অপরাজিতা
শাশ্বতী চট্টোপাধ্যায়
বিকেলের
ম্লান আর বিষণ্ণ আলোটা এসে পড়েছিল ঘরের এককোণে রাখা পুরোনো ভারী কাঠের
টেবিলটার ওপর। ধুলোর সূক্ষ্ম কণাগুলো সেই আলোয় অলসভাবে ভাসছে। স্বাতী পরম
যত্ন আর সজল চোখে হাত বোলাচ্ছিল তার বাবার ছবিটার ওপর। চশমার আড়ালে প্রখর
অথচ শান্ত একজোড়া চোখ, কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ।
তার
বাবা—সুধাময় চ্যাটার্জী—যিনি ছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের একজন অত্যন্ত
উচ্চপদস্থ, নীতিবান আমলা। একাধারে আন্তর্জাতিক স্তরে উচ্চশিক্ষিত এবং প্রখর
ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে বসেও সততা, নম্রতা আর
মধ্যবিত্তের চিরায়ত আদর্শই ছিল তাঁর জীবনের মূল ভিত্তি।
স্বাতী
ছোটবেলা থেকেই সেই আদর্শকে নিজের জীবনের ধ্রুবতারা বানিয়েছিল। সে ছিল
অসম্ভব আবেগপ্রবণ, সাহিত্যে অনুরাগী এবং শুদ্ধ ভালোবাসায় বিশ্বাসী এক মেয়ে।
সুধাময়বাবু প্রায়ই স্বাতীর মাথায় হাত রেখে বলতেন,
"মা
রে, সততা হলো একটা অদৃশ্য বর্ম। বাইরে থেকে মনে হতে পারে তুই একা, কিন্তু
এই বর্ম তোকে কখনো কোনো ঝড়ে ভেঙে পড়তে দেবে না। নিজের আত্মসম্মান বিক্রি
করে পাওয়া সুখের চেয়ে, মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার দুঃখও অনেক বেশি পবিত্র।"
বাবার
সেই গভীর কণ্ঠস্বর আজও যেন এই ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়।
কিন্তু নিয়তির এক নির্মম পরিহাসে তার বিয়ে হয়েছিল অস্ট্রেলিয়াবাসি প্রবাসী
ভারতীয় নীলয়ের সাথে, যে সব দিক থেকেই ছিল তার বাবার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর
বাসিন্দা।
নীলয়ের পড়াশোনা থেকে শুরু করে যোগ্যতা,
মেধা কিংবা চাকরি—কোনো কিছুতেই সে স্বাতীর বাবার ব্যক্তিত্বের ছায়ার
কাছাকাছি দাঁড়ানোর যোগ্য ছিল না। কিন্তু নিজের কোনো মেধা বা বিশেষ যোগ্যতা
না থাকলেও, নীলয়ের ছিল তার বাবার অঢেল এবং অবৈধ উপার্জনের টাকা। আর সেই
বাপের টাকার জোরেই সে সিডনিতে গিয়ে একটা মাঝারি মানের ছোট্ট আইটি চাকরি
জুটিয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, ওই সামান্য অর্জন আর বিদেশের তকমাটা
নিয়েই নীলয়ের নিজের পুরুষাকারের ওপর ছিল আকাশচুম্বী, অন্ধ অহংকার। তার কাছে
মানুষের ভালোবাসা, আবেগ কিংবা সততা—সবই ছিল অর্থহীন বিলাসিতা এবং বোকা
মানুষদের দুর্বলতা।
আজ যখন স্বাতী সেই পুরোনো টেবিলের
সামনে দাঁড়িয়ে, তখন তার জীবনের চারপাশের আকাশটা এক অদ্ভুত ধূসর রঙে ঢেকে
গেছে। প্রকৃতিও যেন তার ভেতরের ভাঙাচোরা অবস্থাটাকে অনুভব করছিল। চারপাশে
একটা পাথরের মতো ভারী নীরবতা, অথচ সেই নীরবতার ভেতরেই ছিল অসংখ্য
শব্দ—সমাজের অভিযোগ, অপমান, আর অদৃশ্য আঙুল তুলে বিচার করার নিষ্ঠুরতা।
