সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর দেশপ্রেম ও সদ্য পাক সেনাদের পরাজিত করে তাদের দখল করা ভারতীয় ভূখণ্ডকে পুণর্দখল করার কারগিল যুদ্ধ সেই যুদ্ধের মাটি স্পর্শ করে ভারতমাতা কে প্রণাম করাও জোয়ানদের স্যালুট জানানোর তীব্র ইচ্ছা আমাকে উজ্জীবিত করে তুলল । মন বলছে বাঁ ধো তল্পিতল্পা । এর থেকে আর শরীর ভালো হবে না।
১৫/৭/১৪ তারিখ বাবা অমরনাথের অসীম করুনায় আমাদের কাশ্মীর যাত্রার শুভারম্ভ সূচিত হলো।
আসানসোল স্টেশনে বিশাল একটা দলের সাথে আমরা দু'টি পরিবার যুক্ত হলাম। বৈকাল ৩.২৫ মিনিটে দুর্গিয়ানা এক্সপ্রেস ,সুপার ফাস্ট ট্রেনটি স্টেশনে ঢুকল। ট্রেনটি আসছে হাওড়া থেকে। আমরা লাগেজ নিয়ে একেএকে উঠে সিট নাম্বার অনুযায়ী নিজেদের বসার ব্যবস্থা করলাম। প্রথমে আমাদের গন্তব্য স্থল অমৃতসর। মনের মধ্যে সেই ঐতিহাসিক জালিয়ানাওয়ালা বাগের ঘটনা রঙ ছড়াচ্ছে।পবিত্র মাটির স্পর্শ পেতে চলেছি। ভাবতেই শিহরিত হচ্ছি।। ট্রেন স্টেশন ছেড়ে গতি বৃদ্ধি করেছে। আমি উপর বার্থে শুয়েছি । ট্রেনের দুলুনিতে সারা দিনের ক্লান্তির পরে চোখে ঘুম নেমে এসেছে।ঘুম যখন ছাড়ল তখন গয়া স্টেশনে পৌছেছি। এদিকে ট্যুর ম্যানেজার পুলকের তদ্বির আর দেখভালে আমি বিড়ম্বনায় পড়েছি। টিফিনের প্লেটে লুচি আর সবজি এসে হাজির। আমাদের দলে ছিলাম ৬৬ জন। একসূত্রে আমরা যেন গাঁথা পড়ে গেলাম। পারস্পরিক পরিচয় পর্ব শেষ করে মহিলাদের গল্প জমে উঠল। নিজের জায়গা ছেড়ে পাশাপাশি বসে আড্ডা ,হাসি খুশিতে রাত্রি গভীর হতে থাকল।ক্লান্তি আর নেই।এখন খুশির হাওয়া সারা কম্পার্টমেন্টে। এটাই তো বিশাল পাওনা। তীর্থ স্থানে পুণ্যত্ব প্রাপ্তি পরের বিষয় এখন যে প্রাণে আনন্দ ধারা প্রবাহিত হতে শুরু করেছে এতে মনে হচ্ছে শরীর মনের সব রোগ ,শোক ,দুঃখ কষ্ট কোথায় হারিয়ে গেছে।মনের মধ্যে যে ভয় তা আর নেই।বাইরে লোকে বের হয় কেন বেশ বুঝতে পারছি।আমার আত্মীয়া যে কিনা সারা বছর ধরে কোন না কোন অসুখে আক্রান্ত ,মনের সব ইচ্ছে গুলো হারিয়ে যাচ্ছিল ,কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল , শরীর দুর্বল -- দেখি বাহিরের বাতাসে
তিনি ও জেগে উঠেছেন।বেশ কথা বলছেন , আড্ডা দিচ্ছেন । বেশ চনমনে ভাব।তার কর্তা আমাকে কানে কানে বললেন --দেখছেন মশাই এখন আমাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। সবে তো ট্যুর শুরু -- শেষ যখন হবে তখন অবস্থাটা একবার ভাবুন।আমি বললাম কাকে বলছেন মশাই ? উপর থেকে নিচে নেমে পাশাপাশি বসে টিফিন খাচ্ছি আর গল্প ও জমে উঠেছে । যতো কাছাকাছি আসা যায় ততো আনন্দ। আর এই আনন্দের টানেই বাইরে আসা । মুক্ত মনে সবার সঙ্গে একাত্মতা অনুভব না করতে পারলেই সবটাই মাটি ।
আমরা এখন উত্তরপ্রদেশের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছি ।
ঘন্টা খানেক এভাবে কাটানোর পর দেখি মেঝেয় পেপারের উপর দুজন কম বয়সী অচেনা ছেলে শুয়ে আছে। তাদের নাসিকা গর্জন শুরু হয়ে গেছে । হয়তো ওদের রিজার্ভড টিকিট নেই তাই এই অবস্থা। কেউ কেউ বলল এদেরকে এখানে থাকতে দেওয়া নিরাপদ নয়। এখান থেকে তাড়িয়ে দিন । খারাপ উদ্দেশ্য থাকতে পারে ।ওদেরকে ডাকুন।
ওদের তোলা হলো। অতি উৎসাহীরা প্রায় গলাধাক্কা দেওয়ার উপক্রম । আমি নিরস্ত করলাম।
ওরা হিন্দীতে ভীষণ অনুনয় বিনয় করতে লাগল। রিজার্ভে টিকিট পায়নি। তাই সাধারণ টিকিটে উঠেছে । ওরা বলার সাথে সাথে লোটা কম্বল গুটিয়ে কেটে পড়ল।মনটা ভারাক্রান্ত হলো । ট্রেনটা যেন আমাদের সম্পত্তি এমন সব ভাব।
