ফেনাভাত
অনিন্দ্য পাল
১.
অফিসের কাঁচের দরজাটা ঠেলে বাইরে পা রাখতেই পুষ্পলের মনে হলো, সে বুঝি আস্ত একটা জ্বলন্ত চুল্লির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। কলকাতার বৈশাখী দুপুর তার সমস্ত রুদ্ররূপ নিয়ে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল শরীরের ওপর। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরের কৃত্রিম ঠাণ্ডায় বসে বোঝার উপায় ছিল না যে, বাইরের পৃথিবীটা এভাবে গনগনে আগুনে রূপ নিয়েছে। পিচগলা রাস্তা থেকে একটা ভ্যাপসা গরম হাওয়া এসে চোখে-মুখে ধাক্কা মারল।
পুষ্পল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁধের ব্যাগটা একটু গুছিয়ে নিয়ে শিয়ালদা স্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। ঠিক তখনই বুক ঠেলে একটা টক ঢেকুর উঠে গলাটা যেন অ্যাসিডে পুড়িয়ে দিয়ে গেল। অম্বলের তীব্র জ্বালায় মুখটা তেতো হয়ে উঠল তার। মনে মনে নিজেকেই একটা গাল দিল পুষ্পল—দুপুরের টিফিনে ওই রাস্তার ধারের নোংরা কড়াইয়ে ভাজা শিঙাড়া আর কড়া লিকারের দুধ-চা-টা না খেলেই হতো। কিন্তু উপায়ও তো ছিল না।
রুমিটা গত দুদিন ধরে জ্বরে শয্যাশায়ী। গা যেন পুড়ে যাচ্ছে ওর। রোজ সকালে রুমিই পরম যত্নে পুষ্পলের টিফিন গুছিয়ে দেয়। আজ আর তা হয়ে ওঠেনি। সকালে বেরোনোর সময় তড়িঘড়ি নিজেই চারটে পাঁউরুটি সেঁকে নিয়েছিল। শুকনো মুখে সেই রুটি চিবিয়েই সকাল কেটেছে। আর দুপুরের খিদেটা মারতেই ওই বিষাক্ত শিঙাড়া পেটে ঢোকাতে হয়েছিল।
হাঁটতে হাঁটতে পুষ্পলের মনে হলো, জীবনটা কেমন যেন একটা খাঁচায় বন্দি হয়ে গেছে।
সকালে উঠে কোনোমতে গিলে নেওয়া শুকনো রুটি। দুপুরে যদি বা কোনোদিন ভাত জোটে, চার ঘণ্টা আগের সেই ঠাণ্ডা, জমাট বাঁধা ভাত মুখে তুলতে ইচ্ছে করে না। রাতে ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরে আবার সেই রুটি আর বিস্বাদ তরকারি।
অথচ, একটা সময় ছিল যখন গরম ভাতের ওপর একটু ঘি আর আলুসেদ্ধ পেলেই তার দিনটা তৈরি হয়ে যেত। সেই দিনগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে কর্পোরেট জীবনের ফাইলের স্তূপে।
দুই.
