ভূতুড়ে চশমার ফ্রেম
সুচন্দ্রা বসু
সিনেমা হলের আলো তখনও নিভে যায়নি। আমি আর অনিন্দ নিজেদের আসনে বসে পপকর্নের প্যাকেট খুলছি, এমন সময় এক কর্মচারী এসে আমাদের হাতে কালো রঙের অদ্ভুত দুটি চশমার ফ্রেম ধরিয়ে দিল।
—"সিনেমা শুরু হওয়ার আগেই পরে নেবেন, স্যার। আজকের বিশেষ শো।"
আমি অবাক হয়ে বললাম, "এতে কাচই তো নেই!"
অনিন্দ মজা করে বলল, "হয়তো থ্রিডির নতুন সংস্করণ।"
আমরা দুজনেই ফ্রেম দুটো চোখে পরলাম।
পরের মুহূর্তেই চারদিকে ঘন অন্ধকার। দূরে পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক প্রাচীন দুর্গ। ভাঙা ফটক, ধসে পড়া প্রাচীর, বাতাসে ধুলো আর এক অদ্ভুত শীতলতা। কোথাও কোনও মানুষ নেই, অথচ মনে হচ্ছে অসংখ্য চোখ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
একটি গম্ভীর কণ্ঠস্বর চারদিক থেকে ভেসে এল—
"স্বাগতম ভানগড়ে... ভারতের সবচেয়ে আলোচিত পরিত্যক্ত দুর্গগুলোর একটিতে। কিংবদন্তি, ইতিহাস আর লোকবিশ্বাস—সব মিলিয়ে যে স্থানকে ঘিরে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য রহস্য।"
আমাদের সামনে যেন একের পর এক দৃশ্য ফুটে উঠতে লাগল।
আরাবল্লী পাহাড়ের পাদদেশে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সেই দুর্গ, পাঁচটি প্রবেশদ্বার, ভগ্ন রাজপ্রাসাদ, পরিত্যক্ত মন্দির আর একসময়ের জমজমাট বাজারের ধ্বংসাবশেষ। দিনের আলোয় সবকিছুই নিঃশব্দ ইতিহাস, কিন্তু লোককথা বলে—রাত নামলেই নাকি বদলে যায় ছবিটা। কেউ শুনেছে নূপুরের শব্দ, কেউ বা অদৃশ্য পায়ের আওয়াজ। আবার অনেকে এসবকেই নিছক কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেন।
কণ্ঠস্বরটি আবার বলল—
"এই দুর্গকে ঘিরে দুটি বহুল প্রচলিত কিংবদন্তি রয়েছে। একটি বাবা বালুনাথের অভিশাপ, অন্যটি রাজকন্যা রত্নাবতী ও তান্ত্রিক সিঙ্ঘিয়ার কাহিনি। ইতিহাস এগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করে না, কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের কৌতূহলকে বাঁচিয়ে রেখেছে।"
আমরা দুজন যেন দর্শক নই, সময়ের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা সাক্ষী।
হঠাৎ চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
দূরে একটি বিশাল পাথর নিজে থেকেই গড়িয়ে এল।
তার সঙ্গে ভেসে এল ক্ষীণ নূপুরের শব্দ।
আমি আতঙ্কে অনিন্দর হাত চেপে ধরলাম।
ঠিক তখনই বুঝতে পারলাম—আমরা আর সিনেমা হলের আসনে বসে নেই...
চোখের সামনে ভাঙা প্রাসাদটা মুহূর্তে যেন জীবন্ত হয়ে উঠল।
ধুলো-মাখা উঠোনে একের পর এক মশাল জ্বলে উঠছে। রাজপথে ঘোড়ার খুরের শব্দ। বাজারের দোকান খুলছে। মন্দিরের ঘণ্টা বাজছে। কয়েক মুহূর্ত আগেও যেখানে নিস্তব্ধ ধ্বংসস্তূপ ছিল, সেখানে যেন কয়েক শতাব্দী আগের ভানগড় ফিরে এসেছে।
আমি ফিসফিস করে বললাম, —"অনিন্দ আমরা কি অতীতে চলে এসেছি?"