সেদিন
সকালে স্বাতী যখন কোর্টের ভেতর থেকে বেরোচ্ছিল, তার হাতে ছিল একটা কাগজ।
আইনের ভাষায় সেটা ছিল “বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি”—আর তার নিজের জীবনের ভাষায়,
সেটা ছিল একটা রক্তাক্ত ক্ষতের দলিল এবং স্বপ্নের নির্মম বিসর্জন।
কোর্ট
চত্বরের বটগাছটার নিচে সেদিন এমন অনেক মানুষ ছিল, যারা সম্পর্কে স্বাতীর
খুবই কাছের মানুষ, আত্মীয়, পরিচিত, প্রতিবেশী—যারা একসময় তার রাজকীয় বিয়েতে
হাততালি দিয়ে হিংসা করেছিল, তারাই আজ তার এই ভাঙা অবস্থাটাকে দেখতে ভিড়
করেছে। পাড়ার সুরজিৎ কাকা, যিনি একসময় সুধাময়বাবুর কাছে উপকারের জন্য হাত
পেতে দাঁড়িয়ে থাকতেন, তিনিই আজ চশমার ওপর দিয়ে বাঁকা চোখে তাকিয়ে খোঁচা
মারলেন। কেউ সরাসরি মুখে কিছু না বললেও তাদের চোখের কুৎসিত ভাষা, ঠোঁটের
কোণে চাপা উপহাসের হাসি, আর ফিসফিস শব্দগুলো স্বাতীর কানে পরিষ্কার
পৌঁছাচ্ছিল।
"মেয়েটা এত বড় ঘরের বউ হয়েও সংসার করতে পারল না..."
"নিশ্চয়ই মেয়েরই কোনো গোপন দোষ আছে... এতো অহংকার আর দেমাক কি মেয়েদের মানায়? ও তো নিজেও লইয়ার ছিল, আইনের গরম দেখিয়েছে নিশ্চয়ই!"
"ডিভোর্সি মেয়ে… এখন তো সেই বাপের নাম ভাঙিয়ে আর বাপের পেনশনের টাকায় অন্নধ্বংস করবে। সমাজ কি করে ওকে আবার গ্রহণ করবে?"
প্রতিটা
কথা যেন ধারালো কাঁচের টুকরোর মতো স্বাতীর ভেতরটা ফালাফালা করে দিচ্ছিল।
সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল এই বিশাল পৃথিবীটা হঠাৎ খুব ছোট
হয়ে গেছে। যেন তার জন্য কোথাও আর কোনো জায়গা নেই। যেন সে একটা জ্যান্ত ভুল,
একটা চরম ব্যর্থতা—যাকে সবাই এড়িয়ে যেতে চায়, অথবা ছুঁড়ে ফেলে দিতে চায়
ডাস্টবিনে।
বিয়ের পর যখন
স্বাতী প্রথম সিডনি গিয়ে নেমেছিল, তখন তার চোখে ছিল এক বুক ভরা স্বপ্ন।
স্বাতী নিজেও পড়াশোনাতে অত্যন্ত ভালো ছিল। উপরন্তু সে ভারতের একটি নামী
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাস করে হাইকোর্টে লইয়ার হিসেবে খানিকটা নামডাকও
করেছিল। স্বাধীনচেতা অথচ ঐতিহ্যপ্রেমী স্বাতী নীলয়ের সাথে তার জীবনদর্শন
না মিললেও, মনে-প্রাণে ভালোবেসেছিল নিজের স্বামীকে। সে ভেবেছিল নিজের
ভালোবাসা, ধৈর্য আর নমনীয়তা দিয়ে নীলয়ের ভেতরের এই মেকি অহংকার আর কঠিন
হীনম্মন্যতার পাথরটাকে একদিন ঠিকই গলিয়ে জল করে দিতে পারবে। কিন্তু
প্রতিদানে সে পেয়েছে কেবলই শীতল অবহেলা, সন্দেহ আর কুৎসিত কটূক্তি।
বিদেশের
সেই ঝাঁ চকচকে তিন কামরার অ্যাপার্টমেন্টটি স্বাতীর কাছে ধীরে ধীরে একটা
সোনার খাঁচায় পরিণত হয়েছিল। নীলয় তার স্বাধীনভাবে চলাফেরা বা অস্ট্রেলিয়ার
ল-কাউন্সিলে রেজিস্ট্রেশন করার চেষ্টাকে মোটেও ভালো চোখে দেখেনি।