সবাই নিশ্চিন্তে আবার ঘুমোবার প্রস্তুতি শুরু করল। মুশকিল আমার । নিদ্রা দেবী এতো অভিমানী যে একবার উনি বিদায় নিলে পুণরায় তার যতোই সাধনা করা হোক না কেন তিনি আর এমুখো হননা ।। পূর্বের ঘটনাটা মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকলো। অথচ কেউ কেউ নির্বিকার চিত্তে নাসিকা গর্জন শুরু করে দিয়েছে।আমি মনে মনে তাদের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালাম। চরম বিপদেও যাদের হৃদয় ব্যাকুল হয়না ,উৎকণ্ঠা , উদ্বেগ থেকে বহু যোজন দূরে সৃষ্টিকর্তা তাদের মনো জগৎ কীভাবে যে তৈরি করেছেন সেটাই বিষ্ময়ের! এই কম্পার্টমেন্টে বেশিরভাগ কাশ্মীর যাত্রী । ট্রেন এগিয়ে চলেছে । শরীর দুলছে ট্রেনের ছন্দে।নীরব --নিস্তব্ধ রাত্রির বুক চিরে এগিয়ে চলেছে ভয়ংকর শব্দের যন্ত্র দানব। হঠাৎ বিপরীত দিকের সিট থেকে আমাদের সঙ্গী গৌরাণ্ডী গ্ৰামের এক মহিলা যাত্রীর সশব্দে কান্না --হায় হায় ভগবান এ তুমি কী করলে গো--আমার সব কুছু উয়ারা নিয়ে গ্যালেক গো --সব কুছুই --এতো জোরে কান্না যে সবাই জেগে গেছে ,কেউ কেউ মহিলাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে ।ভদ্র মহিলার স্বামী দেবতা তখন উপরের বাঙ্কার থেকে মুখ বাড়িয়ে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বিদ্বেষ বাণী নিক্ষেপ করছেন ।
প্রাথমিক ধাক্কাটা কাটিয়ে নিচে নেমে দেখি মহিলা তখন হায় হায় শব্দে কেঁদে চলেছেন।অন্য যাত্রীরা তাকে ঘিরে আছে। ব্যাপারটা বোঝা গেল --মহিলা ঘুমিয়ে গিয়েছিল।আর তাকে বলেই দু,টি ছেলে তার পায়ের তলে আশ্রয় নিয়েছিল ।সঙ্গে ছিল ছোট থলেটি পেটের নিচে শাড়ির আড়ালে। থলের মধ্যেই তার সংসার । কিছু খুচরো পয়সা , ঘরের চাবির গোছা আর গুলের কৌটো । মহিলা কেঁদেই চলেছে --" হায় হায় সকাল বেলায় আমি কোথায় পাবোরে -- ওকে না পেলে আমি থাকব কেমন করে ? --আমার আর তীর্থ করে কাজ লাই। আমার ঘরে ফেরার ব্যবস্থি করে দাও গো --- গো। -- । চোরদের উদ্দেশ্যে বলে কেনে তুদের দয়া দেখাতে গেলুম রে।তুদের প্যাটে এতো বুদ্ধি ছেলো ? টাকা পয়সা সব নিয়ে যা আমার জানটা ফিরিয়ে দে বাবারা? আমার পাশে তোদের শুতে দিলাম ছ্যালার মতো । শ্যাষে তুরা এইটো করতে পারলি ? আমি কিছু বুঝতে না পেরে অন্যদের জিজ্ঞেস করি --কী ফেরতের কথা বলছে মাসীমা ? বুঝলেন না ? ঐ থলেতে গুলের ডিব্বা ছিল ওটাও চলে গেছে ।ওটার জন্যে ওর শোক ।+ট্রেন ততক্ষণে স্লো হতেই ওরা ঝাপ দিয়েছে। মহিলার কথা শুনে হাসিও পাচ্ছে আবার কষ্ট ও হচ্ছে।জিজ্ঞেস করলাম কত টাকা ছিল ? অত গুনা গুনতি ছেলোনা ।
--উনার স্বামী এতোক্ষণ পর মুখ খুললেন --কতো করে বললাম থলেটা আমাকে দাও । কিছুতেই দিলেক না। অবিশ্বাস।সারা জেবনে বিশ্বাস করতে পারলেক না। কী বললে জানেন ? তোমার গাধার মতো ঘুম --ভদ্রলোক দাঁ ত খিঁচিয়ে বলে -- হুঁ দেখলে তো গাধার ঘুম কার ? ভদ্রলোক বললেন মুনে হয় -- হাজার তিনেক ছেলো।আমি দিনছিলুম।ওর লিজের কুছু জেলো কিনা কে জানে? সবটাই খুচরো।ঠাকুর থানে দেবো করে খুচরো গুলো ঐ থলেতে রাখা ছেলো।স্ত্রীকে বলে -- এখন কেঁদে কুনো লাভ হবেনা? ।দুষ তোমার ই। দরদ দেখাতে গেলছো ।