অনিন্দ উত্তর দিল না। তার চোখ স্থির হয়ে আছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধের দিকে।
বৃদ্ধের গায়ে ধূসর পোশাক। হাতে একটি লণ্ঠন। আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কুয়াশার আড়ালে যেন মুখের সব রেখা মুছে গেছে।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, —"তোমরা আজ এই ভানগড়ের সাক্ষী।"
—"কার সাক্ষী?" আমি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
বৃদ্ধ লণ্ঠনটা উঁচু করতেই রাজপ্রাসাদের দিক থেকে ভেসে এল এক নারীর চাপা কান্না।
—"সেই রাতের... যেদিন এই শহর শেষবারের মতো নিঃশ্বাস নিয়েছিল।"
হঠাৎ আমাদের চোখের সামনে দৃশ্য বদলে গেল।
রাজপ্রাসাদের করিডর দিয়ে প্রাণভয়ে দৌড়ে যাচ্ছে মানুষ। কেউ সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে, কেউ মন্দিরের দিকে ছুটছে। দূরে যুদ্ধের দামামা, ধোঁয়া আর আগুনে আকাশ লাল হয়ে উঠেছে।
ঠিক তখনই এক যুবতী রাজকীয় পোশাকে সিঁড়ির মাথায় এসে দাঁড়াল।
তার চোখে অদ্ভুত এক বিষাদ।
সে যেন সরাসরি আমার দিকেই তাকিয়ে বলল, —"সত্যিটা সবাই জানতে চেয়েছে। কিন্তু কেউ শেষ পর্যন্ত জেনে যেতে পারেনি।"
আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
পরের মুহূর্তেই সে ডান হাত তুলে আমাদের দিকেই ইশারা করল।
তার আঙুলের ডগা থেকে যেন কালো ধোঁয়ার সরু রেখা বেরিয়ে এসে আমাদের চোখের চশমার ফ্রেম দুটিকে জড়িয়ে ধরল। তারপর কেমন অস্বস্তি লাগছিল।
ফ্রেমগুলো চোখ থেকে আমরা টেনে
খুলে ফেলে হাতে ধরলাম।
তখন এক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটলো চশমার অদৃশ্য কাচের ওপারে তখন আর ভানগড় দেখা গেল না।
দেখতে পেলাম আমাদেরই সিনেমা হল।
সব দর্শক নিশ্চিন্তে নিজেদের আসনে বসে আছে। অথচ আমাদের আসন দুটি ফাঁকা।
আমরা আর সেই আসনে বসে নেই।
আমি আর অনিন্দ দুজনেই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলাম।
—"এটা কী হচ্ছে!"
কিন্তু আমাদের গলার আওয়াজ যেন কোথাও পৌঁছোল না। সিনেমা হলের দর্শকেরা নির্বিকারভাবে পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ আমাদের দেখতে পাচ্ছে না, শুনতেও পাচ্ছে না।
অথচ আমাদের ফাঁকা আসন দুটিতে বসে আছে দুই অচেনা ব্যক্তি।
তাদের মুখে সেই একই কালো চশমার ফ্রেম।
আমি আতঙ্কে পিছিয়ে যেতেই বৃদ্ধটি আবার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
—"ভয় পেও না। তোমাদের ঠিক সময়ে ফিরিয়ে আনা হবে ।"
—"আমরা ফিরব কীভাবে?" আমি তো কেঁদেই ফেললাম।
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—"এই ফ্রেম যদি আবার চোখে পরে নেওয়া হয় তবেই সে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায়।"
কথাগুলো শেষ হতেই আমরা আবার চশমার ফ্রেম চোখে পরে নিলাম।
চারপাশের দৃশ্য আবার বদলে গেল।
আমরা দাঁড়িয়ে আছি ভানগড় দুর্গের প্রধান ফটকের সামনে। ভাঙা পাথরের ওপর খোদাই করা অক্ষরগুলো ধীরে ধীরে রক্তের মতো লাল হয়ে উঠল।
তার নিচে একটি মাত্র প্রশ্ন ভেসে উঠল—
"ইতিহাস, কিংবদন্তি আর ভয়—কোনটিকে তুমি সত্যি বলে মানো?"