একদিন রাতে ডাইনিংটেবিলে নীলয় মদের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলেছিল,
"শোনো
স্বাতী, এখানে এসে আবার কোর্ট-কাছারির চক্কর কাটার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার
বাপের যা সম্পত্তি আছে আর আমি যা কামাই, তাতে তোমার মতো দশটা মেয়ে বসে
খেতে পারবে। ঘরে থাকবে, ঘর সামলাবে। একজন কর্পোরেট এক্সিকিউটিভের বউয়ের মতো
স্ট্যাটাস বজায় রেখে party-তে হাসিমুখে কথা বলবে—ব্যস, এটাই তোমার কাজ।"
স্বাতী
শান্ত গলায় প্রতিবাদ করে বলেছিল, "নীলয়, পড়াশোনা আর কেরিয়ারটা আমার কাছে
শুধু টাকা উপার্জনের মাধ্যম নয়। ওটা আমার আত্মপরিচয়। আমার বাবা আমাকে নিজের
পায়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন।"
'বাবা' শব্দটা শুনলেই নীলয়ের ভেতরের হীনম্মন্য রাক্ষসটা জেগে উঠত। সে বাঁকা হেসে উপহাসের সুরে বলত,
"ওহ!
প্লিজ! তোমার ওই বাবার মহানতার গল্প আমাকে শুনিও না। তোমার বাবা সরকারের
একজন বড় অফিসার হতে পারেন, কিন্তু ওনার ওই তথাকথিত সততার মূল্য খোলা
বাজারে দু-পয়সাও না। এই সততা দেখিয়ে কী লাভ হলো ওনার? রিটায়ারমেন্টের পর
একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট ছাড়া ব্যাংক ব্যালেন্স তো আর আমার বাবার মতো কোটি কোটি
বানাতে পারলেন না! সততা হলো আসলে অক্ষমদের অজুহাত।"
স্বাতীর
চোখে জল আসত, বুকটা অভিমানে আর ক্ষোভে ফেটে যেতে চাইত। যে ছেলে নিজের
বাপের দুর্নীতির টাকায় বিদেশ গিয়ে সস্তা দেখনদারি করে, সে কীভাবে একজন সৎ,
দেশপ্রেমিক ও উচ্চশিক্ষিত মানুষের জীবনদর্শনকে মূল্যায়ন করবে?
স্বাতী
প্রথম প্রথম মুখ বুজে সহ্য করত, কারণ সে ঘর ভাঙতে চায়নি। সে মধ্যবিত্ত
সংস্কারে বিশ্বাস করত। তার বিশ্বাস ছিল সেই চিরন্তন সত্যটার ওপরে—"ভালোবাসা
নিরক্ষর হলেও চলবে, কিন্তু মন হতে হবে সুশিক্ষিত।" কিন্তু দিন যত যাচ্ছিল,
স্বাতী ততই বুঝতে পারছিল যে নীলয় সিডনিতে চাকরি করলেও, দামী ব্র্যান্ডের
জামাকাপড় পরলেও, তার মনটা আসলে ছিল চরম অশিক্ষিত, সংকীর্ণ আর বর্বর। আর
সেই অশিক্ষিত, হীনম্মন্য মনটাই বারবার স্বাতীর সুশিক্ষিত ভালোবাসার গায়ে
গভীর,রক্তাক্ত ক্ষত এঁকে দিচ্ছিল।
অপমান যতক্ষন চার
দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তাও স্বাতী মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল,
কিন্তু নীলয়ের অত্যাচার মানসিক নির্যাতন থেকে ধীরে ধীরে শারীরিক লাঞ্ছনার
দিকে মোড় নিতে শুরু করল। স্বাতী যদি কখনো ভারতের কোনো বান্ধবীর সাথে বা
বাবার সাথে ফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা বলত, নীলয় ফোন কেড়ে নিয়ে আছাড় মারত। সন্দেহ
করত তার চরিত্র নিয়ে।
"কাকে অত ফোন করা হচ্ছে?