হ্যাঁ সি তো বলবেক ।ইখন আমি গুল কোথা পাব। ? হয় গুলের ব্যবস্থি করো -- ন ইলে ঘরে ফেরার ব্যবস্থি করুক। রাত যতো এগোতে থাকে চলতেই থাকে ওদের ভাববাচ্যে ঝগড়া ।কখনো চড়া কখনো খাদে। এদিকে পূবের আলো দেখা যাচ্ছে ।দুই ধারে সবুজ ক্ষেত । ক্ষেতের আলে পপুলারের পাড়ি । মনে হচ্ছে যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির । ভোর থেকে কর্তার সাথে স্ত্রী ছেলে মেয়েরাও কাজে নেমে পড়েছে । মোরাদেবাদে যখন পৌছালাম তখন ১৬জুলাইয়ের সকাল ৯.৩০টা ।১০মি ঐ স্টেশনে বিরতির পর আবার যাত্রা হল শুরু। দুপুর ১২.৫৫ টায় আমরা পৌছালাম সাহারানপুর।ইউ পি ছেড়ে আমাদের ট্রেন হরিয়ানা ছুঁয়ে ঢুকে পড়েছে পঞ্জাবে ।লুধিয়ানা স্টেশনে সামান্য কয়েক মুহূর্ত । তারপর বিরতি হীন দীর্ঘ প্রায় ৫ঘন্টার পর আমরা পৌছালাম পাঞ্জাবের জলন্ধর স্টেশনে । তখন ঘড়িতে ৫.১০ সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। সবাই তৈরি হচ্ছে পরের স্টেশন অমৃতসরে আমাদের নামতে হবে । প্রায় ২৫ ঘন্টার দীর্ঘ যাত্রা শেষে আমরা যখন অমৃতসর স্টেশনে অবতরন করলাম তখন সন্ধ্যার নীরবতা নেমে এসেছে।চটপট লাগেজ নামিয়ে আমাদের অটোতে তোলা হলো। কয়েক মিনিট ই আমরা পৌছালাম সীতা লজে।বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ঘর গুলো। পাশাপাশি রুম গুলি। একটু জিরিয়ে জামা কাপড় চেঞ্জ করে অ্যাটাচড বাথরুম পেয়ে বেশ খুশিই হলাম।এদিকে পুলকের তারা শুরু হয়েছে কাছাকাছি স্বর্ণমন্দির রেডি হয়ে নিন। এই এক সমস্যা।ওরা ওদের কাজ ঠিক রুটিন মাফিক করবেই। এতো ধকল শরীরে গেছে একটু বিশ্রাম নেবার উপায় নেই ।রেডি না হলে তুমিই পড়ে থাকবে । দেখতে দেখতেই টিফিন মুড়ি আর গরম গরম পকোড়ার ঠোঙা হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেছে। বিশ্রামের কথা ভাবছি আর ট্যুর কোম্পানির ছেলেরা আমাদের সাথে এসে কী ভাবে এতো তাড়াতাড়ি এসব প্রস্তুত করল ? এটাই বোধ হয় প্রফেশনালিজম। পরিষেবার ক্ষেত্রে কোম্পানি কোন আপোষ করেনা। সেরকম কর্মী তারা তৈরী করে নেয়।আর কর্মীরাও জানে কোম্পানি তার কাছে কী চায়। এই বোঝাপড়ার মাধ্যমে কোম্পানি ব্যবসা বাড়াচ্ছে আর যাত্রীরা পরিষেবাই আনন্দ পাচ্ছে। মনে মনে রাগ হলেও পরিস্থিতি উপলব্ধি করে পুলককে পিঠ চাপড়ে বললাম --এই ক'দিন এই ভাবেই যেনো পাশে থেকো ভাই। পুলক বলল - আশীর্বাদ করুন যেন সুস্থ থেকে আপনাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারি। কারন আপনাদের ভালোবাসাই আমার বাঁ চার উপায় ।
টিফিন তাড়াতাড়ি শেষ করে বেরিয়ে পড়লাম স্বর্ণমন্দিরের উদ্দেশ্যে।কিছু নিয়ম কানুনের বিষয় জানানো হলো। প্রচণ্ড ভাবে শৃঙ্খলা বজায় রাখা প্রাথমিক কর্তব্য।মাথায় ঢাকা নিতে হবে।রুমাল বা মন্দির সংলগ্ন দোকানে কাপড় কিনতে পাওয়া যায়। আমরা এসব জোগাড় করে বিশাল গেট দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ পথে আমাদের চপ্পল গুলো মন্দিরের দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তি পা থেকে নিজেরাই খুলে সযত্নে যথাস্থানে রাখলেন।মন্দির প্রবেশের পূর্বে বহমান নদীর স্রোতের মতো জল ধারায় পা গুলো ধৌত হলে আমরা সামনে এগিয়ে চলেছি। মন্দিরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে মনের মধ্যে পবিত্রতার ভাব সৃষ্টি হোল।এতো নিয়ম মাফিক , সুশৃঙ্খলভাবে হাজার হাজার দর্শনার্থীদের প্রতি যত্ম ,তাদেরকে স্বর্ণমন্দির এবং শিখগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের যে ব্যবস্থা তা অভাবনীয়।হাজার হাজার মানুষ ,ভক্ত পংক্তিতে বসে প্রসাদ খাচ্ছেন । হালুয়া , গাওয়া ঘি দিয়ে তৈরি রুটি ,বাটিতে ঘন দুধের চা । সেখানে গিয়ে শুধু স্টিলের বাসনের ঝনঝন শব্দ।ধোয়া মাজা চলছে। মেসিনে তৈরি হচ্ছে রুটি ,ঘি মাখাচ্ছে মেয়েরা কর্ম সংস্কৃতির উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ধর্ম মানুষকে আত্ম অহংকার ত্যাগ করে মানব সেবাকেই ঈশ্বরের সেবা বলে মনে করে।