ফুটপাত ধরে এগোতে এগোতে ভিড়ের চাপে এক জায়গায় থমকে দাঁড়াল পুষ্পল। বুকপকেটে রাখা সুগার আর প্রেশারের ওষুধের প্যাকেটটা একবার ছুঁয়ে দেখল। ডাক্তারবাবু জল দিয়ে ওষুধটা খেতে বলেছেন। ব্যাগ থেকে জলের বোতলটা বের করে মুখে ঢালতে যাবে, ঠিক তখনই একটা মৃদু অথচ তীব্র আকর্ষক গন্ধ ভেসে এল তার নাকে।
বাতাসে ভাসমান সেই সুবাস পুষ্পলের বুকের গভীর থেকে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া জাগিয়ে তুলল। সে বোতলটা নামিয়ে চারপাশটা ভালো করে দেখল। গন্ধটা কোথা থেকে আসছে? ওটা কোনো দামী রেস্তোরাঁর বিরিয়ানি বা তন্দুরির চটকদার গন্ধ নয়। ওটা অতি সাধারণ, অতি চেনা অথচ শহুরে জীবনে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া গরম ভাতের অপূর্ব গন্ধ।
একটু এগিয়ে যেতেই পুষ্পলের চোখে পড়ল দৃশ্যটা। ফুটপাতের এক কোণে, ট্রাফিক আর মানুষের কোলাহলকে উপেক্ষা করে তিনটে ইটের উনুন পাতা হয়েছে। কাঠের টুকরো আর ভাঙা প্লাস্টিক জ্বালিয়ে সেখানে রান্না চলছে। কালো কালিঝুলি মাখা, একদিকে তুবড়ে যাওয়া একটা অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি চেপেছে উনুনে।
হাঁড়ির সামনে বসে আছেন এক মহিলা। পরনে কেবল একটা মলিন শায়া আর ব্লাউজ, আঁচলটা কোমরে জড়ানো। ঘামে চকচক করছে তাঁর পিঠ ও মুখ। তিনি পরম যত্নে হাঁড়ির তোবড়ানো ঢাকনাটা একটু সরিয়ে কাঠের হাতা দিয়ে নাড়া দিলেন। আর সাথে সাথেই বাষ্পের সাথে সেই স্বর্গীয় সুবাস আরও তীব্রভাবে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। চাল ফুটে ওঠার সেই আদিম, অমলিন গন্ধ! পুষ্পল অসাড়ের মতো দাঁড়িয়ে রইল। কত বছর, কত যুগ সে এই গন্ধটা পায়নি!
মহিলাটি উনুন থেকে হাঁড়িটা সাবধানে নামিয়ে একপাশে রাখলেন। উনুনের গনগনে আঁচ তখনো ধিকিধিকি জ্বলছে। হাঁড়ি নামানো মাত্রই কোথা থেকে যেন জাদুমন্ত্রের মতো চার-পাঁচটি মলিন পোশাকের শিশু আর একজন অতি বৃদ্ধা মহিলা এসে গোল হয়ে বসলেন। সবার চোখে এক আদিম ক্ষুধার অপেক্ষা, আবার একই সাথে এক পরম তৃপ্তির আশ্বাস।
সবার সামনে সাজানো রয়েছে পুরনো, তুবড়ে যাওয়া এলুমিনিয়াম আর স্টিলের ডিস। কোনো আড়ম্বর নেই, কোনো বিলাসী পদের আয়োজন নেই।
মহিলাটি হাতা দিয়ে একে একে সবার থালায় গরম গরম ভাত ঢালতে লাগলেন। কিন্তু এটা শুধু শুকনো ভাত নয়; ভাতের সাথে হাঁড়ির ঘন, গরম ফ্যানটাও তিনি ঢেলে দিলেন থালাগুলোয়। তারপর নিজের আঁচল থেকে একটা ছোট্ট পুঁটুলি বের করে সবার ভাতে সামান্য একটু নুন আর একটা করে কাঁচা লঙ্কা ছুঁড়ে দিলেন।
বাচ্চাগুলো কোনো তাড়া না করে, গরম ফ্যান-ভাতে হাত দিয়ে সামান্য হাওয়া খাইয়ে মুখে তুলতে লাগল। নুন আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে মেখে সেই গরম ফেনাভাত খাওয়ার সময় তাদের চোখে-মুখে যে তৃপ্তি ফুটে উঠছিল, তা যেন পঞ্চব্যঞ্জনের স্বাদকেও হার মানায়।
ফুটপাতের ধুলোবালি, গাড়ির হর্ন, কালো ধোঁয়া—সবকিছু যেন মুছে গেল এক মুহূর্তে।
পুষ্পলের মনে হতে লাগল, চোখের সামনে যেন এক পরম অন্নপূর্ণার সংসার সাজানো রয়েছে। হঠাৎই পুষ্পলের পেটের ভেতরের সেই অ্যাসিডিটির জ্বালাটা কোথায় যেন উবে গেল। তার জায়গায় চনমন করে জেগে উঠল এক তীব্র, আদিম ক্ষুধা। এই ক্ষুধা পেটের নয়, এই ক্ষুধা আত্মার। তার মনে হলো, এই ফেনাভাতের এক গ্রাস পেটে পড়লে তার সমস্ত ক্লান্তি, রোগ, আর যান্ত্রিক জীবনের গ্লানি এক মুহূর্তে ধুয়েমুছে যাবে। পুষ্পল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার ব্যাগটা খুলল। ব্যাগের ভেতর থেকে বের করল ওষুধ খাওয়ার জন্য রাখা একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের গ্লাস। পা দুটো যেন তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। সে ভিড় ঠেলে, ফুটপাতের নোংরা ডিঙিয়ে সোজা গিয়ে দাঁড়াল সেই ধুলোমাখা চুল্লির পাশে।
তাকে এভাবে স্যুট-বুট পরা বাবু সেজে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বাচ্চাগুলো খাওয়া থামিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। বৃদ্ধা মহিলাটি একটু কুঁকড়ে গেলেন। রান্না করা সেই মা-ও অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকালেন পুষ্পলের দিকে। তাঁর চোখে একরাশ বিস্ময় ও শঙ্কা—কোনো পুলিশ বা কর্পোরেশনের বাবু উচ্ছেদ করতে এল নাকি?