ইন্ডিয়াতে কোনো পুরনো বয়ফ্রেন্ড রেখে এসেছ বুঝি? ল-কলেজের কোনো চেনা জর্জ
বা উকিল?" নীলয়ের এই কুৎসিত ইঙ্গিতগুলো স্বাতীর আত্মসম্মানকে প্রতিদিন
চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিত। সে একসময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজেকে চিনতে
পারত না। এই কি সেই উজ্জ্বল, আত্মবিশ্বাসী স্বাতী, যে জুরির সামনে দাঁড়িয়ে
সওয়াল জবাব করত?
মানুষের
সহ্যশক্তিরও একটা শেষ সীমা থাকে।আর স্বাতীর সেই চেনা জগৎটা সেইদিনই
ওলটপালট হয়ে গেল, যখন সে দেশ থেকে একটা ফোন পেল। ফোনের ওপার থেকে দাদার
কান্নাভেজা গলা ভেসে এল—বাবা আর নেই। এক আকস্মিক, তীব্র হৃদরোগে আক্রান্ত
হয়ে তিনি চিরতরে চোখ বুজেছেন।
স্বাতীর মাথার ওপরে যেন
এক মুহূর্তে আস্ত আকাশটাই ভেঙে পড়েছিল। সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়,
তার আদর্শ, তার পরম ভরসার বাতিঘরকে হারাল। সে পাগলের মতো কাঁদতে কাঁদতে
নীলয়কে বলল, "নীলয়, আমার টিকিটের ব্যবস্থা করো। আমি এখনই দেশে যাব। আমার
বাবা চলে গেছেন নীলয়..."
কিন্তু সেই চরম শোকের
মুহূর্তে নীলয়ের আচরণ ছিল অভাবনীয় রকমের নিষ্ঠুর, অমানবিক ও উদাসীন। নীলয়
স্বাতীকে সান্ত্বনা দেওয়া তো দূর, অত্যন্ত হালকা চালে তার ল্যাপটপে অফিসের
কাজ করতে করতে, কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
"আরে এত
কান্নাকাটির কী আছে? জন্ম হলে তো মৃত্যুই হবে, এটা জীবনেরই একটা অংশ। ওনার
বয়স হয়েছিল, গেছেন। এটা নিয়ে এত নাটক করার কী মানে? জীবন তো আর কারুর জন্য
থেমে থাকবে না। আর উনি তো দেশের জন্য অনেক সততা দেখিয়েছেন, কোনো উপরি টাকা
নেননি। দেখো এখন তোমাদের ভগবান উনার জন্য কী স্বর্গ তৈরি করেন! এবার ওনার
চিন্তা বাদ দিয়ে একটু প্র্যাক্টিক্যাল হও। আমার সামনের সপ্তাহে একটা
ইম্পর্টেন্ট ক্লায়েন্ট মিটিং আছে, আমি এখন লিভ নিতে পারব না। আর তুমিও একা
একা গিয়ে কী করবে? শ্রাদ্ধ- শান্তি তো ওখানকার পুরুত মশাইরাই করিয়ে দেবে।আর
সে সব তো তোমার মা -দাদাই মিটিয়ে নিতে পারবে।"
নীলয়ের
এই একটা কথাই যেন জ্বলন্ত আগুনে এক গ্যালন পেট্রোল ঢেলে দিল। স্বাতী
স্তম্ভিত হয়ে, চোখের জল স্তব্ধ করে নীলয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। যে মানুষটা
নিজের যোগ্যতাহীনতার দেমাক দেখাতে গিয়ে একটা মেয়ের মৃত বাবার চলে যাওয়াকে
'নাটক' বলতে পারে, যে মানুষটা একটা সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় শোককে এতটা