জীবে প্রেম করে যেই জন /সেই জন সেবিছে ঈশ্বরে " --এই বাংলায় সেটা কথার কথাই থেকে গেল বাংলার বাইরে সেকথার যাথার্থতা উপলব্ধি করলাম । ভারতবর্ষের অন্তর্নিহিত মর্মবাণী ভোগ নয় ত্যাগ ,মানব সেবাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম যা দেখেছি অমরনাথের পথে ভাণ্ডারা গুলিতে ,দেখেছি দক্ষিণের তিরুপতি মন্দিরে ।যাই হোক আমরা বেশ কিছু ক্ষণ মন্দিরের ভিতরে কাটালাম। যেখানে অবস্থান করছেন দরবার সাহিব। অবিরাম পাঠ চলছে ধর্মগ্ৰন্থ গ্ৰন্থি সাহিব থেকে। স্বর্ণমন্দির ছেড়ে আসার ইচ্ছে না থাকলেও পুলকের তাড়ায় ফিরতেই হলো ।
প্রথম দিনে চিকেন সহ ডিনার সেরে আমরা নিজেদের ঘরে গিয়ে প্রবেশ করলাম। শ্বেতশুভ্র শয্যা আমাদের আপ্যায়নে র জন্য অপেক্ষা করছে। শরীর ক্লান্ত ছিল এক ঘুমেই সকাল। প্রথম রাত্রি সীতা লজে বেশ আরামেই কাটল।সকালে উঠেই সবাই সবার সঙ্গে খুশির ভাব বিনিময় হলো । ১৭/৭/১৪ তারিখ চা সেবনের পর পরবর্তী যাত্রা নিকটবর্তী ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান জালিয়ানাওয়ালা বাগ।হাজার হাজার শিখ ধর্মপ্রাণ মানুষকে যেখানে গুলি করে হত্যা করে ব্রিটিশ শাসক।সেই বুলেটের ক্ষত বুকে দণ্ডায়মান সভাগৃহ। ঐ নামটা শুনতেই মন প্রাণ জুড়ে একটা আবেগ তৈরী হলো। কিছুক্ষণের সেই মাটিতে পা রাখলাম। শরীর শিহরিত হলো । আমরা সেই পবিত্র মাটি স্পর্শ করে শহীদদের প্রতি প্রণাম জানিয়ে অমর জ্যোতি স্পর্শ করে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলাম।গাইড আমাদের বোঝাচ্ছে সেদিনের ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দের বুলেটের ক্ষত চিহ্ন দেওয়ালের বুকে। দেখলাম প্রাণ রক্ষার্থে যে কূপের মধ্যে লাফ দিয়ে প্রাণ হারিয়েছিল অসংখ্য মানুষ সেই ঐতিহাসিক কূপ , কান পাতলেই সেদিনের আর্তনাদ আর অন্যদিকে কুখ্যাত সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ প্রভুর তাবেদার জেনারেল ডায়ারের হিংস্রতার রূপ । দেখলাম নিরীহ ধর্মপ্রাণ মানুষদের হত্যার প্রতিবাদে কবি গুরুর নাইট উপাধি পরিত্যাগ পত্র যা সংরক্ষিত রয়েছে। সেদিনের জঘন্য হত্যাকান্ডের তৈলচিত্র। অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসনের চিত্র প্রত্যক্ষ করে সেদিনের নিহত মহান ভারত সন্তানদের প্রতি প্রণাম জানিয়ে অবনত মস্তকে পবিত্র ভূমি থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম। ঐ দিন বৈকাল ৩ টায় আমাদের যাত্রা শুরু হোল ওয়ালা বর্ডারের দিকে । ভারতের সীমান্ত এলাকা ওপাশে পাকিস্তান ।ভারতীয় এবং পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর জোয়ানদের যৌথ মহড়া এবং শারীরিক নৈপুণ্য প্রদর্শিত হয়। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিপুল উৎসাহে দুই দেশের বন্ধ দরজা উন্মুক্ত করে একটা জায়গায় মিলিত হয়ে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির অবস্থান গ্ৰহণ করে যা উপস্থিত দুই দেশের দর্শকদের আনন্দ ও দেশাত্মবোধক জাগ্ৰত করে । প্রায় ঘন্টা দুয়েক ধরে এই শারীরিক নৈপুণ্য প্রদর্শিত হয়। সন্ধ্যায় আমরা সীমান্ত বাহিনীকে স্যালুট জানিয়ে ও দেশ মাতৃকা য় পায়ে প্রণাম নিবেদন করে হোটেলে ফিরে এলাম। ভ্রমণে মানুষ কেন যায় শরীর মনে সে অনুভব ছড়িয়ে পড়ছে।মনে হচ্ছে নূতন ভাবে আবার জন্ম নিলাম।সমস্ত জড়তা , দুশ্চিন্তা , ক্ষুদ্রত্ব কোথায় হারিয়ে গেছে । বিরাট এক আনন্দের স্রোত হৃদয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।না জানি এর পর আরো কী অপেক্ষা করে আছে!
আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল জম্বু ।ট্রেন রাত্রি দুটোয়। জম্মুতে পৌছালাম পরের দিন অর্থাৎ ১৮/৭/১৪ তারিখ সকাল ৬.৩০ টায়। জম্মুর হজ ভবনে আমাদের থাকার ব্যবস্থা । জম্মুতে ই অমরনাথ যাত্রার অনুমতি পত্র সংগ্ৰহ করতে হবে। সন্ধ্যায় রঘুনাথ মন্দির পরিদর্শন করলাম।ওখানে সন্ধ্যা শুরু ৭.৩০টায়। রাত্রি ১০.৩০ হজ ভবনে ফিরলাম।সেখানে বিশাল হলঘরে আমাদের রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা হলো।
১৯/৭/১৪ তারিখ ভোর ৫টায় শ্রীনগরের জন্য আমরা বাস যোগে যাত্রা শুরু করলাম ।ঐ শ্বেতশুভ্র দুটি বাস কাশ্মীর ভ্রমণের শেষ দিন পর্যন্ত সুখ দুঃখের সাথী হয়ে থাকল। শ্রীনগর ঢোকার অনেকটা আগে আমাদের গাড়ি আটকানো হলো । সেখানে সি আর পি এফ ক্যাম্প ।আমরা বেশ ঘাবড়ে গেলাম। কাশ্মীরের প্রতি যেমন টান আছে তেমনি ভয় ও আছে।কখন ওপাশ থেকে কী অঘটন ঘটিয়ে দেয় বোঝা যায়না।সেরকম কিছু ঘটেছে নাকি ? তাছাড়া সি আর পি এফ যারা নিরাপত্তার দায়িত্বে তারা কেন আটকাবে? বাস থেকে নেমে খোঁজ নিয়ে জানা গেল বালতাল মানে অমরনাথ যাওয়ার ক্যাম্প সেখানে গতকাল একটি ঘটনা ঘটেছে।এক শিখ যুবক নাকি কাশ্মীরি ঘোড়া ওয়ালাকে ছুড়ি মেরেছে ।তার পরিণতিতে ঘোড়াওয়ালারা একজোট হয়ে সমস্ত ভাণ্ডারা ,দোকান পাট পুড়িয়ে দিয়েছে।বেশ কিছু বাসকে এখানে আটক করা হয়েছে।পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে।শ্রীনগর থেকে সিগন্যাল না আসা পর্যন্ত এখানেই আমাদের স্থিতি।ক্যাম্পে খাওয়া দাওয়া।বিশাল এক দোচালা টিনের ছাউনির হলঘরে আমাদের স্থান হলো। সব নদীর স্রোত যেমন সাগরে মিলিত হয় আমরাও যেন বিভিন্ন স্রোতে ভেসে এসে ভারত মহাসাগরে মিশেছি।সবার একটাই পরিচয় আমরা ভারতবাসী। বৈকাল পাঁচটা থেকে রাত্রি প্রায় বারোটা পর্যন্ত ঐ সি আর পি এফ ক্যাম্পেই আমাদের কাটাতে হয়।সবুজ সঙ্কেত পেয়ে আমাদের গাড়ি ছেড়ে যখন শ্রীনগরে পৌছালাম তখন রাত্রি দুটো। আমরা বাঙালি আবাসে লাগেজ নিয়ে প্রবেশ করলাম । শরীর তখন আর চলছে না। নির্দিষ্ট ঘরে ঢুকে একটু দেখে শুনে নিয়ে বাথরুমে গিয়ে হাতে মুখে জল দিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শরীর মেলে দিলাম। কোন্ সকালে বেরিয়ে সারাটা দিন রাস্তায় কাটিয়ে পৌচ্ছানো গেছে শ্রীনগরে । বাবা অমরনাথের উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করে নিদ্রা দেবীকে আহ্বান জানালাম।
২০/৭/১৪ অনেকটা বিলম্বে ঘুম থেকে উঠে ট্যুর ম্যানেজার পুলকের নির্দেশে চা সেবন করে মোঘল গার্ডেনের উদ্দেশ্যে প্রায় নয়টা নাগাদ আমাদের যাত্রা শুরু হোল।এই ঐতিহাসিক মোগল গার্ডেন কাশ্মীরের সৌন্দর্যের অন্যতম আকর্ষন । মোঘল গার্ডেন বলতে শালিমার নিশাত ,চশমে শাহী , যা কাশ্মীর ও পারস্য স্থাপত্যের নিদর্শন।সোপান যুক্ত নকশা ,ঝর্না ,চিনার গাছ ,ও ফুলের বিচিত্র সমারোহ। শালিমার বাগানকে বলা হয় গার্ডেন অফ জয়। ১৬১৯ খ্রী: সম্রাট জাহাঙ্গীর ডাললেকের পূর্ব তীরে নির্মাণ করেন।মোঘল সম্রাট গন দিল্লীর অতিরিক্ত গরম থেকে ঠাণ্ডা উপভোগ করতে এই কাশ্মীর উপত্যকায় আসতেন।তাদের বিনোদনের জন্য এই মোঘল উদ্যান।সেই ঐতিহাসিক উদ্যানে প্রবেশ করে বিচিত্র দেশি বিদেশি ফুলের সমারোহ থেকে চোখ ফেরানো যায়না।আর আকর্ষন বৃদ্ধি করেছে টি উলিভ ফুল। রক্ষণাবেক্ষণ যথাযথ হয়না বলে অনেক সেই আমলের গাছ বা স্থাপত্য ধ্বংস হয়েছে। ফোয়ারা অকেজো। অথচ এই বাগানকে কেন্দ্র করে শ্রীনগরকে আর ও আকর্ষনীয় করা যেতে পারে। দ্বন্দ্ব আর আক্রমনের ভয়াবহতা নিয়ে দণ্ডায়মান মোঘল উদ্যান।গভীর যন্ত্রণা নিয়ে আমরা ফিরে এলাম।