পুষ্পল কাঁপা কাঁপা হাতে প্লাস্টিকের গ্লাসটা মহিলার দিকে বাড়িয়ে দিল। গলার স্বর বুজে এল তার, চোখের কোণে জমে উঠল এক ফোঁটা জল। অত্যন্ত মৃদু অথচ ব্যাকুল কণ্ঠে সে বলল:
"মা, আমাকে এক গ্লাস ফেনাভাত দেবে? আমার খুব খিদে পেয়েছে..."
ফুটপাতের কোলাহল যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। মহিলাটি প্রথমটায় থতমত খেয়ে গেলেন। পুষ্পলের ব্র্যান্ডেড জুতো, দামি চশমা আর হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাঁর বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে এই বাবুটি তাঁর হাতের এই ফ্যান-ভাত খেতে চাইছে। কিন্তু পুষ্পলের চোখের দিকে তাকাতেই মা-সুলভ এক সহজাত মায়া তাঁর সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ধুয়ে দিল। পৃথিবীতে ক্ষুধার ভাষা তো একটাই, আর মায়েরা সেই ভাষা সবচেয়ে ভালো বোঝেন।
মহিলাটি মুখে কিছু বললেন না। একটা হালকা, স্নেহার্দ্র হাসি ফুটে উঠল তাঁর ঘামে ভেজা মুখে। তিনি যত্ন করে কাঠের হাতাটা দিয়ে হাঁড়ির গভীর থেকে গরম ভাত আর ঘন মাড়ের মতো ফ্যান তুলে পুষ্পলের প্লাস্টিকের গ্লাসে ঢেলে দিলেন। উপর থেকে আলতো করে একটু নুন আর একটা কাঁচা লঙ্কা দিয়ে গ্লাসটা বাড়িয়ে দিলেন পুষ্পলের দিকে।
গরম গ্লাসটা হাতে নিতেই পুষ্পলের মনে হলো, সে যেন এক পরম অমৃতের বাটি হাতে পেয়েছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে, ফুটপাতের একধারে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েই সে গ্লাসে মুখ দিল। গরম, নোনতা আর কাঁচা লঙ্কার হালকা ঝাঁঝ মেশানো সেই ফেনাভাত যখন তার গলা বেয়ে নামল, তখন পুষ্পলের মনে হলো—পৃথিবীর সমস্ত সুখ, সমস্ত আরাম এই এক গ্লাস ফেনাভাতের কাছে তুচ্ছ।
শিয়ালদা স্টেশনের দিকে ট্রেনের হুইসেল বাজল, চারপাশের মানুষ ছুটে চলল নিজেদের গন্তব্যে। কিন্তু পুষ্পল তখন এক পরম শান্তিতে চোখ বুজে ফুটপাথের মায়ের হাতের জাদুকরী স্বাদটুকু নিজের অস্তিত্বে মিশিয়ে নিচ্ছে।
Comments
Post a Comment