সস্তা উপহাসে উড়িয়ে দিতে পারে, তার সাথে আর যাই হোক—আর এক ছাদের নিচে থাকা
যায় না।
স্বাতীর মনে হলো, নীলয়ের ভেতরের পুরুষাকার
আসলে একটা ফাঁপা রঙিন বেলুন, যা কেবল বাপের কালো টাকার জোরে বাতাসে ভাসছে।
নীলয়ের চরম অশিক্ষিত মন আজ স্বাতীর আত্মসম্মান ও পিতৃভক্তিতে এমন এক কুৎসিত
আঘাত করেছে, যার কোনো উপশম নেই, কোনো ক্ষমা নেই।
স্বাতী
আর একটা মুহূর্তেও দ্বিধা করেনি। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, যে সংসারে নিজের
আবেগের, নিজের শিক্ষার কোনো মূল্য নেই, যেখানে তার উচ্চশিক্ষিত ও আদর্শবান
মৃত বাবার প্রতি ন্যূনতম কোনো শ্রদ্ধা নেই, সেখানে টিকে থাকা মানে নিজের
আত্মাকে প্রতিদিন বিষ খাইয়ে হত্যা করা। তার চেয়ে সারাজীবন একলা থাকা,
সমাজের গালি খাওয়া অনেক শ্রেয়। সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাটাই এখন তার জীবনের
একমাত্র মূলমন্ত্র।
পরদিন সকালে, সিডনির আকাশে যখন
ভোরের আলো ফুটছে, নীলয় তখনো মদের ঘোরে গভীর ঘুমে মগ্ন। স্বাতী কোনো শোরগোল
করল না, কোনো ঝগড়া বা অভিযোগের ঝড় তুলল না। সে নিঃশব্দে তার পাসপোর্ট, কিছু
দরকারি সার্টিফিকেট আর একটা ছোট ট্রলি ব্যাগ হাতে তুলে নিল। নীলয়ের দেওয়া
সমস্ত গয়না, দামী শাড়ি সে ড্রেসিং টেবিলের ওপর সাজিয়ে রেখে দিল।
যাওয়ার আগে, আলমারির ওপর সে একটা সাদা কাগজে কলম দিয়ে লিখে রেখে গেল একটিমাত্র ছোট্ট লাইন—
"মন যদি অশিক্ষিত হয়, তবে শিক্ষিত ভালোবাসাও কেবল আঁকবে ক্ষত।"
সে
নীলয়কে তার মেকি অহংকারের চাদরে ঘুমন্ত রেখেই নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে
ক্যাব ধরে এয়ারপোর্টে চলে এল। চিরদিনের জন্য সে অস্ট্রেলিয়ার সেই
বিলাসবহুল খাঁচাকে বিসর্জন দিল।
ইন্ডিয়াতে
ফিরে আসার পর স্বাতীর জীবনটা মোটেই সুগম হয়নি। বাবার মৃত্যুর শোক কাটতে না
কাটতেই শুরু হলো সম্পর্কের এক নতুন এবং রূঢ় মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। যে মা
(করুণাদেবী) সারাজীবন সুধাময়বাবুর আদর্শের ছায়ায় থেকে এক ধরণের সামাজিক
সুরক্ষায় অভ্যস্ত ছিলেন, তিনিও স্বাতীর এই ফিরে আসাকে সহজভাবে নিতে পারলেন
না।
স্বাতী যখন ভাঙা মন নিয়ে চ্যাটার্জী বাড়ির দরজায় দাঁড়াল, করুণাদেবী কপালে হাত দিয়ে কেঁদে উঠলেন,
"একী
অলক্ষুণে কাণ্ড করলি স্বাতী? জামাইয়ের ঘর ছেড়ে চলে এলি? লোকে যে মুখে
চুনকালি দেবে! মেয়েদের একটু মানিয়ে-গুছিয়ে চলতে হয়। তোর বাবার ওই অতিরিক্ত
অহংকার আর নীতিটাই তোকে শেষ করল। উনি তো মরে বেঁচে গেলেন, এখন আমি সমাজকে
মুখ দেখাব কী করে?"