বৈকালে শঙ্করাচার্যের মন্দির পরিদর্শনে যাই। ২৪৩ টি সোপান বেয়ে উঠতে হয় মন্দিরে।প্রস্তর নির্মিত মন্দির।ভিতরে শিবলিঙ্গের পূজা হয়।আদি শঙ্করাচার্য এখানে সাধনা করতেন। হিন্দু দের পবিত্র তীর্থস্থান। ভগবান শিবকে উৎসর্গ করা হয়েছে এই মন্দির।খ্রীষ্টিয় প্রথম শতকে রাজা গোদাপট্ট মন্দির সংস্কার করেন।এই মন্দির থেকে সমস্ত শ্রীনগর শহরটি দৃশ্যমান হয়। সন্ধ্যায় ডাললেকের শিকারায় ঘন্টা দুয়েক কেটে গেল হৈ চৈ আর গরম গরম ভুট্টার স্বাদে।
২১/৭/১৪ তারিখ ভোর ৫.৩০ টায় আমাদের নিয়ে দুটি বাস র ওনা দিল বালতালের উদ্দেশ্যে। বেশ মনোরম আবহাওয়া।মেঘমুক্ত নীল আকাশ ।বৃষ্টির কোন লক্ষণ নেই ।কাশ্মীর যাত্রার পূর্বে আমার শারীরিক ,মানসিক অবস্থা যা ছিল এখন যেন আমি পুরোপুরি অন্যরকম। আমার শরীর মন যথেষ্ট উপযোগী ভূমিকায় সদা উৎসাহিত করছে আরো আরো --এহো বাহ্য।তাই পরিবেশ ,শরীর যখন সহায়ক তখন কে আর একাকী বদ্ধ ঘরে আটকে থাকে।সবার সাথে আমিও সঙ্গী হলাম অমরনাথ যাত্রারজন্য।বাবা অমরনাথের উদ্দেশ্যে প্রণাম নিবেদন করলাম।
শোন মার্গে আমাদের টিফিন খাওয়ায় জন্য কিছু ক্ষণের বিশ্রাম।তখন ঘড়িতে বাজে ৯.৪০ । মনে পড়ে গেল কিছু দিন আগে শোন মার্গে র নাম বাংলার মানুষের কাছে ভীষণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল ।সারদা কেলেঙ্কারির নায়ক টাকা লুঠ করে এখানেই লুকিয়ে ছিল কোন এক হোটেলে । পুলিশ এখান থেকে অ্যারেস্ট করে । আমাদের গন্তব্য আপাতত বালতাল ।সেখানে দিনটা কাটিয়ে পরের দিন ভোরে আমাদের অমরনাথ যাত্রা।ভিতরে বিরাট আলোড়ন চলছে।এখন পর্যন্ত জলবায়ু ঠিক আছে।এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলেই রাস্তায় আর পা দেওয়া যাবেনা। এঁটেল মাটি।পা পিছলে গেলে আর বাড়ি ফেরা যাবেনা । রাস্তা নেই --পাহাড়ি উঁচু নিচু পথ। ঘোড়া ,ডুলি ,পায়ে হেঁটে ও ২৪ কিঃমিঃ দুর্গম পথ অতিক্রমের পর সেই বহু আকাঙ্খিত অমরনাথ দর্শন করা যাবে।সবার কপালে সেটা জোটেনা। প্রাকৃতিক বিপর্যয় , অবিরাম চলছে জঙ্গীদের আক্রমন ।কে কোথায় ঘুপটি মেরে বসে থাকে বোঝার বাইরে।যেতে যেতে আগামী কালের কথা ভাবছি।বালতাল থেকে অমরনাথ পর্যন্ত খাবার ট্রাভেল কোম্পানি আর বহন করবে না।ভাণ্ডারাতেই খাবার নিতে হবে।শুনেছি ঐ পুলকের কাছেই ভাণ্ডারাতে যে যা খেতে চায় সব পাওয়া যায়।আশঙ্কা --ওখানে যে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে তাতে ভাণ্ডারাগুলো আর সচল আছে কিনা ? কারন ঘটনার কেন্দ্রস্থল বালতাল।এসব চিন্তা মাথায় নিয়ে বালতালে যখন পৌছালাম তখন মাথার উপর সূর্যদেবের প্রবল প্রতাপ ।এদিকে চর্তুদিকে অগ্নিদগ্ধ ভাণ্ডারার ধ্বংসস্তূপ।কোথাও তখনো ধুয়া নির্গত হচ্ছে।পোড়া গন্ধ। পুণরায় সেগুলোকে চালু করার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সেখানে সমস্ত কিছুই সেনাবাহিনী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। সাধারণ প্রশাসনিক ব্যবস্থা কিছুই নেই। বুঝলাম জায়গাটা কাশ্মীর । এভাবেই এখানে প্রশাসন চলে।