আমি উত্তর দিতে পারছিলাম না।
ঠিক তখনই অনিন্দ বলল,
—" সত্যিটাই জানতে চাই।"
মুহূর্তের মধ্যে প্রচণ্ড ঝড় উঠল। চারদিকে উড়ে যেতে লাগল ধুলো আর শুকনো পাতা। বৃদ্ধের মুখে প্রথমবারের মতো একটুকরো হাসি ফুটে উঠল।
তিনি বললেন,
—"তাহলে মনে রেখো, প্রতিটি কিংবদন্তির জন্ম হয় মানুষের স্মৃতি থেকে, কিন্তু সব স্মৃতিই অলৌকিক নয়।"
পরের মুহূর্তেই চোখ-ধাঁধানো সাদা আলো আমাদের গ্রাস করল।
আমি চমকে উঠে দেখলাম, সিনেমা হলের আলো জ্বলে গেছে।
সিনেমা শেষ।
দর্শকেরা একে একে বেরিয়ে যাচ্ছে।
অনিন্দ আমার পাশেই বসে হাঁপাচ্ছে।
আমাদের দুজনের হাতেই সেই কালো চশমার ফ্রেম।
আমি তাড়াতাড়ি হলের কর্মচারীকে খুঁজতে গেলাম।
—"যে ভদ্রলোক আমাদের এই ফ্রেম দিয়েছিলেন, তিনি কোথায়?"
কর্মচারী বিস্মিত চোখে তাকিয়ে বলল,
—"স্যার, আজ তো কোনও থ্রিডি শোই ছিল না। আর আপনাদের কাউকে তো কোনও চশমাও দেওয়া হয়নি।"
আমি থমকে গেলাম।
হাতের দিকে তাকালাম।
এক মুহূর্ত আগেও যে চশমার ফ্রেমটা শক্ত করে ধরে ছিলাম, সেটা আর নেই।
তার বদলে মুঠোর মধ্যে পড়ে আছে ছোট্ট লালচে কাগজের টিকিট।
টিকিটটির পিছনে লাল কালিতে লেখা মাত্র দুটি শব্দ—
"ভানগড় সাক্ষী।"
আমি আর অনিন্দ একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আজও মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে কখনও কখনও কানে ভেসে আসে ক্ষীণ নূপুরের ছমছম শব্দ...
সিনেমা দেখে ফেরার পর আমরা দুজনেই ঠিক করেছিলাম, ঘটনাটাকে আর মনে রাখব না। নিজেদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, সবটাই হয়তো অদ্ভুত এক মানসিক বিভ্রম। কিন্তু সেই রাতের পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই একই দুঃস্বপ্ন আমাদের ঘুম ভাঙিয়ে দিত। ঠিক তিন দিন পরে, গভীর রাতে ঘরের জানলার কাচে টোকা পড়ল।
অনিন্দ উঠে গিয়ে জানলার বাইরে তাকাল। কাউকে দেখা গেল না। ফিরে এসে দেখল, টেবিলের ওপর সেই চশমার ফ্রেমটা পড়ে আছে। পাশে রাখা রয়েছে লালচে রঙের সিনেমার টিকিট।
ঠিক তখনই আমার মোবাইলে একটি বার্তা এসে ঢুকল।
"চশমার ফ্রেমটা আজ রাত বারোটায় পৌঁছে যাবে। প্রস্তুত থেকো।"
আমি আতঙ্কে অনিন্দর দিকে তাকালাম। ওর ফোনেও একই বার্তা এসেছে।
আমার বুক কেঁপে উঠল। আবার চশমার ফ্রেম! ঠিক সেই মুহূর্তে চশমার ফ্রেমটির দু'পাশে ধীরে ধীরে অদৃশ্য কাচ তৈরি হতে লাগল...

Comments
Post a Comment