মায়ের এই আকস্মিক ভোলবদল এবং
বাবার আদর্শকে দোষারোপ করাটা স্বাতীর বুকে নীলয়ের অত্যাচারের চেয়েও বড়
ধাক্কা হয়ে লাগল। সে বুঝল, তার মা আসলে সমাজের চোখে 'ভালো মা' ও 'ভালো
শাশুড়ি' সাজার মোহে অন্ধ।
এদিকে ভাই-বোনের সম্পর্কের
রসায়নটাও এক লহমায় বদলে গেল। স্বাতীর বড়দা, সৈকত, যিনি একসময় বোনের সাফল্যে
গর্ব বোধ করতেন, এখন তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। সৈকতের নিজের চাকরির
পরিবেশটা ভালো যাচ্ছিল না, তায় আবার বাবার মৃত্যুর পর সম্পত্তির
উত্তরাধিকারের প্রশ্ন এসেছে। স্বাতীর ফিরে আসাটাকে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী
(বৌদি সুমনা) দেখছেন এক বিশাল বোঝা এবং ভাগীদার হিসেবে।
একদিন ড্রয়িংরুমে সৈকত রুক্ষ গলায় বলল,
"দেখ
স্বাতী, তুই যদি ভাবিস বাবার এই ফ্ল্যাটে সারাজীবন ডিভোর্সি তকমা নিয়ে বসে
থাকবি, আর আমরা পাড়ার লোকের কথা শুনব, তা কিন্তু হবে না। এত অলীক অহংকার
দেখানোর কী দরকার ছিল? নীলয় একটু আধটু শাসন করেছে তো কী হয়েছে? টাকা তো
দিচ্ছিল! এখন তুই ল-ইয়ারগিরি করবি আর কোর্টের লোক আমাদের দিকে আঙুল তুলবে,
এটা আমি বরদাস্ত করব না।"
বৌদি সুমনা পাশ থেকে আলতো
করে বিষ ঢাললেন, "আসলে কী জানো বোনটি , বেশি পড়াশোনা করলে আবার মেয়েদের
মাটিতে পা থাকে না। এখন বাপের পেনশনের টাকায় আর কদিনই বা টানবে? শেষমেশ
তো দাদার ওপরেই চাপবে !"
স্বাতী অবাক হয়ে দেখল,
রক্তের সম্পর্কগুলোও কীভাবে টাকার মাপকাঠিতে এবং সামাজিক সম্মানের
দাঁড়িপাল্লায় বদলে যায়। যে ভাই ছোটবেলায় তাকে চকোলেট এনে দিত, আজ সে-ই তাকে
পর ভাবছে। আত্মীয়দের কটূক্তি, সমাজের বাঁকা চাউনি, আর কোর্টের চত্বরে
দাঁড়িয়ে মানুষের ফিসফিসানি স্বাতীর জীবনকে আরো বিষময় করে তুলেছিল। কিন্তু
স্বাতীর ভেতরে ছিল তার বাবার রক্ত। সে ভেঙে পড়লেও মচকে যেতে রাজি ছিল না।
সে
আবার কোর্টের কালো কোটটা গায়ে জড়াল। চার বছরের গ্যাপের পর আবার নতুন করে
ওকালতি শুরু করা সহজ ছিল না। জুনিয়ার উকিলরা তাকে দেখে হাসত, মক্কেলরা
একাকী নারীর যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করত। কিন্তু স্বাতী হাল ছাড়েনি।
দিনে কোর্টের ফাইলের পর ফাইল পড়া, আর রাতে বাবার ছবির সামনে বসে চোখের জল
ফেলা—এই ছিল তার দিনলিপি।
কোর্টে প্রায়ই তার বিপক্ষের পুরুষ উকিলরা তাকে মানসিকভাবে হেনস্থা করার চেষ্টা করত। কেস চলাকালীন ব্যক্তিগত আক্রমণ করত,
"ম্যাডাম
তো নিজের ঘরটাই সামলাতে পারলেন না, তিনি আবার মক্কেলকে জাস্টিস কীভাবে
পাওয়াবেন ? যার নিজের জীবনেই আইন খাটেনি, সে অপরের জন্য কী সওয়াল করবে?"