সোনমার্গ থেকে বালতালের দূরত্ব ১৫ কিঃমিঃ। একটা টানেল অতিক্রম করেছি।যাঁর দৈর্ঘ্য ৬.৫ কিঃমিঃ। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে বালতালের উচ্চতা ৮৯৬০ ফুট থেকে ৯০০০ফুট বা ২৭৩০ থেকে ২৭৪৩ মিটার।শ্রীনগর থেকে বালতালের দূরত্ব ৯৩ কিঃমিঃ।অমর নাথ এখান থেকে ১৪ কিঃমিঃ যেটা আগেই বলেছি ভীষণ কষ্ট কর । যাত্রার জন্য আমরা ক্যাম্পখাটে বসে আলাপ আলোচনা করে আমরা ঘোড়ায় চড়ে অমরনাথ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।আর আমাদের জীবনসঙ্গিনীদের জন্য ডুলির ব্যবস্থা হলো। কারন ওদের পক্ষে ঘোড়ায় বা হেঁটে যাওয়া কষ্টকর।আর আমাদের ছেলেরা পাহাড়ী পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিল। অবশ্যই এটা রোমাঞ্চকর অভিযান। যদি মন আর শরীর সঙ্গে দেয়।
২২/৭/১৪ ভোর ৫টায় আমাদের যাত্রা শুরু হোল। পরিচয় পত্র দেখিয়ে চেকপোস্টে আমাদের সঙ্গের সমস্ত জিনিস পত্র এমন কী ক্যামেরা ,পেন ও নিয়ে যাওয়া নিষেধ।বরফের উপর হাঁটার জন্য স্পাইক দেওয়া জুতো পাওয়া যাচ্ছে ছেলেরা সেগুলো কিনলেও আমরা নিজেদের জুতো পরেই চললাম।শোনা গেল এখন রাস্তায় বরফ নেই ।তাই ঘোড়ার পিঠে উঠে যাত্রা শুরু হোল। ভেবেছিলাম ঘোড়ায় চেপে পাহাড়ী পথে যাত্রা বেশ আরাম দায়ক হবে। দেখলাম তার উল্টো।উঁচু নিচু পথ ।কখনো সামনে ঝুঁকে কখনো পিছে এই ভাবে চলতে চলতে ধৈর্যহারা সেই সঙ্গে শারীরিক কষ্ট তীব্র।মনে হচ্ছিল হেঁটে যাওয়াই ভালো ছিল। যতো কষ্ট ই হোক তথাপি ভারত স্রোতে পা মেলানোর আনন্দ ভাষায় প্রকাশ অসম্ভব । দেখলাম বৈচিত্র্যময় ভারতের মহামানবের তীর্থক্ষেত্র।হিন্দী ,বাংলা ,মারাঠি ,ওড়িয়া ,গুজরাঠী সবাইকে মিলিয়ে দিয়েছে বাবা অমরনাথ । শ্বেতশুভ্র দেবাদিদেব মহাদেবের মাধুর্য অপার্থিব আনন্দের সন্ধান দিয়েছে ।ঞপথের ধারে ঘোড়াদের জল খাওয়ায় ব্যবস্থা রয়েছে।চায়ের দোকান ও দেখা যাচ্ছে।।একটু অবস্থা পাল্টানোর জন্য নেমে হাত পা গুলোকে একটু বিশ্রাম দিলাম।চা ও খেলাম। ১০ টা নাগাদ আমরা অমরনাথের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি ।পাহা্ড়ের উপরে দৃশ্যমান পবিত্র গূহা।অনেকটা উঁচু। ১৩৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত অমরনাথ গুহা ।লোহার তৈরী সিঁড়ি।নিচে নেমে এগোতে গিয়েই স্লিপ করে পড়লাম।দেখি আমরা বরফের উপর হাঁটছি।আর ঐ জুতোই আমাদের আতঙ্কের কারন হোল।কয়েক বার এমন অভিজ্ঞতা হ ওয়াতে শেষে জুতোয় খুলে ফেললাম।সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে দেখে অক্সিজেন ঘাটতি।শ্বাস নিতে পারছিনা। তখন আমাদের রাস্তার পাশে মেডিকেল ক্যাম্পে মিনিট পনেরো অক্সিজেন নিয়ে পুণরায় এগিয়ে যেতে লাগলাম। অবশেষে বাবা অমরনাথের শ্বেতশুভ্র তুষার মূর্তির সন্মূখে উপস্থিত হয়ে মহাদেবকে
প্রণাম করলাম। যে মূর্তিটা আমাদের নজরে আসে সেই তুষার ধবল মূর্তিটা প্রত্যক্ষ করে সব কষ্ট যেন মিলিয়ে গেল। জয় করার আনন্দে সব কষ্ট মুহূর্তে বিস্মৃত হলাম । সেই পবিত্র গুহার ভিতরে শ্বেতশুভ্র দেবাদিদেব মহাদেবের তুষার শুভ্র মূর্তির দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে আত্ম তন্ময় হয়ে গেছি ।ভাবছি প্রতি বছর কীভাবে এই মূর্তি নির্মিত হয় সেটাই রহস্য । অমরনাথের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন প্রাণ পূর্ণ হয়ে উঠল। তোমার ই অশেষ কৃপায় এই অসম্ভব সম্ভব হোল।বারবার মাথা নত হয়ে এলো। পৌরাণিক যে কাহিনী প্রচলিত আছে তা হচ্ছে --এই গুহায় শিব পার্বতীর প্রেমের কাহিনী শ্রবণ করে যে কপোত কপোতী অমরত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন জীবন্ত সেই কপোত কপোতী কে প্রত্যক্ষ করলাম।এটা বিশ্বাস । বিজ্ঞান দিয়ে বিচার নিরর্থক। বিভিন্ন ভাবে সেখানে পৌঁছে পুণরায় মিলিত হয়ে মন প্রাণ দিয়ে বাবা অমরনাথের প্রতি প্রণাম নিবেদন করে আমরা ফিরে আসার জন্য প্রস্তুতি শুরু করলাম। সূর্যদেবের উপস্থিতি কালীন ফিরে আসা শ্রেয়।অন্ধকারে রাস্তা যে কতো ভয়াবহ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। সেই ঘোড়ায় চড়ে আবার ফিরতে হবে ভাবতেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছি। শরীর আর চলতে চায়না ।