এজলাসের
ভেতরে সেই সমস্ত কটূক্তির উত্তর স্বাতী মুখে দিত না। সে উত্তর দিত আইনের
ধারালো যুক্তিতে, অকাট্য নথিপত্রে। তার চোখের জল তখন আর দুর্বলতা ছিল না,
তা হয়ে উঠেছিল এক একটি জ্বলন্ত অঙ্গার। সে সমাজের এই রূঢ় বাস্তবতাকে মেনে
নিয়েছিল যে, এখানে একটা মেয়েকে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে গেলে পুরুষের
চেয়ে দশগুণ বেশি খাটতে হয়।
ধীরে ধীরে স্বাতীর সততা,
প্রখর মেধা আর নির্ভীক সওয়াল-জবাব কোর্টের করিডোরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠল।
সে একের পর এক কঠিন এবং প্রায় হেরে যাওয়া কেস জিততে শুরু করল।
সবচেয়ে
বড় পরিবর্তন এল তার পরিবারে। যখন স্বাতী নিজের ক্ষমতায় একটি বড় কেস জিতে
সংবাদপত্রের শিরোনামে এল এবং নিজের উপার্জনে আলাদা ফ্ল্যাট কিনে মাকে নিজের
সাথে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিল, তখন দাদা সৈকত ও বৌদি সুমনার গলার সুর
রাতারাতি বদলে গেল।
সৈকত একদিন লজ্জিত মুখে এসে বলল,
"স্বাতী, আমি আসলে বুঝতে পারিনি বোন... তুই যে এতটা লড়তে পারবি। বাবার আসল
যোগ্য উত্তরসূরি তো তুই-ই।"
মা করুণাদেবীও মেয়ের এই
অনমনীয় জেদ আর সততার সামনে নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। তিনি স্বাতীর হাত ধরে
কেঁদে ফেলে বললেন, "আমাকে ক্ষমা করিস মা। আমি সমাজের ভয়ে তোর বাবার
আদর্শকেই ভুলে গিয়েছিলাম। আজ বুঝলাম, তুই তোর বাবার মান রেখেছিস।"
বিশেষ
করে যেসব নারীরা গার্হস্থ্য হিংসার শিকার, তাদের জন্য স্বাতী হয়ে উঠল এক
ভরসার নাম। সে তাদের হয়ে নিখরচায় লড়তে লাগল, কারণ সে নিজে সেই নরকযন্ত্রণা
ভোগ করে এসেছে।
এইভাবে
বছরের পর বছর কেটে গেছে। অনেক কষ্ট, অনেক একাকী রাত, অনেক ব্যর্থতার গ্লানি
আর সমাজের হাজারো কটূক্তি মাথায় নিয়ে স্বাতী আজ ভারতের একজন অন্যতম
শীর্ষস্থানীয় এবং সম্মানীয় আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আজ
সমাজের মানুষ তাকে ‘ডিভোর্সি মেয়ে’ বলে অবহেলা করে না, বরং তাকে দেখে
মায়েরা তাদের মেয়েদের বলে, "স্বাতীর মতো সাহসী হতে শেখো।"
আজকের
দিনটা স্বাতীর জীবনে এক পরম প্রাপ্তির দিন। সুপ্রিম কোর্টের বার
অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে তাকে ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যান্ড লিগ্যাল
জাস্টিস’ সম্মানে ভূষিত করা হচ্ছে। দিল্লির এক সুবিশাল কনভেনশন হলে ভারতের
আইনমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি এবং হাজার হাজার গুণী মানুষের সামনে স্বাতী
মঞ্চে এসে দাঁড়াল। হলের দর্শকাসনে বসে আছেন তার মা করুণাদেবী, যাঁর চোখে আজ
অনুশোচনা ছাড়িয়ে গর্বের অশ্রু।
স্বাতীর পরনে রয়েছে
একটি সাধারণ সিল্কের শাড়ি, চুলে হালকা পাক ধরেছে, কিন্তু চোখে সেই বাবার
মতোই এক প্রখর, দীপ্ত এবং শান্ত চাউনি। তার হাতে তুলে দেওয়া হলো সেই
সম্মানজনক ট্রফি। পুরো হলঘর তখন করতালি আর প্রশংসার বন্যায় ভেসে যাচ্ছে।
ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটগুলো তার মুখের ওপর এসে পড়ছে।
মাইক্রোফোনের
সামনে দাঁড়িয়ে স্বাতী কিছুক্ষণ নিথর হয়ে রইল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল
সিডনির সেই অন্ধকার ঘর, আলমারির ওপর ফেলে আসা সেই চিঠি, আর বাবার সেই শান্ত
ছবিটা। বাবার সেই কথাটি আবার মনে পড়ল—“নিজের আত্মসম্মান বিক্রি করে পাওয়া
সুখের চেয়ে, মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার দুঃখও অনেক বেশি পবিত্র।” আজ স্বাতী
বাবার সেই ঋণ কানায় কানায় শোধ করেছে।
সে গভীর একটা নিশ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করল,
"আজ
আপনারা আমার যে জয় দেখছেন, যে সম্মান দেখছেন, তার পেছনে একটা গভীর ক্ষত
এবং একটি মহাপবিত্র বিসর্জনের গল্প লুকিয়ে আছে। আজ থেকে অনেক বছর আগে, আমি
যখন আমার আত্মসম্মান, আমার শিক্ষা আর আমার বাবার আদর্শকে বাঁচানোর জন্য
আমার সংসার বিসর্জন দিয়েছিলাম, তখন এই সমাজ আমাকে অযোগ্য বলেছিল। আমাকে বলা
হয়েছিল, আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সমাজ ভেবেছিল স্বামী ছাড়া নারীর কোনো
অস্তিত্বই থাকতে পারে না।"
স্বাতীর গলাটা একটু কেঁপে উঠল, কিন্তু সে সামলে নিল। সে ট্রফিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
"আমি
সেদিনই বুঝেছিলাম, ভালোবাসা মানে সবসময় একটা কুৎসিত, অপমানজনক সম্পর্কের
খাঁচায় আটকে থাকা নয়। কখনো কখনো নিজের আত্মমর্যাদাকে বাঁচানোর জন্য দূরে
সরে যাওয়াটাও ভালোবাসার এবং জীবনের গভীরতম বহিঃপ্রকাশ। আমি আমার জীবনের সেই
সোনালী খাঁচাকে বিসর্জন দিয়েছিলাম বলেই, আজ এই মুক্ত আকাশে ডানা মেলতে
পেরেছি। আজ আমার এই জয় সেই সমস্ত নারীদের জন্য, যারা প্রতিদিন চার দেওয়ালে
নিজের আত্মাকে হত্যা করছে। মনে রাখবেন, সমাজ আপনাকে তখনই মানবে, যখন আপনি
নিজে নিজের মর্যাদা রক্ষা করতে শিখবেন।"
পুরো হলঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। অনেকের চোখেই তখন জল। স্বাতী মঞ্চ থেকে নেমে এল।
আজ
স্বাতী অনেক দূরে, নিজের তৈরি করা এক নিজস্ব জগতে শান্তিতে বাস করছে। তার
বুকে এখন আর নীলয়ের প্রতি কোনো হাহাকার নেই, কোনো ক্ষোভ বা রাগও নেই। সে
বুঝে গেছে, নীলয় হয়তো সারাজীবন তার বাপের কালো টাকার অহংকার, তার স্বল্প
অর্জিত বিদেশী চাকরি, আর সংকীর্ণ মানসিকতার ছোট বৃত্তেই বন্দি থাকবে। সে
কোনোদিনও জানতে পারবে না মুক্ত আকাশের স্বাদ কী, সুশিক্ষিত মনের গভীরতা কী।
আর
স্বাতী? সে স্মৃতির অস্পষ্ট ভিড়ে নীলয়কে চিরতরে হারিয়ে দিয়েও নিজের ভেতরে
খুঁজে পেয়েছে এক পরম আত্মমর্যাদা ও অনাবিল শান্তি। একলা পথ চলার এই দীর্ঘ
মরুভূমি পার হয়ে সে আজ এক মুক্ত আকাশ ছোঁয়া পাখি, যার ডানায় আর কোনো ক্ষতের
দাগ নেই, আছে শুধু ওড়ার অফুরন্ত আনন্দ। সে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে
মনে শুধু একটাই প্রার্থনা করে—
"ভালো থেকো তুমি তোমার মতন, তোমার চেনা ছোট জগতে। আমি মুক্ত, আমি অপরাজিতা।"

Comments
Post a Comment