বালতালে যখন ফিরে এলাম তখনো দিগন্তে অন্ধকার নামেনি। অনেক সংস্থা থেকে তীর্থ যাত্রীদের প্রতি এগিয়ে দিচ্ছে জল , ঠাণ্ডা পানীয় ,লস্যি , ফ্রুটি ইত্যাদি ।ঘোড়া থেকে নেমে ঘোড়া ওয়ালা ভাইদের ব্যবহার ও আচরনের প্রশংসা করে তাদের ধন্যবাদ জানালাম।তারা এই সময়টাকে ব্যবহার করে কিছু রোজকারের চেষ্টা করে।বাকী সময়টা গ্ৰামে ফিরে গিয়ে চাষাবাদ করে কিংবা পশু ভেড়া পালন করে। পর্যটকদের প্রতি কাশ্মীরি দের ভালোবাসা তুলনাহীন। "অতিথি দেব ভবঃ " তা কাশ্মীরে গিয়ে প্রমাণ পেলাম।
বালতালে সে রাত্রি ক্যাম্পের ফোল্ডিং খাটে কাটালাম।রাত্রে ঠান্ডা লাগছিলো ।অবশ্য সেটা চিন্তা করেই কম্বলের ব্যবস্থাও ছিল।পরের দিন ভোরে গাড়ি ছাড়ল ।শ্রীনগরে পুণরায় ফিরে এলাম বেলা ১১টায় ।দিনটা ছিল ২৩ জুলাই ।
আমরা বৈষ্ণদেবীর দর্শনের ২৫/৭ তারিখ শ্রীনগর ছেড়ে কাটরায় হোটেলে উঠলাম।কাটরা থেকে বৈষ্ণদেবী 12কিমি । পাহাড়ী পথ হলেও যাত্রীরা বিভিন্ন ভাবে যেতে পারে। অটো ,ঘোড়া ,বা হেঁটেও যাওয়া যায়। সুন্দর ঢালাই রাস্তা। মাথার উপর ছাদন।মাঝে মধ্যে হোটেল , টি স্টল ।ক্লান্ত হলে বিশ্রামের ব্যবস্থা আছে। আমরা সবাই একসাথে চড়াই পথে হাঁটতে শুরু করলাম। পথ হাঁটার অভ্যাস তো বহুদিন নেই তাই অসুবিধা হচ্ছিল। কেউ এগিয়ে যাচ্ছে কেউ অনেকটা পিছনে।তার জন্য অপেক্ষা। সঙ্গে নিয়ে আবার হাঁটা । এভাবেই একসময় পৌঁছে গেলাম বৈষ্ণদেবীর মন্দিরে। ৫২০০ফুট উচ্চতায় অবস্থিত মন্দির।দেবী আদি শক্তির প্রধান রূপ বৈষ্ণদেবী। জম্মু কাশ্মীরের সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত এই মন্দির। কথিত আছে হিন্দু তান্ত্রিক ভৈরবনাথ মেলায় যুবতী বৈষ্ণদেবীকে দেখে প্রেমে পাগল হন। তখন দেবী পালিয়ে আশ্রয় নেন ত্রিকূট পাহাড়ে।সেখানে তিনি প্রকৃত রূপ গ্ৰহণ করে দুর্গা রূপে ভৈরব নাথকে হত্যা করেন। বৈষ্ণদেবী দর্শনের পর কাটরার বাজার দর্শনে বের হলাম।ওখানে কম্বল ,গরম চাদর , শাল , বাদাম ইত্যাদি সস্তা ? বাঙালি বাজার প্রিয় জাত। কেনাকাটায় কোন আপত্তি থাকবে না । বিশেষ করে করে স্ত্রীরা যদি সঙ্গে থাকে।তাদের সব চাই। কিন্তু মাল বহনের সময় কুলিগিরি করতে হয় স্বামীকেই। অথচ সব জিনিস ই আমাদের বাজারে পাওয়া যায় ।দামের খুব একটা ইতর বিশেষ হয়না। তবু নিয়ে যাওয়া চাই । আত্মীয় স্বজন আছেন। কাশ্মীরের কিছু স্মৃতি তো নিয়ে যেতেই হবে। অবশ্য কাটরায় ক্রয় সামগ্ৰী বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ভারত সরকারের পোষ্টাল বিভাগ গ্ৰহণ করায় আমরা অনেক ভার মুক্ত হয়েছিলাম। সে সব সামগ্ৰী অক্ষত অবস্থায় যথাসময়ে বাড়ি পৌঁছে গিয়েছিল।পোষ্টাল বিভাগকে অনেক ধন্যবাদ ।
..................................
সুনীল কর্মকার
দুবরাজপুর , লালবাজার , ওয়ার্ড নং -১
জেলা --বীরভূম ,পিন--৭৩১১২৩
Sunil karmakar, Dubrajpur , Lal bazar
Ward 01, Dt--Birbhum,pin 731123
photo credit: commons.wikimedia.org


Comments
Post a Comment